ক্যামেরায় ধরা পড়ল কোয়ান্টাম জগতের রহস্য
কোয়ান্টাম জগতের কথা উঠলেই একটি অদ্ভুত প্রশ্ন সামনে আসে। দুটি কণা যদি অনেক দূরে চলে যায়, তবু কি তারা একে অপরের সঙ্গে কোনোভাবে যুক্ত থাকতে পারে? একটি কণার ধর্ম মাপলে কি অন্য কণাটির ধর্মের সঙ্গে তার সম্পর্ক পাওয়া সম্ভব?
পদার্থবিদ্যার ভাষায় এই অদ্ভুত ঘটনাকে বলা হয় কোয়ান্টাম এন্ট্যাঙ্গেলমেন্ট বা কোয়ান্টাম জট। দুটি কণা কোয়ান্টামগতভাবে জড়িয়ে পড়লে তাদের ধর্মের মধ্যে এমন সম্পর্ক তৈরি হয় যে তাদের মধ্যে অনেক দূরত্ব থাকলেও একটির সঙ্গে অন্যটির সম্পর্ক খুঁজে পাওয়া যায়। আলবার্ট আইনস্টাইন এই ঘটনাকে বলেছিলেন স্পুকি অ্যাকশন অ্যাট আ ডিসট্যান্স। বাংলা করলে বাক্যটা অনেকটা এমন দাঁড়া— দূর থেকে ভুতুড়ে কাণ্ড।
আইনস্টাইনের কাছে বিষয়টি বেশ অস্বস্তিকর ছিল। কারণ, প্রচলিত পদার্থবিদ্যার ধারণার সঙ্গে এটি সহজে মেলে না। তিনি মনে করতেন, কণাগুলোর আচরণের পেছনে হয়তো এমন কোনো অজানা তথ্য আছে, যা আমরা এখনো জানি না। এই অজানা তথ্যকে বলা হয় হিডেন ভেরিয়েবল বা গোপন চলক। অর্থাৎ আইনস্টাইনের ধারণা ছিল, কণাগুলো হয়তো আগে থেকেই নিজেদের আচরণ ঠিক করে রাখে, শুধু আমরা তা জানি না।
দুটি কণা কোয়ান্টামগতভাবে জড়িয়ে পড়লে তাদের ধর্মের মধ্যে এমন সম্পর্ক তৈরি হয় যে তাদের মধ্যে অনেক দূরত্ব থাকলেও একটির সঙ্গে অন্যটির সম্পর্ক খুঁজে পাওয়া যায়।
কিন্তু এই দুই ধারণার মধ্যে কোনটি ঠিক, তা পরীক্ষা করা সহজ ছিল না। ১৯৬০-এর দশকে পদার্থবিদ স্যার জন বেল এ সমস্যার একটি সমাধান দেন। তিনি এমন একটি পরীক্ষার প্রস্তাব করেন, যার মাধ্যমে বোঝা সম্ভব যে কণাগুলোর আচরণের পেছনে সত্যিই কোনো গোপন চলক আছে কি না। এই পরীক্ষার সঙ্গে জড়িয়ে আছে একটি নির্দিষ্ট সীমা, যাকে বলা হয় বেলের অসমতা।
কোয়ান্টাম কণার আচরণ যদি বেলের অসমতার নির্দিষ্ট সীমা অতিক্রম করে, তাহলে গোপন চলকের ধারণা দিয়ে সেই আচরণ ব্যাখ্যা করা যায় না। বিভিন্ন পরীক্ষায় বিজ্ঞানীরা আগেই বেলের অসমতা লঙ্ঘনের প্রমাণ পেয়েছিলেন। কিন্তু এবার বিজ্ঞানীরা আরও একধাপ এগিয়ে গিয়ে কোয়ান্টাম এন্ট্যাঙ্গেলমেন্টের সেই প্রভাব ক্যামেরায় ধারণ করেছেন।
