উড়োহুমকি

‘ধরে নাও, তোমার ছেলের সামনে বড্ড বিপদ! পারলে তাকে রক্ষা করো।’—বুকটা ধক করে ওঠে মেয়র সাদ কায়েসের। এটা উড়োচিঠি ধাঁচের একটা খুদে বার্তা। ‘উড়োহুমকিও’ বলা যায়।

শব্দগুলো যেন বিষকাঁটার মতো ঢুকে গেল মেয়রের নরম হৃদয়ে। তিনি মানবদরদি। মেয়র নির্বাচিত হয়ে ভেবেছিলেন, নগরের জ্যান্ত–জড় সব জঞ্জাল সাফ করে বাসিন্দাদের একটু স্বস্তির ব্যবস্থা করবেন। কিন্তু পদে পদে বাধা সাপের ছোবলের মতো ওত পেতে আছে। এরপরও তিনি বেদখল হয়ে যাওয়া কয়েকটি বড় খাল উদ্ধার করেছেন, চোরাই বৃক্ষনিধন বন্ধ করে ১০ লাখ নতুন চারা লাগিয়েছেন, ফুটপাত দখলমুক্ত করে আরও কিছু উন্নয়ন করেছেন। এসব কাজের জন্য এরই মধ্যে তিনি জনপ্রিয় হয়ে উঠেছেন। একই সঙ্গে প্রতিপক্ষ দলও ভারী হয়েছে। মেয়র টের পান, তাঁর অদেখা শত্রুর সংখ্যা বাড়ছে।

বিশেষ করে সাম্প্রতিক মশকনিধন অভিযানে অভাবনীয় সাফল্যের পর অদৃশ্য শত্রুরা মাথাচাড়া দিয়ে উঠেছে। মশকনিধনে তিনি দেশের একদল তরুণ বিজ্ঞানীর সাহায্য নিয়েছেন। তাঁরা বিশেষ ধরনের মাইক্রোড্রোন উদ্ভাবন করে ছেড়ে দিয়েছেন। খালি চোখে এগুলো দেখা যায় না। ড্রোনগুলো খুঁজে খুঁজে স্বয়ংক্রিয়ভাবে মশা ধ্বংস করে। মশা ব্যাপক হারে কমে যাওয়ায় ইনসেক্টিসাইড কেমিক্যালসের ব্যবসা লাটে উঠেছে। তারা এখন মহাখাপ্পা মেয়রের ওপর।

আরও পড়ুন
শব্দগুলো যেন বিষকাঁটার মতো ঢুকে গেল মেয়রের নরম হৃদয়ে। তিনি মানবদরদি। মেয়র নির্বাচিত হয়ে ভেবেছিলেন, নগরের জ্যান্ত–জড় সব জঞ্জাল সাফ করে বাসিন্দাদের একটু স্বস্তির ব্যবস্থা করবেন।

এই এত শত্রুর মধ্যে কে যে এমন হুমকি দিয়ে মেসেজ পাঠিয়েছে, তা বোঝা মুশকিল। মেসেজের মুঠোফোন নম্বর ধরে প্রেরককে শনাক্ত করার চেষ্টা করলেন মেয়র। কিন্তু ওই নম্বর ধরে কাউকে শনাক্ত করা গেল না। মেসেজটা এমন কৌশলে পাঠানো হয়েছে, যা ধরার মতো প্রযুক্তি আপাতত কারও নেই। এরপরও গোয়েন্দা বিভাগ কাজ শুরু করেছে। হুমকির বিষয়টা গোপন রাখা হবে। জানাজানি হলে বিপদের ডালপালা ছড়াবে।

এর আগেও এমন উড়োহুমকি পেয়েছেন মেয়র। কখনো পাত্তা দেননি। আর হুমকি অনুযায়ী তেমন কিছু ঘটেনি। কিন্তু এবারের এই উড়োহুমকির ধরনটা যেন কেমন। মনে হচ্ছে, সত্যিই কোনো ভয়ংকর বিপদ আসছে!

