ইলেকট্রনিকস পাঠশালা-১১
কীভাবে এসি ভোল্টেজকে ডিসি ভোল্টেজে রূপান্তর করা যায়
সাইকেল চালানো শিখতে হলে কেবল তত্ত্ব শিখলেই হয় না, সত্যিকারে চালিয়েই শিখতে হয়। একইভাবে ইলেকট্রনিকস শিখতে হলে তত্ত্বের পাশাপাশি হাতে-কলমে সার্কিট তৈরি করতে হয়। সার্কিটের বিভিন্ন বিন্দুতে পরিমাপ করে তত্ত্বের সঙ্গে তার মিল-অমিলের কারণ চিন্তা করে খুঁজে বের করতে হয়। আবার কেবল সার্কিট তৈরিই নয়, কীভাবে তাকে খোলসবন্দী করে অন্য সবার ব্যবহারের উপযোগী করা যায়, তা-ও শিখতে হয়। নইলে ওই সার্কিট কোনো কাজে আসবে না। এই পাঠশালায় তাই কিছু কাজের সার্কিট বানানো শেখানো হবে। সেই সঙ্গে তার প্রয়োগ ও প্রয়োজনীয় তত্ত্বও ধাপে ধাপে আলোচনা করা হবে। তাতে একসঙ্গে সব কটি দিকই শেখা হয়ে যাবে...
ডায়োড ব্যবহার করে এসি ভোল্টেজকে ডিসি ভোল্টেজে রূপান্তর
গত সংখ্যার পর
মূল বিষয়ে যাওয়ার আগে একটু আলাপ করে নেওয়া যাক এসি ও ডিসি বলতে আমরা কী বুঝি? ১ নং ছবিতে ব্যাটারির সার্কিটে বৈদ্যুতিক বোঝা হিসেবে একটি রেজিস্টর RL দেখানো হয়েছে। ব্যাটারির নিচের গ্রাউন্ড প্রান্ত (যার ভোল্টেজকে শূন্য ধরা হয়), এর তুলনায় ওপর প্রান্তের ভোল্টেজ VS সব সময়ই পজিটিভ। তাহলে ব্যাটারির ভোল্টেজের প্রভাবে RL-এর ভেতর দিয়ে যে কারেন্ট IL প্রবাহিত হবে, তার দিকও সব সময় একই থাকবে। এ কারেন্টের দিকটি ছবিতে একটি বাঁকানো তির চিহ্ন দিয়ে দেখানো হয়েছে। এর অর্থ এ কারেন্টের দিক সব সময় একমুখী থাকবে বা দিক অপরিবর্তী হবে। একে বলা হয় Direct current বা সংক্ষেপে DC (ডিসি)।
ব্যাটারিটি আদর্শ হলে তার ভোল্টেজও সব সময় একই থাকবে। তাই RL-এর মানে কোনো পরিবর্তন না হলে ওহমের সূত্র অনুযায়ী কারেন্টে IL-এর মানও সব সময় একই থাকবে। এ বিষয়টি একটি গ্রাফের (কালো রেখা) সাহায্যেও দেখানো হয়েছে ১ নং ছবিতে।
এবার ২ নং ছবির মতো দুটি ব্যাটারি পাশাপাশি রাখি, তবে একটি অপরটির উল্টো করে। অর্থাৎ একটির পজিটিভ প্রান্ত যেদিকে, অপরটির নেগেটিভ প্রান্ত সেদিকে। এবার নিচের প্রান্ত দুটি ছবির মতো সার্কিটের গ্রাউন্ড প্রান্তে সংযুক্ত করে দিই। এবার একটি সুইচের সাহায্যে RL-এর ওপরের প্রান্তে লাগানো তারটিকে একবার বাঁ দিকের ব্যাটারিতে (ক প্রান্ত) লাগাই। কিছুক্ষণ রেখে আবার