টাইফুন চলে যাওয়ার পর আকাশটা ঝলমলে নীল হয়ে ওঠে। শহরের কাছে একটি ছোট্ট গ্রামও এতে ভীষণভাবে ক্ষতিগ্রস্ত হয়। গ্রাম থেকে একটু দূরেই এক পাহাড়ের কাছে একটি পুরোনো মঠ ভেসে যায় ভূমিধসে।
‘আমি বিস্মিত হয়ে ভাবছি, মঠটা কত দিন ধরে এখানে ছিল, কে জানে?’
‘সে যা–ই হোক, মঠটা এখানে বহু বছর ধরে ছিল।’
‘এটা আবার তৈরি করতে হবে আমাদের।’
যখন দুই গ্রামবাসী নিজেদের মধ্যে বলছিল, তখন কয়েকজন গ্রামবাসী এগিয়ে এল। মঠটা ধ্বংস হয়ে গেছে।
‘আমার মনে হয়, ওটা এখানেই ছিল।’
‘না, ওটা মনে হয় একটু ওই দিকে ছিল।’
একজন গ্রামবাসী গলা উঁচিয়ে বলে উঠল, ‘আরে, এখানে গর্তটা কিসের?’
যেখানে দাঁড়িয়ে ওরা কথা বলছিল, ঠিক তার পাশেই প্রায় এক মিটার ব্যাসের একটি গর্ত দেখা গেল। ওরা সবাই গর্তে উঁকি দিল, কিন্তু ভেতরে এত অন্ধকার যে কিছুই দেখা যাচ্ছিল না। তবে মনে হচ্ছিল গর্তটা পৃথিবীর কেন্দ্র পর্যন্ত চলে গেছে।
ওদের ভেতর একজন বলে উঠল, ‘এটা হয়তো শিয়ালের গর্ত।’
একজন যুবক চিত্কার করে গর্তের দিকে মুখ করে বলল, ‘এই, কেউ থাকলে বেরিয়ে এসো।’ না, কোনো প্রতিধ্বনি শোনা গেল না। সে একটা ছোট পাথর তুলল গর্তের মধ্যে ফেলার জন্য।
যেখানে দাঁড়িয়ে ওরা কথা বলছিল, ঠিক তার পাশেই প্রায় এক মিটার ব্যাসের একটি গর্ত দেখা গেল। ওরা সবাই গর্তে উঁকি দিল, কিন্তু ভেতরে এত অন্ধকার যে কিছুই দেখা যাচ্ছিল না।
তখন এক বৃদ্ধ তাকে সাবধান করে বলল, ‘সাবধান, তুমি আমাদের ওপর অভিশাপ ডেকে এনো না।’ কিন্তু যুবকটি গায়ের জোরে পাথরটা গর্তে ফেলে দিল। আগের মতোই পাথর পড়ার কোনো শব্দ শোনা গেল না। গ্রামবাসী কয়েকটি গাছ কেটে গর্তের চারপাশে একটা বেড়া তৈরি করল। তারপর তারা গ্রামে ফিরে গেল গ্রাম মেরামতের কাজে।
‘এখন আমরা কী করব, তুমি কী ভাবছ?’
‘গর্তের ওপর মঠটা তৈরি করি, তাহলে কেমন হয়?’
