কোয়ান্টাম বলবিদ্যায় সবকিছুই কি অনিশ্চিত

কোয়ান্টাম জগতে সবকিছুই অনিশ্চিতছবি: ইউএনএসডব্লিউ

কোয়ান্টাম তত্ত্বের জন্ম হয়েছিল জার্মান বিজ্ঞানী ম্যাক্স প্ল্যাঙ্ক ও আলবার্ট আইনস্টাইনের হাতে। গত শতাব্দীর দ্বিতীয় ও তৃতীয় দশকে এই তত্ত্বকে এগিয়ে নেন নীলস বোর, ম্যাক্স বর্ন, ফরাসি বিজ্ঞানী লুই দ্য ব্রগলি এবং ঢাকা বিশ্ববিদ্যালয়ের সাবেক অধ্যাপক সত্যেন্দ্রনাথ বসু। তবে কোয়ান্টাম বলবিদ্যার আসল রূপকার হিসেবে গণ্য করা হয় জার্মান বিজ্ঞানী ওয়ার্নার হাইজেনবার্গ এবং অস্ট্রিয়ার বিজ্ঞানী আরউইন শ্রোডিঙ্গারকে।

হাইজেনবার্গের অনিশ্চয়তা নীতি ও শ্রোডিঙ্গারের তরঙ্গ ফাংশন খুদে কণাদের জগৎকে ফেলে দেয় চরম অনিশ্চয়তার মধ্যে। কোয়ান্টাম বলবিদ্যার সমাধানগুলো থেকে বেরিয়ে আসে একের পর এক অদ্ভুত তত্ত্ব। সেসব তত্ত্ব বলে, খুদে কণাদের জগতে কোনো কিছুই নিশ্চিত নয়। এই জগতের হিসাব-নিকাশ নির্ভর করে সম্ভাবনা তত্ত্বের ওপর। অর্থাৎ কণাদের চরিত্র বা ধর্মগুলো নিশ্চিতভাবে বলতে পারে না কোয়ান্টামের হিসাব-নিকাশ, তবে সর্বোচ্চ সম্ভাব্য ফলাফল বলে দিতে পারে। মোদ্দা কথা, কোয়ান্টাম জগতে সবকিছুই অনিশ্চিত।

এই যে অনিশ্চয়তার কথা আমরা চোখ বুজে বলে দিই, এটি কি আসলে ঠিক, নাকি বহুল প্রচলিত কোনো মিথ? চলুন, বিষয়টি বিশ্লেষণ করা যাক।

ধরা যাক ইলেকট্রনের কথা। একটি ইলেকট্রন পরমাণুর কোথায় থাকবে, তা নিশ্চিত করে বলার উপায় নেই যতক্ষণ না আপনি পরীক্ষা করছেন। হাইজেনবার্গের নীতি বলছে, কক্ষপথে থাকা একটি ইলেকট্রনের অবস্থান ও ভরবেগ একই সঙ্গে নিখুঁতভাবে জানা সম্ভব নয়। আপনি যদি অবস্থান নিশ্চিতভাবে জানতে চান, তাহলে ভরবেগ অনিশ্চিত হয়ে পড়বে। আবার ভরবেগ যদি নিশ্চিতভাবে জানতে চান, তাহলে এর অবস্থান অনিশ্চিত হবে।

আরও পড়ুন
কণাদের চরিত্র বা ধর্মগুলো নিশ্চিতভাবে বলতে পারে না কোয়ান্টামের হিসাব-নিকাশ, তবে সর্বোচ্চ সম্ভাব্য ফলাফল বলে দিতে পারে। মোদ্দা কথা, কোয়ান্টাম জগতে সবকিছুই অনিশ্চিত।

অনিশ্চয়তার এই তত্ত্বে কি আপনি নিশ্চয়তার দেখা পাচ্ছেন না? আপনি ভরবেগ নিশ্চিতভাবেই মাপতে পারবেন, যদি অবস্থানের অনিশ্চয়তা মেনে নেন। তেমনি উল্টোটাও সত্য—অবস্থানের নিশ্চয়তা পাবেন, তখন খেসারত হিসেবে ভরবেগের অনিশ্চয়তা মেনে নিতে হবে। অর্থাৎ অনিশ্চয়তা নীতি মেনেই আপনি ইলেকট্রনের যেকোনো একটি ধর্ম নিশ্চিতভাবে পরিমাপ করতে পারেন।