হঠাৎ করে ডান দিকের ব্যাটারিতে (খ প্রান্ত) লাগাই। এভাবে কিছুক্ষণ রেখে আবার হঠাৎ বাঁ দিকের ব্যাটারিতে (ক প্রান্ত) ফিরে যাই এবং এমন ধারায় চলতে থাকি। তাহলে RL-এর ভেতর দিয়ে প্রবাহিত কারেন্টের ধরন কী হবে? বোঝাই যাচ্ছে, কারেন্টের দিক বারবার ওল্টাতে থাকবে। একবার নিচের দিকে যাবে, পরেরবার ওপরের দিকে যাবে। আবার নিচের দিকে যাবে। অর্থাৎ দিক পরিবর্তন হতে থাকবে। সার্কিটে লাল ও নীল রঙের বাঁকানো তির চিহ্ন দিয়ে কারেন্টের দিক পরিবর্তনের বিষয়টি দেখানো হয়েছে। এ ধরনের কারেন্টকে বলা হয় দিক পরিবর্তী কারেন্ট বা Alternating Current বা সংক্ষেপে AC (এসি)। ২ নং ছবির নিচের গ্রাফটিতে সময়ের সঙ্গে সঙ্গে বারবার কারেন্টের দিক পরিবর্তনের বিষয়টি তুলে ধরা হয়েছে। কিছুক্ষণ ‘0’ অক্ষের ওপরে, অর্থাৎ পজিটিভ থাকে কারেন্টের মান, পরক্ষণেই ‘0’ অক্ষের নিচে, অর্থাৎ নেগেটিভ হয়ে যায় কারেন্টের মান। অর্থাৎ এ ক্ষেত্রে RL-এর মধ্য দিয়ে ওপর থেকে নিচে কারেন্ট চলাকে বলা হচ্ছে পজিটিভ কারেন্ট, আর নিচ থেকে ওপরে চলাকে বলা হচ্ছে নেগেটিভ কারেন্ট। গ্রাফে কারেন্টের পজিটিভ অংশ ‘ক’ দিয়ে ও নেগেটিভ অংশ ‘খ’ দিয়ে দেখানো হয়েছে। তাহলে পজিটিভ ও নেগেটিভ কারেন্টের সঙ্গে দিক পরিবর্তনের বিষয়টি জড়িত, এটিই বলার চেষ্টা করা হয়েছে গ্রাফটিতে। তবে কেউ যদি উল্টিয়ে বলতে চায় যে RL-এর মধ্য দিয়ে ওপর থেকে নিচে কারেন্ট চলাকে বলা হবে নেগেটিভ কারেন্ট, আর নিচ থেকে ওপরে চলাকে বলা হবে পজিটিভ কারেন্ট, সেটিও চলবে। তবে যেটি একবার বলা হবে, সে বর্ণনাতেই স্থির থাকতে হবে, বারবার বর্ণনা পাল্টানো যাবে না।
সাধারণত আমরা মেইনস লাইনের মাধ্যমে যে এসি পাই, তা আসে বিদ্যুত্চুম্বকীয় জেনারেটর থেকে। মাইকেল ফ্যারাডের আবিষ্কৃত বিদ্যুৎ চুম্বকীয় আবেশের ওপর ভিত্তি করে জেনারেটর তৈরি করা হয়।
২ নং ছবির গ্রাফটিতে যে আকার বা প্যাটার্নটি আমরা দেখতে পাচ্ছি, তাকে বলা হয় স্কয়ার ওয়েভ (Square wave)। অর্থাৎ পরিবর্তনের সময় একটি সমকোণী চতুর্ভুজের মতো প্যাটার্নটি ৯০ ডিগ্রি কোণে পরিবর্তিত হচ্ছে। আমরা ব্যাটারি দুটিকে সুইচ দিয়ে পাল্টাতে থাকলে এ ধরনের কারেন্টের আকার দেখতে পাব। সাধারণত আমরা মেইনস লাইনের মাধ্যমে যে এসি পাই, তা আসে বিদ্যুত্চুম্বকীয় জেনারেটর