‘মঙ্গলে আসলে সে রকম অপরাধটপরাধ হয় না’, একটু মন খারাপের সুরেই কথাটা বলল ডিটেকটিভ ইন্সপেক্টর রাওলিংস। ‘সে জন্যই মূলত আবার ইয়ার্ডে ফিরে যাচ্ছি। এখানে বেশি দিন থাকলে গোয়েন্দাগিরি যা শিখেছি, ভুলে যাব।’
ফোবোস স্পেসপোর্টের ভিউ সেন্টারে বসে আছি আমরা। ছোট্ট চাঁদটার সূর্যস্নাত উঁচু-নিচু পাহাড়গুলো পরিষ্কার দেখা যাচ্ছে এখান থেকে। মঙ্গল গ্রহ থেকে যে ফেরি রকেটটা আমাদের পৌঁছে দিয়ে গেছে এখানে, সেটা আরও ১০ মিনিট আগেই ফিরতি যাত্রা শুরু করেছে লাল মাটির গ্রহটার দিকে। আর আধা ঘণ্টার মধ্যে লাইনারে করে পৃথিবীর উদ্দেশে যাত্রা শুরু হবে আমাদের। পৃথিবী এমন একটা গ্রহ, যেখানে অধিকাংশ যাত্রীরই এই প্রথম পা পড়বে, তবু নামটা শুনলেই আপন বোধ হয়।
‘তবে’, ইন্সপেক্টর বলে, ‘মাঝেসাঝে বিচ্ছিন্ন কিছু ঘটনা যে ঘটে না, তা নয়। আপনার তো চিত্রকর্ম, ভাস্কর্যের ব্যবসা, মি. ম্যাকার। মাস দুয়েক আগের মেরিডিয়ান সিটির ঘটনাটার ব্যাপারে জানেন নিশ্চয়ই?’
‘সে রকম কিছু মনে পড়ছে না,’ তামাটে চেহারার লোকটা জবাব দেয়। ছোটখাটো গড়ন। খুব সম্ভবত আরেকজন ফিরতি পর্যটক। ইন্সপেক্টর নিশ্চয়ই যাত্রীতালিকা খুঁটিয়ে খুঁটিয়ে দেখেছে। আমার সম্পর্কে কতটুকু জানে?—ভাবি। মনে মনে নিজেকে আশ্বস্ত করলাম যে আমার ভয় পাওয়ার কিছু নেই। মঙ্গল গ্রহের শুল্ক বিভাগের চোখ ফাঁকি দিয়ে সবাই কিছু না কিছু নিয়ে আসে।
‘সে রকম কিছু মনে পড়ছে না,’ তামাটে চেহারার লোকটা জবাব দেয়। ছোটখাটো গড়ন। খুব সম্ভবত আরেকজন ফিরতি পর্যটক। ইন্সপেক্টর নিশ্চয়ই যাত্রীতালিকা খুঁটিয়ে খুঁটিয়ে দেখেছে।
‘সবকিছু ধামাচাপা দেওয়ার চেষ্টা হয়েছে’, ইন্সপেক্টর বলে। কিন্তু এসব ব্যাপার বেশি দিন চেপে রাখা যায় না। যা–ই হোক, এই রত্নচোর পৃথিবী থেকে এসেছিল মেরিডিয়ান জাদুঘরের সবচেয়ে মূল্যবান সম্পদ—‘সাইরেন গডেস’ চুরি করতে।
‘এ আবার কেমন চোর!’ প্রতিবাদের সুরে বলি। ‘ওটা অমূল্য, সন্দেহ নেই। কিন্তু বেলেপাথরের একটা খণ্ড বৈ আর কিছু নয়। কোথাও বিক্রিও করা যাবে না—ওটা চুরি করা আর মোনালিসাকে চুরি করা একই কথা।’
কাষ্ঠল হাসি ফোটে ইন্সপেক্টরের মুখে। ‘মোনালিসাও কিন্তু একবার চুরি হয়েছিল’, বলে সে। ‘অনেক সংগ্রাহকই আছে, যারা এসবের জন্য মোটা অঙ্ক দিতে রাজি। তাই না মিস্টার ম্যাকার?’
