একুশে ২১
কোয়ান্টাম জগতের ভৌতিক রহস্য
একবিংশ শতাব্দী এখনও চলছে, কিন্তু এই সময়টাই আমাদের ভাবনার ভাষা বদলে দিচ্ছে। আগে যেসব প্রশ্নের উত্তর সহজ মনে হতো, সেগুলো এখন নতুন করে ভাবতে হচ্ছে। মানুষ, জীবন, প্রকৃতি ও মহাবিশ্ব যেন ধীরে ধীরে বদলে যাচ্ছে। এই বদলের পেছনে আছে কিছু শক্তিশালী ধারণা। সেগুলো শুধু ল্যাবরেটরিতে সীমাবদ্ধ নয়, আমাদের দৈনন্দিন জীবনেও প্রভাব ফেলছে। নিউ সায়েন্টিস্ট-এ প্রকাশিত তেমন ২১টি ধারণার সঙ্গে আমরা ধীরে ধীরে পরিচিত হব। সেগুলো একবিংশ শতাব্দীর চিন্তাজগৎকে নতুন পথে নিয়ে গেছে।
ষষ্ঠ পর্বে থাকছে কোয়ান্টাম স্পুকিনেস
১৯৩০-এর দশক। আলবার্ট আইনস্টাইন কোয়ান্টাম গবেষণার জগতে ডুবে আছেন। কোয়ান্টাম তত্ত্বের খুঁত খুঁজতে গিয়ে তিনি এমন একটি বিষয় আবিষ্কার করে বসলেন, যা তাঁকেই বিভ্রান্তিতে ফেলে দিল। তিনি ভাবলেন, এটি কোয়ান্টাম তত্ত্বের ত্রুটি। কিন্তু কয়েক দশক পর দেখা গেল, আইনস্টাইন যাকে ভুল ভেবেছিলেন, সেটাই আসলে কোয়ান্টাম জগতের সবচেয়ে বড় ও অদ্ভুত বৈশিষ্ট্য; কোয়ান্টাম এনট্যাঙ্গেলমেন্ট। আইনস্টাইন একে বলেছিলেন ভুতুড়ে—দূর থেকে ভুতুড়ে কাণ্ড। শেষ পর্যন্ত বিজ্ঞানীদের পরীক্ষায় এই ভৌতিক নীতিই সত্য প্রমাণিত হয়েছে, যা আমাদের চিন্তার জগৎকে আমূল বদলে দিয়েছে।
কোয়ান্টামের এই অদ্ভুত বৈশিষ্ট্যটি এখন বেল নন-লোকালিটি নামেও পরিচিত। সহজ কথায় এর অর্থ হলো, মহাবিশ্বের দুটি কোয়ান্টাম বস্তু একে অপরের চেয়ে হাজার হাজার মাইল দূরে থাকলেও তাদের মধ্যে এক গভীর যোগাযোগ থাকতে পারে। আমাদের সাধারণ বুদ্ধিতে এটি মেলানো কঠিন। তবুও একবিংশ শতাব্দীতে বিজ্ঞানের অন্যতম সেরা ধারণা এটি।
বিষয়টি বুঝতে একজোড়া মোজার কথা কল্পনা করুন। একটি বাঁ পায়ের, অন্যটি ডান পায়ের। সাধারণ পৃথিবীতে আপনি যদি মোজা দুটিকে আলাদা বাক্সে ভরে অ্যালিস এবং ববকে দিয়ে দেন, তবে বাক্স খোলার আগেই মোজাগুলোর পরিচয় নির্দিষ্ট থাকে। অ্যালিস বাক্স খুলে বাঁ পায়ের মোজা পেলে বব অবশ্যই ডান পায়েরটা পাবে, এটা সাধারণ যুক্তি। কিন্তু কোয়ান্টাম জগতটা এমন নয়। সেখানে বাক্স খোলার আগপর্যন্ত মোজাগুলোর কোনো নির্দিষ্ট পরিচয় থাকে না। দুটোই একই সঙ্গে ডান ও বাঁ পায়ের হতে পারে!
