কেন কোয়ান্টাম গ্র্যাভিটি
প্রকৃতির চারটি মৌলিক বলকে একীভূত করার প্রয়াস কোয়ান্টাম গ্র্যাভিটি। কেন প্রয়োজন এই তত্ত্ব? এ রকম কোনো সবকিছুর তত্ত্ব থাকলে তার রূপরেখা কেমন হতে পারে?
আমরা জানি, প্রকৃতির সব প্রক্রিয়ার পেছনে চারটি মৌলিক বলের ভূমিকা রয়েছে—মহাকর্ষ, তড়িৎ-চুম্বকীয়, শক্তিশালী ও দুর্বল মিথস্ক্রিয়া। তাদের মধ্যে মহাকর্ষ বল বোঝা সহজ নয়। অন্য তিনটি বলকে কোয়ান্টাম তত্ত্বের পরিপ্রেক্ষিতে ব্যাখ্যা করা গেলেও মহাকর্ষকে সেই আঙ্গিকে এখনো বিশ্লেষণ করা সম্ভব হয়নি।
খুব সাধারণ একটি উদাহরণ দেখা যাক। একটি হাইড্রোজেন পরমাণুর কেন্দ্রের প্রোটনের চারদিকে ইলেকট্রনের অবস্থান নির্দিষ্ট নয়, বরং বিভিন্ন দশার সমষ্টি বা সুপারপজিশন। শুধু যখন ইলেকট্রনটি অবলোকন করা হয়, সেটি একটি নির্দিষ্ট স্থানে আবির্ভূত হয়। ইলেকট্রনের একটি মহাকর্ষ ক্ষেত্র আছে, তাহলে সুপারপজিশন অবস্থায় থাকার সময় সেই ক্ষেত্রকে কীভাবে বর্ণনা করা যাবে? এ রকম কোয়ান্টাম সুপারপজিশনের কোনো ব্যবস্থা নিউটনীয় বা আইনস্টাইনীয় মহাকর্ষ তত্ত্বে নেই।
একই ব্যাপার ঘটছে যখন ইলেকট্রন বা ফোটনকে দুটি চেরা ফাটলের মধ্য দিয়ে পাঠানো হয় (Double Slit Experiment)। যতক্ষণ না ফাটল দুটির অপর পাশে পর্দার ওপর ইলেকট্রন বা ফোটনটি আপতিত হয়, ততক্ষণ তাদের শ্রোডিঙ্গারের সমীকরণ দিয়ে তরঙ্গ হিসেবে বর্ণনা করতে হবে। এই বর্ণনায় ওই কণার অবস্থান যেকোনো জায়গায় হতে পারে।
কিন্তু মহাকর্ষের এ রকম কোনো কোয়ান্টাম তত্ত্ব নেই, যেখানে সেটাকে একই সঙ্গে কণা ও তরঙ্গ হিসেবে ব্যাখ্যা করা যাবে। এই এক্সপেরিমেন্টে ইলেকট্রনের উৎস ও পর্দার মধ্যবর্তী অংশে সেটির মহাকর্ষ ক্ষেত্রকে বুঝতে পারার কোনো উপায় আমাদের আপাতত নেই। অন্যদিকে আবার কৃষ্ণগহ্বরের সিঙ্গুলারিটির স্থান-কালের অসীম বক্রতায় সাধারণ আপেক্ষিকতার সূত্র কাজ করে না।
যতক্ষণ না ফাটল দুটির অপর পাশে পর্দার ওপর ইলেকট্রন বা ফোটনটি আপতিত হয়, ততক্ষণ তাদের শ্রোডিঙ্গারের সমীকরণ দিয়ে তরঙ্গ হিসেবে বর্ণনা করতে হবে।
