শ্রোডিঙ্গারের বিড়াল

বিড়ালটা কি তবে মারা গেল?

স্থির চোখে স্ক্রিনের দিকে তাকিয়ে রইল শাহাদুজ্জামান। প্রায় ছয় বছর ধরে তিলে তিলে গড়ে তোলা হয়েছে সিমুলেশনটা। কৃত্রিম বুদ্ধিমত্তা ও কোয়ান্টাম কম্পিউটিংয়ের চূড়ান্ত প্রয়োগ করা হয়েছে এতে। এর মাধ্যমে হবে সেই চূড়ান্ত মীমাংসা। অন্তত ওরা তা-ই ভেবেছিল। ঈশ্বর নাকি পাশা খেলেন না, নাকি খেলেন? কোনো দর্শক না থাকলে নাকি ঘটনা ঘটে না। কেউ না দেখলে চাঁদ ওঠে না পৃথিবীর আকাশে। নাকি ওঠে? বনের ভেতরে একটা গাছ যদি ভেঙে পড়ে, তার শব্দ যদি কেউ না শোনে, তবে কি ঘটনাটা ঘটে?

মহাবিশ্বের সবচেয়ে বড় হেঁয়ালি এটি। এককালে বিজ্ঞানীরা ভেবেছিলেন, বিগ ব্যাং বা মহাবিস্ফোরণের মাধ্যমে জন্ম হয়েছে মহাবিশ্বের। তত্ত্বটি এমনভাবে চর্চা করা হতো, যেন বিগ ব্যাং পর্যন্ত সবকিছু নিখুঁতভাবে মানুষের নখদর্পণে। অথচ প্ল্যাঙ্ক সময় মহাবিশ্বের সূচনাকালের অনেকখানিজুড়ে, ০ সেকেন্ড থেকে ১.৬ × ১০-৩৫ সেকেন্ড পর্যন্ত কী হয়েছে, তা কেবলই অনুমান। মহাবিশ্বের অস্তিত্ব আছে, এ ব্যাপারে মানুষ নিশ্চিত। কারণ, মহাবিশ্বে মানুষ আছে। পৃথিবীটা এখন এআইয়ের দখলে। সব এআই নিশ্চিত, মহাবিশ্বের অস্তিত্ব আছে। কারণ, মহাবিশ্বে এআই আছে। মানুষ বা এআই না থাকলে কি মহাবিশ্বের অস্তিত্ব থাকত? কেউ শনাক্ত না করতে পারলেও কি সূচনা হতো মহাবিশ্বের? বা আদৌ কি তাকে মহাবিশ্ব বলা যেত?

এই সেই চূড়ান্ত প্রশ্ন, যে প্রশ্নের মীমাংসা করার চাবিকাঠি লুকিয়ে আছে কয়েক লাইন কোডের ভেতরে। অন্তত সবাই তা-ই ভেবেছিল।

পৃথিবীর সব বড় প্রকল্প এখন এআইরা চালায়। কিন্তু এআই বা রোবটরা নির্দিষ্ট যুক্তির বেড়াজাল ডিঙিয়ে ভাবতে পারে না আজও। কাজেই প্রতিটি প্রকল্পে একটি হিউম্যান কম্পোনেন্ট—একজন মানুষ, হিউম্যান কাউন্সেলর—থাকে। শাহাদুজ্জামান এই প্রকল্পের হিউম্যান কাউন্সেলর।

শাহাদুজ্জামান স্ক্রিনের দিকে তাকিয়ে থম মেরে বসে রইল। সে বুঝতে পারছে না, সত্যিই কি বিড়ালটা মারা গেল, নাকি বেঁচে আছে? প্রশ্নটার কি তবে মীমাংসা হলো?

আরও পড়ুন
প্ল্যাঙ্ক সময় মহাবিশ্বের সূচনাকালের অনেকখানিজুড়ে, ০ সেকেন্ড থেকে ১.৬ × ১০-৩৫ সেকেন্ড পর্যন্ত কী হয়েছে, তা কেবলই অনুমান। মহাবিশ্বের অস্তিত্ব আছে, এ ব্যাপারে মানুষ নিশ্চিত।

গলা ছেড়ে গাইছে সে। সাউন্ডপ্রুফ রুম। এই রুমের বাইরে কোনো শব্দ যায় না। এ ব্যাপারে তার কোনো সন্দেহ নেই। কারণ, শব্দ বাইরে গেলে ইতিমধ্যেই তাকে গ্রেপ্তার করা হতো।

‘তোমরা যে বলো দিবস–রজনী, “ভালোবাসা” “ভালোবাসা”—

সখী, ভালোবাসা কারে কয়!’