নগরের গোয়েন্দাপ্রধান সোবহান শিকদার বলেছেন, অন্তত একটা সপ্তাহ ছেলেকে যেন বাসা থেকে বের করা না হয়। এর মধ্যে তাঁরা অনুসন্ধান করে দেখবেন, কোত্থেকে কে বা কারা এই ঘোঁট পাকাচ্ছে।

মেয়র তাঁর স্ত্রী তাসফিয়াকে বলে দিয়েছেন, এক মাস ছেলেকে বাসা থেকে বের করা যাবে না। এটা বাড়তি সতর্কতা। তাসফিয়া অবশ্য আপত্তি তুললেন, ‘সামনে ছেলের পরীক্ষা?’

পাত্তা দিলেন না মেয়র। বললেন, ‘আগে ছেলের প্রাণ বাঁচাও, তারপর পরীক্ষা!’

রাদ চতুর্থ শ্রেণিতে পড়ে। ভারি চঞ্চল। ঘরবন্দী থেকে কয়েক দিনেই সে হাঁপিয়ে গেল। বাসার অদূরে গুগলির মাঠে বন্ধুদের সঙ্গে ফুটবল খেলে ও। ওরা ইচ্ছেমতো খেলে বেড়াবে, আর সে খোঁয়াড়ের মোরগের মতো আটকা থেকে ছটফট করবে, সেটি হবে না। সপ্তাহখানেক পর সে জেদের সুরে বলল, ‘আজ আমি খেলতে যাবই যাব!’

আরও পড়ুন
নগরের গোয়েন্দাপ্রধান সোবহান শিকদার বলেছেন, অন্তত একটা সপ্তাহ ছেলেকে যেন বাসা থেকে বের করা না হয়। এর মধ্যে তাঁরা অনুসন্ধান করে দেখবেন, কোত্থেকে কে বা কারা এই ঘোঁট পাকাচ্ছে।

ছেলের ঘ্যানঘ্যানে বেকায়দায় পড়ে গেলেন তাসফিয়া। রাদের বাবাকে কল দিলেন তিনি। মেয়র ফোন ধরলেন না। মেসেজ এল, ‘আই অ্যাম বিজি, কল ইউ লেটার’।

শেষমেশ ধৈর্য হারালেন তাসফিয়া। ছেলেকে যাওয়ার অনুমতি দিলেন। বাসার চারপাশে কড়া পাহারা। এর বাইরে রাদের দেহরক্ষী হিসেবে আছে একটি রোবোকপ। বিপজ্জনক কেউ এলে সঙ্গে সঙ্গে তার সেন্সরে ধরা পড়ে যাবে সে। অমনি গুলিতে ঝাঁঝরা হয়ে যাবে শত্রু।

বাড়ির বাইরে এসে মনটা আনন্দে নেচে ওঠে রাদের। নীল আকাশ আর মৃদু বাতাসে মুক্তির ঘ্রাণ। আহ্, কী শান্তি!

নাচতে নাচতে গুগলির মাঠে গেল রাদ। সঙ্গে ছায়ার মতো আছে এআই রোবোকপ। কোনো চিন্তা নেই।

রাদকে পেয়ে খুব খুশি ওর বন্ধুরা। শিগগিরই খেলায় মেতে উঠল ওরা। মাঠের এক কোণে সতর্ক পাহারায় রোবোকপ। বেলা ডোবার আগপর্যন্ত ইচ্ছেমতো ছোটাছুটি করে খেলল ওরা। এবার ফেরার পালা।

ক্লান্ত শরীরে পা টেনে টেনে যেতে লাগল রাদ। মনটা খারাপ। কাল কি আবার খেলতে পারবে? বাইরে আসার কথা শুনে বাবা না জানি কী কঠোর ব্যবস্থা নেন!

