১
‘আপেক্ষিকতা (Relativity)’ কে আবিষ্কার করেছিলেন? আইনস্টাইন? না, ভুল বলেছেন। আপেক্ষিকতা কথাটি প্রথমে কিন্তু গ্যালিলিও উল্লেখ করেছিলেন ১৬৩৯ সালে, যখন তিনি চলন্ত জাহাজে একটি পতনশীল বস্তু এবং একটি স্থির দালানে একই ধরনের বস্তুর আচরণকে তুলনা করেছিলেন। তবে আলোর কাছাকাছি গতিতে চললে বস্তুগুলোর কী হবে, এ ধারণাকে আইনস্টাইনই প্রথম গ্যালিলিওর আপেক্ষিকতা অনুসারে সূত্রবদ্ধ করেছিলেন। তিনি দেখিয়েছিলেন যে এ ক্ষেত্রে সময় শ্লথ হয়ে আসবে এবং স্থান সংকুচিত হবে।
২
আইনস্টাইনও একে ‘আপেক্ষিকতা’ বলে উল্লেখ করেননি। ১৯০৫ সালে প্রকাশিত তাঁর বিখ্যাত ‘ইলেকট্রোডাইনামিকস অব মুভিং বডিস’ নিবন্ধটিতে শব্দটি ছিল না। তিনি শব্দটিকে ঘৃণা করতেন। এর বদলে তিনি পছন্দ করতেন ইনভেরিয়েন্স থিওরি (Invariance Theory) ব্যবহার করতে। কারণ, পদার্থবিদ্যার নিয়ম সব দর্শকের কাছে একই রকম মনে হবে।
৩
স্থান-কালের অবিচ্ছিন্নতা? না, এটাও আইনস্টাইনের নয়। সময়কে চতুর্থ মাত্রা হিসেবে ধরার আইডিয়াকে গাণিতিকভাবে প্রথম প্রকাশ করেছিলেন আইনস্টাইনেরই অধ্যাপক হারম্যান মিনকাউস্কি। উচ্চতর গণিতে আইনস্টাইনের কিছু দুর্বলতা রয়েছে, এটা তিনি জানতেন বলেই তাঁকে লেজি ডগ বা অলস কুকুর বলে ডাকতেন।
৪
বিখ্যাত যে সূত্রটির জন্য আমরা আইনস্টাইনকে জানি, সেই E=Mc2 সূত্রটিও আইনস্টাইনের এক বছর আগে ফ্রেডারিখ হাসেনওহল প্রকাশ করেছিলেন। তাঁর নামটি আগে কোথাও শোনেননি? ফ্রেডারিখ তাঁর সমীকরণটি আপেক্ষিকতার সঙ্গে যোগসূত্র স্থাপন করতে ব্যর্থ হয়েছিলেন, এ কারণেই তিনি প্রচারের আলো থেকে বঞ্চিত হয়েছেন।
৫
সুইস পেটেন্ট চাকরিরত অবস্থায় নিজের রুটিন কাজে ফাঁকি দিয়ে, লুকিয়ে লুকিয়ে যখন কেউ তাঁকে লক্ষ করতেন না, তখন বিশেষ আপেক্ষিকতার সমাধান করেছেন আইনস্টাইন। আশপাশে কাউকে দেখলে তিনি খসড়া খাতাটি ড্রয়ারে লুকিয়ে ফেলতেন।
৬
আপেক্ষিকতার দুটি প্রকারভেদ রয়েছে—বিশেষ আপেক্ষিকতা; নির্দিষ্ট গতিতে ছুটে চলা বস্তুর ওপর কাজ করে। আর সাধারণ আপেক্ষিকতা কাজ করে ত্বরিতগতিতে ছুটে চলা বস্তু এবং মহাকর্ষ–সংক্রান্ত কাজে। বিশেষ আপেক্ষিকতা প্রকাশের এক দশক পর আইনস্টাইন সাধারণ আপেক্ষিকতা প্রকাশ করেন।
৭
