আর্টেমিস ২ মিশন কীভাবে চিকিৎসাবিজ্ঞানকে বদলে দিতে পারে
আর্টেমিস ২ মিশন শুধু চাঁদের বুকেই যাচ্ছে না, এটি মহাকাশ চিকিৎসাবিজ্ঞানে এক যুগান্তকারী পরিবর্তনের সূচনা করতে চলেছে। মহাকাশে বিকিরণ ও শূন্য অভিকর্ষ মানুষের শরীরে কী প্রভাব ফেলে, তা জানতে এই মিশনে পাঠানো হচ্ছে অ্যাভাটার নামে একটি বিশেষ পরীক্ষা। এই প্রথম চাঁদের গভীর কক্ষপথে এমন পরীক্ষা হচ্ছে।
নাসার আর্টেমিস ২ মিশন চাঁদের দিকে এগিয়ে যাচ্ছে। এই ফ্লাইটটি ভবিষ্যতে চাঁদের বুকে এবং এর বাইরে দীর্ঘমেয়াদী মহাকাশ অভিযানের জন্য প্রয়োজনীয় অনেক গুরুত্বপূর্ণ তথ্য দেবে। কিন্তু এ ধরনের অভিযান নিরাপদে পরিচালনা করার আগে বিজ্ঞানীদের বুঝতে হবে, মহাকাশের বিকিরণ এবং মাইক্রোগ্র্যাভিটি আমাদের শরীরের ওপর ঠিক কী ধরনের প্রভাব ফেলে। আর এই কারণেই আর্টেমিস ২ মিশনের সঙ্গে প্রথমবারের মতো এক অনন্য পরীক্ষা চালানো হচ্ছে, যার নাম অ্যাভাটার। অর্থাৎ আ ভার্চুয়াল অ্যাস্ট্রোনট টিস্যু অ্যানালগ রেসপন্স।
অ্যাভাটার পরীক্ষায় অর্গান-অন-এ-চিপ ব্যবহার করা হচ্ছে। এগুলো মূলত তরলে পূর্ণ ফ্ল্যাশ ড্রাইভের মতো ছোট ছোট ডিভাইস, যার ভেতরে জীবন্ত মানবকোষ থাকে। এগুলোকে এমনভাবে তৈরি করা হয়েছে যেন এরা মানুষের বিভিন্ন অঙ্গের মতো আচরণ করতে পারে। যেহেতু একটি চিপের ওপর যেকোনো নির্দিষ্ট ব্যক্তির কোষ চাষ করা সম্ভব, তাই এগুলো ওই নির্দিষ্ট মানুষের অঙ্গের মতোই হুবহু কাজ করে। বিজ্ঞানীরা ২০১০ সাল থেকে পৃথিবীতে এই মডেলগুলো নিয়ে গবেষণা করছেন। এর মাধ্যমে মানবদেহ নিয়ে অনেক গুরুত্বপূর্ণ তথ্য জানা গেছে। যেমন নতুন কোনো ওষুধ প্রয়োগ করলে বা অতিরিক্ত চাপে শরীর কীভাবে সাড়া দেয়।
অ্যাভাটার পরীক্ষায় অর্গান-অন-এ-চিপ ব্যবহার করা হচ্ছে। এগুলো মূলত তরলে পূর্ণ ফ্ল্যাশ ড্রাইভের মতো ছোট ছোট ডিভাইস, যার ভেতরে জীবন্ত মানবকোষ থাকে।
এই অর্গান-অন-এ-চিপ প্রযুক্তি এর আগে ইন্টারন্যাশনাল স্পেস স্টেশনে সফলভাবে পরীক্ষা করা হয়েছে। তবে আর্টেমিস ২ মিশনটি তার চেয়েও অনেক দূরে মহাকাশের গভীরে যাচ্ছে। এর ফলে চাঁদের চারপাশের বিকিরণ ও শূন্য অভিকর্ষের পরিবেশ মানুষের শরীরে কী প্রভাব ফেলে, সে সম্পর্কে সম্পূর্ণ নতুন ধারণা দিতে পারে অ্যাভাটার। চূড়ান্তভাবে, এই পরীক্ষার মাধ্যমে নাসা হয়তো একদিন প্রতিটি নভোচারীর শারীরিক গঠন অনুযায়ী আলাদা ও সম্পূর্ণ ব্যক্তিগত মেডিকেল কিট তৈরি করতে সক্ষম হবে।
