১০ দিনের মিশনে কোন দিন কী করবেন নভোচারীরা

নাসার ওরিয়ন স্পেসক্রাফটের কাল্পনিক ছবিছবি: নাসা

প্রায় ৫৪ বছর পর মানুষ আবার চাঁদের পানে ছুটছে! নাসার ঐতিহাসিক আর্টেমিস ২ মিশনে চারজন নভোচারী ওরিয়ন স্পেসক্রাফটে চড়ে যাচ্ছেন ১০ দিনের এক শ্বাসরুদ্ধকর যাত্রায়। সে মিশন ইতিমধ্যে শুরু হয়ে গেছে। বাংলাদেশ সময় ২ এপ্রিল যুক্তরাষ্ট্র থেকে সফলভাবে উৎক্ষেপণ করা হয়েছে আর্টেমিস ২ মিশন।

কিন্তু এই ১০ দিন মহাকাশে তাঁরা কী করবেন? শুধুই কি জানালার বাইরে তাকিয়ে চাঁদের সৌন্দর্য দেখবেন? মোটেই নয়! চাঁদের একদম কাছ ঘেঁষে উড়ে যাওয়ার সেই মাহেন্দ্রক্ষণটি স্থায়ী হবে মাত্র তিন ঘণ্টা। আর বাকি সময়ে বিজ্ঞান গবেষণা, মহাকাশযানের পরীক্ষা, ডাক্তারি চেকআপ ও টিকে থাকার লড়াইয়ের মহড়ায় কাটবে নভোচারীদের। এই ১০ দিনের প্রতিটি মিনিট একদম নিখুঁতভাবে রুটিন করা আছে। চলুন, দেখে নিই এই ঐতিহাসিক মিশনের প্রথম তিন দিনে নভোচারীরা কী কী করলেন এবং বাকি দিনগুলোতে আর কী করবেন!

আরও পড়ুন
দ্বিতীয় দিনের মূল আকর্ষণ ছিল ঘুম থেকে ওঠার ছয় ঘণ্টা পর। এ সময় ওরিয়নের ইঞ্জিন টানা ৩০ মিনিটের জন্য জ্বলে উঠছিল! বিজ্ঞানের ভাষায় একে বলে ট্রান্সলুনার ইনজেকশন।

প্রথম দিন: মহাকাশে প্রথম টেস্ট ড্রাইভ

যেকোনো মিশনের সবচেয়ে ভয়ংকর এবং রোমাঞ্চকর সময় হলো প্রথম আট মিনিট। নাসার দানবীয় এসএলএস রকেটে চড়ে তীব্র গতিতে মহাকাশে পৌঁছেছেন ক্রুরা। মহাকাশে যাওয়ার পর ওরিয়ন স্পেসক্রাফটটি রকেটের ওপরের অংশ আইসিপিএসের সঙ্গে যুক্ত ছিল। কিছুক্ষণ পর ক্রুরা আইসিপিএস থেকে বিচ্ছিন্ন হয়ে যান। এরপর শুরু হয় প্রক্সিমিটি অপারেশনস পরীক্ষা। নভোচারীরা ওরিয়নকে চালিয়ে বাতিল হয়ে যাওয়া ওই আইসিপিএসের চারপাশে ঘোরান। ভবিষ্যতে চাঁদে নামার ল্যান্ডারের সঙ্গে মহাকাশে কীভাবে নিখুঁতভাবে যুক্ত হতে হবে, এটি মূলত তারই একটা মহড়া। এরপর স্পেসস্যুট খুলে আরামদায়ক পোশাক পরে প্রথম দিনের মতো ঘুমাতে যান তাঁরা।

দ্বিতীয় দিন: মহাকাশে জিম এবং চাঁদের পথে আসল ধাক্কা

স্পেস স্টেশনে দীর্ঘদিন মানুষের থাকার অভিজ্ঞতায় বিজ্ঞানীরা দেখেছেন, শূন্য অভিকর্ষে মানুষের শরীর দ্রুত দুর্বল হয়ে পড়ে। তাই দ্বিতীয় দিনের শুরুতেই ক্রুরা ওরিয়নের ভেতরের ফ্লাইহুইল এক্সারসাইজ মেশিনে ঘাম ঝরিয়েছেন। তবে দিনের মূল আকর্ষণ ছিল ঘুম থেকে ওঠার ছয় ঘণ্টা পর। এ সময় ওরিয়নের ইঞ্জিন টানা ৩০ মিনিটের জন্য জ্বলে উঠছিল! বিজ্ঞানের ভাষায় একে বলে ট্রান্সলুনার ইনজেকশন। এই ধাক্কাটিই ওরিয়নকে পৃথিবীর মায়া কাটিয়ে চাঁদের দিকে ছুড়ে দিয়েছে। এটি এমন এক জাদুকরী পথ তৈরি করেছে, যার ফলে নভোযানটি চাঁদের উল্টো পাশ ঘুরে কোনো অতিরিক্ত জ্বালানি ছাড়াই বুমেরাংয়ের মতো পৃথিবীতে ফিরে আসতে পারবে।