দিনটা চলে গেল, কেউই কোনো সিদ্ধান্তে আসতে পারল না। খবরটি দ্রুত চারদিকে ছড়িয়ে পড়ল। পত্রিকা অফিসের একটা গাড়ি এসে উপস্থিত হলো। একজন বিজ্ঞানী এলেন গর্তটা পরীক্ষা করতে। বিজ্ঞানীর চেহারায় সেই চেনা অভিব্যক্তি দেখা দিল গর্তের ভেতর তাকিয়ে। এরপর উত্সুক জনতাও গর্তটি দেখতে চলে এল। উত্সুক জনতা এদিক-ওদিক অতি উত্সাহী হয়ে তাকাচ্ছে। গর্তে পড়ে যেতে পারে জেনে পুলিশ এসে গর্তের চারপাশে নিরাপত্তার জন্য পাহারাদার বসাল।
একজন রিপোর্টার লম্বা একটা দড়ির শেষে ওজন বেঁধে গর্তে নামিয়ে দিলেন। দড়িটা অনেকটা নিচে নামল। দড়িটা ছাড়া শেষ হলো। তারপরও রিপোর্টার দড়িটা তুলে আনার চেষ্টা করলেন। আর দড়িটা উঠে এল না। দুই থেকে তিনজন লোক সাহায্য করল, দড়িটা টেনে তোলার চেষ্টা করল। কিন্তু দড়িটা গর্তের ভেতর ছিঁড়ে গেল। আরেকজন রিপোর্টার, যার হাতে ক্যামেরা ছিল, যিনি সবকিছু দেখছিলেন, নিজের কোমরে বেঁধে রাখা দড়িটা খুলে ফেললেন।
দিনটা চলে গেল, কেউই কোনো সিদ্ধান্তে আসতে পারল না। খবরটি দ্রুত চারদিকে ছড়িয়ে পড়ল। পত্রিকা অফিসের একটা গাড়ি এসে উপস্থিত হলো। একজন বিজ্ঞানী এলেন গর্তটা পরীক্ষা করতে।
বিজ্ঞানী তাঁর ল্যাব থেকে আশপাশের লোকদের সাহায্যে একটি শক্তিশালী বুল হর্ন আনিয়ে নিলেন। সেটার সাহায্যে গর্তের তল থেকে ইকো মাপার চেষ্টা করলেন। বিভিন্ন ধরনের শব্দ বাজালেন, কিন্তু কোনো ইকো বা প্রতিধ্বনি হলো না। বিজ্ঞানী বিভ্রান্ত হলেন, সবাই তাঁর দিকে তাকিয়ে আছে দেখে তিনি দমে গেলেন না। তিনি বুল হর্নটিকে গর্তমুখী করে দীর্ঘক্ষণ একটানা উচ্চ ভলিউমে শব্দ বাজাতে লাগলেন। শব্দটি কয়েক ডজন কিলোমিটার পর্যন্ত যায়। কিন্তু গর্ত শব্দটাকে যেন গিলে খেয়ে ফেলেছে।
বিজ্ঞানী মনে মনে ব্যর্থতা মেনে নিয়েছিলেন। কিন্তু চেহারায় দৃঢ়তার ভাব রেখে শব্দের সংযোগ কেটে দিলেন। এমনভাবে বললেন যে পুরো ব্যাপারটার একটা যুক্তিসংগত ব্যাখ্যা আছে। সহজভাবে বললেন, ‘গর্তটা বন্ধ করে দাও।’
কেউ বুঝতে পারেনি, এমন কিছু থেকে মুক্তি পাওয়া নিরাপদ। বিজ্ঞানীর কথায় সবাই হতাশ হয়ে ছত্রভঙ্গ হতে শুরু করল। ঠিক তখনই একজন এগিয়ে এসে প্রস্তাব দিল।
‘গর্তটা আমাকে দিন! আমি এটা ভরে দেব।’
গ্রামের মেয়র বললেন, ‘তুমি ভরে দেবে, ঠিক আছে, কিন্তু গর্তটা তো তোমাকে দিতে পারব না। এখানে একটা নতুন মঠ বানানো হবে।’