এই পরীক্ষাটি তদারকি করছে নাসার এমস রিসার্চ সেন্টার। সেখানকার সায়েন্স ডিরেক্টরেটের ভারপ্রাপ্ত পরিচালক অ্যান্থনি কোলাপ্রেট বলেন, ‘এটি আমাদের জন্য বিশাল এক অর্জন হতে চলেছে। বিশেষ করে সামনে যখন আমরা আরও বেশি নভোচারীকে মহাকাশে পাঠাব, তখন এটি দারুণ কাজে আসবে।’
এই অর্গান-অন-এ-চিপ প্রযুক্তির কারণে বিজ্ঞানীরা সরাসরি মানুষের আসল কোষ ব্যবহার করে বিভিন্ন ওষুধ বা ভ্যাকসিনের পরীক্ষা চালাতে পারেন। কীভাবে শরীরে রোগ ছড়ায় বা জীবাণুরা কীভাবে কাজ করে, তা এমনভাবে জানা সম্ভব হয় যা শুধু প্রাণীদের ওপর পরীক্ষা করে জানা খুব কঠিন বা প্রায় অসম্ভব। যদিও কিছু চিকিৎসার গবেষণায় এখনো প্রাণীর ওপর পরীক্ষা করা জরুরি।
হার্ভার্ড বিশ্ববিদ্যালয়ের উইস ইনস্টিটিউট ফর বায়োলজিক্যালি ইনস্পায়ার্ড ইঞ্জিনিয়ারিংইয়ের ডোনাল্ড ইংবারের ল্যাবরেটরি এক দশকেরও বেশি সময় আগে অর্গান-অন-এ-চিপ প্রথম তৈরি করেছিল।
আর্টেমিস ২ মিশনের স্পেসক্রাফট ইন্টিগ্রিটিতে থাকা এই অ্যাভাটার চিপগুলোতে মূলত এই মিশনের চার নভোচারীর নিজস্ব অস্থিমজ্জার কোষ রয়েছে। পৃথিবীতেও ঠিক একই ধরনের এক সেট চিপ রাখা হয়েছে। মহাকাশে থাকা চিপগুলো যখন পৃথিবীতে ফিরে আসবে, তখন গবেষকেরা সিঙ্গেল-সেল আরএনএ সিকোয়েন্সিংয়ের মাধ্যমে কোষের ভেতরের জিনগত পরিবর্তনগুলো মেপে দেখবেন। ফলে দূরপাল্লার মহাকাশযাত্রা শরীরে কী প্রভাব ফেলে, তা আগের চেয়ে অনেক বিস্তারিতভাবে জানা সম্ভব হবে।
হার্ভার্ড বিশ্ববিদ্যালয়ের উইস ইনস্টিটিউট ফর বায়োলজিক্যালি ইনস্পায়ার্ড ইঞ্জিনিয়ারিংইয়ের ডোনাল্ড ইংবারের ল্যাবরেটরি এক দশকেরও বেশি সময় আগে এই অর্গান-অন-এ-চিপ প্রথম তৈরি করেছিল। তিনি এখন অ্যাভাটার প্রোগ্রামে নাসার সঙ্গে কাজ করছেন। তিনি বলেন, ‘ষাটের দশকের শুরুতে নাসার মহাকাশযাত্রাগুলো দেখে আমি বড় হয়েছি। সে সময়কার মহাকাশ অভিযানের উত্তেজনা আমাকে বিজ্ঞানে আসার অনুপ্রেরণা জুগিয়েছিল। আজ নিজের তৈরি প্রযুক্তিকে মহাকাশে যেতে দেখাটা সত্যিই এক অসাধারণ অনুভূতি।’
চিপগুলোর আকার অনেক ছোট হওয়ায় ভবিষ্যতের চন্দ্রাভিযানে একই জায়গার মধ্যে বিজ্ঞানীরা আরও অনেক বেশি পরীক্ষা-নিরীক্ষা চালাতে পারবেন। এ ছাড়া ভবিষ্যতের চিকিৎসা সরঞ্জাম আজকের নভোচারীদের ব্যবহৃত কিটগুলোর চেয়ে অনেক বেশি গোছানো ও আধুনিক হবে।
অ্যান্থনি কোলাপ্রেট বলেন, ‘মহাকাশযানে ভর বা ওজন সব সময়ই একটি বড় চিন্তার বিষয়। আমরা চাইলেই সব ধরনের ওষুধ সঙ্গে করে মহাকাশে নিয়ে যেতে পারি না, কারণ আমাদের সেই বহনক্ষমতা নেই। তাই আপনার ঠিক কোন ওষুধটি দরকার, তা আগে থেকে নিখুঁতভাবে জানার এই সক্ষমতা অর্জন করা আমাদের জন্য অত্যন্ত গুরুত্বপূর্ণ।’