আরও পড়ুন
মহাকাশে যাওয়ার পর ওরিয়ন স্পেসক্রাফটটি রকেটের ওপরের অংশ আইসিপিএসের সঙ্গে যুক্ত ছিল। কিছুক্ষণ পর ক্রুরা আইসিপিএস থেকে বিচ্ছিন্ন হয়ে যান।

তৃতীয় দিন: জিরো গ্র্যাভিটিতে কাজের মহড়া

চাঁদের দিকে ক্রমশ এগিয়ে যেতে থাকা নভোচারীরা এই দিনটি কাটিয়েছেন চাঁদের কাছাকাছি যাওয়ার পর ঠিক কী কী করবেন, তার রিহার্সাল করে। পৃথিবীতে তাঁরা হাজারবার এই কাজগুলো প্র্যাকটিস করেছেন ঠিকই, কিন্তু শূন্য অভিকর্ষে ভেসে ভেসে কাজ করার অভিজ্ঞতা তো সম্পূর্ণ আলাদা! এ ছাড়া কোনো ইমার্জেন্সিতে কীভাবে সিপিআর দিতে হবে, তারও কিছু সেফটি ডেমো করেছেন তাঁরা। এদিন জেরেমি হ্যানসেন স্পেসক্রাফটের পথ ঠিক রাখার জন্য ছোট একটি ইঞ্জিন ফায়ার করেছেন।

চতুর্থ দিন: পৃথিবীর দিকে ফিরে তাকানো

মিশনের এই পর্যায়ে ওরিয়নের ইঞ্জিন ব্যবহার করে দ্বিতীয়বারের মতো পথ সংশোধনের কাজ করা হবে। এদিন মিশন কন্ট্রোলের সঙ্গে যোগাযোগ ও মিডিয়ার সঙ্গে কথা বলেই বেশি সময় কাটবে। তবে ক্রুরা এদিন ২০ মিনিট সময় আলাদা করে রেখেছেন শুধু ছবি তোলার জন্য! পৃথিবী এবং চাঁদের ঠিক মাঝামাঝি অবস্থান থেকে এই দুই মহাজাগতিক বস্তুর অবিশ্বাস্য সুন্দর কিছু ছবি তুলবেন তাঁরা।

পঞ্চম দিন: চাঁদের রাজত্বে প্রবেশ

এদিন এক ইতিহাস তৈরি হবে। এই দিনটিতে পৃথিবীর চেয়ে চাঁদের মাধ্যাকর্ষণ বল ওরিয়নের ওপর বেশি শক্তিশালী হয়ে উঠবে। ১৯৭২ সালের পর এই প্রথম মানুষ চাঁদের নিজস্ব রাজত্বে প্রবেশ করবে!

এদিন ক্রুরা তাঁদের সেই বিখ্যাত কমলা রঙের স্পেসস্যুট পরবেন। জরুরি অবস্থায় কেবিনের চাপ কমে গেলে এই স্যুটগুলো কীভাবে দ্রুত পরতে হয় এবং প্রেশারাইজ করতে হয়, তা চেক করে দেখবেন তাঁরা। এই স্যুটগুলোর ভেতরে খাবার, পানি ও বর্জ্য ব্যবস্থাপনার টিউব থাকে। যেকোনো বিপদে নভোচারীদের টানা ছয় দিন পর্যন্ত বাঁচিয়ে রাখতে পারে এই স্যুটগুলো!

আরও পড়ুন
পঞ্চম দিনটিতে পৃথিবীর চেয়ে চাঁদের মাধ্যাকর্ষণ বল ওরিয়নের ওপর বেশি শক্তিশালী হয়ে উঠবে। ১৯৭২ সালের পর এই প্রথম মানুষ চাঁদের নিজস্ব রাজত্বে প্রবেশ করবে!

ষষ্ঠ দিন: বহুল প্রতীক্ষিত লুনার ফ্লাইবাই

যে দিনের জন্য এত অপেক্ষা! এদিন ওরিয়ন চাঁদের পৃষ্ঠ থেকে মাত্র ৬ হাজার ৪৪০ থেকে ৯ হাজার ৬৫০ কিলোমিটার ওপর দিয়ে উড়ে যাবে। জানালার বাইরে তাকালে নভোচারীদের কাছে চাঁদকে মনে হবে ঠিক এক হাত দূরে রাখা একটি বাস্কেটবলের মতো! চাঁদের উল্টো পাশ ঘুরে আসতে প্রায় সারা দিন লেগে যাবে। এই সময়ে ক্রুরা টানা তিন ঘণ্টা ধরে অসংখ্য ছবি তুলবেন এবং ভূতাত্ত্বিক তথ্য সংগ্রহ করবেন। এদিন তাঁরা পৃথিবী থেকে এতই দূরে চলে যাবেন, যা ইতিহাসে আর কোনো মানুষ কখনো যায়নি!

