প্লাস্টিকের প্যাকেট মোচড়ালে এত শব্দ হয় কেন
কল্পনা করুন, আপনি ক্লাসের শেষ বেঞ্চে বসে একটি বিরক্তিকর বক্তৃতা শুনছেন। হঠাৎ আপনার সবচেয়ে কাছের বন্ধুটি চিপসের একটি প্যাকেট বের করে আপনার দিকে বাড়িয়ে দিল। আপনি খুব সাবধানে, চুপচাপ প্যাকেটটা খোলার চেষ্টা করলেন। ঠিক তখনই মড়মড় করে উঠল সেটি! ব্যস, মুখ তুলে দেখলেন শিক্ষক ইতিমধ্যেই আপনার দিকে একদৃষ্টে তাকিয়ে আছেন।
এই অভিজ্ঞতা আমাদের অনেকেরই আছে। আমরা অনেকেই হয়তো কোনো নিস্তব্ধ ক্লাসরুম বা লাইব্রেরিতে লজেন্স বা চিপসের প্যাকেট খোলার চেষ্টা করেছি এবং অনিবার্যভাবে নিজেদের বিব্রত করেছি। কিন্তু কখনো ভেবে দেখেছেন, প্লাস্টিকের প্যাকেট কেন এত শব্দ করে?
বেশির ভাগ প্লাস্টিকের প্যাকেট তৈরি হয় পলিমার দিয়ে। যেমন পলিইথিলিন, মাইলার বা সেলোফেন। এগুলো দেখতে পাতলা হলেও বেশ শক্ত। রাবারের মতো সহজে টেনে লম্বা করা যায় না, আবার ভাঁজ করলেও সহজে ছিঁড়ে যায় না। তাই একটি সমতল প্লাস্টিকের পাত মচকালে তাতে একের পর এক ভাঁজ বা খাঁজ তৈরি হয়। এই ভাঁজগুলোই প্লাস্টিকের সেই পরিচিত মড়মড় শব্দের মূল কারণ।
বেশির ভাগ প্লাস্টিকের প্যাকেট তৈরি হয় পলিমার দিয়ে। যেমন পলিইথিলিন, মাইলার বা সেলোফেন। এগুলো দেখতে পাতলা হলেও বেশ শক্ত। রাবারের মতো সহজে টেনে লম্বা করা যায় না।
ব্যাপারটা বুঝতে হলে আগে একটু শক্তির বিষয়ে কথা বলা যাক। কোনো বস্তুর ওপর বল প্রয়োগ করে সেটিকে বিকৃত করলে তার মধ্যে শক্তি জমা হতে পারে। বস্তুর আকৃতি আবার আগের অবস্থায় ফিরে যাওয়ার প্রবণতার সঙ্গে সম্পর্কিত এই শক্তিকে বলা হয় স্থিতিস্থাপক বিভব শক্তি। ধনুকের কথাই ধরুন। ধনুক বাঁকিয়ে তাতে তির লাগালে ধনুকের মধ্যে শক্তি জমা হয়। তির ছোড়ার সময় সেই শক্তির একটি অংশ গতিশক্তিতে রূপান্তরিত হয়, যা তিরটি ছুড়তে সাহায্য করে এবং ধনুকটি তার আগের অবস্থায় ফিরে আসে।
প্লাস্টিকের পাতের ক্ষেত্রেও অনেকটা একই ঘটনা ঘটে। একটি সমতল প্লাস্টিকের পাতের স্বাভাবিক বা স্থিতিশীল অবস্থা হলো সমতল হয়ে থাকা। কিন্তু একবার সেটিকে মচকে দিলে তাতে অসংখ্য ভাঁজ তৈরি হয়।
তখন পাতটি আর শুধু সমতল অবস্থাতেই থাকতে চায় না। ভাঁজের ওপর নির্ভর করে এটি বিভিন্ন স্থিতিশীল অবস্থায় থাকতে পারে। অর্থাৎ, মচকানো প্লাস্টিকের পাতকে বিভিন্নভাবে বাঁকিয়ে বা ভাঁজ করে ছেড়ে দিলে সেটি সেই অবস্থাতেই থেকে যেতে পারে।