এ সমস্যার অন্যতম কারণ হলো, তিনটি কোয়ান্টাম তত্ত্বের বল—তড়িৎ-চুম্বকীয়, শক্তিশালী ও দুর্বল মিথস্ক্রিয়া—বোসন কণা (ফোটন, গ্লুয়ন এবং ডব্লিউ ও জেড বোসন) বিনিময় করে ঘটনা কার্যকর করে। মহাকর্ষের ক্ষেত্রে এ রকম কোনো কণা আমরা এখন পর্যন্ত আবিষ্কার করতে পারিনি। তার চেয়েও বড় কথা, ওই তিনটি মিথষ্ক্রিয়া স্থান-কালের চাদরের (Space-Time Continuum) ওপর সংঘটিত হয়, অথচ সাধারণ আপেক্ষিকতা তত্ত্বে সেই কন্টিনিউয়ামই হলো মহাকর্ষ ক্ষেত্র। অর্থাৎ মহাকর্ষ ক্ষেত্র যেন একটি আধার, যার ওপর প্রকৃতির সবকিছু ঘটছে।
বিভিন্ন কোয়ান্টাম মহাকর্ষ (Quantum Gravity) তত্ত্ব এই সমস্যা থেকে উদ্ধারের উপায় বলে ভাবা হচ্ছে। এ তত্ত্বে গ্র্যাভিটন নামে একটি ভরহীন ও আধানহীন কণার অস্তিত্ব অনুকল্পনা করা হচ্ছে, যা কিনা বস্তুগুলোর মধ্যে মহাকর্ষ বলের বাহন হতে পারে। এটির কোয়ান্টাম স্পিন হবে ২। কারণ, সাধারণ আপেক্ষিকতার শক্তি-ভরবেগ টেনসরের অর্ডার হলো ২। সে রকমভাবে তড়িৎ-চুম্বকীয় মিথস্ক্রিয়ার বাহন ফোটন।
ফোটনের স্পিন ১। কারণ, আপেক্ষিকতা তত্ত্বে তড়িৎ-চুম্বকীয় ক্ষেত্রের উৎস হলো ‘চার-তড়িৎ’ নামের ১-অর্ডারের একটি টেনসর। দুঃখের বিষয়, বস্তুর মধ্যে গ্র্যাভিটন দিয়ে মিথস্ক্রিয়া ব্যাখ্যা করতে গেলে বিভিন্ন ফলাফল ‘অসীম’ হয়ে যায়, যা কিনা গ্রহণযোগ্য নয়। তাত্ত্বিকেরা এসব ক্ষেত্রে ফাইনম্যান ডায়াগ্রাম নামের একটি পদ্ধতি অনুসরণ করেন।
গ্র্যাভিটন নামে একটি ভরহীন ও আধানহীন কণার অস্তিত্ব অনুকল্পনা করা হচ্ছে, যা কিনা বস্তুগুলোর মধ্যে মহাকর্ষ বলের বাহন হতে পারে। এটির কোয়ান্টাম স্পিন হবে ২।
৭০ বছর আগে তড়িৎ-চুম্বকীয় ক্ষেত্রের (কোয়ান্টাম ইলেকট্রডাইনামিকস বা কিউসিডি—QCD) জন্য তাঁরা একই বাধার সম্মুখীন হন, কিন্তু সেটিতে রিনরমালাইজেশন (Renormalization) নামে একটি কৌশল ব্যবহার করে ‘অসীমের’ হাত থেকে মুক্ত হওয়া গিয়েছিল।
কিউসিডির ফাইনম্যান ডায়াগ্রাম যেমন দুটি ইলেকট্রনের বিকর্ষণকে প্রতিনিধিত্ব করে, অনুরূপভাবে গ্র্যাভিটন দিয়েও সে রকম চিত্র আঁকা সম্ভব—
এখানে দুটি ইলেকট্রন প্রথম চিত্রে একটি ও দ্বিতীয় চিত্রে দুটি গ্র্যাভিটন (G) বিনিময় করে একে অপরের মহাকর্ষ বল অনুভব করছে (সময়ের বিপরীতে চলমান পজিট্রনকে ইলেকট্রন হিসেবে ধরা হয়)। এখানে GN হলো নিউটনের মহাকর্ষ ধ্রুবক। এ ধরনের মিথস্ক্রিয়ায় গ্র্যাভিটন বিন্দুসম ইলেকট্রনের সঙ্গে GN ও ইলেকট্রনের শক্তির অনুপাতে বিক্রিয়া করে। যত বেশি বিক্রিয়ার বিন্দু আমরা ব্যবহার করব (প্রথম চিত্রে একটি, দ্বিতীয় চিত্রে চারটি বিন্দু) তত বেশি শক্তি গণনায় ধরতে হবে এবং শেষাবধি ফল হবে অসীম। কারণ, দুটি ইলেকট্রন যে শুধু গ্র্যাভিটন দিয়ে একে অপরের সঙ্গে বিক্রিয়া করবে তা নয়, তারা ফোটনও বিনিময় করতে পারে।