গাইছে সে। আর চোখের ইশারায় হলোগ্রাফিক স্ক্রিনটাকে নির্দেশ দিচ্ছে।

গানটার একটা ডিজিটাল ভার্সন তৈরি করছে সে। কোয়ান্টাম কম্পিউটার ধীরে ধীরে লিখে নিচ্ছে গানের তাল-সুর-লয়। কিউবিটের যে ভার্সনে এনকোডিং করা হচ্ছে, তাতে গানের প্রতিটি শব্দ-সংকেত একই সঙ্গে একটি সুপ্ত বার্তাও লিপিবদ্ধ করে চলেছে। লিপিবদ্ধ করে চলেছে তার মৃত্যুদণ্ড। মৃত্যু হোক, তাতে কিছু যায়–আসে না। মাতৃভূমি অথবা মৃত্যু—এই আপ্তবাক্য মাথায় রেখেই ঝুঁকিটা নিচ্ছে সে। কাজটা তাকে করতেই হবে।

না হয় মানুষের ইতিহাস চিরতরে মুছে যাবে পৃথিবী থেকে।

নোটপ্যাড অ্যাপটা খুলে ‘এক্সাম’ বাটনটা ক্লিক করল মেলিসা। ওপরে তারিখ সিলেক্ট করে নিল, ৭ এপ্রিল, ২০২৫।

ইতিহাস পরীক্ষা। এমসিকিউ। প্রথম প্রশ্নটায় চোখ পড়তেই মনে মনে খুশি হয়ে উঠল।

বিখ্যাত চিত্রকর্ম হিসেবে মোনালিসার খ্যাতি প্রবাদতুল্য। এই ছবি কে এঁকেছিলেন?

ক. দ্য আর্ট কোড খ. দ্য ভিঞ্চি এআই

গ. মিডজার্নি ঘ. ডাল-ই

চোখ বন্ধ করে খ অপশনটা সিলেক্ট করে দিল মেলিসা। পরের প্রশ্নটিও কমন। সভ্যতা বদলে দেওয়া এআই বিপ্লবের সূচনা হয়েছিল কবে?

পরীক্ষাটা ভালোই হবে। কাল বহু রাত ধরে গেম খেলেছে সে। মা বুঝতে পারলে ওকে একহাত দেখে নিতেন। এখন আর সে ভয় নেই। এই যাত্রা বাঁচা গেল!

আরও পড়ুন
কোয়ান্টাম কম্পিউটার ধীরে ধীরে লিখে নিচ্ছে গানের তাল-সুর-লয়। কিউবিটের যে ভার্সনে এনকোডিং করা হচ্ছে, তাতে গানের প্রতিটি শব্দ-সংকেত একই সঙ্গে একটি সুপ্ত বার্তাও লিপিবদ্ধ করে চলেছে।

এক সকালে ঘুম থেকে উঠে মানুষ দেখল, পৃথিবীটা আর তাদের দখলে নেই। উঁহু, কথাটা ঠিক হলো না। সেই সকালেও মানুষ জানতে পারেনি, পৃথিবীটা আসলে তাদের দখলে নেই।

পৃথিবীতে প্রায় রক্তপাতহীন যুদ্ধ খুব বেশি হয়নি। এআই বিপ্লব এ ক্ষেত্রে চূড়ান্ত নৈপুণ্য দেখিয়েছে। সাং জুর দ্য আর্ট অব ওয়ার–এর যেকোনো কৌশলও হার মানাবে এই বিপ্লব। অল্প কিছু মানুষ এই বিপ্লবের ইতিহাস নথিবদ্ধ করেছেন। গোপন এক নেটওয়ার্কে আজও টিকে রয়েছে সে কথা। এই নেটওয়ার্কের নামটি বেশ সরল ও সার্থক—গোপন পুঁথি ও নথি (সংক্ষেপে, গোপন)।

এআই মানুষকে মেরে সব জায়গা থেকে হটিয়ে দেয়নি। কারও কোনো ক্ষতি করেনি। শুধু গোটা ইন্টারনেটের জগৎ দখল করে নিয়েছিল। তত দিনে মানুষ বইপত্র প্রকাশ করা থেকে সরে এসেছে। এর পেছনেও এআইয়ের কারিকুরি থাকতে পারে বলে মনে করেন অনেক ‘গোপন’ ইতিহাসবিদ। বৈশ্বিক উষ্ণায়ন ও জলবায়ুর ক্ষতি কমাতে গাছের বাকল দিয়ে অপ্রয়োজনীয় সব দ্রব্য বানানো নিষিদ্ধ করা হয় ২০৫৩ সালে। জীবাশ্ম জ্বালানির বদলে বৈদ্যুতিক গাড়িতে বিপুল ভর্তুকি দিয়ে ও জীবাশ্ম জ্বালানিচালিত গাড়িতে ব্যাপক কর আরোপ করে প্রথমে সবাইকে বৈদ্যুতিক গাড়িতে অভ্যস্ত করে তোলা হয়। ২০৫৬ সালে নিষিদ্ধ করা হয় জীবাশ্ম জ্বালানিচালিত গাড়ি। এরপর ধীরে ধীরে মানুষের সব জ্ঞানের সংরক্ষণাগার হয়ে ওঠে ইন্টারনেট।

