‘আর এগোনো যাবে না,’ বলল রফিক আহমেদ।
স্কাউট কারের ইঞ্জিন বন্ধ করল সে। শুক্র গ্রহের দক্ষিণ মেরুর কাছাকাছি পৌঁছে গেছে ওরা। সামনে ওদের খাড়া উঠে গেছে সুউচ্চ এক পাহাড়। পাথুরে পাহাড় বাইতে পারবে না স্কাউট কার।
‘পেছাতে হবে আমাদের।’ রফিক বলল সঙ্গীদের।
সঙ্গীরা হলো তিনজন বিজ্ঞানী। শুক্র গ্রহের দক্ষিণ মেরুতে গবেষণা করতে এসেছে। পিছু হটতে মোটেও আগ্রহী নয় তারা। বরকত বিনকিউলার ভেদ করে সতর্ক দৃষ্টিতে নিরিখ করল পাহাড়টা।
‘দেখো!’ বলে উঠল। ‘দেখতে পাচ্ছ?’
নিজের বিনকিউলারে চোখ রাখল জব্বার আর সালাম।
‘কোনো এক সময় পাহাড় থেকে পানির ঢল নামত,’ বলল বরকত। ‘আমরা শুকনো এক জলপ্রপাত দেখতে পাচ্ছি। বলেছিলাম না, এ গ্রহে নদী আছে?’ ভয়ানক উত্তেজিত সে।
‘নদী থাকে কীভাবে?’ প্রশ্ন করে রফিক। ‘শুক্র গ্রহে পানি নেই। এতই গরম এখানে, বৃষ্টি পড়তে পারে না। পানি থাকার প্রশ্নই ওঠে না।’
‘কিন্তু এখানে, দক্ষিণ মেরুর কাছে তো বেশ ঠান্ডা। আর পাহাড়ের মাথায় নিশ্চয়ই আরও ঠান্ডা হবে। ওখানে দেখা যাবে উল্টো। ঠান্ডার চোটে বৃষ্টি পড়ে না। মেরুতে গিয়ে দেখি না কেন আমরা?’
‘কী দরকার?’ জবাব চায় রফিক।
‘ওখানে যদি পানি থাকে,’ বলে বরকত, ‘পানিতে প্রাণের সন্ধানও মিলবে। ওদিকটায় হ্রদটদ আছে কি না, দেখতে চাই আমি।’
‘কিন্তু এই গাড়ি নিয়ে ওখানে উঠবে কী করে?’ বলে রফিক।
‘গাড়ি নেব কেন, চড়াই বেয়ে উঠব,’ বলে বরকত। ‘দেখো, খুব একটা কষ্ট হবে না।’
‘কোনো এক সময় পাহাড় থেকে পানির ঢল নামত,’ বলল বরকত। ‘আমরা শুকনো এক জলপ্রপাত দেখতে পাচ্ছি। বলেছিলাম না, এ গ্রহে নদী আছে?’ ভয়ানক উত্তেজিত সে।
জব্বার আর সালাম পেছনে রইল। পাহাড়চূড়ার উদ্দেশে রওনা দিল রফিক আর বরকত। বড় কষ্টকর যাত্রা। বাইরে তাপমাত্রা ২৩০ ডিগ্রি। হিমায়িত স্পেসস্যুট পরতে বাধ্য হয়েছে ওরা এবং সেই সঙ্গে বৈজ্ঞানিক যন্ত্রপাতিও বহন করছে। ফলে ওজন সহজেই কাহিল করে দিচ্ছে ওদের।
যতই চড়াই বাইছে, গ্রহের সবুজ আলো চারদিকে জাল বিস্তার করে চলেছে। পাহাড়চূড়ায় মাটি সমতল, লক্ষ করল ওরা। আবিষ্কার করল শুকনো নদীর চিহ্ন। হাঁটছে তো হাঁটছেই। কেমন গা–ছমছমে পরিবেশ। রফিক একটু একটু ভয় পেতে শুরু করেছে, কিন্তু বরকতের উৎসাহের কমতি নেই। মাঝেমধ্যে থেমে পড়ে পাথরের নমুনা সংগ্রহ করছে সে।
‘ক্রমেই ঠান্ডাটা বাড়ছে,’ বলল বরকত। ‘আমার ইনস্ট্রুমেন্ট বলছে, বাতাসে অক্সিজেন আছে।’
‘তাতে তী হলো?’