এই ফোটন আবার অন্য কণায় রূপান্তরিত হতে পারে এবং তারা আবার ফোটনে প্রবর্তিত হতে পারে। এ প্রক্রিয়ায় অংশগ্রহণরত সবার আবার মহাকর্ষ ক্ষেত্র আছে। বিন্দুসম কণাদের মধ্যে এ রকম অসীমসংখ্যক মহাকর্ষ ক্ষেত্রকে কিউসিডির মতো ‘নরমালাইজ’ করা যায় না। ব্যাপারটি অন্যভাবেও ব্যাখ্যা করা যায়—বিন্দুসম কণার ক্ষেত্রে, বিপরীত বর্গের সূত্র অনুযায়ী (১/r২ , r → ০ হলে) মিথস্ক্রিয়ার মান অসীম হবে।
এখানেই উদ্ধারকর্তা হিসেবে স্ট্রিংয়ের আবির্ভাব। স্ট্রিং তত্ত্বে সবকিছু ছোট স্ট্রিং দিয়ে তৈরি। স্ট্রিংকে সুতার মতো ভাবা গেলেও এর কোনো প্রস্থ নেই এবং এর দৈর্ঘ্য বা ব্যাস ১০-৩৫ মিটার। অর্থাৎ প্ল্যাঙ্ক দৈর্ঘ্যের সমতুল্য। স্ট্রিংয়ের দুটি প্রান্ত খোলা থাকতে পারে বা দুটি মিলিত হয়ে বদ্ধ আকার (লুপ) দিতে পারে।
মিথস্ক্রিয়ায় গ্র্যাভিটন বিন্দুসম ইলেকট্রনের সঙ্গে GN ও ইলেকট্রনের শক্তির অনুপাতে বিক্রিয়া করে। যত বেশি বিক্রিয়ার বিন্দু ব্যবহার করা হয় তত বেশি শক্তি গণনায় ধরতে হয় এবং শেষাবধি ফল হবে অসীম।
স্ট্রিং কম্পিত হয় এবং এর কম্পন বিভিন্ন মৌলিক কণার প্রতিনিধিত্ব করতে পারে, সর্বনিম্ন কম্পন মহাকর্ষ বলের বাহক গ্র্যাভিটন হতে পারে; আবার উচ্চতর কম্পন ফোটন, ইলেকট্রন এবং অন্যান্য কণার প্রতিনিধিত্ব করতে পারে। একটি স্ট্রিং বিভক্ত হতে পারে, আবার দুটি স্ট্রিং মিলিতও হতে পারে। স্ট্রিংয়ের যে কম্পন, সেটা একদিকে যেমন মৌলিক কণার প্রতিনিধিত্ব করতে পারে, আবার অন্যদিকে সেটাকে কোয়ান্টাম ক্ষেত্র হিসেবেও ভাবা যেতে পারে। যেহেতু স্ট্রিং কণা বা বিন্দু নয়, সেহেতু ১/r২, r → ০ অবস্থায় মিথস্ক্রিয়ার মান অসীম হবে না।
যদি আমরা ১ নম্বর চিত্রটি স্ট্রিং দিয়ে আঁকতে চাই, তাহলে এ রকম একটি ফাইনম্যান ডায়াগ্রাম পাব (চিত্র ৩)
এখানে ইলেকট্রনকে ধরা হয়েছে একটি স্ট্রিং হিসেবে, যা কিনা নিচ থেকে ওপরে সময়ে ভ্রমণ করছে, আর সেটি আরেকটি ইলেকট্রনের সঙ্গে একটি গ্র্যাভিটন দিয়ে বিক্রিয়া করছে। গ্র্যাভিটনটি হলো একটি স্ট্রিং লুপ। এ প্রক্রিয়ায় গ্র্যাভিটনের স্পিন গণনা করে দেখা গেছে, সেটি হবে ২। অর্থাৎ গ্র্যাভিটন মহাকর্ষ বলের বাহক (আমরা আগে উল্লেখ করেছিলাম, এই বাহকের কোয়ান্টাম স্পিন হবে ২। কারণ, সাধারণ আপেক্ষিকতার শক্তি-ভরবেগ টেনসরের অর্ডার হলো ২।)
