দ্য ভিজিট

‘বাবা, তুমি কি মনে করো সময় ভ্রমণ সম্ভব?’ বিলি জিজ্ঞেস করল। ‘স্পেস ক্যাডেট জ্যাকের মতো?’

‘সম্ভবত টেলিভিশন বা মুভিতে বিষয়টা যেভাবে ঘটে, সে রকম নয়।’ ছেলের মাথার চুল এলোমেলো করে দিলেন বাবা। তারপর টেলিস্কোপটা ঠিক করলেন। দ্রুত অন্ধকার হয়ে আসছে আকাশ। শুক্র ও বৃহস্পতি জ্বলছে মাথার ওপর। এমনকি মঙ্গল গ্রহও এখন দৃশ্যমান। বাবা গাড়ির ট্রাংক থেকে রান্নাঘরের ছোট প্লাস্টিকের টুল টেনে আনলেন, যাতে বিলি ওটার ওপর দাঁড়িয়ে টেলিস্কোপের আইপিসে চোখ রাখতে পারে। বৃহস্পতি বিলির পছন্দের গ্রহ। বাবার টেলিস্কোপের মাধ্যমে এর ব্যান্ডগুলো দেখা যাবে। আরও দেখা যাবে চারটি তারা, যেগুলো আসলে গ্যালিলিওর চাঁদ; এমনকি কখনো কখনো গ্রেট রেড স্পটও দেখা যাবে। ছবিতে গ্রহটা শুধু লাল দেখাচ্ছিল। অথচ টেলিস্কোপে দেখলে পুরো গ্রহটা হলুদ হয়ে যায়।

‘কেন নয়?’

বাবা একটু ভাবলেন। উত্তরে তিনি টেলিস্কোপের ট্রাইপড ঘুরিয়ে পূর্ণ চাঁদের দিকে নির্দেশ করলেন। আসলে লেজার ডায়োড ব্যবহার না করলেও চলে, কিন্তু ব্যবহার করছেন, যাতে বিলি দেখে শিখতে পারে। ‘ঠিক আছে, সোনা,’ তিনি বললেন। ‘আইপিস দিয়ে তাকাও। কী দেখতে পাচ্ছ?’

বিলি টুলের ওপর আঙুলের ডগায় ভর দিয়ে দাঁড়াল। বলল, ‘কিছু না।’

‘অপেক্ষা করো,’ বাবা বললেন।

কয়েক মুহূর্ত কেটে গেল। ‘চাঁদ!’ বিলি উত্তেজিত গলায় বলল। ‘আমি পার্শ্বরেখা দেখতে পাচ্ছি!’

‘দেখতে থাকো,’ বাবা বললেন।

আরও কয়েক সেকেন্ড কেটে গেল। ‘এখন আরও বেশি কিছু দেখতে পাচ্ছি,’ বিলি বলল, ‘বৃত্তের মতো করে ঘুরছে!’

আরও পড়ুন
আসলে লেজার ডায়োড ব্যবহার না করলেও চলে, কিন্তু ব্যবহার করছেন, যাতে বিলি দেখে শিখতে পারে। ‘ঠিক আছে, সোনা,’ তিনি বললেন। ‘আইপিস দিয়ে তাকাও। কী দেখতে পাচ্ছ?’

‘ভিউ ফিল্ড,’ বাবা বললেন। ‘হ্যাঁ, দেখতে থাকো।’

এক মিনিট পর বিলি বলল, ‘ওটা প্রায় চলে গেছে।’

‘ঠিক আছে। চলে গেল কেন?’

বিলি একটু চিন্তা করে বলল, ‘টেলিস্কোপ কি নড়ছে?’

বাবা হাসলেন। ‘ভালো অনুমান! কিন্তু না। ট্রাইপডে লক করা আছে।’

‘তাহলে চাঁদ নড়ছে!’

‘হ্যাঁ। চাঁদ পৃথিবীকে প্রদক্ষিণ করছে।’

‘কিন্তু টাইম ট্রাভেলের সঙ্গে এর সম্পর্ক কী?’