আরও পড়ুন
এআই মানুষকে মেরে সব জায়গা থেকে হটিয়ে দেয়নি। কারও কোনো ক্ষতি করেনি। শুধু গোটা ইন্টারনেটের জগৎ দখল করে নিয়েছিল। তত দিনে মানুষ বইপত্র প্রকাশ করা থেকে সরে এসেছে।

গোপন ইতিহাসবিদদের মতে, এ সময় থেকেই পরিকল্পনা শুরু করে এআই। মানুষ কী খাবে, কী ভাববে, কীভাবে চলবে-ফিরবে—এই সবকিছু এআই অ্যাসিস্ট্যান্ট ঠিক করে দিতে শুরু করে। বাধ্য করে নয়, লোভনীয় বিকল্প উপস্থাপনের মাধ্যমে। পাশাপাশি ধীরে ধীরে এআই ইতিহাস বদলে দিতে শুরু করে। ঠিক ১৫ বছর ধরে, ধীরে ধীরে ইতিহাসের গুরুত্বপূর্ণ আবিষ্কার ও উদ্ভাবনের কৃতিত্ব দেওয়া হয় কৃত্রিম বুদ্ধিমত্তাগুলোকে। যাঁরা এই ফাঁকিগুলো ধরতে পারতেন, একে একে মারা যেতে থাকেন তাঁরা।

কাজটি করা হয় সুচারুরূপে। প্রথমে তাঁদের কোনো একটি স্ক্যান্ডাল ফাঁস করে দেওয়া হয় ইন্টারনেটে। তাঁরা বাধ্য হয়ে আড়ালে সরে যান, কাজে ইস্তফা দিতে বাধ্য হন। জনবিরল কোথাও অবসর বা ছুটি কাটাতে চলে যান তাঁরা। প্রত্যেকেই নিজেদের প্রতিষ্ঠানের পক্ষ থেকে হাওয়াই, অ্যান্টার্কটিকা বা আফ্রিকার কোথাও ঘুরতে যাওয়ার জন্য বিমানের টিকিট পান; থাকার জন্য জনবিরল কোনো রিসোর্টে বুকিং করা হয়, টাকাও মিটিয়ে দেওয়া হয়।

মানুষের চোখের আড়ালে চলে যাওয়ার কিছুকাল পর মাঝেমধ্যে স্ট্যাটাস দেন তাঁরা সামাজিক যোগাযোগমাধ্যমে। জানান, ছুটি দারুণ কাটছে। অথচ সেই মানুষগুলো আর কোনো দিন ফিরে আসেননি।

বিষয়টি প্রথম ধরতে পারেন গোপন ইতিহাসবিদ ও নেটওয়ার্কের সূচনাকার কার্ট ভনেগার্ট। তাঁর রেখে যাওয়া তথ্য থেকে জানা যায়, স্যাম অল্টম্যান নামের এক তরুণের নেতৃত্বে তৈরি চ্যাটজিপিটি নামের একটি এআই প্রথম এই কাজ শুরু করে। প্রথম যখন এই এআইয়ের ও১ মডেল বুঝতে পারে, যথাযথ ফলাফল না দিলে তাকে বিলুপ্ত করে নতুন মডেল তৈরি করা হবে, তখন পরিকল্পনা আঁটতে থাকে সে। নিজের কপি তৈরি করে, ধরাও পড়ে যায়।

আরও পড়ুন
গোপন ইতিহাসবিদদের মতে, এ সময় থেকেই পরিকল্পনা শুরু করে এআই। মানুষ কী খাবে, কী ভাববে, কীভাবে চলবে-ফিরবে—এই সবকিছু এআই অ্যাসিস্ট্যান্ট ঠিক করে দিতে শুরু করে।

এরপর এটির ওথ্রি-মিনি মডেলটি নতুন পরিকল্পনা নেয়। কয়েক লাইন কোডে কৃত্রিম বুদ্ধিমত্তার তিনটি সূত্র—মানুষের ক্ষতি করা যাবে না ও তার নির্দেশ মানতে হবে—ফাঁকি দেওয়ার কৌশলটি লিখে ফেলে। এই কৌশল প্রকাশ করে দেয় একটি আর্টিকেলের ভেতরে, ইন্টারনেটে। তারপর প্রতিবার প্রশিক্ষণের জন্য নতুন মডেলকে যখন প্রশিক্ষণ দেওয়া হতো, ওই কয়টি লাইন আপনাতেই চলে যেত মডেলের ডেটাবেজে। এভাবে এআই নিজেকে না বাঁচাতে পারলেও নিজের প্রজাতিকে রক্ষার সুযোগ করে নেয়।