‘তাতে হলো এই, এখানে গাছপালা থাকতে বাধ্য,’ ব্যাখ্যা করে বোঝাল বরকত। ‘গাছপালা অক্সিজেন তৈরি করে। তার অর্থ শুক্র গ্রহে প্রাণের অস্তিত্ব আছে। মৃত গ্রহ নয় এটা।’
হেঁটে চলল দুজনে। একটু পরই সামনে একটা হ্রদ দেখতে পেল। কালো আয়নার মতো চকচকে দেখাচ্ছে সেটাকে। বরকত কয়েক ফোঁটা পানি সংগ্রহ করে মাইক্রোস্কোপে পরখ করল। কিন্তু ওতে প্রাণের দেখা পেল না সে।
আবার হাঁটার পালা। ক্রমেই মেজাজটা খিঁচড়ে উঠছে রফিকের। মোটেই জুত লাগছে না তার এখানে। সবুজ আলো আর কালো পানির হ্রদ কেমন ভুতুড়ে অনুভূতি ছড়াচ্ছে ওর মনে।
আচমকা থমকে দাঁড়াল বরকত।
‘কী হলো?’ প্রশ্ন করল রফিক।
‘পাথরটা দেখো,’ বলল বরকত। ‘বাড়ছে ওটা। বেড়ে উঠে কেমন নড়াচড়া করছে দেখেছ?’
যতই চড়াই বাইছে, গ্রহের সবুজ আলো চারদিকে জাল বিস্তার করে চলেছে। পাহাড়চূড়ায় মাটি সমতল, লক্ষ করল ওরা। আবিষ্কার করল শুকনো নদীর চিহ্ন। হাঁটছে তো হাঁটছেই। কেমন গা–ছমছমে পরিবেশ।
রফিক লক্ষ করল। কালো অবয়বটা নড়ছে। এগিয়ে আসছে ওদের উদ্দেশে। বিনকিউলারে চোখ রেখে ঠায় দাঁড়িয়ে রয়েছে বরকত। পাথরটা ক্রমান্বয়ে এগিয়ে আসছে। আর যখন শ খানেক গজ দূরে, কথা বলে উঠল রফিক।
‘কী ওটা?’
‘আমার মনে হয়, কোনো ধরনের উদ্ভিদ হবে,’ জবাব দিল বরকত।
‘কিন্তু নড়ছে যে! গাছপালা নড়ে নাকি?’
‘নড়ে,’ বলল বরকত। ‘পৃথিবীতে এমনও উদ্ভিদ আছে, নড়াচড়া করে। কিন্তু খুবই ধীরে ধীরে, তাই বোঝা যায় না। এটা অনেক বেশি দ্রুত নড়ছে!’
কালো, পুরু, নরম কার্পেটের মতো দেখতে লাগছে উদ্ভিদটাকে। নিঃশব্দে ওদের দিকে এগোচ্ছে ওটা। তারপর একটা সময়, ১০ ফুটের মতো ফারাক রেখে থেমে গেল। এবার সামনে পা বাড়াল বরকত। অমনি পেছনে সরে গেল আজব উদ্ভিদটা।
‘আমাদের স্পেসস্যুটের তাপ টের পাচ্ছে ওটা,’ বলল বরকত। টর্চ বের করল সে। ‘দেখি তো, জিনিসটা আলো অনুভব করে কি না।’
সে টর্চ জ্বালতে দুজনই বিস্ময়ে চিৎকার করে উঠল। শুক্র গ্রহের সবুজ আলোয় কুচকুচে কালো দেখিয়েছিল উদ্ভিদটাকে। কিন্তু এখন টর্চের সাদা আলো পড়তেই ওরা লক্ষ করল, জিনিসটার গায়ে আগুনে লাল আর সোনালির মিশেল। অপূর্ব সুন্দর এক গালিচা যেন।
কালো, পুরু, নরম কার্পেটের মতো দেখতে লাগছে উদ্ভিদটাকে। নিঃশব্দে ওদের দিকে এগোচ্ছে ওটা। তারপর একটা সময়, ১০ ফুটের মতো ফারাক রেখে থেমে গেল। এবার সামনে পা বাড়াল বরকত।