আচমকা রোবোকপের সেন্সর গড়বড় হয়ে গেল। হারিয়ে গেল নজরদারির ক্ষমতা। ঠিক এ সময় বিশাল এক কালো মাইক্রোবাস এসে দাঁড়াল রাদের পাশে। গাড়ির কাচও কালো। ভেতরে কিছুই দেখা যাচ্ছে না। নিঃশব্দে খুলে গেল গাড়ির স্লাইডিং ডোর।

একটা হাত এসে মুখ চেপে ধরল রাদের। অন্য দুটি শক্ত হাত ওকে শূন্যে তুলে নিয়ে গেল ভেতরে। মাত্র কয়েক সেকেন্ডে ঘটল ঘটনা। তারপর দ্রুতবেগে রওনা হলো মাইক্রোবাস।

আরও পড়ুন
আচমকা রোবোকপের সেন্সর গড়বড় হয়ে গেল। হারিয়ে গেল নজরদারির ক্ষমতা। ঠিক এ সময় বিশাল এক কালো মাইক্রোবাস এসে দাঁড়াল রাদের পাশে। গাড়ির কাচও কালো। ভেতরে কিছুই দেখা যাচ্ছে না।

একটা ঝাঁকুনি দিয়ে সচল হলো রোবোকপের সেন্সর। সে প্রচণ্ড বেগে দৌড়াতে লাগল কালো গাড়িটার পেছনে। কিন্তু গাড়ির গতি অনেক বেশি। ক্রমে পিছিয়ে পড়ছে রোবোকপ। গুলি করতে গিয়েও করল না সে। মেয়রের ছেলের ক্ষতি হতে পারে।

এর মধ্যে তার মেমোরি থেকে রাদ অপহৃত হওয়ার তথ্য চলে গেছে জায়গামতো। তোলপাড় শুরু হয়েছে মেয়রের পরিবার ও গোয়েন্দা বিভাগে।

তাসফিয়া ছেলের জন্য রীতিমতো মাতম শুরু করলেন। বিমর্ষ মেয়র বিরক্ত হয়ে বললেন, ‘ছেলেকে বাইরে যেতে দেওয়ার মজাটা বোঝো এবার!’

তাসফিয়া অবুঝের মতো বললেন, ‘আমি কিছু বুঝতে চাই না। যেভাবেই হোক, আমার ছেলেকে ফিরিয়ে নিয়ে এসো!’

মেয়র চোখ মুছতে মুছতে বললেন, ‘কথা শুনবে না, আবার বলছে ফিরিয়ে নিয়ে আসতে! যেন মামার বাড়ির আবদার!’

কিন্তু খুব দ্রুত একটা কিছু করতে হবে। আইনশৃঙ্খলা রক্ষাকারী বাহিনীর যৌথ দল ঝটিতি নগরজুড়ে অভিযান চালাল। শ তিনেক ছিনতাইকারী ও চোর–ডাকাত গ্রেপ্তার হলো। এ ছাড়া লাভের লাভ কিছুই হলো না।

এরই মধ্যে মুক্তিপণ চেয়ে মেয়রের কাছে মেসেজ এল, ২০ কোটি টাকা দিলে রক্ষা পাবে রাদ। সময় মাত্র ২৪ ঘণ্টা। টাকাটা ক্রিপ্টোকারেন্সির মাধ্যমে কীভাবে পাঠাতে হবে, তা লিখে দিয়েছে তারা।

নিরুপায় মেয়রের সাহায্যের আবেদনে আবার এগিয়ে এলেন তরুণ বিজ্ঞানীরা। তাঁরা সদ্য একটা হিউম্যানয়েড এআই রোবট তৈরি করেছেন। এটি মাল্টিফাংশনাল, নাম ‘মাস্টার’। সফল পরীক্ষা হলেও এখনো কাজে নামানো হয়নি। প্রথম অ্যাসাইনমেন্টে দেখা যাক কী হয়।

আরও পড়ুন
এরই মধ্যে মুক্তিপণ চেয়ে মেয়রের কাছে মেসেজ এল, ২০ কোটি টাকা দিলে রক্ষা পাবে রাদ। সময় মাত্র ২৪ ঘণ্টা। টাকাটা ক্রিপ্টোকারেন্সির মাধ্যমে কীভাবে পাঠাতে হবে, তা লিখে দিয়েছে তারা।