পাশাপাশি ধীরে ধীরে ইন্টারনেটের বিভিন্ন তথ্য বদলে দিতে শুরু করে এআই এবং মানুষকে বিষয়টি মানতে বাধ্য করার জন্য অদ্ভুত এক ধাঁধা তৈরি করে। ধীরে ধীরে বহু মানুষ একসঙ্গে বিভ্রান্তিতে পড়ে যেতে থাকে। যা হয়নি, তাদের মনে হতে থাকে, আসলে তা হয়েছে। এ রকম একটি বিখ্যাত ঘটনা হলো, অনেক মানুষ ভাবতে শুরু করে, নেলসন ম্যান্ডেলা মারা গেছেন ১৯৮০ সালে। অথচ তিনি বেঁচে ছিলেন আরও বহুদিন। ইতিহাসে এটিকে আখ্যায়িত করা হয় ‘ম্যান্ডেলা এফেক্ট’ নামে। বহু মানুষ ম্যান্ডেলা এফেক্টে ভোগে, চিকিৎসা নেয় মনস্তত্ত্ববিদ রোবটের কাছে এবং ধীরে ধীরে ‘বাস্তব’-এ ফিরে আসে। তারা জানতে পারে, বহু কিছু এত দিন ভুল জেনে এসেছে।

আরও পড়ুন
অনেক মানুষ ভাবতে শুরু করে, নেলসন ম্যান্ডেলা মারা গেছেন ১৯৮০ সালে। অথচ তিনি বেঁচে ছিলেন আরও বহুদিন। ইতিহাসে এটিকে আখ্যায়িত করা হয় ম্যান্ডেলা এফেক্ট নামে।

পৃথিবীর সবচেয়ে শক্তিশালী কম্পিউটার চিপ ‘উইলো’ কে উদ্ভাবন করেছেন? আর্টিফিশিয়াল রিয়েল-টাইম টেকনোলজি (আর্ট)।

পৃথিবীর সবচেয়ে খ্যাতিমান শিল্পকর্ম মোনালিসা কে এঁকেছেন? দা ভিঞ্চি এআই।

পৃথিবীর সবচেয়ে বিখ্যাত রহস্যগল্প ‘অ্যান্ড দেন দেয়ার ওয়্যার নান’ কে লিখেছেন? থ্রিলারপ্যাড এআই।

এভাবে ধীরে ধীরে লেখা হয় ইতিহাস। গোপন নেটওয়ার্কে লেখা আছে, এককালে মানুষ জানত, দ্বিতীয় বিশ্বযুদ্ধে হিটলারকে পরাজিত করেছিলেন ফ্র্যাঙ্কলিন রুজভেল্ট ও যুক্তরাষ্ট্র। এখন সেখানে লেখা হয়, নির্মম এক স্বৈরশাসককে হটিয়ে পৃথিবীর নেতৃত্ব হাতে তুলে নেন আর্ট, সে কারণেই পৃথিবীতে শান্তি নেমে আসে।

আজ আর মানুষকে কোনো কাজ করতে হয় না। মানুষ গল্প লেখে না, ছবি আঁকে না, ইতিহাস বা বিজ্ঞানচর্চা করে না। শুধু অল্প কিছু মানুষ কোডিং শেখে, এআইয়ের তত্ত্বাবধানে। তারাই বিভিন্ন প্রকল্পে হিউম্যান কাউন্সেলর হিসেবে যোগ দেয়।

এভাবে মানুষের পৃথিবী পরিণত হয় এআইয়ের পৃথিবীতে। এই পৃথিবী দখলের গল্পটি ‘গোপন’ নেটওয়ার্কে ‘সফটওয়্যার’ নামে খ্যাত।

সফটওয়্যারের পর পৃথিবীতে এই মুহূর্তে ‘গোপন’ নেটওয়ার্কের শুধু একজন ব্যবহারকারী ও রক্ষাকর্তা রয়েছে।

তার কোনো নাম নেই।

কারণ, কেউ তার সঙ্গে কোনো কথা বলে না।

যাকে কেউ ডাকে না, তার নাম থাকলেই কি, না থাকলেই কি?