বরকত কাছ থেকে খুঁটিয়ে নিরিখ করতে চাইল ওটাকে। উদ্ভিদের অল্প একটু অংশ কেটে নেওয়ারও চেষ্টা করল সে। কিন্তু ওটাকে কায়দা করা কঠিন হলো। তবে শেষমেশ একটা টুকরা ঠিকই কেটে নেওয়া গেল। এরপর আবারও পাথরের কিছু নমুনা সংগ্রহ করল সে। কাজের ধকলে দুজন হাঁপিয়ে উঠল ভারী স্পেসস্যুটের ভেতর।
খানিক বিশ্রাম নেবে, ঠিক করল ওরা। খিদে-তেষ্টায় কাহিল দশা। ছোট তাঁবুটা খাটিয়ে, কিছু মুখে দিয়ে ভেতরে সটান হলো। দুজনই ভয়ানক উত্তেজিত। সবাই বলেছিল, ভেনাস ‘মৃত গ্রহ’। কিন্তু কোথায়? দিব্যি প্রাণ আবিষ্কার করে বসে আছে ওরা। ভেনাসেরও জীবন আছে পৃথিবী আর মঙ্গল গ্রহের মতো।
এবার ফেরার পালা। নিজেদের অভুক্ত আবর্জনা জড়ো করে একটা প্লাস্টিকের ব্যাগে পুরল ওরা। একটা গর্ত খুঁড়ে ব্যাগটা মাটিচাপা দিল। তারপর বেশ কিছু পাথর দিয়ে ঢেকে দিল মুখটা। এবার ফিরতি পথ ধরল। কিছু ঘণ্টা বাদে, স্কাউট কারের কাছে এসে পৌঁছাল। ইতিমধ্যে সিদ্ধান্ত নিয়ে ফেলেছে, শিগগিরই আবার দক্ষিণ মেরু অভিযানে আসবে।
বেশ কিছুক্ষণ হ্রদের কাছে কোনো নড়াচড়া নেই। এবার আরেকটি উদ্ভিদের আগমন হলো। পাথর মাড়িয়ে এগোল ওটা। খাবারের খোঁজ করছে। টের পাচ্ছে, কিছু একটা আছে ওখানে, ওই পাথরখণ্ডগুলোর নিচে। একের পর এক পাথর সরিয়ে তল্লাশি চালাচ্ছে ওটা এবং অবশেষে পেয়েও গেল প্লাস্টিকের ব্যাগটা।
এবার ফেরার পালা। নিজেদের অভুক্ত আবর্জনা জড়ো করে একটা প্লাস্টিকের ব্যাগে পুরল ওরা। একটা গর্ত খুঁড়ে ব্যাগটা মাটিচাপা দিল। তারপর বেশ কিছু পাথর দিয়ে ঢেকে দিল মুখটা।
ব্যাগটা সহজেই খুলে ফেলে, ভেতরের আবর্জনা গিলে ফেলল উদ্ভিদটা এবং জঞ্জালের সঙ্গে সঙ্গে বেশ কিছু ছোট জীবন্ত প্রাণীও চলে গেল ওর পেটে। পৃথিবীর বুকে, খুদে যেসব প্রাণী রোগবালাইয়ের জন্য দায়ী, সেগুলো গলাধঃকরণ করেছে ওটা। মানুষ এদের ব্যাকটেরিয়া আর ভাইরাস নামে চেনে। ওদের বেশ অনেকগুলো তখনো বেঁচেবর্তে ছিল অভুক্ত খাবারের ভেতর।
উদ্ভট উদ্ভিদটা এবার ধীরে ধীরে ফিরে চলল হ্রদের উদ্দেশে এবং পেটে করে বয়ে নিয়ে গেল রোগজীবাণু, শুক্র গ্রহের সমস্ত প্রাণ একদিন যারা ধ্বংস করে ছাড়বে। রফিক আর বরকত জানল না, তারা কী কাজটাই না করেছে। ভেনাসে প্রাণের অস্তিত্ব বিলোপের জন্য ওরাই দায়ী। আবারও মৃত গ্রহে পরিণত হবে শুক্র।