থেকে। মাইকেল ফ্যারাডের আবিষ্কৃত বিদ্যুৎ চুম্বকীয় আবেশের ওপর ভিত্তি করে জেনারেটর তৈরি করা হয়। এ ধরনের এসি উত্সকে বৃত্তের মধ্যে একটি ঢেউ আঁকা সাংকেতিক চিহ্ন দিয়ে দেখানো হয়, যেমনটি দেখানো হয়েছে ৩ নং ছবিতে। এ জেনারেটরে সহজাত যে ভোল্টেজ তৈরি হয়, তা-ও দিক পরিবর্তী বা এসি। তবে এর মানের পরিবর্তনের আকারটি ভিন্ন, ৩ নং ছবির নিচের গ্রাফের মতো, সুন্দর ঢেউখেলানো। গাণিতিক সাইন (sine) ফাংশনের প্যাটার্নের সঙ্গে এর হুবহু মিল। জেনারেটরের কার্যকরণের সঙ্গে এ মিলের বৈজ্ঞানিক কারণও রয়েছে। তাই এ ধরনের প্যাটার্নকে বলা হয় সাইন ওয়েভ আর এ ধরনের জেনারেটরকে বলা হয় সাইন ওয়েভ জেনারেটর।
এবার আসা যাক আমাদের মূল বিষয়ে। ডায়োড ব্যবহার করে এসিকে কীভাবে ডিসিতে রূপান্তর করা যাবে। আমরা আগের পর্বে দেখেছি, ডায়োড একদিকে কারেন্ট চলতে দেয়, উল্টো দিকে দেয় না। তাহলে ব্যাপারটা খুবই সহজ হবে গেল না কি? ৩ নং সার্কিটের মধ্যে সুবিধামতো জায়গায় একটি ডায়োড বসিয়ে দিলেই হলো, যেমনটি দেখিয়েছি আমরা ৪ নং ছবিতে। এখানে ডায়োডটি কেবল তার সংকেতের তিরচিহ্নিত দিকে কারেন্ট চলতে দেয়, উল্টো দিকে দেয় না। কারেন্টটির দিকও ছবিতে দেখানো হয়েছে। লোড রেজিস্টর RL-এর ভেতর দিয়ে কারেন্ট IL1 চলার কারণে RL-এর ওপরের প্রান্তে যে ভোল্টেজ তৈরি হবে, তার পরিমাণ হবে VL1 = IL1 X RL, ওহমের সূত্রের অনুগত সূত্রের মাধ্যমে। আর এর মানটি হবে পজিটিভ, গ্রাউন্ডের তুলনায়। তাই ‘+’ দেখানো হয়েছে ছবিতে। তবে একটা জিনিস খেয়াল করতে হবে। এখানে উেসর যে কারেন্ট প্যাটার্ন ছিল, সেটি ছিল সাইন ওয়েভ। এর পজিটিভ অর্ধেককে, অর্থাৎ ‘ক’ অংশকে ডায়োড যেতে দিচ্ছে, ‘খ’ অংশকে নয়। ৩ নং ছবির গ্রাফের নিচের অংশকে বাদ দিলেই কারেন্টের প্যাটার্নটি পেয়ে যাব, যেটি হবে তার ওপরের অংশ। আবার এ কারেন্টটির কারণে যেহেতু ওপরের সূত্র অনুযায়ী VL1 তৈরি হচ্ছে, তাই VL1 এবং IL1-এর প্যাটার্ন দুটিও একই হবে, কেবল তাদের উলম্ব (Vertical) অক্ষ রেখার নাম, মান ও একক পরিবর্তিত হবে।
সার্কিটে লাল ও নীল রঙের বাঁকানো তির চিহ্ন দিয়ে কারেন্টের দিক পরিবর্তনের বিষয়টি দেখানো হয়েছে। এ ধরনের কারেন্টকে বলা হয় দিক পরিবর্তী কারেন্ট বা Alternating Current বা সংক্ষেপে AC (এসি)।