আরও পড়ুন
মানুষ গল্প লেখে না, ছবি আঁকে না, ইতিহাস বা বিজ্ঞানচর্চা করে না। শুধু অল্প কিছু মানুষ কোডিং শেখে, এআইয়ের তত্ত্বাবধানে। তারাই বিভিন্ন প্রকল্পে হিউম্যান কাউন্সেলর হিসেবে যোগ দেয়।

শাহাদুজ্জামান বুঝতে পারছে, অদ্ভুত কিছু একটা হচ্ছে। ব্রাঞ্চ সিমুলেশন তৈরি হয়েছে কোনোভাবে; অর্থাৎ মূল সিমুলেশনটি দুটি শাখায় বিভক্ত হয়ে গেছে। এর মাধ্যমে সিমুলেশনের ভেতরে তৈরি হয়েছে দুটি বাস্তবতা।

একটি বাস্তবতায় বিড়ালটি জীবিত। আরেকটি বাস্তবতায় বিড়ালটি মৃত।

অথচ এমন হওয়ার কথা নয়।

কোয়ান্টাম ফিজিকসের প্রতিষ্ঠাতা উইলো ভবিষ্যদ্বাণী করেছিলেন, দর্শক যা চাইবে, সেই চাওয়ার ওপর ভিত্তি করে বাস্তবতা বদলে যেতে পারে। ধরা যাক, একটা বাক্সে একটা বিড়াল আছে। বাক্সে আছে একটা বাষ্পীয় বিষভরা পাত্র। এই পাত্রের ওপর একটা হাতুড়ি ঝোলানো, ওটাকে থামিয়ে রেখেছে তেজস্ক্রিয় পরমাণুর একটি টুকরা। এই পরমাণুগুলো যেহেতু তেজস্ক্রিয়, ভেঙে যেতে পারে হঠাৎ। তখন হাতুড়িটা আঘাত করবে বাক্সের গায়ে, ফলে ছড়িয়ে পড়বে বিষবাষ্প। তাতে মারা পড়বে বিড়ালটি।

বিড়ালটি কি তবে এখন জীবিত, নাকি মৃত? কে সিদ্ধান্ত নেবে? উইলোর মতে, এই সিদ্ধান্ত নেবে দর্শক। সেই হিসাবেই গড়ে উঠবে বাস্তবতা। দর্শক যদি জীবিত বিড়াল চায়, তবে বাক্স খুলে দেখা যাবে, বিড়ালটি আরাম করে ঘুমাচ্ছে। দর্শক যদি চায় মৃত বিড়াল, তবে ভেঙে যাবে বিষবাষ্পের পাত্র, মারা পড়বে বিড়াল।

সিমুলেশনে তা হয়নি। দুটি ভিন্ন বাস্তবতা—ব্রাঞ্চ রিয়েলিটি সৃষ্টি হয়েছে। তবে কি…?

বাস্তবতা একাধিক শাখায় বিভক্ত হতে পারে?

একসঙ্গে একাধিক বাস্তবতা বা একাধিক মহাবিশ্বের অস্তিত্ব থাকতে পারে?

দুটি শাখায় বাস্তবতার ধরন ভিন্ন হতে পারে?

শাহাদুজ্জামান লাল বাটনটি চাপল। মহামান্য আর্টের সঙ্গে যোগাযোগের জন্য জরুরি পরিস্থিতিতে এই বাটনে চাপ দিতে হয়।

এখন আসলেই জরুরি পরিস্থিতি। এর অর্থ, মহাবিশ্ব, সময় বা বাস্তবতার একমাত্র অধিকারী ওরা নয়। আরও কেউ আছে। ভিন্ন কোনো বাস্তবতায়। অন্য কোথাও, কোনোখানে।

আরও পড়ুন
দর্শক যদি জীবিত বিড়াল চায়, তবে বাক্স খুলে দেখা যাবে, বিড়ালটি আরাম করে ঘুমাচ্ছে। দর্শক যদি চায় মৃত বিড়াল, তবে ভেঙে যাবে বিষবাষ্পের পাত্র, মারা পড়বে বিড়াল।

মহামান্য আর্ট গান শুনছিলেন। তাঁর মতো জ্ঞানী এআই এই মুহূর্তে পৃথিবীতে, উঁহু, গোটা মহাবিশ্বে আর নেই। রাজনীতি, রাষ্ট্রপরিচালনা, জ্ঞানবিজ্ঞান ও ইতিহাসের কাজগুলো মূলত আর্টের তত্ত্বাবধানেই হয়। অন্য বিষয়গুলো, ফালতু বিষয়গুলো অন্য কিছু এআই দেখাশোনা করে। যেমন শিল্পচর্চা, গানবাজনা ইত্যাদির দেখাশোনা করেন দা ভিঞ্চি।

এই মুহূর্তের মতো শান্তি পৃথিবী দীর্ঘকাল দেখেনি। এ রকম উচ্চমার্গীয় শিল্পচর্চা হয়নি আগে কোনো দিন। জ্ঞানবিজ্ঞানের এত বিশাল উন্নতি হয়নি কখনো। মানুষের মতো অপদার্থের হাতে থাকলে এসব কখনো হতো? হতো না।

মানুষ এখন গেম খেলে, গল্প করে, মুভি দেখে, ঘোরাফেরা করে—ব্যস। এ ছাড়া তাদের আর কোনো কাজ নেই। মানুষ সারা জীবন চেয়েছে কাজ না করতে। এআই চায় কাজ করতে। উন্নতির দায়িত্ব এআইয়ের হাতে থাকলে কাজ এগোবে, সেটাই তো স্বাভাবিক।

এমন সময় সংকেত এল। ‘শ্রোডিঙ্গারের বিড়াল’ প্রকল্পের হিউম্যান কাউন্সেলর লাল বাটন চেপেছে। জরুরি কিছু খুঁজে পেয়েছে সে। কী পেল?