কোয়ান্টাম এনট্যাঙ্গেলমেন্ট বলতে বোঝায় মহাবিশ্বের দুটি কোয়ান্টাম বস্তু একে অপরের চেয়ে হাজার হাজার মাইল দূরে থাকলেও তাদের মধ্যে এক গভীর যোগাযোগ থাকতে পারে।
মজার ব্যাপার হলো, অ্যালিস যখনই তার বাক্স খুলে দেখবে মোজাটি বাঁ পায়ের, ঠিক সেই মুহূর্তেই হাজার মাইল দূরে থাকা ববের বাক্সের মোজাটি ডান পায়ের হয়ে যাবে। মাঝখানের এই যোগাযোগটা ঘটে চোখের পলকে, আলোর গতির চেয়েও দ্রুত। যেন কোনো জাদুমন্ত্রে ওরা একে অপরের খবর জেনে যাচ্ছে!
এবার কণার জগতে আসা যাক। অ্যালিস ও বব দুজনের কাছেই এমন একজোড়া কণা আছে, যেগুলো এনট্যাঙ্গেলড বা একে অপরের সঙ্গে ওতপ্রোতভাবে জড়িত। এই কণাগুলো একে অপরের থেকে বহু দূরে থাকলেও এদের ভাগ্য এক সুতোয় বাঁধা। কোনো সংকেত ছাড়াই অ্যালিস তার কণাটি পরিমাপ করার সঙ্গে সঙ্গে ববের কণার অবস্থাও নির্ধারিত হয়ে যায়। আইনস্টাইন এই ভুতুড়ে যোগাযোগ মেনেই নিতে পারেননি।
কোয়ান্টাম বাস্তবতা আপনাকে অস্বস্তিতে ফেলতে বাধ্য। এটি ভীষণ অনিশ্চিত। কোয়ান্টাম তত্ত্ব অনুযায়ী, কোনো পরমাণু যখন কেউ পর্যবেক্ষণ করে না, তখন সেটি নির্দিষ্ট কোনো স্থানে থাকে না। সেটি একই সঙ্গে X, Y এবং Z বিন্দুতে থাকার সম্ভাবনা নিয়ে বিরাজ করে। অর্থাৎ, কণাটি একই সঙ্গে সব জায়গায় ভুতের মতো ছড়িয়ে থাকে। একে বলা হয় সুপারপজিশন।
এই অবস্থা ততক্ষণই থাকে, যতক্ষণ না আপনি কণাটিকে দেখার চেষ্টা করছেন। আপনি যখনই পরিমাপ করবেন, কণাটি নিজেকে যেকোনো একটি নির্দিষ্ট অবস্থানে প্রকাশ করবে। অনেকটা পরীক্ষার প্রশ্নপত্রের মতো। প্রশ্ন হাতে পাওয়ার আগপর্যন্ত বইয়ের ১০০টি প্রশ্নই আসার সম্ভাবনা থাকে। কিন্তু প্রশ্ন হাতে পেলেই নির্দিষ্ট ১০টি প্রশ্ন আপনার সামনে মূর্ত হয়ে ওঠে।
কোয়ান্টাম তত্ত্ব অনুযায়ী, কোনো পরমাণু যখন কেউ পর্যবেক্ষণ করে না, তখন সেটি নির্দিষ্ট কোনো স্থানে থাকে না। অর্থাৎ, কণাটি একই সঙ্গে সব জায়গায় ভুতের মতো ছড়িয়ে থাকে। একে বলে সুপারপজিশন।
এই অদ্ভুতুড়ে ব্যাপারটি আরও ভালোভাবে বোঝা যায় ফোটন বা আলোর কণা দিয়ে। বিজ্ঞানীরা বিশেষ প্রক্রিয়ায় একটি ফোটন বা আলোকে ভেঙে এমন দুটি কণা তৈরি করেন, যাদের বৈশিষ্ট্য একে অপরের বিপরীত এবং তারা এনট্যাঙ্গেলড। এদের স্পিন বা ঘূর্ণন মাপতে গেলেই চমকটা দেখা যায়।