‘আপনারা যদি মঠ চান, পরে আমি বানিয়ে দেব। সঙ্গে একটা মিটিং হলও থাকবে।’
মেয়র কিছু বলার আগে গ্রামের লোকেরা খুশিতে চিত্কার করে ওঠে।
‘সত্যিই? ঠিক আছে, সে ক্ষেত্রে মঠটা গ্রামের কাছাকাছি থাকা উচিত।’
‘এটা তো শুধু একটা গর্ত। ঠিক আছে তোমাকে দেওয়া হলো।’
এভাবেই বিষয়টি নিষ্পত্তি হলো। আর মেয়র এতে কোনো আপত্তি করলেন না।
কিন্তু বিজ্ঞানী চেহারায় দৃঢ়তার ভাব রেখে শব্দের সংযোগ কেটে দিলেন। এমনভাবে বললেন যে পুরো ব্যাপারটার একটা যুক্তিসংগত ব্যাখ্যা আছে। সহজভাবে বললেন, ‘গর্তটা বন্ধ করে দাও।’
লোকটা তার প্রতিশ্রুতি রেখেছিল। গ্রামের কাছাকাছি একটি ছোট মিটিং হলসহ মঠ তৈরি করেছিল।
শরৎ উত্সবের সময় গর্তের পাশে এক মঠে উত্সব অনুষ্ঠিত হলো। গর্ত ভরাটকারী সংস্থাটি গর্তের কাছে একটি খুপরিতে তার ছোট সাইনবোর্ডটা ঝুলিয়ে রাখল।
সেই গ্রামবাসী ও তার দলবল শহরে জোর প্রচারণা চালাল।
‘আমরা একটি দুর্দান্ত গভীর গর্ত পেয়েছি। বিজ্ঞানীরা বললেন অন্তত পাঁচ হাজার মিটার গভীর। পারমাণবিক চুল্লির বর্জ্য ফেলার জন্য উপযুক্ত স্থান।’
সরকারি কর্তৃপক্ষ অনুমতি দিল। পারমাণবিক বিদ্যুৎকেন্দ্রগুলো চুক্তির জন্য লড়াই করছিল। গ্রামের লোকেরা এ নিয়ে কিছুটা চিন্তিত ছিল। কিন্তু তারা সম্মতি দেয়, যখন তাদের ব্যাখ্যা করে বোঝানো হয়েছিল যে কয়েক হাজার বছর মাটির উপরিভাগে কোনো দূষণ হবে না এবং তার ওপর তারা লাভের অংশীদার হবে। দর–কষাকষির ফলে খুব শিগগির শহর থেকে গ্রামে একটি রাস্তা তৈরির প্রতিশ্রুতি পেয়েছিল।
সেই রাস্তা ধরে ট্রাক আসতে শুরু করল সিসার বাক্স নিয়ে। গর্তের ওপর সিসার বাক্স এনে ঢাকনা খুলে দেয় আর পারমাণবিক বর্জ্য গর্তে গড়িয়ে পড়ে।
পররাষ্ট্র মন্ত্রণালয় ও প্রতিরক্ষা এজেন্সি থেকে অপ্রয়োজনীয় ক্লাসিফায়েড ডকুমেন্টস আনা হয়েছিল গর্তে ফেলার জন্য। ডকুমেন্টস ফেলার জন্য যে কর্মকর্তারা এসেছিলেন, তাঁরা গলফ নিয়ে আলোচনা করছিলেন। যে কর্মীরা ডকুমেন্টস গর্তে ফেলেছিল, তারা পিনবল নিয়ে আলাপ করছিল।
গর্তটি ভরাটের কোনো লক্ষণ দেখা যায়নি। গর্তটি অত্যন্ত গভীর ছিল, কেউ কেউ ভেবেছিলেন গর্তটি নিচে বেশ প্রশস্ত হতে পারে। একটু একটু করে গর্ত ভরাট সংস্থাটি তাদের ব্যবসা প্রসারিত করতে থাকে।