সপ্তম দিন: বিদায় চাঁদ, হ্যালো স্পেস স্টেশন

চাঁদের রাজত্ব থেকে বেরিয়ে পৃথিবীর দিকে ফেরার পালা। দিনের প্রথম ভাগে তাঁরা পৃথিবীতে বিজ্ঞানীদের কাছে অসংখ্য ডেটা পাঠাবেন। এদিন দুপুরে ঘটবে মহাকাশযাত্রার ইতিহাসে প্রথম এক চমৎকার ঘটনা। গভীর মহাকাশে থাকা এই নভোচারীরা পৃথিবীর নিম্ন কক্ষপথে থাকা ইন্টারন্যাশনাল স্পেস স্টেশনের ক্রুদের সঙ্গে সরাসরি অডিও কলে কথা বলবেন! এরপর পৃথিবীতে নিখুঁতভাবে নামার জন্য তাঁরা প্রথম রিটার্ন ট্রাজেক্টরি কারেকশন বার্ন করবেন। দিনের বাকি সময়টা তাঁদের বিশ্রামের জন্য বরাদ্দ।

অষ্টম দিন: সৌরঝড় থেকে বাঁচার লড়াই

গভীর মহাকাশে সবচেয়ে বড় শত্রু হলো বিকিরণ। হঠাৎ কোনো সৌরঝড় আঘাত হানলে কীভাবে বাঁচবেন তাঁরা? এদিন তাঁরা ওরিয়নের ভেতরের পানির ট্যাংক ও স্পেসক্রাফটের হিটশিল্ডকে কাজে লাগিয়ে তেজস্ক্রিয়তা থেকে বাঁচার জন্য একটি অস্থায়ী রেডিয়েশন শেল্টার বা আশ্রয়কেন্দ্র বানানোর প্র্যাকটিস করবেন। বিকেলে তাঁরা ওরিয়নকে ঘুরিয়ে এর অ্যাটিচ্যুড কন্ট্রোল ঘোরানোর ক্ষমতা পরীক্ষা করবেন।

আরও পড়ুন
সপ্তম দিনে দুপুরে গভীর মহাকাশে থাকা নভোচারীরা পৃথিবীর নিম্ন কক্ষপথে থাকা ইন্টারন্যাশনাল স্পেস স্টেশনের ক্রুদের সঙ্গে সরাসরি অডিও কলে কথা বলবেন!

নবম দিন: বাড়ি ফেরার প্রস্তুতি

মহাকাশে এটিই তাঁদের শেষ পুরো দিন। এদিন তাঁরা আরও কিছু প্রযুক্তিগত পরীক্ষা এবং পথ সংশোধনের ছোট একটি ইঞ্জিন বার্ন করবেন। পৃথিবীতে ফেরার পর অভিকর্ষের কারণে শরীরে যে ধকল যায়, তা সামলাতে এদিন তাঁরা একধরনের বিশেষ কম্প্রেশন পোশাক পরে দেখবেন। দিনের শেষে সবকিছু শক্ত করে বেঁধে পরদিনের ল্যান্ডিংয়ের জন্য প্রস্তুত হবেন ক্রুরা।

দশম দিন: অগ্নিপরীক্ষা এবং প্রশান্ত মহাসাগরে ল্যান্ডিং

শেষবারের মতো ইঞ্জিন জ্বালিয়ে পৃথিবীর বায়ুমণ্ডলের দিকে ছুটে আসবে ওরিয়ন। নভোচারীরা স্পেসস্যুট পরে সিটে শক্ত হয়ে বসবেন। পৃথিবীতে ঢোকার ঠিক আগে ওরিয়নের সার্ভিস মডিউলটি খসে পড়বে এবং ক্যাপসুলের হিটশিল্ডটি বায়ুমণ্ডলের দিকে ঘুরে যাবে। বায়ুমণ্ডলের সঙ্গে প্রচণ্ড ঘর্ষণের ফলে বাইরে প্রায় ৩ হাজার ডিগ্রি ফারেনহাইট (১ হাজার ৬৫০ ডিগ্রি সেলসিয়াস) তাপমাত্রার এক নরককুণ্ড তৈরি হবে!

কিন্তু ভেতরে নভোচারীরা থাকবেন একদম সুরক্ষিত। নামার শেষ কয়েক মিনিটে তিনটি বিশাল প্যারাসুট খুলে যাবে এবং ওরিয়নের গতি কমিয়ে মাত্র ২৭ কিলোমিটার প্রতি ঘণ্টায় নিয়ে আসবে। অবশেষে যুক্তরাষ্ট্রের সান ফ্রান্সিসকো উপকূলের কাছে প্রশান্ত মহাসাগরের বুকে আছড়ে পড়বে ওরিয়ন। মার্কিন নৌবাহিনীর জাহাজ গিয়ে উদ্ধার করবে এই ইতিহাসজয়ী বীরদের!

সূত্র: স্পেস ডটকম

আরও পড়ুন