অন্তরঙ্গতাও আপেক্ষিক। ‘আমার স্ত্রীকে আমার প্রয়োজন। কারণ, সে-ই আমার প্রয়োজনীয় সব গাণিতিক সমস্যা সমাধান করে দেয়,’ আইনস্টাইন এ রকমই লিখেছিলেন ১৯০৪ সালে। তবে শিগগিরই তাঁদের সম্পর্কে তিক্ততা দেখা দেয়। তারই জেরে ১৯১৪ সালে মিলেভাকে আদেশ দেন তাঁর কাছ থেকে দূরে থাকতে, সামাজিক কারণে যতটুকু প্রয়োজন হয়, তার চেয়ে কাছে যেন না আসেন।
৮
সাধারণ আপেক্ষিকতার জন্য প্রয়োজনীয় গণিতজ্ঞান আইনস্টাইনের ছিল না। ফলে তিনি শরণাপন্ন হলেন স্কুল ও কলেজজীবনের বন্ধু মার্সেল গ্রসম্যানের। গ্রসম্যানও খুশিমনে তাঁকে সাহায্য করেন।
৯
এরপর সাধারণ আপেক্ষিকতায় প্রথম দিককার সমীকরণে মহাকর্ষ বলের আকর্ষণে আলোক বিচ্যুতির পরিমাণ সম্পর্কে কিছু ভুল রয়ে গিয়েছিল। পরে এটি শুদ্ধ করা হয়। তবে ১৯১৪ সালে প্রথমবার যখন ক্রিমিয়াতে সূর্যগ্রহণ পরীক্ষা করে তার তত্ত্বটি যাচাই করার প্রস্তাব করা হয়েছিল, তা করা হলে তত্ত্বটি ভুল প্রমাণিত হতো—প্রথম মহাযুদ্ধের কারণে সে উদ্যোগ পরিত্যক্ত হয়। ১৯১৯ সালে আফ্রিকার পশ্চিম উপকূলে সূর্যগ্রহণ চলাকালে পদার্থবিদ এডিংটনের নেতৃত্বে এটি পরীক্ষা করা হয়। আইনস্টাইনের সৌভাগ্য, তত দিনে এর গাণিতিক ভুলটি শুদ্ধ করে নেওয়া হয়েছে এবং এডিংটন প্রত্যাশিত ফলটিই পেয়েছিলেন। এরপরই আইনস্টাইন বিখ্যাত হয়ে ওঠেন। বিশ্বখ্যাত এবং তাঁর উষ্কখুষ্ক চুল–গোঁফসহ ছবি কফির মগে ছাপা হতে শুরু করে।
১০
এটি কেউই লক্ষ করেননি, ১৯৫৫ সালে আইনস্টাইনের মৃত্যুর সময় পর্যন্তও সাধারণ আপেক্ষিকতার কোনো প্রমাণ বিজ্ঞানীদের কাছে ছিল না। ১৯৬০ সালে বিজ্ঞানীরা কৃষ্ণগহ্বর ও নিউট্রন তারকা আবিষ্কার করেন, যা স্থান–কালকে প্রবলভাবে দুমড়েমুচড়ে দেয়। বর্তমানে সাধারণ আপেক্ষিকতা অনেকটাই স্পষ্ট। সেটা এতটাই, এর সাহায্যে ছায়াপথের ভর মাপতে, দূরবর্তী গ্রহগুলোকে (Exoplanets) চিহ্নিত করতে ব্যবহার করতে পারি।
১১
আপেক্ষিকতা কী? এটি এখনো যদি আপনি না বোঝেন, তবে তা আইনস্টাইনের উদ্ধৃতি থেকেই বুঝে নিন, ‘একটি গরম চুলার ওপর আপনার হাত এক মিনিট রাখুন, আপনার কাছে মনে হবে যেন এক ঘণ্টা। আবার একজন সুন্দরী মেয়ের সঙ্গে এক ঘণ্টা সময় গল্প করুন, মনে হবে যেন মাত্র এক মিনিট সময় পেরিয়েছে।’