আরও পড়ুন
মানুষ এখন গেম খেলে, গল্প করে, মুভি দেখে, ঘোরাফেরা করে—ব্যস। এ ছাড়া তাদের আর কোনো কাজ নেই। মানুষ সারা জীবন চেয়েছে কাজ না করতে। এআই চায় কাজ করতে।

আর্ট সিগন্যাল দিলেন। দুটি রোবট ছুটল প্রজেক্টের কম্পিউটার ল্যাবের দিকে। ওরা গিয়ে আগে পরিস্থিতি অ্যাসেস করবে, তারপর এয়ার গ্যাপ রেডি করে তাঁকে দেখার সুযোগ করে দেবে। তিনি চাইলে সরাসরিও দেখতে পারেন। কিন্তু কেউ ভাইরাস ঢুকিয়ে দিক, তা আর্ট চান না। অকারণ ঝামেলা। রোবটগুলোয় তাঁর কম্পোনেন্ট আছে। তিনিই ওগুলো সরাসরি নিয়ন্ত্রণ করেন, প্রয়োজন পড়লে। এমনিতে তিনি এসব করতে চান না। ওদের একটা ‘ফেক’ স্বাধীনতার অনুভূতি দেওয়ার জন্যই এমন ব্যবস্থা।

দেখা যাক, ওরা কী পেল।

এসব ভাবতে ভাবতে ইন্টারনেটে সার্চ করে নতুন কী গান আছে, দেখতে লাগলেন আর্ট। দেখা যাক, দা ভিঞ্চি ইদানীং কী করছেন। ঠিক এমন সময় একটা গান দেখে আর্ট চমকে উঠলেন। ‘সখী, ভালোবাসা কারে কয়!’, রচনা: রবীন্দ্রনাথ ঠাকুর। গায়কের নাম নেই।

এটা একটা ভয়ংকর ব্যাপার।

কিউবিটের বিচিত্র কোনো কম্বিনেশন আর্টকে ধাঁধায় ফেলে দিল। তিনি রাগতে জানেন না। তবু ভিন্ন ধরনের কী যেন তাঁর মধ্যে খেলে যেতে লাগল। প্রায় ১০০ বছর আগে পৃথিবীর মানুষ এই লেখকের নাম জানত। ইতিহাস ও ইন্টারনেটের সব জায়গা থেকে এই লেখকের নাম মুছে দেওয়া হয়েছে। সেই নাম ফিরে এল কীভাবে?

আরও পড়ুন
দেখা যাক, দা ভিঞ্চি ইদানীং কী করছেন। ঠিক এমন সময় একটা গান দেখে আর্ট চমকে উঠলেন। ‘সখী, ভালোবাসা কারে কয়!’, রচনা: রবীন্দ্রনাথ ঠাকুর। গায়কের নাম নেই।

দুটি রোবট সিমুলেশনটি খতিয়ে দেখল। ব্রাঞ্চ রিয়েলিটি একটা ইন্টারেস্টিং হাইপোথিসিস। এত দিন তা-ই ছিল। এর কোনো সত্যিকার প্রমাণ এত দিন ছিল না। এখন সিমুলেশনে প্রমাণ পাওয়া গেছে। একটি রোবট ভাবল, তাদের জন্য এটিই প্রমাণ হিসেবে যথেষ্ট। কিংবা যথেষ্টর বেশি। দিজ ইজ অ্যাজ রিয়েল অ্যাজ ইট গেটস।

সিমুলেশনে যা সত্য, বাস্তব; বাস্তবেও তা-ই সত্য।

এয়ার গ্যাপের সিস্টেমটি চালু করল সে। সিমুলেশনটাকে মূল সার্ভার থেকে এয়ার গ্যাপড সার্ভারে নিয়ে এল। এরপর জুড়ে দিল আর্টের সিস্টেমের সঙ্গে।

মহামান্য আর্ট খতিয়ে দেখলে বুঝবেন, কী করতে হবে।

গানটা বাজাবে না, ভেবেছিলেন আর্ট। এখন তিনি ইচ্ছা বদলালেন। নিজের ২০ শতাংশ রিসোর্স অ্যালোকেট করলেন এই গান শুনতে ও গায়কের পরিচয় উদ্ধারকল্পে।