এবার আসা যাক শ্রোডিঙ্গারের তত্ত্বে। লুই দ্য ব্রগলি দেখিয়েছিলেন, যেকোনো কণার তরঙ্গ ধর্ম আছে। অন্যদিকে ম্যাক্স প্ল্যাঙ্ক দেখিয়েছিলেন আলোক তরঙ্গেরও কণা ধর্ম আছে। এই দুই তত্ত্বের হিসাব থেকে আরেকটি বিখ্যাত টার্মের উদ্ভব হয়—কোয়ান্টাম সুপারপজিশন। অর্থাৎ যেকোনো কণা একই সঙ্গে কণা ও তরঙ্গের সুপারপজিশনে থাকে। তাই পর্যবেক্ষণের ওপর নির্ভর করে কোনটি কণা, কোনটি তরঙ্গ হিসেবে পাবেন।

কোয়ান্টাম সুপারপজিশন বলতে বোঝায় যেকোনো কণা একই সঙ্গে কণা ও তরঙ্গের সুপারপজিশনে থাকে
ছবি: এআইয়ের সাহায্যে তৈরি

আপনি যদি কণা হিসেবে পেতে চান, তবে সেভাবেই আপনাকে পরীক্ষার যন্ত্রপাতি সাজাতে হবে। তখন এর তরঙ্গ ফাংশন কলাপ্স করবে। আর যদি তরঙ্গ হিসেবে পেতে চান, তাহলে এর কণা ধর্ম প্রকাশ পাবে না। সুতরাং এখানেও নিশ্চয়তা আছে—পর্যবেক্ষক ঠিক যেভাবে কণাদের দেখতে চান, সেভাবেই দেখতে পাবেন।

কোয়ান্টাম মেকানিকস পদার্থবিজ্ঞানের ইতিহাসে সবচেয়ে সফল শাখা। গত এক শতকে হাজার হাজার পরীক্ষা-নিরীক্ষা হয়েছে এবং প্রায় প্রতিটি পরীক্ষাতেই উত্তীর্ণ হয়েছে কোয়ান্টাম মেকানিকস। চিরায়ত আলোকবিজ্ঞান, তড়িৎবিজ্ঞান কিংবা প্রাচীন কণাতত্ত্বের চেয়ে অনেক নির্ভুল ও সূক্ষ্মভাবে পরীক্ষা-নিরীক্ষার ফল পাওয়া সম্ভব কোয়ান্টাম মেকানিকস থেকে। আর এই নিশ্চয়তা আছে বলেই ইলেকট্রনিক যন্ত্রপাতিগুলো এত নিখুঁতভাবে কাজ করে, কম্পিউটারে জটিল হিসাব-নিকাশ করা যায় এবং মহাকাশের দূর-দূরান্তে নভোযান পাঠানো সম্ভব হয়।

আরও পড়ুন
কোয়ান্টাম সুপারপজিশন বলতে বোঝায় যেকোনো কণা একই সঙ্গে কণা ও তরঙ্গের সুপারপজিশনে থাকে। তাই পর্যবেক্ষণের ওপর নির্ভর করে কোনটি কণা, কোনটি তরঙ্গ হিসেবে পাবেন।

বিজ্ঞানীরাও কোয়ান্টাম মেকানিকসের ফলাফল নিয়ে সন্তুষ্ট। মার্কিন তাত্ত্বিক পদার্থবিজ্ঞানী শন ক্যারলের বক্তব্যই তার প্রমাণ। তিনি বলেন, ‘কোয়ান্টাম তত্ত্ব সবচেয়ে সফল বৈজ্ঞানিক তত্ত্বগুলোর একটি। এর গাণিতিক পূর্বাভাসগুলো পরীক্ষার মাধ্যমে যাচাই করা সম্ভব হয়েছে।’ অথচ ক্যারলের বক্তব্যের উল্টো ধারণাই আমাদের মস্তিষ্কে গেঁথে গেছে যে, চিরায়ত বলবিদ্যার মতো সুন্দরভাবে কোয়ান্টাম মেকানিকস কোনো ঘটনার ভবিষ্যদ্বাণী করতে পারে না।