‘ঠিক বলেছেন, আমাদের কারবারে এ ধরনের পাগলের কমতি নেই।’
‘হ্যাঁ, ড্যানি ওয়েভার নামের এই চোরকেও ও রকম একজন বেশ মোটা অঙ্কের অর্থ দিয়েছিল। বেচারার নেহাত কপাল খারাপ, নয়তো এতক্ষণে ওগুলো হাতিয়ে নিত নিশ্চিত।’
স্পেসপোর্টের পি.এ. সিস্টেম ক্ষণিক বিলম্বের জন্য ক্ষমা চাইল এ সময়। শেষবারের মতো যাচাই করে দেখা হচ্ছে, জ্বালানির মজুত ঠিক আছে কি না। কয়েকজন যাত্রীর নাম উল্লেখ করে তাদের তথ্যকেন্দ্রে দেখা করতে বলা হলো। সব আনুষ্ঠানিকতা শেষ—এই ঘোষণা শোনার অপেক্ষায় বসে থাকতে থাকতে সাইরেন গডেস সম্পর্কে যা যা জানি, ভাবার চেষ্টা করলাম। আসল শিল্পকর্মটি আমি কখনো দেখিনি। তবে অন্যান্য ফিরতি পর্যটকদের মতো আমার ব্যাগেও একটা রেপ্লিকা আছে ওটার। মার্সের প্রত্নতত্ত্ব অধিদপ্তরের সার্টিফিকেটও এসেছে সঙ্গে। রেপ্লিকাটা যে সাইরেন গডেসের হুবহু নকল, সেটা নিশ্চিত করা হয়েছে ওখানে। ২০১২ খ্রিষ্টাব্দে (২৩ মঙ্গলাব্দ) তৃতীয় অভিযানের সময় সাইরেন গডেস পাওয়া যায় মেয়ার সাইরেনিয়াম থেকে।
কাষ্ঠল হাসি ফোটে ইন্সপেক্টরের মুখে। ‘মোনালিসাও কিন্তু একবার চুরি হয়েছিল’, বলে সে। ‘অনেক সংগ্রাহকই আছে, যারা এসবের জন্য মোটা অঙ্ক দিতে রাজি। তাই না মিস্টার ম্যাকার?’
যে পরিমাণ আলোচনা হয়েছে জিনিসটা নিয়ে, সেই তুলনায় মূর্তিটা নিতান্ত ক্ষুদ্র। মাত্র ৮ কি ৯ ইঞ্চি। পৃথিবীর জাদুঘরে এ রকম জিনিস দেখে দ্বিতীয়বার কেউ ফিরে তাকাবে না। এক তরুণীর বক্ষমূর্তি। চেহারায় প্রাচ্যের ধাঁচ। কানে লম্বা দুল, কোঁকড়ানো চুল ছড়িয়ে আছে কপালে। আর ঠোঁটজোড়া হালকা ফাঁক হয়ে আছে—আমোদে কিংবা বিস্ময়ে! কিন্তু ছোট্ট এই মূর্তিটাকে ঘিরে রহস্যের এত ঘনঘটা, বেশ কিছু ধর্মে উপাসনা পর্যন্ত করা হয়। প্রত্নতাত্ত্বিকদের মাথাও খারাপ হয়ে যায় সাইরেন গডেস নিয়ে ভাবতে ভাবতে। মঙ্গল গ্রহে এ রকম নিখুঁত মানুষের মাথা পাওয়া আশ্চর্যের ব্যাপার বৈকি।
