আর্টেমিস ২ মিশনে টয়লেট বিভ্রাট

নাসার আর্টেমিস ২ মিশনের ওরিয়ন স্পেসক্রাফটের টয়লেটছবি: নাসা/কানাডিয়ান স্পেস এজেন্সি

মানুষ এখন আগের চেয়ে অনেক গভীর মহাকাশে পাড়ি জমাচ্ছে। নাসার ঐতিহাসিক আর্টেমিস ২ মিশন তার সবচেয়ে বড় প্রমাণ। কিন্তু এত অত্যাধুনিক প্রযুক্তি থাকার পরও একটা জায়গায় এসে যেন সব আটকে গেছে! সেটা ওরিয়ন স্পেসক্রাফটের টয়লেট!

বাংলাদেশ সময় ২ এপ্রিল পৃথিবী থেকে উড্ডয়নের পর থেকেই চার নভোচারী এই টয়লেট নিয়ে বেশ বিপাকে পড়েছেন। ওরিয়ন ক্যাপসুলের এই টয়লেটে কিছুক্ষণ পরপর সমস্যা দেখা দিচ্ছিল। শনিবার তো রীতিমতো আরেক বিপদ! টয়লেটের বর্জ্য মহাকাশযান থেকে বাইরে ফেলার পাইপটি কাজ করা বন্ধ করে দেয়। নাসার বিজ্ঞানীদের ধারণা, বর্জ্য বের হওয়ার ওই ভেন্ট লাইন বা পাইপটি হয়তো জমে বরফ হয়ে গেছে। উপায় না পেয়ে নভোচারীরা তখন বিকল্প এক ব্যবস্থা নেন। তাঁরা প্রস্রাব ধরে রাখার জন্য বিশেষ ধরনের ভাঁজ করা যায় এমন প্লাস্টিকের পাত্র ব্যবহার করতে বাধ্য হন!

তবে এই টয়লেট বিভ্রাটের পরও আর্টেমিস ২ মিশনের ঐতিহাসিক ১০ দিনের মিশন সফলভাবেই এগিয়ে চলেছে। মিশনটি এখন পঞ্চম দিনে পৌঁছেছে। এই মিশনে চার নভোচারী আছেন। তাঁরা হলেন নাসার রিড ওয়াইজম্যান, ভিক্টর গ্লোভার, ক্রিস্টিনা কোচ এবং কানাডিয়ান স্পেস এজেন্সির জেরেমি হ্যানসেন। তাঁরা সবাই ওরিয়ন ক্যাপসুলের ছোট্ট একটি কেবিনে অবস্থান করছেন। এই কেবিনের আকার অনেকটা ক্যাম্পার ভ্যানের মতো। এটি চওড়ায় মাত্র ১৫ ফুট এবং লম্বায় ৯ ফুট। এত ছোট জায়গায় টয়লেট নষ্ট হওয়াটা যে কতটা ভয়াবহ, তা নিশ্চয়ই আর বলে বোঝাতে হবে না!

আরও পড়ুন
শনিবার ওরিয়ন ক্যাপসুলের টয়লেটের বর্জ্য মহাকাশযান থেকে বাইরে ফেলার পাইপটি কাজ করা বন্ধ করে দেয়। নাসার বিজ্ঞানীদের ধারণা, বর্জ্য বের হওয়ার ভেন্ট লাইনটি হয়তো জমে বরফ হয়ে গেছে।

গত ৩ এপ্রিল পৃথিবীর সঙ্গে এক ভিডিও কলে যুক্ত হয়েছিলেন নভোচারীরা। সেখানে মিশন স্পেশালিস্ট ক্রিস্টিনা কোচ টয়লেটের এই সমস্যার কথা জানিয়েছিলেন। তিনি মজা করে বলেছিলেন, ‘নিজেকে এখন স্পেস প্লাম্বার বলতে আমার বেশ গর্বই হচ্ছে! আমি তো বলব, নভোযানের ভেতরে এটিই সম্ভবত সবচেয়ে গুরুত্বপূর্ণ যন্ত্র।’

