আর্টিমিসের ১০ দিনের চাঁদে অভিযানে মহাকাশে কী কী খাবেন নভোচারীরা
চাঁদের বুকে মানুষের ফিরে যাওয়ার ঐতিহাসিক মিশন আর্টেমিস ২। দীর্ঘ পাঁচ দশকেরও বেশি সময় পর চাঁদের উদ্দেশ্যে পাড়ি জমিয়েছেন চার নভোচারী নাসার রিড ওয়াইজম্যান, ভিক্টর গ্লোভার, ক্রিস্টিনা কোচ এবং কানাডিয়ান স্পেস এজেন্সির জেরেমি হ্যানসেন। চাঁদের পথে এই দীর্ঘ রোমাঞ্চকর যাত্রায় তাঁদের তো আর না খেয়ে থাকলে চলবে না!
কিন্তু প্রশ্ন হলো, ওরিয়ন নামে যে স্পেসক্রাফটে চড়ে তাঁরা চাঁদে যাবেন, সেখানে তো আমাদের রান্নাঘরের মতো কোনো চুলা নেই, নেই কোনো ফ্রিজও! তাহলে উপায়?
ভয় নেই, সেসব সমস্যার সমাধানও করেছে মার্কিন মহাকাশ গবেষণা সংস্থা নাসা। কয়েক সপ্তাহ নিরাপদে সংরক্ষণ করা যায় এবং প্রস্তুত করা যায় খুব দ্রুত, এমন খাবারই নভোচারীদের সঙ্গে দেওয়া হচ্ছে। নাসার বিজ্ঞানীরা জানিয়েছেন, মহাকাশ-খাদ্য বিশেষজ্ঞদের সঙ্গে নিয়ে নভোচারীদের ব্যক্তিগত পছন্দের কথা মাথায় রেখেই এই মেনু সাজানো হয়েছে। সেই সঙ্গে ক্যালরি, শরীরে পানির পরিমাণ এবং পুষ্টির দিকেও রাখা হয়েছে কড়া নজর।
দীর্ঘ পাঁচ দশকেরও বেশি সময় পর চাঁদের উদ্দেশ্যে পাড়ি জমিয়েছেন চার নভোচারী নাসার রিড ওয়াইজম্যান, ভিক্টর গ্লোভার, ক্রিস্টিনা কোচ এবং কানাডিয়ান স্পেস এজেন্সির জেরেমি হ্যানসেন।
মহাকাশে রান্নাবান্না ও খাবার গরম করার জাদুকরী বাক্স!
নিশ্চয়ই ভাবছেন, মহাকাশে খাবার তৈরি করা কি খুব সহজ? একদমই না! তাই সেখানে এমন সব খাবার নিতে হয়, যা খাওয়ার সময় কোনো উচ্ছিষ্ট তৈরি হবে না। কারণ মহাকাশের মাইক্রোগ্র্যাভিটিতে খাবারের ছোট গুঁড়ো ভাসতে ভাসতে কোনো যন্ত্রের ভেতরে ঢুকে গেলে ঘটতে পারে বিশাল বিপত্তি!
তাই ওরিয়ন স্পেসক্রাফটের ভেতরে আছে একটি চমৎকার পানির ডিসপেন্সার। এটি ব্যবহার করে নভোচারীরা শুকনো খাবারের ভেতর পানি মিশিয়ে সেগুলোকে খাওয়ার উপযোগী করে তোলেন। আর খাবার গরম করার জন্য তাঁদের কাছে রয়েছে ব্রিফকেসের মতো দেখতে দারুণ একটি ওভেন!
চাঁদের চারপাশ ঘুরে আসার এই মিশনে নভোচারীদের কাজের কোনো শেষ নেই। তবে এত শত ব্যস্ততার মাঝেও সকালের নাশতা, দুপুরের খাবার এবং রাতের খাবারের জন্য তাঁদের আলাদা সময় বরাদ্দ থাকবে। খাবারের পাশাপাশি তাঁরা দিনে অন্তত দুটি ফ্লেভারযুক্ত পানীয় পান করতে পারবেন। এমনকি যাঁদের কফির অভ্যাস আছে, তাঁদের জন্য কফির ব্যবস্থাও থাকছে!
ওরিয়ন স্পেসক্রাফটের ভেতরে আছে একটি চমৎকার পানির ডিসপেন্সার। এটি ব্যবহার করে নভোচারীরা শুকনো খাবারের ভেতর পানি মিশিয়ে সেগুলোকে খাওয়ার উপযোগী করে তোলেন।
ইন্টারন্যাশনাল স্পেস স্টেশন ও আর্টেমিস ২ মিশনে খাবারের পার্থক্য
১৯৭২ সালে অ্যাপোলো মিশনের পর মহাকাশের খাবারদাবারে অনেক উন্নতি হয়েছে। স্পেস শাটল প্রোগ্রাম এবং ইন্টারন্যাশনাল স্পেস স্টেশনে এখন অনেক ধরনের খাবার পাওয়া যায়। কিন্তু আর্টেমিস ২ মিশনের নভোচারীরা স্পেস স্টেশনের মতো রাজকীয় মেনুর আশা করতে পারছেন না!
কারণ স্পেস স্টেশন পৃথিবীর খুব কাছে থাকে। ফলে সেখানে ফ্রিজের সুবিধা আছে এবং কার্গো শিপের মাধ্যমে পৃথিবী থেকে সহজেই তাজা ফলমূল বা শাকসবজি পাঠানো যায়।
কিন্তু চাঁদের পথে এই গভীর মহাকাশে আর্টেমিস ২ মিশনে নতুন করে খাবার দিয়ে আসার জন্য কোনো ডেলিভারি শিপ নেই!
