আজ ১১ ফেব্রুয়ারি। বিজ্ঞানের ইতিহাসের অন্যতম সেরা জাদুকর টমাস আলভা এডিসনের জন্মদিন। বৈদ্যুতিক বাতি দিয়ে তিনি পৃথিবীকে আলোকিত করেছেন, আবার ফোনোগ্রাফ দিয়ে শব্দকে করেছেন বন্দি। হাজারেরও বেশি আবিষ্কারের পেটেন্ট তাঁর নামে। কিন্তু জানেন কি, যে মানুষটি পৃথিবীকে শোনার যন্ত্র উপহার দিয়েছিলেন, তিনি নিজেই কানে খুব কম শুনতেন?
হ্যাঁ, টমাস এডিসন ছোটবেলা থেকেই শ্রবণশক্তি হারিয়েছিলেন। কিন্তু মজার ব্যাপার হলো, তিনি একে কখনোই নিজের দুর্বলতা ভাবেননি। বরং তিনি মনে করতেন এই বধিরতাই তাঁকে বিশ্বের সেরা আবিষ্কারক হতে সাহায্য করেছে। কোলাহলপূর্ণ পৃথিবীতে নিস্তব্ধতাই ছিল তাঁর ফোকাস করার গোপন অস্ত্র।
চলুন, আজকের এই বিশেষ দিনে জেনে নিই এডিসনের সেই অদ্ভুত সুপারপাওয়ারের গল্প।
কখন এবং কীভাবে এডিসন শ্রবণশক্তি হারালেন
এডিসন কীভাবে কানে শোনার ক্ষমতা হারালেন, তা নিয়ে ঐতিহাসিকদের মধ্যে নানা তর্ক আছে। কেউ বলেন, ছোটবেলায় স্কারলেট ফিভার বা ঘন ঘন কানের সংক্রমণের কারণে তাঁর এই অবস্থা হয়েছিল। আবার একটা গল্প চালু আছে—একবার ট্রেনের ল্যাবরেটরিতে আগুন ধরে গিয়েছিল। তখন রাগী কন্ডাক্টর নাকি এডিসনের কানে এত জোরে থাপ্পড় মেরেছিল যে, তাতেই তাঁর কানের বারোটা বেজে যায়।
তবে চিকিৎসকরা বলেন, কারণ যাই হোক, ছোটবেলা থেকেই তিনি ধীরে ধীরে শোনার ক্ষমতা হারাতে থাকেন। মাঝবয়সে পৌঁছাতে পৌঁছাতে তিনি প্রায় পুরোপুরি বধির হয়ে যান। অল্প শব্দ তিনি একদমই শুনতে পেতেন না। কিন্তু এডিসন এতে দমে যাননি।
একবার ট্রেনের ল্যাবরেটরিতে আগুন ধরে গিয়েছিল। তখন রাগী কন্ডাক্টর নাকি এডিসনের কানে এত জোরে থাপ্পড় মেরেছিল যে, তাতেই তাঁর কানের বারোটা বেজে যায়।
কানে কম শোনা নিয়ে এডিসন কী ভাবতেন
এডিসন নিজেই বিভিন্ন সাক্ষাৎকারে বলেছেন, কানে কম শোনা তাঁর জন্য শাপে বর হয়েছে। তিনি বলতেন, ‘কানে কম শুনি বলে আমাকে অপ্রয়োজনীয় কথাবার্তা, আড্ডা এবং বাইরের বাজে শব্দ শুনতে হয় না। ফলে আমি নিজের চিন্তায় ডুবে থাকতে পারি।’
এডিসনের ল্যাবরেটরি ছিল বিশাল। সেখানে সবসময় মেশিনের খটখট শব্দ, সহকারীদের হাঁকডাক লেগেই থাকত। সাধারণ মানুষের পক্ষে সেখানে মনোযোগ দেওয়া কঠিন। কিন্তু এডিসনের জন্য ওটা ছিল পিনপতন নীরবতা! বাইরের শব্দ তাঁর কানে ঢুকত না বলে তিনি ঘণ্টার পর ঘণ্টা একনাগাড়ে কাজ করে যেতে পারতেন।
আধুনিক বিজ্ঞানও কিন্তু এডিসনের কথায় সাঁয় দিয়েছে। আমাদের মস্তিষ্ক সবসময় বাইরের তথ্য প্রসেস করতে ব্যস্ত থাকে। মনস্তত্ত্ববিদ্যা বলছে, যখন আমাদের ইন্দ্রিয়গুলো কম তথ্য পায়, তখন মস্তিষ্ক বাকি শক্তিটুকু জটিল সমস্যা সমাধানে কাজে লাগাতে পারে।
এডিসনের ক্ষেত্রেও তাই হয়েছিল। বাইরের শব্দ কম শোনায় তাঁর মস্তিষ্ক সৃজনশীল চিন্তার জন্য বাড়তি শক্তি পেত। কোলাহল কম থাকার কারণে তিনি নতুন নতুন আইডিয়া নিয়ে সহজে কাজ করতে পারতেন।
এডিসন ছিলেন পরিশ্রমী মানুষ। তিনি দিনে ১৮-২০ ঘণ্টা কাজ করতেন, ঘুমাতেন খুব কম। হাজার হাজার বার পরীক্ষা-নিরীক্ষা করে তবেই তিনি একটা আবিষ্কারে সফল হতেন। এই যে দিনের পর দিন একই কাজ ধৈর্য ধরে করা, এর পেছনেও ছিল তাঁর সেই বধিরতা।