‘পৃথিবীও একই কাজ করছে, সূর্যকে প্রদক্ষিণ করছে। এমনকি এখন, এই মুহূর্তেও সূর্যকে প্রদক্ষিণ করছে পৃথিবী। সূর্যের ওপরে ঘুরছে। তাই এখন রাত।’ বাবা তাঁর হাত দিয়ে সামান্য নড়াচড়া করলেন, যেন একটা অদৃশ্য বলের চারপাশে কিছু ঘুরছে। ‘এটা হলো সূর্য,’ সে তার অন্য মুঠি ধরে বলল। ‘এটা পৃথিবী।’ তিনি প্রথমে পৃথিবী ঘুরিয়ে বললেন, ‘রাত্রি।’ তারপর একই হাতে অন্য বৃত্ত তৈরি করলেন। বললেন, ‘গ্রীষ্ম, শরৎ, শীত, বসন্ত।’

‘আমি এখনো বুঝতে পারিনি,’ বিলি বলল। ‘বলতে চাচ্ছি, ঋতু এবং অন্যান্য জিনিস আমি বুঝতে পারি, কিন্তু সময় ভ্রমণ বুঝতে পারি না।’

বাবা শুক্রের দিকে টেলিস্কোপটি আবার তাক করলেন। ‘জ্যাক যখন তার সময়ে ফিরে যায়, তখন সে সব সময় একই জায়গায় থাকে। সে যদি টেবিলে বসে থেকে তার কবজিতে টাইম-শিফট বোতামে চাপ দেয় আর পাঁচ মিনিট পেছনে লাফ দেয়, তবে সে এখনো টেবিলে বসে আছে, তা–ই না?’

আরও পড়ুন
বাবা তাঁর হাত দিয়ে সামান্য নড়াচড়া করলেন, যেন একটা অদৃশ্য বলের চারপাশে কিছু ঘুরছে। ‘এটা হলো সূর্য,’ সে তার অন্য মুঠি ধরে বলল। ‘এটা পৃথিবী।’ তিনি প্রথমে পৃথিবী ঘুরিয়ে বললেন, ‘রাত্রি।’

‘ঠিক, ঠিক!,’ বিলি চেঁচিয়ে বলে উঠল। ‘সে সিটের ওপর কিছু আঠা রাখল। কারণ, সে জানত, সোরান দ্য সরোনিয়ান এসে বসবে এবং সবাইকে বোকা বানাবে!’

‘ঠিক,’ বাবা বললেন। ‘কিন্তু এটা নিয়ে ভাবো। টেবিলটা কেন এখনো সেখানে থাকবে? একই জায়গায়। জ্যাক যেখানে বসে ছিল, ঠিক সেই জায়গায়?’

‘আমি এখনো বুঝতে পারিনি।’

বাবা তার মুঠি ধরে বললেন। ‘জ্যাক এখানে সেই টেবিলে বসে আছে।’ তিনি তাঁর তর্জনীর গাঁটের দিকে ইশারা করলেন। ‘বর্তমানে ঠিক এখানে, তা–ই তো?’

‘হ্যাঁ।’

‘এখন, পৃথিবী তো ঘুরবে, তা–ই না? তাহলে সে যদি পাঁচ মিনিট পিছিয়ে যায়,’ বাবা একটু থামলেন, তারপর ঘড়ির কাঁটার বিপরীত দিকে হাত ঘোরালেন। ‘টেবিলটি পাঁচ মিনিট আগে যেখানে ছিল, সেখানে ফিরে আসবে। ঠিক যেমন চাঁদ যেখানে ছিল, সেখানে ফিরে আসবে, যখন তুমি পাঁচ মিনিট আগে চাঁদকে প্রথমবার ভিউ ফিল্ডে দেখেছিলে। এতক্ষণে এটি সেখানে পৌঁছে গেছে।’ তিনি ইশারা করলেন চাঁদ এখন কোথায়। ‘তুমি সম্ভবত কোনোমতে দেখতে পাচ্ছ, কিন্তু দেখতে পাচ্ছ। এ মুহূর্তে ওটা বৃক্ষের মতো দেখতে তার শাখার ওপরে আছে, দেখো? দেখতে ‘ভি’র (V) মতো? এক মিনিট পর আবার নড়তে শুরু করবে। দেখো।’