২০১৯ সালে যুক্তরাজ্যের গ্লাসগো বিশ্ববিদ্যালয়ের একদল গবেষক বিশেষ একটি ক্যামেরা ব্যবহার করে কোয়ান্টাম এন্ট্যাঙ্গেলমেন্টের প্রথম ছবি তোলেন। তাঁদের পরীক্ষায় বেলের অসমতা লঙ্ঘনের প্রমাণও পাওয়া যায়। ছবিটি তোলার জন্য গবেষকেরা প্রথমে অতিবেগুনি রশ্মির একটি লেজার বিটা-বেরিয়াম বোরেট নামের একটি বিশেষ ক্রিস্টালের ওপর ফেলেন। এতে কিছু ফোটন বা আলোককণা ভেঙে দুটি ফোটনে পরিণত হয়। শক্তি ও ভরবেগ সংরক্ষণের নিয়ম অনুযায়ী, তৈরি হওয়া এই দুই ফোটন পরস্পরের সঙ্গে কোয়ান্টামগতভাবে জড়িয়ে পড়ে বা এন্ট্যাঙ্গেলড হয়ে যায়।
২০১৯ সালে যুক্তরাজ্যের গ্লাসগো বিশ্ববিদ্যালয়ের একদল গবেষক বিশেষ একটি ক্যামেরা ব্যবহার করে কোয়ান্টাম এন্ট্যাঙ্গেলমেন্টের প্রথম ছবি তোলেন।
এরপর গবেষকেরা এই ফোটন দুটির আচরণ পর্যবেক্ষণ করেন। দেখা যায়, তাদের মধ্যে এমন একটি সম্পর্ক রয়েছে, যা কোনো গোপন চলক থাকলে যতটা হওয়ার কথা, তার চেয়ে অনেক বেশি। অর্থাৎ ফোটন দুটির আচরণ বেলের অসমতার সীমা অতিক্রম করে। এভাবেই পরীক্ষাটি কোয়ান্টাম এন্ট্যাঙ্গেলমেন্টের অদ্ভুত বৈশিষ্ট্যের আরও একটি শক্ত প্রমাণ দেয়।
তবে ছবিটি তোলা হয়েছে একটু অন্যভাবে। গবেষকেরা এমন একটি বিশেষ ক্যামেরা ব্যবহার করেন, যা একেকটি ফোটন আলাদাভাবে শনাক্ত করতে পারে। ক্যামেরাটি তখনই ছবি তুলেছে, যখন একটি ফোটনের সঙ্গে এন্ট্যাঙ্গেলড সঙ্গী ফোটনটিও শনাক্ত হয়েছে। ফলে ছবিতে ধরা পড়ে কোয়ান্টাম এন্ট্যাঙ্গেলমেন্টের প্রভাব।
এই গবেষণার সঙ্গে যুক্ত বিজ্ঞানী মাইলস প্যাজেটের মতে, এটি কোয়ান্টাম এন্ট্যাঙ্গেলমেন্ট যাচাইয়ের একটি গুরুত্বপূর্ণ পরীক্ষা। কোয়ান্টাম কম্পিউটিং ও কোয়ান্টাম ক্রিপ্টোগ্রাফির মতো প্রযুক্তিতে কোয়ান্টাম এন্ট্যাঙ্গেলমেন্ট এবং বেলের অসমতা এরই মধ্যে গুরুত্বপূর্ণ হয়ে উঠেছে। তবে ক্যামেরা ব্যবহার করে কোয়ান্টাম এন্ট্যাঙ্গেলমেন্টের প্রভাব নিশ্চিত করার ঘটনা এটাই প্রথম।
কোয়ান্টাম জগতের অনেক ঘটনাই আমাদের দৈনন্দিন অভিজ্ঞতার সঙ্গে মেলে না। দুটি কণার মধ্যে এমন অদ্ভুত সম্পর্ক তারই একটি উদাহরণ। এত দিন এই সম্পর্কের কথা বিজ্ঞানীরা হিসাব-নিকাশ ও পরীক্ষার ফলাফল দিয়ে বুঝেছেন। এবার সেই অদ্ভুত সম্পর্কের প্রভাব ছবিতেও ধরা পড়ল।