তাঁর জীবনীকাররা বলেন, কানে কম শোনার কারণে বাইরের জগতের তুচ্ছ ঘটনা তাঁকে ছুঁতে পারত না। তিনি কোনো একটা সমস্যার সমাধানে দিনের পর দিন ডুবে থাকতে পারতেন। গভীর মনোযোগের জন্য যে নিস্তব্ধতা দরকার, তা এডিসন প্রাকৃতিকভাবেই পেয়েছিলেন।
এডিসনের ল্যাবরেটরি ছিল বিশাল। সেখানে সবসময় মেশিনের খটখট শব্দ, সহকারীদের হাঁকডাক লেগেই থাকত। সাধারণ মানুষের পক্ষে সেখানে মনোযোগ দেওয়া কঠিন।
বধিরতা এবং শব্দের সঙ্গে এডিসনের সম্পর্ক
কী অদ্ভুত তাই না? যিনি কানে শোনেন না, তিনিই আবিষ্কার করলেন ফোনোগ্রাফ। অর্থাৎ শব্দ রেকর্ড করার যন্ত্র! ঐতিহাসিকেরা বলেন, কানে কম শুনতেন বলেই হয়তো শব্দের প্রতি তাঁর এত আগ্রহ ছিল।
শব্দকে তিনি শুধু শোনার বিষয় মনে করতেন না, বিজ্ঞানের ধাঁধা হিসেবে দেখতেন। শব্দ কীভাবে তৈরি হয়, কীভাবে তা ধরে রাখা যায়, কীভাবে তা বাড়ানো যায়—এগুলো নিয়ে তিনি ভাবতেন পদার্থবিজ্ঞানের দৃষ্টিতে। তিনি দাঁত দিয়ে পিয়ানোর কাঠ কামড়ে ধরে হাড়ের মাধ্যমে শব্দ অনুভব করার চেষ্টা করতেন।
এডিসন যখন কানে প্রায় শুনতেনই না, তখন তিনি পিয়ানো বা ফোনোগ্রাফের শব্দ শোনার জন্য দাঁত দিয়ে যন্ত্রের কাঠের বডি কামড়ে ধরতেন। বিজ্ঞানের ভাষায় একে বলে বোন কন্ডাকশন। এর মাধ্যমে শব্দতরঙ্গ কানের পর্দা এড়িয়ে সরাসরি করোটির হাড়ের মাধ্যমে অন্তঃকর্ণে পৌঁছাত। ফলে তিনি সুর বা কম্পন স্পষ্টভাবে অনুভব করতে পারতেন। তাঁর এই ভিন্ন দৃষ্টিভঙ্গিই তাঁকে ফোনোগ্রাফ আবিষ্কারে সাহায্য করেছিল।
তবে সাবধান! কানে কম শোনা মানেই যে কেউ জিনিয়াস হয়ে যাবে, তা কিন্তু নয়। অনেকের জন্য এটি হতাশা ও একাকীত্বের কারণ হতে পারে। এডিসনের ব্যাপারটা ছিল আলাদা। তাঁর চারপাশে ছিল প্রচুর সাহায্যকারী এবং তাঁর নিজের অদম্য মানসিকতা। তিনি তাঁর সীমাবদ্ধতাকে জয়ে পরিণত করার উপায় জানতেন।
এডিসন যখন কানে প্রায় শুনতেনই না, তখন তিনি পিয়ানো বা ফোনোগ্রাফের শব্দ শোনার জন্য দাঁত দিয়ে যন্ত্রের কাঠের বডি কামড়ে ধরতেন। বিজ্ঞানের ভাষায় একে বলে বোন কন্ডাকশন।
উদ্ভাবন নিয়ে বড় শিক্ষা
এডিসনের জীবন থেকে আমরা একটা বড় শিক্ষা পাই। কোনো সমস্যা বা সীমাবদ্ধতা মানেই পথের শেষ নয়। উদ্ভাবন বা সৃষ্টিশীলতা অনেক সময় অভাব থেকেই জন্ম নেয়। এডিসন কানে কম শুনতেন, তাই তিনি নিজের কাজের ধরন বদলে ফেলেছিলেন। এই গুণই হয়তো তাঁকে অন্যদের চেয়ে আলাদা করে তুলেছিল।
টমাস আলভা এডিসন বধির ছিলেন বলে আবিষ্কারক হননি, তিনি আবিষ্কারক হয়েছিলেন কারণ তিনি তাঁর সীমাবদ্ধতাকে ব্যবহার করতে শিখেছিলেন। বাইরের কোলাহল তাঁর কানে পৌঁছাত না, তাই তিনি নিজের মনের ভেতরে এক বিশাল জগত তৈরি করে নিয়েছিলেন।
আজকের এই সামাজিক যোগাযোগ মাধ্যমের যুগে যেখানে এক মুহূর্তও মনোযোগ ধরে রাখা দায়, সেখানে এডিসনের এই গল্প আমাদের শেখায়, মাঝেমধ্যে একটু নিস্তব্ধতা, একটু কোলাহলমুক্ত পরিবেশ আমাদের মস্তিষ্কের জাদুকরী ক্ষমতাকে জাগিয়ে তুলতে পারে।
শুভ জন্মদিন, প্রযুক্তির জাদুকর!