স্ট্রিং ব্যবহার করলে মিথস্ক্রিয়াটি নরমালাইজ করা যাচ্ছে। অর্থাৎ অসীমের হাত থেকে মুক্তি পাওয়া যাচ্ছে; কিন্তু এর জন্য বড় ত্যাগ স্বীকার করতে হচ্ছে। প্রথমত, এই সবকিছুর জন্য স্ট্রিং তত্ত্বকে আমাদের পরিচিত তিনটি স্থানিক মাত্রার বদলে আরও অনেক মাত্রার সাহায্য নিতে হচ্ছে—২৬টি, তবে সুপারসিমেট্রি তত্ত্বে ১০টি। অসীমের ঝামেলা দূর করার ব্যাপারে সুপারসিমেট্রির দরকার পড়ছে—প্রতিটি মৌলিক ফারমিওন কণার (ইলেকট্রন বা কোয়ার্কের) একটি প্রতিসম বোসন কণা আছে, আবার প্রতিটি বোসন কণার (ফোটন বা গ্লুয়নের) প্রতিসম ফারমিওন কণা রয়েছে।
একটি স্ট্রিং বিভক্ত হতে পারে, আবার দুটি স্ট্রিং মিলিতও হতে পারে। স্ট্রিংয়ের যে কম্পন, সেটা যেমন মৌলিক কণার প্রতিনিধিত্ব করতে পারে, আবার সেটাকে কোয়ান্টাম ক্ষেত্র হিসেবেও ভাবা যেতে পারে।
প্রতিসম সুপেরসিমেট্রি কণাগুলো খুব উচ্চ শক্তিসম্পন্ন। মনে করা হয়েছিল, জেনেভায় অবস্থিত লার্জ হ্যাড্রন কলাইডারে তাদের সাক্ষাৎ পাওয়া যাবে, কিন্তু এ পর্যন্ত সেগুলোর কোনোটির সাক্ষাৎ মেলেনি। এ ছাড়া আমাদের ত্রিমাত্রিক স্থানের বাইরে অন্য মাত্রার সন্ধানও আপাতত মেলেনি; যদি স্ট্রিং তত্ত্ব বলছে, সেই মাত্রাগুলো এমন গুটিয়ে রয়েছে, যা কিনা আমাদের আধুনিক এক্সপেরিমেন্টের পক্ষে নির্ণয় করা সম্ভব নয়। পরোক্ষভাবে ওই মাত্রাগুলোর অস্তিত্ব প্রমাণের জন্য যেসব পর্যবেক্ষণ করা হয়েছে, জ্যোতির্বিদ্যায় বা কণা-ত্বরক যন্ত্রে, সেগুলোর ফলাফল ধনাত্মক হয়নি।
কোয়ান্টাম মহাকর্ষের সমাধানে লুপ কোয়ান্টাম গ্র্যাভিটি (LQG) নামে আরেকটি তত্ত্ব আছে। সাধারণ আপেক্ষিকতা ধরে নেয় মহাকর্ষ ক্ষেত্র অবিচ্ছিন্ন (Continuous), কিন্তু LQG এই মহাকর্ষ ক্ষেত্রকেই ছোট ছোট কোয়ান্টাম জালে ভাগ করে ফেলে। এভাবে মহাকর্ষ ক্ষেত্রকে কোয়ান্টাম বৈশিষ্ট্য দেওয়া হয় এতে। কিন্তু বর্তমানে স্ট্রিং বা লুপ কোয়ান্টাম তত্ত্বের মূল সমস্য হচ্ছে, তাদের এমন কোনো ভাবিকথন নেই, যা কিনা এক্সপেরিমেন্ট দিয়ে প্রমাণ করা যাবে। আপেক্ষিকতা ও কোয়ান্টামের মেলবন্ধনের জন্য আমাদের হয় তাদের মধ্যেই নতুন পদ্ধতির প্রবর্তন করতে হবে, নয় একেবারে নতুন আইডিয়া আনতে হবে।