প্রতিটি অবস্থার সঙ্গে নির্দিষ্ট পরিমাণ স্থিতিস্থাপক বিভব শক্তি যুক্ত থাকে। আপনি যখন প্যাকেটটি টানেন, মোচড়ান বা চাপ দেন, তখন তার ভেতরে আরও শক্তি জমা হয়। কিন্তু কোনো একটি অবস্থায় যত খুশি শক্তি জমা হতে পারে না। একটা পর্যায়ে গিয়ে সেই সীমা ছাড়িয়ে গেলে প্লাস্টিকের পাতটি হঠাৎ অন্য একটি স্থিতিশীল অবস্থায় চলে যায়। তখন জমা শক্তির কিছু অংশ মুক্তি পায়। এই আকস্মিক পরিবর্তনই ক্ষুদ্র একটি ক্লিক শব্দ তৈরি করে।
ভাঁজের ওপর নির্ভর করে পাতটি বিভিন্ন স্থিতিশীল অবস্থায় থাকতে পারে। অর্থাৎ, মচকানো প্লাস্টিকের পাতকে বিভিন্নভাবে বাঁকিয়ে বা ভাঁজ করে ছেড়ে দিলে সেটি সেই অবস্থাতেই থেকে যেতে পারে।
এভাবে একটি ভাঁজ থেকে আরেকটি ভাঁজে যাওয়ার সময় একবার করে শব্দ তৈরি হয়। তাই প্লাস্টিকের প্যাকেট মচকালেই আমরা একটানা কোনো শব্দ শুনি না; বরং খুব দ্রুত পরপর অনেকগুলো ছোট ছোট শব্দ শুনি। সবগুলো মিলেই তৈরি হয় সেই পরিচিত মচমচ বা কড়কড় আওয়াজ।
বিষয়টি আরও সহজে বোঝা যায় একটি পাহাড়ি রাস্তার উদাহরণ দিয়ে। ভাবুন, অনেক উঁচু-নিচু জায়গা এবং খাঁজযুক্ত একটি পথে একটি পাথর ঠেলে ওপরে তুলছেন। পাথরটিকে যত ওপরে তুলবেন, তত শক্তি জমা হবে। কোনো একসময় পাথরটি চূড়ায় পৌঁছে গড়িয়ে নিচে নেমে যাবে এবং নিচের কোনো একটি খাঁজে আটকে যাবে। আবার তাকে ওপরে তুললে অন্য কোনো খাঁজে গিয়ে আটকে থাকতে পারে।
মচকানো প্লাস্টিকের পাতের ক্ষেত্রেও ব্যাপারটা অনেকটা এমন। পাহাড়ের খাঁজগুলো হলো প্লাস্টিকের বিভিন্ন স্থিতিশীল অবস্থা। পাথরকে ওপরে তোলার মতো করে প্লাস্টিককে বাঁকানো বা মোচড়ানোর সময় তাতে শক্তি জমা হয়। সীমা ছাড়িয়ে গেলে পাতটি হঠাৎ অন্য একটি অবস্থায় চলে যায় এবং কিছু শক্তি মুক্তি পায়। তখনই শোনা যায় শব্দ।
প্লাস্টিকের প্যাকেট মচকালেই আমরা একটানা কোনো শব্দ শুনি না; বরং খুব দ্রুত পরপর অনেকগুলো ছোট ছোট শব্দ শুনি। সবগুলো মিলেই তৈরি হয় সেই পরিচিত মচমচ বা কড়কড় আওয়াজ।