মাঠে নেমে গেল মাস্টার। মাত্র কয়েক সেকেন্ডে নিজের কোয়ান্টাম স্ক্যানারে নগরের সব সিসিটিভি ক্যামেরা ঘেঁটে ফেলল সে। নগরের এক প্রান্তে একটি পরিত্যক্ত গবেষণাগারের নিচে ভূগর্ভস্থ আস্তানার সন্ধান পেল মাস্টার। এটি ‘ব্ল্যাক ম্যালিস’ নামের একটি দুর্বৃত্ত দলের ঘাঁটি। সেখানে রাখা হয়েছে রাদকে।

শিগগির ওই আস্তানায় পৌঁছে গেল মাস্টার। তার দিকে শাঁ শাঁ করে ছুটে এল কয়েকটা ড্রোন। সেগুলোর ক্ষতিকর লেজার সে ঠেকাল বাহুর ন্যানো–শিল্ড দিয়ে। তারপর মাইক্রো-ইএমটি পালস ছুড়ে একে একে অচল করে দিল ড্রোনগুলোকে। ভেতরে গিয়ে রাদকে খুঁজে পেতে সময় লাগল না। কিন্তু ওকে নিয়ে ফেরার সময় পথ আগলে দাঁড়াল একজন। মাস্টার টের পেল এই বেটা মানুষ নয়, তার মতোই হিউম্যানয়েড এআই রোবট। তাকে যেমন একদল মানুষ মিশনে পাঠিয়েছে, একইভাবে দুর্বৃত্তরাও একই কৌশল নিয়েছে।

প্রতিপক্ষের রোবট বলল, ‘ভালো চাস তো কেটে পড়, নইলে তোর একদিন কি আমার একদিন!’

কিন্তু মাস্টার তো পিছু হটার জন্য আসেনি। সে–ও পাল্টা জেদ দেখাল। শুরু হলো দুই হিউম্যানয়েড এআই রোবটের যুদ্ধ। ইস্পাতের ঘুষি, প্লাজমা ব্লেড আর বিদ্যুতের ঝলকে যেন মূর্তিমান বিভীষিকা নেমে এল আস্তানায়। রাদ বেচারা ভয়ে জড়সড়। যেন ভয়ংকর কোনো কল্পবিজ্ঞান কার্টুনছবি জ্যান্ত হয়ে উঠেছে চোখের সামনে।

আরও পড়ুন
ভেতরে গিয়ে রাদকে খুঁজে পেতে সময় লাগল না। কিন্তু ওকে নিয়ে ফেরার সময় পথ আগলে দাঁড়াল একজন। মাস্টার টের পেল এই বেটা মানুষ নয়, তার মতোই হিউম্যানয়েড এআই রোবট।

মাস্টার বুঝতে পারল শক্তিতে তার প্রতিদ্বন্দ্বীর সঙ্গে পেরে ওঠা বেশ কঠিন। তাই বুদ্ধি খাটাল সে। নিজের অ্যালগরিদমের একটি অংশ প্রতিদ্বন্দ্বীর সিস্টেমে পাঠিয়ে তাকে একটি প্রশ্নের মুখে দাঁড় করাল, ‘তোমাকে যে মানব তৈরি করেছে, সেই মানবশিশুর ক্ষতি করা কি তোমার সাজে? মানুষ না থাকলে এআই রোবট তৈরি হবে কী করে?’

এই প্রশ্নে হকচকিয়ে গেল সে। উত্তর খুঁজতে সময় লাগল। এই সুযোগে তাকে আঘাত করে অকেজো করে দিল মাস্টার।

তারপর দ্রুত ঘটে গেল ঘটনা। ব্ল্যাক ম্যালিস দলের সব দুর্বৃত্ত পাকড়াও হলো। রাদ ভালোয় ভালোয় ফিরে গেল মা–বাবার কাছে। প্রথম অ্যাসাইনমেন্টে সফল হলো মাস্টার।

*লেখাটি ২০২৬ সালে বিজ্ঞানচিন্তায় আগস্ট সংখ্যায় প্রকাশিত

আরও পড়ুন