তাই এই মিশনের মেনু আগে থেকেই সম্পূর্ণ নির্দিষ্ট করা। তবে ওড়ার আগে পৃথিবীতে বসে নভোচারীরা এই মেনুর সব খাবার চেখে দেখার এবং রেটিং দেওয়ার সুযোগ পেয়েছেন।
স্পেস স্টেশন পৃথিবীর খুব কাছে থাকে। ফলে সেখানে ফ্রিজের সুবিধা আছে এবং কার্গো শিপের মাধ্যমে পৃথিবী থেকে সহজেই তাজা ফলমূল বা শাকসবজি পাঠানো যায়।
মহাকাশের মেনুতে কী থাকছে
এই মিশনে নভোচারীদের জন্য ১৮৯টি ভিন্ন ধরনের খাবার ও পানীয় থাকছে! এর মধ্যে ১০ ধরনের পানীয়, ৫ রকমের হট সস এবং পাউরুটির বদলে থাকছে ৫৮টি টরটিলা। টরটিলা মেক্সিকোর একটি ঐতিহ্যবাহী পাতলা ও চ্যাপ্টা রুটি। আমাদের দেশের আটা বা ময়দার রুটির সঙ্গে এর অনেক মিল থাকলেও এটি সাধারণত আরও বেশি পাতলা ও নমনীয়। সাধারণত ভুট্টা বা গমের আটা দিয়ে এই খাবারটি তৈরি করা হয়। সাধারণ পাউরুটি বা বিস্কুট খেলে প্রচুর গুঁড়ো পড়ে। মহাকাশে এই গুঁড়ো যন্ত্রপাতির ভেতরে ঢুকে বিপদ ঘটাতে পারে। কিন্তু টরটিলা ছিঁড়লে কোনো গুঁড়ো পড়ে না, তাই নভোচারীদের খাবারে পাউরুটির বিকল্প হিসেবে এটি অত্যন্ত জনপ্রিয়। পাশাপাশি মিষ্টিমুখ করার জন্য রাখা হয়েছে পুডিং, কেক, চকলেট এবং কুকিজেরও দারুণ সব ব্যবস্থা।
তবে মিশন চলাকালীন সব সময় চাইলেই সব খাবার খাওয়া যাবে না। বিশেষ করে রকেট উৎক্ষেপণ বা পৃথিবীতে ফিরে আসার সময় যখন স্পেসক্রাফট প্রচণ্ড ঝাঁকুনির মধ্যে থাকে, তখন ওই পানির ডিসপেন্সার ব্যবহার করা যায় না। তাই ওই সময়গুলোর জন্য নভোচারীদের এমন খাবার দেওয়া হয়, যা প্যাকেট খুলেই সরাসরি খেয়ে ফেলা যায়।
মহাকাশে খাওয়ার এই অভিজ্ঞতাকে ক্যাম্পিংয়ের সঙ্গে তুলনা করা যেতে পারে। খুব সাধারণ উপাদান, কোনো রকম ঝামেলা ছাড়া তৈরি করা এবং একসঙ্গে বসে খাওয়া দারুণ এক ব্যাপার! ক্রিস্টিনা কোচ নিজে এই খাবারের বৈচিত্র্য নিয়ে বেশ মুগ্ধ। আর জেরেমি হ্যানসেন মনে করেন, বন্ধুদের সঙ্গে মহাকাশে এক টেবিলে বসে খাবার খাওয়ার এই সময়টা তাঁদের সম্পর্ককে আরও গভীর করে তুলবে।
সাধারণ পাউরুটি বা বিস্কুট খেলে প্রচুর গুঁড়ো পড়ে। মহাকাশে এই গুঁড়ো যন্ত্রপাতির ভেতরে ঢুকে বিপদ ঘটাতে পারে। কিন্তু টরটিলা ছিঁড়লে কোনো গুঁড়ো পড়ে না, তাই নভোচারীদের কাছে এটি বেশ জনপ্রিয়।
মোট মেনু আইটেম: ১৮৯টি
১০ ধরনের বেশি পানীয়
কফি
গ্রিন টি
আম ও পিচ ফলের স্মুদি
চকলেট জুস
ভ্যানিলা জুস
লেবুর শরবত
অ্যাপল সাইডার
আনারসের জুস
কোকোয়া
স্ট্রবেরি জুস
সাধারণ খাবারের পদ
টরটিলা
গমের পাতলা রুটি
ভেজিটেবল কিশ
সকালের নাশতার সসেজ
বাদামসহ কুসকুস
আমের সালাদ
ব্লুবেরিসহ গ্রানোলা
কাঠবাদাম
কাজুবাদাম
গরুর বারবিকিউ
ব্রকলি ও গ্রাটিন
মসলাদার সবুজ বরবটি
ম্যাকরনি অ্যান্ড চিজ
গ্রীষ্মমণ্ডলীয় ফলের সালাদ
মিষ্টিকুমড়া
ফুলকপি
স্বাদ বাড়ানোর উপাদান
ম্যাপল সিরাপ
চকলেট স্প্রেড
পিনাট বাটার
হট সস
সরিষা
স্ট্রবেরি জ্যাম
মধু
দারুচিনি
কাঠবাদামের মাখন
মিষ্টিজাতীয় খাবার
পুডিং
ফলের ডেজার্ট
মিষ্টি আবরণে জড়ানো কাঠবাদাম
কেক
চকলেট
কুকিজ
আরও যা থাকছে
পাঁচ ধরনের হট সসের ব্যবস্থা
মোট ৪৩ কাপ কফির ব্যবস্থা
৫টি কানাডিয়ান পণ্য
৫৮টি টরটিলা