এখন প্রশ্ন হলো, সব প্লাস্টিকের প্যাকেট কি সমান শব্দ করে? মোটেও নয়। একটি সাধারণ বাজারের প্লাস্টিকের ব্যাগ হাতে নিলে হয়তো খুব সামান্য শব্দ হবে। কিন্তু চিপসের প্যাকেট বা ক্যান্ডির মোড়ক মচকালেই যেন পুরো ঘর কেঁপে ওঠে! এর কারণ প্যাকেট তৈরির ধরন। চিপসের প্যাকেট সাধারণত শুধু একটি পাতলা প্লাস্টিকের স্তর দিয়ে তৈরি হয় না। এতে একাধিক পাতলা স্তর থাকে। অনেক ক্ষেত্রে পলিমারের পাতের ওপর অতিপাতলা অ্যালুমিনিয়ামের স্তরও থাকে। প্যাকেটের ভেতরের চকচকে রুপালি অংশটি আসলে সেই ধাতব স্তর। এর কাজ শুধু প্যাকেটকে চকচকে করা নয়; অক্সিজেন ও আর্দ্রতা ভেতরে ঢুকতে বাধা দিয়ে চিপসকে মচমচে রাখতে সাহায্য করে এটি। প্যাকেটের ভেতরে নাইট্রোজেন গ্যাস ভরা থাকার এটিও একটি কারণ।
প্যাকেটের স্তরগুলো যত শক্ত ও দৃঢ় হয়, বাঁকানোর সময় তাতে তত বেশি স্থিতিস্থাপক শক্তি জমা হতে পারে। ফলে ভাঁজ হঠাৎ বদলে যাওয়ার সময় তৈরি হওয়া শব্দও হয় বেশি তীক্ষ্ণ ও জোরালো। এর একটি মজার উদাহরণ পাওয়া যায় ২০১০ সালে। তখন ফ্রিটো-লে সম্পূর্ণ পচনশীল উপাদান দিয়ে সানচিপস-এর একটি নতুন প্যাকেট বাজারে আনে। প্যাকেটটি মূলত ভুট্টা থেকে তৈরি পলিল্যাকটিক অ্যাসিড বা পিএলএ দিয়ে তৈরি হয়েছিল। কিন্তু নতুন প্যাকেটটি এত জোরে কড়কড় শব্দ করত যে ক্রেতাদের অনেকেই অভিযোগ করেন। পরীক্ষায় এর শব্দের মাত্রা প্রায় ৯৫ ডেসিবেল পর্যন্ত উঠেছিল, যা মোটরসাইকেলের শব্দের কাছাকাছি! সাধারণ প্লাস্টিকের ব্যাগের তুলনায় এর শব্দ ছিল প্রায় ৭৭ ডেসিবেল। পরে ফ্রিটো-লে প্যাকেটটির নকশা বদলে শব্দ কমিয়ে আনে।
প্যাকেটের স্তরগুলো যত শক্ত ও দৃঢ় হয়, বাঁকানোর সময় তাতে তত বেশি স্থিতিস্থাপক শক্তি জমা হতে পারে। ফলে ভাঁজ হঠাৎ বদলে যাওয়ার সময় তৈরি হওয়া শব্দও হয় বেশি তীক্ষ্ণ ও জোরালো।
তবে প্লাস্টিকের প্যাকেট নীরব জায়গায় এত জোরে শোনা যাওয়ার আরেকটি কারণ আছে। সেটা প্যাকেটের নয়, আমাদের কানের। একটি ব্যস্ত রান্নাঘরে একই প্যাকেট খুললে হয়তো শব্দটি তেমন কানে লাগবে না। কারণ আশপাশের নানা শব্দ প্যাকেটের ক্ষীণ শব্দকে ঢেকে দেয়। একে বলা হয় অডিওটরি মাস্কিং। কিন্তু নীরব ক্লাসরুম, লাইব্রেরি কিংবা গভীর রাতে ঘরে যখন চারপাশে প্রায় কোনো শব্দই নেই, তখন প্যাকেটের ছোট ছোট শব্দগুলোও স্পষ্ট শোনা যায়।
তার ওপর মানুষের কান সব ধরনের শব্দের প্রতি সমান সংবেদনশীল নয়। প্রায় ২ হাজার থেকে ৫ হাজার হার্জ কম্পাঙ্কের শব্দ আমরা তুলনামূলক ভালো শুনতে পাই। প্লাস্টিকের প্যাকেটের তীক্ষ্ণ কড়কড় শব্দের একটি বড় অংশ এই সংবেদনশীল কম্পাঙ্কের কাছাকাছি হওয়ায় তা আমাদের কানে আরও জোরালো বলে মনে হয়।