২০২৬ সালেই চাঁদে যাচ্ছে মানুষ
পঞ্চাশ বছরের দীর্ঘ অপেক্ষার অবসান কি হবে? ২০২৬ সালে চাঁদের কক্ষপথে পাড়ি দিতে পারবে চার নভোচারী। এই মিশনের প্রযুক্তিগত চ্যালেঞ্জ কী? কে জিতবে চাঁদের দক্ষিণ মেরু অভিযানে—যুক্তরাষ্ট্র নাকি চীন?
১৯৭২ সালে শেষ মানুষ হিসেবে চাঁদের বুকে তিন দিন কাটিয়ে এসেছিলেন নভোচারী ইউজিন সারনান এবং হ্যারিসন স্মিট। কক্ষপথ থেকে তাঁদের তুলে নিয়েছিলেন আরেক নভোচারী রন ইভান্স। তারপর আর মানুষ চাঁদে ফিরে যায়নি। যুক্তরাষ্ট্রের বাইরে চেষ্টা করেনি অন্য কোনো দেশও। এরপর বহু বছর কেটে গেছে। মিশন পরিকল্পনা হয়েছে, বাতিল হয়েছে, সময় পেছানো হয়েছে। কিন্তু এবার আর দেরি নয়। মার্কিন মহাকাশ গবেষণা সংস্থা নাসা প্রস্তুত। ২০২৬ সাল হতে যাচ্ছে মহাকাশ ইতিহাসের এক গুরুত্বপূর্ণ বছর!
এর আগে, ২০২২ সালের নভেম্বরে আর্টেমিস ১ মিশন সফলভাবে মানুষ ছাড়াই সম্পন্ন হয়েছিল। কথা ছিল ২০২৪ সালেই মানুষ পাঠানো হবে। কিন্তু ওরিয়ন মহাকাশযানের হিটশিল্ডে সমস্যা দেখা দেওয়ায় সেই সময় পিছিয়ে ২০২৬ করা হয়েছে। নাসার পরিকল্পনা শুধু চাঁদে গিয়ে ফিরে আসা নয়, তারা চাঁদে একটি স্থায়ী ঘাঁটি বানাতে চায়। সেখান থেকেই ভবিষ্যতের প্রযুক্তির পরীক্ষা-নিরীক্ষা হবে এবং ভবিষ্যতে মানুষ মঙ্গলের দিকে পাড়ি দেবে।
তবে সেসব আলোচনা এখন অনেকটাই চাপা পড়ে গেছে। এখন মূল আলোচনা হলো, কে আগে চাঁদে নামবে? আমেরিকা নাকি চীন? ১৯৭২ সালেও যুক্তরাষ্ট্রের সঙ্গে রাশিয়ার এমন একটি অঘোষিত প্রতিযোগিতা ছিল। সেই প্রতিযোগিতায় জিতে যায় যুক্তরাষ্ট্র। এবার রাশিয়ার জায়গায় এসেছে চীন। এবারও কি জিততে পারবে মার্কিনরা? চীনের আগে চাঁদে মানুষ পাঠাতে পারবে তাঁরা?