বিলি সতর্ক দৃষ্টিতে তাকাল এবং দেখল ‘ওহ!’ চেঁচিয়ে বলল সে।

আরও পড়ুন
‘এখন, পৃথিবী তো ঘুরবে, তা–ই না? তাহলে সে যদি পাঁচ মিনিট পিছিয়ে যায়,’ বাবা একটু থামলেন, তারপর ঘড়ির কাঁটার বিপরীত দিকে হাত ঘোরালেন।

বাবা হাত আবার মুঠি করলেন। ‘ঠিক আছে,’ তিনি বললেন, ‘এটা সূর্য।’ তিনি তাঁর অন্য মুঠি ধরে রাখলেন। ‘এটা পৃথিবী। ধরা যাক, গ্রীষ্মকাল। জ্যাক যদি ছয় মাসের মধ্যে ফিরে আসে, তখন পৃথিবী কোথায় থাকবে?’

বিলি ভাবল। ‘সূর্যের ওপরে!’ সে চেঁচিয়ে বলল। ‘এবার বুঝতে পেরেছি!’

বাবা পরীক্ষা করার জন্য জিজ্ঞেস করলেন, ‘জ্যাক যদি ছয় মাস পিছিয়ে যায়, তারপরও একই জায়গায় থাকে, তাহলে তাকে কোথায় পাওয়া যাবে?’

‘মহাকাশে!’

‘হ্যাঁ। ভালো কথা, তার কাছে তো একটা স্পেসস্যুট আছে, তাই না?’

‘বাহ, আমি এটা নিয়ে কখনো ভাবিনি!’

‘অনেক মানুষই তা ভাবে না। আসলে এটা অনেক বেশি জটিল। এটা ঠিক না যে পৃথিবীই শুধু সূর্যের চারপাশে ঘুরছে। সবকিছুই ঘুরছে। সূর্য ঘুরছে। পুরো মিল্কিওয়ে গ্যালাক্সি ঘুরছে। আমার বয়স ৪৫ বছর। আমার জন্মের সময় থেকে এখন পর্যন্ত—এর মধ্যে পৃথিবী ট্রিলিয়ন মাইল স্থানান্তরিত হয়েছে। তুমি যদি আমার পিতামহের সময়ে ফিরে যেতে চাও, তাহলে তোমাকে দীর্ঘ সময় ভ্রমণ করতে হবে। তিনি যখন জীবিত ছিলেন, তখন পৃথিবী আসলে যেখানে ছিল, সেখানে পৌঁছানোর জন্য পাড়ি দিতে হবে দীর্ঘ সময়।’

আরও পড়ুন
বাবা পরীক্ষা করার জন্য জিজ্ঞেস করলেন, ‘জ্যাক যদি ছয় মাস পিছিয়ে যায়, তারপরও একই জায়গায় থাকে, তাহলে তাকে কোথায় পাওয়া যাবে?’

‘ওহ, বাহ,’ বিলি বলল। তারা কিছুক্ষণ চুপ করে রইল। বাবা মঙ্গল গ্রহের দিকে মনোনিবেশ করলেন, তাকে দেখাচ্ছিলেন মাঠে বরফের ছিদ্রগুলো কীভাবে উজ্জ্বল রংধনুর মতো দেখায়। কিন্তু যখন তারা সব যন্ত্রপাতি গুছিয়ে নিয়ে বাড়ি ফিরছিল, তখন তাকে হতাশা পেয়ে বসল। ‘আমার খুব খারাপ লাগছে যে ভবিষ্যতের লোকেরা আমাদের সঙ্গে কখনোই দেখা করবে না।’

বাবা বিলির মাথায় হাত বুলিয়ে দিলেন। ‘হয়তো তারা পারবে,’ তিনি বললেন। ‘তবে গাণিতিক হিসাব-নিকাশগুলো নিয়ে তাদের সতর্ক থাকতে হবে। তাহলেই তারা পৃথিবীতে আসতে পারবে। বুঝতেই পারছ, এর বদলে…তারা যদি পৃথিবীর সামনে বা অন্য কোথাও…এর কক্ষপথে পা—’

‘দেখো!’ বিলি আকাশের দিকে তাকিয়ে বলল। ‘একটা খসে পড়া তারা!’

অনুবাদ: হাসান খুরশীদ রুমী

*লেখাটি ২০২৪ সালে বিজ্ঞানচিন্তায় সেপ্টেম্বর সংখ্যায় প্রকাশিত

আরও পড়ুন