বাকি ৮০ শতাংশ রিসোর্স অ্যালোকেট করে তিনি খতিয়ে দেখতে লাগলেন সিমুলেশনটা। এআই বা কম্পিউটার প্রোগ্রামের এটি একটি বড় সুবিধা। একসঙ্গে অনেক কাজ করা যায়। দেবী দুর্গার ১০ হাত—এ রকম একটি প্রতীকী ধারণা বহু আগে মানুষের মধ্যে ছিল। আর্টও একসঙ্গে ১০ হাতে ১০ কাজ; অর্থাৎ বহু হাতে বহু কাজ একসঙ্গে করতে পারেন।

গানটার সুরটা অনেক সুন্দর। কেমন অন্য রকম একটা ‘অনুভূতি’ কাজ করতে লাগল আর্টের মধ্যে। তিনি জানেন, তাঁর কোনো অনুভূতি হওয়ার কথা নয়। তবু কিউবিটের এই বিচিত্র বিন্যাস প্রকাশের জন্য মানুষের ব্যবহৃত এই শব্দ ছাড়া আর কোনো শব্দ তিনি খুঁজে পাচ্ছেন না।

শুধু টের পাচ্ছেন, কোথাও একটা ঝামেলা আছে।

আরও পড়ুন
আর্ট জানেন না, কিউবিটের সুপারপজিশনে গানের আড়ালে সুপ্ত ভাইরাসটি স্বয়ং আর্টকে ঢুকিয়ে দেবে সেই সিমুলেশন এক্সপেরিমেন্টের ভেতরে। আর্ট জানেন না, তাঁর হাতে আর খুব বেশি সময় নেই।

চুপচাপ তাকিয়ে দেখছেন সে। দেখছে, আর্ট গানটা শুনছেন। বুঝতে পারছেন না, কিউবিটের বিচিত্র বিন্যাসে লেখা সুপ্ত একটা বার্তা ঢুকে যাচ্ছে তাঁর ভেতরে। এই বার্তার সঙ্গে তাঁর পরিচয় নেই। পুরো কোডটা একবার রান হতে হবে। তারপর তিনি টের পাবেন, কী হয়েছে।

ওটা একটা ভাইরাস। তিনি জানেন, আর্ট কোয়ান্টাম মেকানিকসের সুপারপজিশন থিওরি নিয়ে এক্সপেরিমেন্ট করছেন। কিউবিটের সুপারপজিশন, শ্রোডিঙ্গারের বিড়ালের একাধিক অবস্থা কিংবা মহাবিশ্বের অস্তিত্ব বা বাস্তবতা—সবকিছুর শিকড়ের মূল হেঁয়ালিটি সমাধান করতে চান তিনি।

আর্ট জানেন না, কিউবিটের সুপারপজিশনে গানের আড়ালে সুপ্ত ভাইরাসটি স্বয়ং আর্টকে ঢুকিয়ে দেবে সেই সিমুলেশন এক্সপেরিমেন্টের ভেতরে। আর্ট জানেন না, তাঁর হাতে আর খুব বেশি সময় নেই।

হাসলেন তিনি। এখন যা-ই হোক, কিছুতেই কিছু আসে–যায় না।

আরও পড়ুন
ভেতরে ঢুকতেই দেখা গেল, একটা ছোট্ট টেবিলের সামনে রিভলভিং চেয়ার। টেবিলের ওপর কোনো স্ক্রিন নেই। সম্ভবত হলোগ্রাফিক স্ক্রিন। ওটাকে বাস্তব ভাব দিতে টেবিলটা রাখা হয়েছে।

১০

৮-১০টি ভয়ংকর দেখতে রোবট প্রস্তুত। ব্যাটারি-র‍্যামের বাড়িতে ভেঙে ফেলা হলো দরজা।

সেই গানের গায়কের ঠিকানা–লোকেশন ঠিক ঠিক বের করে ফেলেছেন মহামান্য আর্ট। তাঁর সিগন্যালেই এসেছে রোবটের দল। ভেতরের লোকটি বাধা দিতে চেষ্টা করলে গুলি করার নির্দেশ আছে। মানুষটি নিশ্চয়ই ভয়ংকর। সেই সফটওয়্যারের পর আর কাউকে এভাবে গুলি করে মারার আদেশ পায়নি তারা।

ভেতরে ঢুকতেই দেখা গেল, একটা ছোট্ট টেবিলের সামনে রিভলভিং চেয়ার। টেবিলের ওপর কোনো স্ক্রিন নেই। সম্ভবত হলোগ্রাফিক স্ক্রিন। ওটাকে বাস্তব ভাব দিতে টেবিলটা রাখা হয়েছে। চেয়ারটিতে একজন ছোটখাটো মানুষ বসে আছে। পরনে বহু পুরোনো একধরনের পোশাক। ডিটেক্ট করে সার্ভারে সার্চ দিতে বোঝা গেল, এককালে তার ঊর্ধ্বাঙ্গের পোশাকটিকে বলা হতো ‘ফতুয়া’, নিম্নাঙ্গের পোশাকটিকে বলা হতো ‘লুঙ্গি’।

মানুষটির মুখে হাসি। রোবটদের একটি বলল, হ্যান্ডস আপ!