কারণ, এ গ্রহের একমাত্র বুদ্ধিমান অধিবাসী বলতে ক্রাস্টাশিয়ান–জাতীয় কিছু প্রাণী (চিংড়ি মাছের মতো)। পত্রপত্রিকাগুলো ‘শিক্ষিত চিংড়ি’ বলে মজা করে। মঙ্গলের এই আদিবাসীদের কখনোই এ রকম প্রযুক্তি ছিল না, যার সাহায্যে মহাকাশ পাড়ি দেওয়া যায়। তা ছাড়া বহু আগেই এদের সভ্যতা বিলুপ্ত হয়ে গেছে। তখনো পৃথিবীতে মানবসভ্যতা গড়ে ওঠেনি। এই দেবীমূর্তিকে তাই বলা যায় সৌরজগতের ১ নম্বর রহস্য। আর এই রহস্যের কিনারা আমার জীবদ্দশায় হবে বলে মনে হয় না।
‘ড্যানির পরিকল্পনা ছিল সোজাসাপটা’—ইন্সপেক্টর বলতে লাগল। ‘মঙ্গলের শহরগুলো যে রোববারে একদম খালি হয়ে যায়, এটা সবাই জানে। সবকিছু বন্ধ থাকে ওই দিন। কলোনিস্টদের সবাই যার যার বাড়িতে পৃথিবী থেকে সম্প্রচারিত অনুষ্ঠান দেখে টিভিতে। ড্যানি ঠিক ওই সুযোগেরই অপেক্ষায় ছিল। গত শুক্রবার দুপুরে পশ্চিম মেরিডিয়ানে এক হোটেলে ওঠে সে। পরিস্থিতি বোঝার চেষ্টা করে। শনিবার জাদুঘর ভালো করে ঘুরে দেখে ছক এঁকে ফেলে। সে নিশ্চয়ই ভেবেছিল, নির্ঝঞ্ঝাট রোববারে কাজ সেরে সোমবার বাকি পর্যটকদের মতো ফিরে যাবে।
মঙ্গলের এই আদিবাসীদের কখনোই এ রকম প্রযুক্তি ছিল না, যার সাহায্যে মহাকাশ পাড়ি দেওয়া যায়। তা ছাড়া বহু আগেই এদের সভ্যতা বিলুপ্ত হয়ে গেছে। তখনো পৃথিবীতে মানবসভ্যতা গড়ে ওঠেনি।
‘শনিবার ছোট পার্কটার মধ্য দিয়ে হেঁটে মেরিডিয়ানের পূর্বাংশে চলে যায় সে, জাদুঘর ওদিকেই। এ শহরের নাম মেরিডিয়ান বা মধ্যরেখা। কারণ, এটা একদম দ্রাঘিমাংশের ১৮০ ডিগ্রিতে অবস্থিত; ঠিক ওই জায়গাটাতেই পার্কের মধ্যে রাখা আছে পাথরের বড় একটা স্ল্যাব। স্ল্যাবটা এমনভাবে বসানো, যাতে পার্কে লোকজন এসে দুই গোলার্ধে দুই পা রেখে নিজেদের ছবি তুলতে পারে।
‘জাদুঘরে যাওয়ার দিনটায় অন্য পর্যটকেরা মঙ্গলে আসার পর যা যা করে, সেসব করেই কাটায় ড্যানি। কিন্তু জাদুঘর বন্ধ হয়ে যাওয়ার পরও সে থেকে যায়। এমন একটা গ্যালারিতে লুকায়, যেটা জনসাধারণের জন্য উন্মুক্ত করা হয়নি। অর্থাভাবে লেইট ক্যানাল পিরিয়ডের একটা প্রদর্শনীর সংস্কারের কাজ থেমে থাকায় গ্যালারিটা বন্ধ রাখে কর্তৃপক্ষ। তবে সন্ধ্যায়ই বের না হয়ে মধ্যরাত অবধি অপেক্ষা করে সে। অনেক অতি আগ্রহী কর্মী দেরি করে বের হয় জাদুঘর থেকে, তাদের সামনে পড়তে চায়নি।’
‘এক মিনিট’, তার কথার মাঝে বলি, ‘কোনো নিরাপত্তাকর্মী ছিল না?’