ডকুমেন্টস ফেলার জন্য যে কর্মকর্তারা এসেছিলেন, তাঁরা গলফ নিয়ে আলোচনা করছিলেন। যে কর্মীরা ডকুমেন্টস গর্তে ফেলেছিল, তারা পিনবল নিয়ে আলাপ করছিল।
বিশ্ববিদ্যালয়গুলো থেকে সংক্রামক রোগের পরীক্ষায় ব্যবহৃত প্রাণীদের মৃতদেহ এবং এর সঙ্গে বেওয়ারিশ লাশগুলো বের করে আনা হয়েছিল। সমুদ্রে ওই সব মৃতদেহ ফেলার চেয়ে দীর্ঘ পাইপ বসিয়ে তার মাধ্যমে গর্তে ফেলার পরিকল্পনা করা হলো।
গর্তটি শহরের মানুষের মনে প্রশান্তি এনে দেয়। তারা একের পর এক জিনিস উত্পাদনে মনোনিবেশ করে। কেউই চূড়ান্ত পরিণতি সম্পর্কে চিন্তা করতে পছন্দ করত না। মানুষ শুধু উত্পাদন কোম্পানি এবং সেল করপোরেশনের জন্য কাজ করতে চেয়েছিল। তাদের আবর্জনার ডিলার হওয়ার কোনো আগ্রহ ছিল না। তবে মনে করা হতো, গর্তই এ সমস্যাগুলোর সমাধান।
অল্প বয়সী মেয়ে, যাদের বিয়ের ব্যবস্থা করা হয়েছিল, তারা পুরোনো ডায়েরিগুলো গর্তে ফেলে দিতে লাগল। সেখানেও তারা নতুন প্রেমের সূচনা করল এবং সাবেক প্রেমিক–প্রেমিকাদের সঙ্গে তোলা নিজেদের পুরোনো ছবিগুলো গর্তে ফেলে দিল। পুলিশ সান্ত্বনা বোধ করছিল; কারণ, তারা দক্ষতার সঙ্গে করা নকল বিল সঞ্চয় থেকে পরিত্রাণ পাওয়ার জন্য গর্তটা ব্যবহার করেছিল। প্রমাণ গর্তে ফেলে দিয়ে অপরাধীরা স্বস্তির নিশ্বাস ফেলেছিল।
যারা যা বাদ দিতে চেয়েছিল, গর্ত তার সবই গ্রহণ করেছিল। গর্ত তার নোংরা শহর পরিষ্কার করে দিল। দেখা গেল, সমুদ্র এবং আকাশ আগের চেয়ে পরিষ্কার হয়ে গেছে।
এ গর্ত লক্ষ্য করে একের পর এক নতুন দালান তৈরি হতে লাগল।
পুলিশ সান্ত্বনা বোধ করছিল; কারণ, তারা দক্ষতার সঙ্গে করা নকল বিল সঞ্চয় থেকে পরিত্রাণ পাওয়ার জন্য গর্তটা ব্যবহার করেছিল। প্রমাণ গর্তে ফেলে দিয়ে অপরাধীরা স্বস্তির নিশ্বাস ফেলেছিল।
একদিন নির্মাণাধীন একটি নতুন ভবনের উঁচু স্টিলের ফ্রেমের ওপরে একজন শ্রমিক বিশ্রাম নিচ্ছিল। তার মাথার ওপর হঠাৎ একটি কণ্ঠস্বর শুনতে পেল:
‘কেউ থাকলে বেরিয়ে এসো!’
কিন্তু সে আকাশের দিকে তাকিয়ে দেখল, কেউ ছিল না। মাথার ওপর নীল আকাশ ছাড়া কিছুই ছিল না। ভাবল, এটা তার কল্পনা। তারপর সে আবার বিশ্রাম নিতে শুরু করল, ঠিক তখনই যেদিক থেকে কণ্ঠস্বরটা আসছিল, সেদিক থেকে একটা ছোট্ট নুড়ি তার নিচে ছিটকে পড়ল অতীতের গহ্বরে।
লোকটা অবশ্য অলস ভঙ্গিতে শহরের সুন্দর আকাশরেখার দিকে তাকিয়ে ছিল, তাই সে বিষয়টা লক্ষ করতে ব্যর্থ হয়।