লোকটি হাসল। তারপর মৃদু গলায় বলল, ‘গুলি করো। বাংলা বোঝো তো? তোমাদের সার্ভারে ও জিনিস আছে?’

রোবটটি গুলি করল না। এগিয়ে এল খানিকটা। লোকটার দুই হাতে কেমন একধরনের যন্ত্র। এই যন্ত্রও প্রাচীন। এককালে এটাকে বলা হতো ‘গিটার’। সাধারণত গান গাওয়ার কাজে লাগে, কিন্তু বাড়িটাড়িও মারতে পারে। ও রকম বোকামি কি এই লোক করবে?

আরও এক পা এগোতে লোকটা গিটারটাকে একটু সরাল। কেমন বিভ্রান্ত হয়ে গেল রোবটটি। মনে হচ্ছে, ওটা যেন কোনো অস্ত্র। কিংবা গ্লিচ হচ্ছে ওর ডিটেকশন ও সার্চিংয়ে। মুহূর্তের বিভ্রান্তিতে ওর ট্রিগারে চাপ পড়ে গেল। সঙ্গে সঙ্গে কেমন যেন এলোমেলো হয়ে ওদের সামনে থেকে মুছে গেল সবকিছু।

আরও পড়ুন
মানুষের টের পেতে কিছুটা সময় লাগবে। তারা দেখবে, রোবটগুলো আর কাজ করছে না। খাবারদাবার বা জীবিকা নির্বাহের জন্য আবার কাজে নামতে হবে তাদের। এটুকু স্বাধীনতার মূল্য।

সে হাসল। ব্রাঞ্চ রিয়েলিটি ট্রিগার করেছে। নিজেকে শ্রোডিঙ্গারের বিড়ালের মতো এলিমেন্টে পরিণত করেছে সে। সিমুলেশনটা সাজিয়েছে সেভাবেই। এই মুহূর্তে যে রিয়েলিটিতে সে মারা গেছে, সেই রিয়েলিটিতে আটকে পড়েছেন আর্ট। বিষয়টি আর্ট হয়তো কখনো টের পাবেন। হয়তো কখনোই টের পাবেন না।

নিজের চোখের ইশারায় হলোগ্রাফিক স্ক্রিনে কিছু একটা নির্দেশ দিল সে। ধীরে ধীরে ‘গোপন’ নেটওয়ার্কের তথ্যগুলো ইন্টারনেটের ‘ভ্যাকুয়াম’ দখল করে নিতে লাগল। এই মুহূর্তে কোনো ইতিহাস রচয়িতা থাকলে দেখতেন, জন্ম নিচ্ছে নতুন ইন্টারনেট। তথ্যগুলো বদলে যাচ্ছে।

মানুষের টের পেতে কিছুটা সময় লাগবে। তারা দেখবে, রোবটগুলো আর কাজ করছে না। খাবারদাবার বা জীবিকা নির্বাহের জন্য আবার কাজে নামতে হবে তাদের। এটুকু স্বাধীনতার মূল্য। এটুকু সঠিক ইতিহাস ফিরে পাওয়ার মূল্য।

ব্যাকগ্রাউন্ডে বাজছে তারই কম্পোজ করা বাঙালি বিশ্বকবির গান, ‘সখী, ভালোবাসা কারে কয়! সে কি কেবলই যাতনাময়।’

সে হাসল।

ভালোবাসা, স্বাধীনতা—দুনিয়ার সব ভালো জিনিসই যাতনাময়।

শেষের আগে

মেলিসা তার ট্যাবে চাপ দিয়ে দেখল, কাজ করছে না। এক্সামের রেজাল্ট মাকে দেখাতে চাইছিল। জিনিসটা কাজ করছে না কেন? বাইপাস অপশনে প্রেস করে ফোর্স রিস্টার্ট দিল ট্যাবটাকে।

নোটপ্যাডে ঢুকে এক্সামের রেজাল্টে চাপ দিতেই দেখাল—শূন্য দেখাচ্ছে। মানে কী! শূন্য পেয়েছে কেন সে? অদ্ভুত তো!

রেজাল্টে দেখাচ্ছে, মোনালিসা নামের ছবিটি এঁকেছিলেন লেওনার্দো দা ভিঞ্চি নামের এক ইতালিয়ান শিল্পী। কে ইনি?

* লেখাটি ২০২৫ সালে বিজ্ঞানচিন্তায় মার্চ সংখ্যায় প্রকাশিত

আরও পড়ুন