হাসে ইন্সপেক্টর।
‘আরে ভাই! মঙ্গলে এত খরচ করা কি সম্ভব? কোনো অ্যালার্ম সিস্টেমও নেই। পাথর কে চুরি করবে? তবে হ্যাঁ, দেবীর মূর্তি শক্ত কাচ আর মজবুত ধাতব ক্যাবিনেটের ভেতরে রাখা ছিল। বলা তো যায় না, কেউ যদি খেয়ালের বশে ব্যাগে ঢুকিয়ে ফেলে বা পড়ে গিয়ে ক্ষতি হয়। আর চুরি হলেও চোর লুকাবে কোথায়? সব পথে তো তল্লাশি হবেই।’
‘আরে ভাই! মঙ্গলে এত খরচ করা কি সম্ভব? কোনো অ্যালার্ম সিস্টেমও নেই। পাথর কে চুরি করবে? তবে হ্যাঁ, দেবীর মূর্তি শক্ত কাচ আর মজবুত ধাতব ক্যাবিনেটের ভেতরে রাখা ছিল।'
ঠিকই বলেছে ইন্সপেক্টর। মঙ্গলের প্রতিটি শহর আসলে সুরক্ষাবলয়ের ভেতরে অবস্থিত বদ্ধ জায়গামাত্র। এই বলয় রক্ষা করে সবাইকে। শহর রক্ষাকারী বৈদ্যুতিক এসব শিল্ডের বাইরে কেবল বৈরী শূন্যতা। কোনো সুরক্ষা ব্যতিরেকে মানুষের পক্ষে এক সেকেন্ডও বেঁচে থাকা অসম্ভব সেখানে। সে কারণেই এখানকার আইনব্যবস্থাও ঢিলেঢালা। অপরাধ প্রায় হয় না বললেই চলে...।
‘ড্যানির কাছে চমৎকার কিছু যন্ত্র। ঘড়ি নির্মাতাদের ব্যবহার উপযোগী, অসম্ভব রকম সূক্ষ্ম কাজের জন্য তৈরি ওগুলো। প্রধান যন্ত্রটা হচ্ছে ছোট্ট একটি করাত, সোল্ডারিং আয়রনের চেয়েও ছোট। আলট্রাসনিক পাওয়ার প্যাকে চলা একদম পাতলা ব্লেড, সেকেন্ডে ১০ লাখ ঘূর্ণনে সক্ষম। গ্লাস বা যেকোনো ধাতুর মধ্য দিয়ে মাখনের মতো ঢুকে যাবে। আর কাটার পর ফাঁক হয় চুল পরিমাণ। ড্যানিকে এমনভাবে কাজ সারতে হতো, যাতে কোনো প্রমাণ না থাকে। তাই এই যন্ত্রগুলো ভীষণ জরুরি ছিল তার।
‘বুঝতেই পারছেন, কীভাবে কাজটা করতে চেয়েছিল সে। ক্যাবিনেটটা নিচ থেকে কেটে আসল মূর্তিটা সরিয়ে রেপ্লিকা মূর্তিগুলোর একটা বসিয়ে দেবে ভেতরে। বিশেষজ্ঞ কেউ ছাড়া অন্য কেউ কয়েক বছরেও বিষয়টা ধরতে পারত বলে মনে হয় না। তত দিনে রেপ্লিকা হিসেবে পৃথিবীতে চালান করে দেওয়া হতো জিনিসটা। পরিকল্পনাটা ভালোই, তাই না?
শহর রক্ষাকারী বৈদ্যুতিক এসব শিল্ডের বাইরে কেবল বৈরী শূন্যতা। কোনো সুরক্ষা ব্যতিরেকে মানুষের পক্ষে এক সেকেন্ডও বেঁচে থাকা অসম্ভব সেখানে। সে কারণেই এখানকার আইনব্যবস্থাও ঢিলেঢালা।