১২
ডেভিড হিলবার্ট ছিলেন আইনস্টাইনেরই বন্ধু। কিন্তু একসময় তাঁদের মধ্যে মনোমালিন্য দেখা দেয়। এর কারণ, হিলবার্টও আপেক্ষিকতার একটি সাধারণ তত্ত্ব প্রকাশ করেছিলেন, তা আইনস্টাইনের প্রকাশিত তত্ত্বের পাঁচ দিন আগে। এ ঘটনায় তাঁদের মধ্যে দূরত্ব তৈরি হয়, একে অন্যের বিরুদ্ধে কুম্ভিলকতার অভিযোগ আনেন। বিশেষজ্ঞরা পরে দুজনের কাজই পরীক্ষা করে দেখেন। হিলবার্টের সমীকরণে কিছু ঘাটতি থাকায় বিশেষজ্ঞরা আইনস্টাইনকেই আপেক্ষিকতার প্রকৃত জনক বলে রায় দেন।
১৩
১০০ বছরের বেশি আগে জন্ম হওয়া আপেক্ষিকতার সূত্র এখন আমাদের বুঝতে সাহায্য করছে কৃষ্ণগহ্বর অদৃশ্য বস্তু ও অদৃশ্য শক্তি, বিগব্যাং এবং তৎপরবর্তী ঘটনাক্রম, আমাদের ত্বরিতগতিতে প্রসারমাণ মহাবিশ্ব, মহাকর্ষ তরঙ্গ ইত্যাদি সবকিছু। একদিন হয়তো তা আমাদের কাঙ্ক্ষিত মহা একীভবন তত্ত্ব (Grand unified theory বা GUT) এনে দেবে, যার মাধ্যমে আমরা আমাদের মহাবিশ্বের একটি পূর্ণ চিত্র পেয়ে যাব। শতবর্ষ আগে আইনস্টাইনের ক্ষুদ্র পদক্ষেপ আমাদের এখন যেমন সাহায্য করছে, তেমনি আরও ১০০ বছরও তা মহাজগতের রহস্য অন্বেষণে সাহায্য করবে, এমনটাই বিজ্ঞানীরা মনে করছেন।
১৪
আইনস্টাইনের আগে গতিবিদ্যাকে বুঝতে ব্যবহার করা হতো নিউটনের সূত্র। নিউটন ১৬৮৭ সালে দেখান, মহাবিশ্বের সবকিছুই একে অন্যকে মহাকর্ষ দ্বারা আকর্ষণ করে। যে মহাকর্ষ বল পৃথিবীকে সূর্যের চারদিকে আবর্তন করায়। তবে এই মহাকর্ষ বলের উৎপত্তি কোথায়, তা নিয়ে নিউটন কখনো ভাবেননি।
১৫
দার্শনিক ভেডিড হিউম একটি প্রবন্ধ লেখেন। নাম ট্রিয়েটিস অব হিউম্যান। হিউমের লেখাটি স্থান ও কাল নিয়ে আইনস্টাইনের চিন্তাভাবনাকে প্রভাবিত করে। হিউম ছিলেন অভিজ্ঞতাবাদী ও সংশয়বাদী (Empiricist ও Skeptic)। তিনি বিশ্বাস করতেন, বৈজ্ঞানিক ধারণাগুলো অবশ্যই প্রমাণ ও প্রত্যক্ষণভিত্তিক হতে হবে, শুধু যুক্তি যথেষ্ট নয়। বস্তুর চলা আর সময় আলাদা কিছু নয় বলে তিনি বিশ্বাস করতেন। ‘এই দার্শনিক মতবাদগুলো ছাড়া আমি কিছুতেই এ রকম একটি সমাধানে আসতে পারতাম না,’ আইনস্টাইন নিজেই এটি বলেছেন।
লেখক: অবসরপ্রাপ্ত চিকিৎসক
সূত্র: আইনস্টাইন: দ্য লাইফ অ্যান্ড টাইমস/ রোনাল্ড ডব্লিউ ক্লার্ক