নাসার পরিকল্পনা শুধু চাঁদে গিয়ে ফিরে আসা নয়, তারা চাঁদে একটি স্থায়ী ঘাঁটি বানাতে চায়। সেখান থেকেই ভবিষ্যতের প্রযুক্তির পরীক্ষা-নিরীক্ষা হবে এবং ভবিষ্যতে মানুষ মঙ্গলের দিকে পাড়ি দেবে।
যুক্তরাষ্ট্র ও চীনের আগ্রহের কেন্দ্রবিন্দু এখন চাঁদের দক্ষিণ মেরু। কারণ, সেখানে প্রচুর পানি জমে বরফ হয়ে আছে বলে ধারণা করা হয়। এই পানি ভবিষ্যতে নভোচারীদের পানীয় এবং রকেট জ্বালানি হিসেবে ব্যবহার করা যাবে। তাই চীনও বসে নেই। ২০২৫ সালে তারা তাদের লং মার্চ ১০ রকেট এবং মেংঝু স্পেসক্রাফট তৈরিতে অনেক এগিয়ে গেছে। তাদের পুনর্ব্যবহারযোগ্য রকেটের পরীক্ষাগুলোও বেশ জোরেশোরে চলছে। সিনেট শুনানিতে সাবেক নাসা প্রধান জিম ব্রাইডেনস্টাইন সতর্ক করে বলেছেন, যদি আমরা পুরোপুরি স্পেসএক্সের ওপর নির্ভর করি, তবে চীনের আগে চাঁদে পৌঁছানো কঠিন হতে পারে।
নাসার বর্তমান পরিকল্পনা অনুযায়ী, আর্টেমিস ২ এবং ৩ মিশনের জন্য তারা নিজস্ব এসএলএস রকেট ব্যবহার করবে। এটি নভোচারীদের চাঁদের কক্ষপথে থাকা গেটওয়ে স্পেস স্টেশনে পৌঁছে দেবে। সেখান থেকে স্পেসএক্সের স্টারশিপ ল্যান্ডারে চড়ে নভোচারীরা চাঁদের বুকে নামবেন।
কিন্তু এখানেও আছে বিতর্ক। এসএলএস রকেট তৈরি করতে ২০০৬ সাল থেকে প্রায় ৫০ বিলিয়ন ডলার খরচ হয়েছে। এর প্রতিটি লঞ্চের জন্য খরচ প্রায় ৪ বিলিয়ন ডলার!
অন্যদিকে স্পেসএক্স তাদের রকেট পুনর্ব্যবহারযোগ্য করে খরচ অনেক কমিয়ে এনেছে। স্পেসএক্সের স্টারশিপের সফল ল্যান্ডিং এবং মেকাজিলা দিয়ে বুস্টার ক্যাচ করার দৃশ্য বিশ্বকে অবাক করেছে। কিন্তু আর্টেমিস ৩-এর জন্য স্টারশিপ কি সময়মতো তৈরি হবে? স্পেসএক্সের নথিপত্র বলছে, এটি ২০২৮ সালের আগে পুরোপুরি প্রস্তুত হওয়ার সম্ভাবনা কম।
এসএলএস রকেট তৈরি করতে ২০০৬ সাল থেকে প্রায় ৫০ বিলিয়ন ডলার খরচ হয়েছে। এর প্রতিটি লঞ্চের জন্য খরচ প্রায় ৪ বিলিয়ন ডলার!
সব অনিশ্চয়তা ছাপিয়ে আর্টেমিস ২ মিশনের জন্য চারজন নভোচারী এখন প্রস্তুত। কমান্ডার রিড ওয়াইজম্যান, পাইলট ভিক্টর গ্লোভার, মিশন স্পেশালিস্ট ক্রিস্টিনা কোচ এবং কানাডিয়ান স্পেস এজেন্সির জেরেমি হ্যানসেন। গত তিন বছর ধরে তাঁরা কঠোর প্রশিক্ষণ নিচ্ছেন। সব ঠিক থাকলে ২০২৬ সালের ফেব্রুয়ারিতেই তাঁরা চাঁদের উদ্দেশে পাড়ি জমাবেন।
আর্টেমিস ২ শুধু চাঁদের কক্ষপথ ঘুরে পৃথিবীতে ফিরবে। তবে এতেই আরও কিছু নতুন ইতিহাসও গড়া হবে। এই মিশনে প্রথমবারের মতো একজন নারী এবং একজন কৃষ্ণাঙ্গ ব্যক্তি চাঁদের অভিযানে যাচ্ছেন। এই মিশনটি অ্যাপোলো ১৩ মিশনের রেকর্ড ভেঙে পৃথিবী থেকে সবচেয়ে দূরে মানুষ পাঠানোর রেকর্ড গড়তে পারে। রাজনীতি, বাজেট আর প্রতিযোগিতার ভিড়ে আর্টেমিস প্রোগ্রাম হয়তো অনেক চড়াই-উতরাই পার হচ্ছে। কিন্তু একটা কথা নিশ্চিত, ২০২৬ সালে মানুষ আর শুধু পরিকল্পনা করছে না, মানুষ সত্যিই চাঁদের আঙিনায় ফিরে যাচ্ছে। এটা মানবজাতির জন্য এক বিশাল অর্জন।