‘অন্ধকার গ্যালারিতে লাখ বছর আগের আঁকিবুঁকি আর ব্যাখ্যাতীত সব নিদর্শনের মধ্যে কাজ করার অভিজ্ঞতাটা অদ্ভুত, তাই না? পৃথিবীর সব জাদুঘরেও রাতের অন্ধকারে গা ছমছম করে। কিন্তু ওখানকার সবকিছু অন্তত মনুষ্যসৃষ্ট। তা ছাড়া ৩ নম্বর গ্যালারি, যেখানে ‘সাইরেন গডেস’ মূর্তিটা রাখা, ওখানে আরও অনেক কিম্ভূত জিনিসপত্র রাখা। যেমন খোদাই করা কিছু নিদর্শন, যেখানে দেখা যাচ্ছে, বিশাল বিশাল গুবরেপোকার মতো কিছু প্রাণী লড়াইয়ে মত্ত। বেশির ভাগ বিশেষজ্ঞের মতে, এসব প্রাণীর এই গ্রহে থাকার সম্ভাবনা শূন্য। তবে কাল্পনিক হোক আর বাস্তব, খোদাইকর্মগুলো যে এখানকার, সেই ব্যাপারে সন্দেহ নেই। তবে ওগুলো ড্যানির জন্য কোনো সমস্যার সৃষ্টি করেনি, যেমনটা সাইরেন গডেস করেছে। মূর্তিটা নাকি একদৃষ্টে ড্যানির দিকে তাকিয়ে জানতে চাইছিল, সে এখানে কী করছে। আমি কীভাবে জানলাম? ড্যানি নিজেই বলেছে।
‘হীরাচোরের মতো সতর্কতায় কাজে লেগে পড়ে ড্যানি। ট্র্যাপ ডোরটা কাটতে প্রায় সারা রাত লেগে যায় তার। ভোরের দিকে অবশেষে করাতটা হাত থেকে নামিয়ে রাখার সুযোগ পায়। তখনো অনেক কাজ বাকি, তবে সবচেয়ে কঠিন পর্বটা শেষ। নকল মূর্তিটা ভেতরে ঢুকিয়ে সঙ্গে করে নিয়ে আসা ছবির সঙ্গে মিলিয়ে সব ঠিকঠাক করতে পুরো রোববার লেগে যাবে, কিন্তু সেটা নিয়ে চিন্তিত ছিল না ড্যানি। আরও ২৪ ঘণ্টা সময় আছে তার কাছে। সোমবার জাদুঘর খোলার পর যে দর্শনার্থীরা আসবে, তাদের সঙ্গে বেরিয়ে যাওয়ার পরিকল্পনা করে রেখেছিল। তাহলে আর কেউ কিছু সন্দেহ করবে না।
‘হীরাচোরের মতো সতর্কতায় কাজে লেগে পড়ে ড্যানি। ট্র্যাপ ডোরটা কাটতে প্রায় সারা রাত লেগে যায় তার। ভোরের দিকে অবশেষে করাতটা হাত থেকে নামিয়ে রাখার সুযোগ পায়।'
‘কিন্তু সকাল সাড়ে আটটায় যখন জাদুঘরের ছয় কর্মীর সবাই একে একে ভেতরে ঢুকে গ্যালারিগুলো খুলে দেওয়ার প্রস্তুতি নিতে শুরু করে, স্বাভাবিকভাবেই ভীষণ ঘাবড়ে যায় ড্যানি। সবকিছু ফেলে জরুরি নির্গমন পথের দিকে দৌড় দেয়। নিজের যন্ত্রপাতি, সাইরেন গডেসের মূর্তি—এসবও রেখে যায়। রাস্তায় বেরিয়ে এসে আরও একবার চক্ষু ছানাবড়া হওয়ার জোগাড় হয় চোর মহাশয়ের। ভেবেছিল সম্পূর্ণ খালি থাকবে চারপাশ। সবাই বাসায় বসে আয়েশ করে খবরের কাগজ পড়বে। কিন্তু পূর্ব মেরিডিয়ানের সব রাস্তা তখন গিজগিজ করছে লোকে। যে যার কাজে যাচ্ছিল পা চালিয়ে।’
‘ড্যানি বেচারা যখন অবশেষে হোটেলে পৌঁছায়, আমরা আগে থেকেই অপেক্ষা করছিলাম সেখানে। অতি সম্প্রতি পৃথিবী থেকে আসা কেউই যে কাজটা করেছে, এটা বুঝতে খুব বেশি বেগ পেতে হয় না আমাদের। কেন, সেটা নিশ্চয়ই বুঝতেই পারছেন?’