এই পূর্বাভাসটা কেমন? ধরুন, আপনি কোথাও কোয়ান্টাম টানেলিংয়ের মাধ্যমে বিরাট একটি বাধা টপকাবেন। ধরা যাক, একটি অ্যালুমিনিয়ামের দেয়াল আছে। তার ওপাশে কিছু ইলেকট্রন পাঠাতে চান। সাধারণ কণাতত্ত্ব দিয়ে হিসাব করুন, দেখবেন সেই হিসাব বলবে দেয়াল ভেদ করে ইলেকট্রনের পক্ষে ওপাশে যাওয়া সম্ভব নয়। কিন্তু কোয়ান্টাম টানেলিংয়ের হিসাব আপনাকে বলবে, ১ কোটি ইলেকট্রনের ভেতর অন্তত ১০টি ইলেকট্রন দেয়াল টপকে ওপারে চলে যাওয়ার সম্ভাবনা আছে।

এবার পরীক্ষা করে দেখার পালা। আপনি ৫০ কোটি ইলেকট্রনের ঝাঁক ছুড়ে মারুন দেয়াল বরাবর। তারপর গুনে দেখুন, ৫০০টি ইলেকট্রনকে আপনি দেয়ালের ওপাশে পাবেন। ঠিক এমনি অনেক জটিল হিসাব আছে, যেগুলো পূর্ণসংখ্যায় হিসাব করলে চলে না, দশমিকের পরেও অনেক ঘর পর্যন্ত নির্ভুলভাবে মাপা দরকার হয়। কোয়ান্টাম বলবিদ্যার সাহায্যে হিসাবটি করে দেখুন। তারপর সেটি পরীক্ষা করুন। দেখবেন দশমিকের পর কয়েক শ ঘর পর্যন্ত নিখুঁতভাবে মিলে গেছে। এমনটা হয়তো চিরায়ত বলবিদ্যায় অসম্ভব।

আরও পড়ুন
মার্কিন তাত্ত্বিক পদার্থবিজ্ঞানী শন ক্যারলের বলেন, ‘কোয়ান্টাম তত্ত্ব সবচেয়ে সফল বৈজ্ঞানিক তত্ত্বগুলোর একটি। এর গাণিতিক পূর্বাভাসগুলো পরীক্ষার মাধ্যমে যাচাই করা সম্ভব হয়েছে।’

মার্কিন পদার্থবিদ ও বিজ্ঞান লেখক জিম আল-খলিলিও শন ক্যারলের সঙ্গে সুর মিলিয়েছেন। তাঁর মতে, কোয়ান্টাম মেকানিকসের জগৎটাকে যে কারও অদ্ভুত বা রহস্যময় মনে হবে, তবে এর গাণিতিক কাঠামো অত্যন্ত শক্তিশালী। তিনি বলেন, ‘কোয়ান্টাম মেকানিকসের সাহায্যে পরমাণু ও অতিপারমাণবিক কণাগুলোর আচরণ খুব নিখুঁতভাবে ব্যাখ্যা করা যায়। চিরায়ত তত্ত্ব এসব ক্ষেত্রে অনেকটাই ব্যর্থ।’

মোদ্দা কথা, অনিশ্চয়তা ও সম্ভাবনা কোয়ান্টাম মেকানিকসের মূল ভিত্তি। তবে এর গাণিতিক ভিত্তি এতই শক্তিশালী যে, হিসাব-নিকাশ ও পরীক্ষণের সাহায্যে সব সময় নিখুঁত ফল পাওয়া সম্ভব।

লেখক: সাংবাদিক

সূত্র: ফিজিকস ওয়ার্ল্ড

আরও পড়ুন