৪ এপ্রিল নাসা এক সংবাদ বিজ্ঞপ্তিতে জানায়, বর্জ্য বের করার পাইপলাইনটিতে বরফ জমে আটকে গেছে। এই জট ছাড়াতে নভোচারীরা নভোযানের দিক কিছুটা পরিবর্তন করেন। তাঁরা আটকে থাকা পাইপটির মুখ সরাসরি সূর্যের দিকে ঘুরিয়ে দেন। সূর্যের তাপে বরফ গলে জট খুলে যাবে, এটাই ছিল তাঁদের উদ্দেশ্য। তবে এতে নভোযানের মূল যাত্রাপথের কোনো পরিবর্তন হয়নি। ফলে বর্জ্য রাখার ট্যাংকে কিছুটা জায়গা খালি হলেও সমস্যা পুরোপুরি মেটেনি।

নাসার পক্ষ থেকে জানিয়েছে, ‘প্রকৌশলীরা পাইপের ভেতরের বরফ গলাতে ভেন্ট হিটার ব্যবহার করছেন। সেই সঙ্গে পাইপের মুখ সূর্যের দিকেই রাখা হয়েছে।’ নাসা আরও জানায়, ‘বর্জ্যের ট্যাংক এখনো পুরোপুরি ভরেনি এবং টয়লেটটি কাজ করছে। তবে রাতের বেলা প্রয়োজনে বিকল্প পাত্র ব্যবহারের নির্দেশ দেওয়া হয়েছে।’

একইদিন সন্ধ্যায় আর্টেমিস ২ মিশন ম্যানেজমেন্ট টিমের প্রধান জন হানিকাট সাংবাদিকদের মুখোমুখি হন। মহাকাশের এই টয়লেট নিয়ে সাধারণ মানুষের বিপুল আগ্রহের বিষয়টি তিনি বেশ চমৎকারভাবে ব্যাখ্যা করেন। তিনি বলেন, ‘টয়লেটের দিকে মানুষের মনোযোগ দেওয়া খুব স্বাভাবিক প্রবৃত্তি। পৃথিবীতে এটি আমাদের জন্য কতটা গুরুত্বপূর্ণ, তা সবাই জানে। আর মহাকাশে এটি সামলানো আরও অনেক বেশি কঠিন।’

আরও পড়ুন
নাসার পক্ষ থেকে জানিয়েছে, ‘প্রকৌশলীরা পাইপের ভেতরের বরফ গলাতে ভেন্ট হিটার ব্যবহার করছেন। সেই সঙ্গে পাইপের মুখ সূর্যের দিকেই রাখা হয়েছে।’

পরেরদিন ৫ এপ্রিল সিএনএনের স্টেট অব দ্য ইউনিয়ন অনুষ্ঠানে নাসার প্রশাসক জ্যারেড আইজ্যাকম্যানও এই সমস্যার কথা স্বীকার করেন। তিনি বলেন, ‘আমরা এখন মহাকাশে অনেক অসাধারণ কাজ করতে পারি। তবে এই টয়লেট ব্যবস্থাপনার দিকটিতে আমাদের আরও অনেক কাজ করতে হবে।’

আর্টেমিস ২ এখন চাঁদের উল্টো পাশ ঘুরে আবার পৃথিবীতে ফিরে আসার পথে রয়েছে। ১৯৭২ সালের পর এই প্রথম মানুষ পৃথিবীর কক্ষপথ ছেড়ে এত দূর মহাকাশে পাড়ি জমিয়েছে। চারজনের এই দল অবশ্য চাঁদের বুকে নামবে না। তাঁরা শুধু চাঁদের চারপাশ ঘুরে আসবেন। ভবিষ্যতে চাঁদের বুকে মানুষের স্থায়ী অবতরণের পথ তৈরি করাই তাঁদের মূল লক্ষ্য। এই মিশনে নভোচারীরা ওরিয়ন ক্যাপসুল চালিয়ে দেখবেন। তাঁরা পৃথিবীর কক্ষপথে এটি নিজেরা চালিয়ে এর স্টিয়ারিং পরীক্ষা করেছেন, যাতে ভবিষ্যতের মিশনগুলোতে চাঁদের বুকে নিখুঁতভাবে নামা যায়।

লেখক: ফ্রন্টেন্ড ডেভলপার, সফটভেঞ্চ

সূত্র: বিবিসি ডটকম

আরও পড়ুন