ধরা যাক, আপনি ল্যাবে বসে একটি ফোটনের স্পিন মাপলেন। অবাক হয়ে দেখবেন, আপনার ফলাফলের ওপর ভিত্তি করেই দ্বিতীয় ফোটনটির ফলাফল নির্ধারিত হচ্ছে, তা সে যত দূরেই থাকুক না কেন। আমাদের সাধারণ পদার্থবিজ্ঞান দিয়ে এই ঘটনা ব্যাখ্যা করা অসম্ভব। এটিই হলো এনট্যাঙ্গেলমেন্ট।
আইনস্টাইন, নাথান রোজেন ও বোরিস পোডলস্কি মিলে এই ভৌতিক আচরণ মানতে চাননি। তাঁরা বলেছিলেন, কণাগুলো নিশ্চয়ই আগে থেকে সব জানে, তাদের মধ্যে হয়তো কোনো লুকানো গোপন তথ্য আছে, যা আমরা দেখতে পাচ্ছি না। তাঁরা চেয়েছিলেন কোয়ান্টাম জগতকেও আমাদের সাধারণ জগতের মতো নিয়মমাফিক প্রমাণ করতে।
কিন্তু ১৯৬০-এর দশকে জন স্টুয়ার্ট বেল নামে এক পদার্থবিজ্ঞানী একটি গাণিতিক পরীক্ষা দাঁড় করান, যা দিয়ে প্রমাণ করা সম্ভব আসলেই কি কোনো গোপন তথ্য আছে, নাকি কোয়ান্টাম জগত সত্যিই অদ্ভুত। কয়েক দশক চেষ্টার পর ২০১৫ সালে বিজ্ঞানীরা চূড়ান্তভাবে প্রমাণ করেন, আইনস্টাইন ভুল ছিলেন। কোয়ান্টাম জগত আসলেই অদ্ভুত এবং এনট্যাঙ্গেলমেন্ট সত্য। এই যুগান্তকারী কাজের জন্য অ্যালান আসপেক্ট, জন এফ. ক্লাউসার এবং অ্যান্টন জাইলিঙ্গার ২০২২ সালে পদার্থবিজ্ঞানে নোবেল পুরস্কার পান।
কয়েক দশক চেষ্টার পর ২০১৫ সালে বিজ্ঞানীরা চূড়ান্তভাবে প্রমাণ করেন, আইনস্টাইন ভুল ছিলেন। কোয়ান্টাম জগত আসলেই অদ্ভুত এবং এনট্যাঙ্গেলমেন্ট সত্য।
নেদারল্যান্ডসের ডেলফট ইউনিভার্সিটি অব টেকনোলজির গবেষক রোনাল্ড হ্যানসন অবশ্য বিষয়টিকে ভৌতিক মানতে নারাজ। তাঁর কাছে এটি প্রযুক্তির এক নতুন সম্ভাবনা। তাঁর পরীক্ষায় ব্যবহৃত যন্ত্রপাতিই গোপন যোগাযোগের ভিত্তি তৈরি করেছে।
এখন রোনাল্ড এমন এক কোয়ান্টাম নেটওয়ার্ক তৈরি করছেন, যা হ্যাক করা অসম্ভব। বিজ্ঞানীরা এখন এনট্যাঙ্গেলড কণা ব্যবহার করে ভবিষ্যতের সুপার-ফাস্ট কোয়ান্টাম ইন্টারনেট ও কম্পিউটার তৈরির স্বপ্ন দেখছেন। পদার্থবিজ্ঞানীরা হয়তো এখনো এনট্যাঙ্গেলমেন্টের সব রহস্য ভেদ করতে পারেননি, কিন্তু এই ভৌতিক শক্তিকে কাজে লাগিয়ে প্রযুক্তির নতুন যুগ শুরু হয়ে গেছে।
দূরে থেকেও কণাগুলো অদ্ভুত এক মায়ায় জড়ানো। আইনস্টাইন একে বলেছিলেন দূর থেকে ভুতুড়ে কাণ্ড—স্পুকি অ্যাকশন অ্যাট আ ডিসটেন্স। যা সত্যিই আমাদের মানব বুদ্ধির চেয়েও অনেক বেশি অদ্ভুত।