উদ্ভাবনপটু দেশপ্রেমী

বহুকাল আগের কথা।

এক দেশে ছিল এক রাজা।

একদিন রাজার দরবারে হাজির হলো এক লোক। সে ছিল বুদ্ধিমান ও উদ্ভাবনপটু এক দেশপ্রেমী।

রাজদরবারে এসে নিজের জামার পকেট হাতড়ে এক টুকরা কাগজ বের করল লোকটি। রাজার উদ্দেশে বলল, ‘মহারাজ, আমি খুব শক্ত বর্ম বানানোর একটা ফর্মুলা আবিষ্কার করেছি। সেটা এত শক্ত হবে যে দুনিয়ার কোনো বন্দুকের গুলি তা ভেদ করতে পারবে না। এই বর্ম যদি রাজকীয় নৌবাহিনীতে ব্যবহার করা হয়, তাহলে আপনার যুদ্ধজাহাজগুলো হয়ে উঠবে অভেদ্য। কেউ আপনাকে আর পরাজিত করতে পারবে না। আপনার মন্ত্রীরাও সেটা পরীক্ষা করে দেখেছেন। এই যে এখানে এই বর্ম সম্পর্কে আপনার মন্ত্রীদের প্রশংসাপত্র আছে। তাঁরাই এর সঠিক মূল্য বুঝতে পেরেছেন। মাত্র এক লাখ টুমটুম মুদ্রার বিনিময়ে আমি এই আবিষ্কারটার স্বত্ব বিনিময় করতে চাই।’

কাগজটা পরীক্ষা-নিরীক্ষা করে সেটা এক পাশে সরিয়ে রাখলেন রাজা। রাজকোষাগার থেকে ওই দেশপ্রেমীকে এক লাখ টুমটুম দেওয়ার জন্য অর্থমন্ত্রীকে নির্দেশ দিলেন।

এবার জামার আরেকটা পকেট হাতড়াতে লাগল দেশপ্রেমী। কিছুক্ষণ পর তার হাতে আরেক টুকরা কাগজ উঠে এল। সেটা দেখিয়ে রাজাকে বলল, ‘মহারাজ, এখানে আমার উদ্ভাবন করা একটা বন্দুকের নকশা রয়েছে। এই বন্দুক দিয়ে আগের ওই শক্ত বর্মটাও অনায়াসে ছিদ্র করে ফেলা সম্ভব—যাকে বলে অপ্রতিরোধ্য বন্দুক। আপনার ভাই, মানে ব্যাংয়ের মহারাজা, এটি কিনতে আগ্রহী। কিন্তু মহামান্য, আপনার এবং আপনার সিংহাসনের প্রতি আনুগত্যের কারণে তাঁকে আমি এ ফর্মুলা দিইনি। এর বিনিময়মূল্যও বেশি নয়, মাত্র এক লাখ টুমটুম মুদ্রা।’

আরও পড়ুন
কাগজটা পরীক্ষা-নিরীক্ষা করে সেটা এক পাশে সরিয়ে রাখলেন রাজা। রাজকোষাগার থেকে ওই দেশপ্রেমীকে এক লাখ টুমটুম দেওয়ার জন্য অর্থমন্ত্রীকে নির্দেশ দিলেন।

অচিরেই দেশপ্রেমীকে রাজকোষ থেকে আরও এক লাখ টুমটুম মুদ্রা দেওয়ার নির্দেশ দেওয়া হলো।

সে প্রতিশ্রুতি পেয়ে গদগদ দেশপ্রেমী আবারও জামার পকেটে হাত ঢোকাল। আরেক টুকরা কাগজ বের করে এনে বলল, ‘মহামান্য সম্রাট, এই অপ্রতিরোধ্য বন্দুকের দাম আরও বেশি হতে পারত। কিন্তু আপনার মহিমায় আমি আরেকটা ফর্মুলা উদ্ভাবন করেছি। সেই ফর্মুলাটা ব্যবহার করলে আগের বর্মটা এই বন্দুকের গুলিও ঠেকিয়ে দিতে পারবে। একদম কার্যকরভাবে। এই ফর্মুলা মাত্র...।’

কিন্তু মুখের কথা শেষ করতে পারল না দেশপ্রেমী। তার আগেই সেনাপতিকে এগিয়ে আসতে ইঙ্গিত করলেন রাজা। হুংকার দিয়ে বললেন, ‘এই লোককে এক্ষুনি তল্লাশি করো। গুনে দেখো, ওর জামায় কতগুলো পকেট আছে।’

‘৪৩টি মহারাজ।’ পরীক্ষা শেষে জবাব দিল সেনাপতি।

‘দয়া করুন, মহারাজ,’ আতঙ্কিত হয়ে উদ্ভাবনপটু দেশপ্রেমী চিৎকার করলে বলল, ‘পকেটগুলোর মধ্যে একটিতে আমার তামাক আছে।’

‘লোকটাকে উল্টো করে ধরে জোরে জোরে ঝাঁকাও,’ কঠোর নির্দেশ দিলেন রাজা, ‘তারপর তাকে ৪২ লাখ টুমটুম মুদ্রা দাও। এরপর দ্রুত ওর মৃত্যুদণ্ড কার্যকর করো। আর সব কাজ শেষে এমন একটা ফরমান জারি করো, যাতে এর পর থেকে উদ্ভাবনী ক্ষমতাকে মৃত্যুদণ্ডযোগ্য অপরাধ হিসেবে গণ্য করা হয়।’

*লেখাটি ২০২৫ সালে বিজ্ঞানচিন্তায় মার্চ সংখ্যায় প্রকাশিত

আরও পড়ুন