যেহেতু এ ক্ষেত্রে কারেন্টের দিক অপরিবর্তিত থাকছে, তাই আমরা বলতে পারি যে আমরা এসিকে ডিসিতে রূপান্তর করতে পেরেছি। তবে আমরা অবশ্যই খেয়াল করতে পারছি যে ১ নং ছবিতে দেওয়া ব্যাটারির কারেন্ট গ্রাফের সঙ্গে এ গ্রাফের মিল নেই। আগেরটিতে কারেন্ট ও ভোল্টেজের মান সময়ের সঙ্গে বদলাত না, কিন্তু এ ক্ষেত্রে তা সময়ের সঙ্গে বদলাচ্ছে। কিন্তু দুটিই দিক অপরিবর্তী, তাই দুটিই ডিসি।
৩ নং ছবিতে যে সাইন ওয়েভ দেখানো হয়েছিল, তাকে বলা হয় পূর্ণ ওয়েভ বা Full wave (ফুল ওয়েভ)। অপর দিকে ৪ নং ছবিতে যে গ্রাফ দেখানো হয়েছে, তাতে আগের ফুল ওয়েভের অর্ধেক অংশ আছে, তাই একে বলা হয় half wave (হাফ ওয়েভ)। যেহেতু এ কারেন্ট ও ভোল্টেজের মান সময়ের সঙ্গে পরিবর্তিত হচ্ছে, একে আমরা পরিবর্তনশীল ডিসি (varying DC) বলতে পারি।
৪ নং ছবিতে আমরা গ্রাউন্ডের সাপেক্ষে পজিটিভ ডিসি উত্স তৈরি করতে পেরেছি। ডায়োডটিকে ঘুরিয়ে দিলেই আমরা গ্রাউন্ডের সাপেক্ষে নেগেটিভ ডিসি উত্সও তৈরি করতে পারব, যেমনটি দেখানো হয়েছে ৫ নং ছবিতে। এখানে ৩ নং ছবির ফুল ওয়েভের ‘খ’ অংশের হাফ ওয়েভ কাজ করছে এবং আউটপুটের VL2 ভোল্টেজটি হচ্ছে নেগেটিভ।
তাহলে দেখা গেল, আমরা খুব সহজেই এসিকে ডিসি করতে পারি। তবে এ পরিবর্তনশীল ডিসি দিয়ে কোনো কোনো যন্ত্র চালানো গেলেও সব ব্যাটারিচালিত যন্ত্র চালানো যাবে না। যেমন এটি দিয়ে রেডিও চালালে একটি ‘ঘ..র..র...’ শব্দ তৈরি হবে। এটি আসবে ভোল্টেজের নিয়মিত বাড়া-কমার কারণে।
আর মেইন লাইনের বিদ্যুৎ সেকেন্ডে ৫০ বার পরিবর্তিত হয় বলে ৫০ হার্টজ ফ্রিকোয়েন্সির শব্দ হবে এটি—যা আমরা শুনতে পাই। পরবর্তী পর্যায়গুলোতে আমরা আলোচনা করব কীভাবে এই পরিবর্তনশীল ডিসিকে ব্যাটারির ডিসির মতো স্থির মানে নেওয়া যায়।
ও, আরেকটি কথা। এ ডায়োডকে কেন রেকটিফায়ার ডায়োড বলা হয়? ঐতিহাসিকভাবে ব্যাটারির মাধ্যমেই মানুষ চলবিদ্যুৎ পেয়েছে। তাই ব্যাটারির স্থির মানকেই আমরা বিশুদ্ধ বিদ্যুতের রূপ কল্পনা করে নিয়েছি। পরে যখন জেনারেটর আবিষ্কারের পর এসি আসতে শুরু করল, এটি আমাদের কল্পনায় হলো ‘দূষিত’ বা অবিশুদ্ধ। অতএব ‘অবিশুদ্ধ’ বিদ্যুৎকে যে ‘বিশুদ্ধ’ করতে পারবে, তার নাম রেকটিফায়ার বা সংশোধক হওয়াটাই তো স্বাভাবিক।