‘সত্যি বলতে, আমি কিছুই বুঝতে পারছি না’, বলি। ‘আসলে মাত্র ছয় মাসের মঙ্গলভ্রমণে সবকিছু দেখা সম্ভব নয়। তা ছাড়া সিরটিস মেজরের পূর্বে যাওয়াও হয়নি আমার।’
‘কারণটা একদমই সহজ। তবে ড্যানিকে দোষ দিয়ে লাভ নেই, এমনকি স্থানীয়দেরও অনেক সময় ভুল হয়। পৃথিবীতে থাকার সময় অবশ্য এই সমস্যা হয় না আমাদের। প্রশান্ত মহাসাগরের ওপর দিয়েই যায় ব্যাপারটা। কিন্তু মঙ্গলে কোনো সাগর নেই। অর্থাৎ আন্তর্জাতিক তারিখরেখাতেও মানুষের আবাস…।
‘সত্যি বলতে, আমি কিছুই বুঝতে পারছি না’, বলি। ‘আসলে মাত্র ছয় মাসের মঙ্গলভ্রমণে সবকিছু দেখা সম্ভব নয়। তা ছাড়া সিরটিস মেজরের পূর্বে যাওয়াও হয়নি আমার।’
‘ড্যানি মঙ্গলে এসে পশ্চিম মেরিডিয়ানের হোটেলে উঠেছে। ওখানে রোববার, এটা ঠিক। আমরা যখন তাকে হোটেল থেকে গ্রেপ্তার করি, তখনো রোববারই ছিল। কিন্তু আধা মাইল দূরে পূর্ব মেরিডিয়ানে তখন শনিবার। পার্কের মধ্যে দিয়ে যাওয়াতেই হিসাবে গোলমাল হয়ে যায়; যেমনটা বলেছিলাম, ভাগ্যই খারাপ ছিল বেচারার।’
লম্বা সময় কথা বললাম না কেউই। এরপর জিজ্ঞাসা করলাম, ‘কত দিনের শাস্তি হলো?’
‘তিন বছর,’ ইন্সপেক্টর রাওলিং বলে।
‘তাহলে তো খুব বেশি দিন নয়।’
‘মঙ্গলের তিন বছর, পৃথিবীতে ছয় বছরের সমান প্রায়। সেই সঙ্গে মোটা অঙ্কের জরিমানা। ও অবশ্য জেলে নেই। মঙ্গলে কাউকে এমনি এমনি বসিয়ে রাখা সম্ভব নয়। কড়া পাহারার মধ্যে কাজ করতে হবে তাকে। মেরিডিয়ান জাদুঘরে রাতের বেলা সব দেখেশুনে রাখার জন্য এত দিন কেউ ছিল না। এখন আছে। বলুন দেখি কে!’ হাসি ফুটল রাওলিংয়ের মুখে।
‘সব যাত্রীকে ১০ মিনিটের মধ্যে মহাকাশযানে বোর্ডিংয়ের অনুরোধ করা হলো। হ্যান্ড লাগেজ নির্ধারিত জায়গায় রাখবেন!’ লাউড স্পিকারে নির্দেশনা এল এ সময়।
এয়ার লকের দিকে যাওয়ার সময় আরেকটা প্রশ্ন না করে পারি না আমি।
‘ড্যানিকে যারা এই কাজে পাঠিয়েছে, তাদের কী হলো? নিশ্চয়ই প্রচুর অর্থ খরচ করেছে তারা। কিছু জানতে পেরেছেন?’
‘সব যাত্রীকে ১০ মিনিটের মধ্যে মহাকাশযানে বোর্ডিংয়ের অনুরোধ করা হলো। হ্যান্ড লাগেজ নির্ধারিত জায়গায় রাখবেন!’ লাউড স্পিকারে নির্দেশনা এল এ সময়।
‘এখনো কোনো তথ্য হাতে আসেনি; এখন পর্যন্ত নিজেদের আড়ালে রাখতে সক্ষম হয়েছে তারা। ড্যানিও এ বিষয়ে কোনো সাহায্য করতে পারেনি। তা ছাড়া এটা আমার কেস নয়। আমি আবারও ইয়ার্ডে ফিরে যাচ্ছি। তবে একজন পুলিশ অফিসারকে সব সময় চোখ–কান খোলা রাখতে হয়, শিল্পকারবারির মতো, নাকি মি. মাক্কার? আপনার চেহারা এ রকম ফ্যাকাসে দেখাচ্ছে কেন? আমার কাছে স্পেস-সিকনেসের ট্যাবলেট আছে, খেতে পারেন একটা।’
‘না, ধন্যবাদ’, মি. মাক্কার জবাব দেন। ‘আমি ঠিক আছি।’
এবার রূঢ় শোনাল তার কণ্ঠস্বর; একটু আগের হাসিখুশি পরিবেশটা উধাও হয়ে গেছে যেন আচমকা। মি. মাক্কার আর ইন্সপেক্টর রাওলিংয়ের দিকে পালা করে তাকালাম। বেশ ঘটনাবহুল এক যাত্রা অপেক্ষা করছে আমাদের সামনে।