গ্রহটাই যদি চুরি হয়ে যায়, তাহলে চাঁদের কী হবে

নতুন সিমুলেশন বলছে, কোনো ধাবমান নক্ষত্র বৃহস্পতিকে সৌরজগৎ থেকে ছিটকে দিলে তার চারটি বৃহৎ চাঁদ—আইও, ইউরোপা, গ্যানিমিড ও ক্যালিস্টো—বৃহস্পতির সঙ্গেই চলে যাবেছবি: নাসা

মিল্কিওয়ে গ্যালাক্সিতে এমন অসংখ্য ভবঘুরে গ্রহ আছে, যারা কোনো নির্দিষ্ট নক্ষত্রকে কেন্দ্র করে ঘোরে না। বিজ্ঞানের ভাষায় এদের বলা হয় রোগ প্ল্যানেট। এরাও কোনো একসময় সাধারণ নক্ষত্রজগতেরই অংশ ছিল। কিন্তু অন্য কোনো গ্রহের ধাক্কায় বা খুব কাছ দিয়ে উড়ে যাওয়া কোনো নক্ষত্রের মহাকর্ষীয় টানে এরা নিজেদের চেনা সৌরজগৎ থেকে চিরতরে ছিটকে মহাকাশের অসীম অন্ধকারে হারিয়ে যায়।

গ্রহের এই করুণ পরিণতির কথা আমরা অনেক আগে থেকেই জানি। কিন্তু একটি গ্রহ যখন নিজের জগৎ থেকে ছিটকে যায়, তখন তার সঙ্গে থাকা উপগ্রহ বা চাঁদগুলোর কী পরিণতি হয়? নিজের নক্ষত্রজগৎ থেকে এভাবে ছিটকে পড়ার ঘটনাটি চরম ধ্বংসাত্মক। সাধারণ হিসেবে মনে হতে পারে, এই মহাজাগতিক ধাক্কায় সবার আগে বুঝি চাঁদগুলোই গ্রহের মায়া কাটিয়ে মহাকাশে হারিয়ে যায়।

কিন্তু নেদারল্যান্ডসের লিডেন অবজারভেটরির দুই গবেষক ইয়ানিক বাদু এবং সাইমন পোর্টেগিস জওয়ার্ট সম্প্রতি বিষয়টি নিয়ে বিস্তারিত গবেষণা করেছেন। তারা সুপার কম্পিউটারের মাধ্যমে প্রায় ৩৪ হাজার নাক্ষত্রিক সংঘর্ষের সিমুলেশন তৈরি করেন। একটি নাক্ষত্রিক জগতের পাশ দিয়ে অন্য একটি নক্ষত্র যেকোনো দূরত্ব থেকে ছুটে গেলে গ্রহ ও চাঁদের ভাগ্যে ঠিক কী ঘটে, তা তারা শেষ মুহূর্ত পর্যন্ত বিশ্লেষণ করেছেন।

আরও পড়ুন
গবেষকেরা দেখেছেন, চাঁদ যদি এই হিল ব্যাসার্ধের বা শিকলের দৈর্ঘ্যের ৪০ শতাংশের ভেতর থাকে, তবে গ্রহটি ছিটকে যাওয়ার সময় চাঁদটিও নিরাপদে তার সঙ্গে চলে যায়।

এই পুরো গবেষণার রহস্য লুকিয়ে আছে ‘হিল ব্যাসার্ধ’ নামে একটি অদৃশ্য সীমানার ভেতর। সহজ ভাষায়, প্রতিটি গ্রহের চারপাশে এমন একটি নির্দিষ্ট এলাকা থাকে, যেখানে গ্রহটির নিজস্ব মহাকর্ষ বল তার নক্ষত্রের মহাকর্ষ বলের চেয়ে বেশি শক্তিশালী হয়। একটি চাঁদকে টিকে থাকতে হলে অবশ্যই এই সীমানার ভেতর থাকতে হবে। একে আপনি পশুর গলার শিকলের সঙ্গে তুলনা করতে পারেন। চাঁদটি সেই শিকলের ঠিক কতটা দূরে আছে, তার ওপর ভিত্তি করেই তার ভাগ্য নির্ধারিত হয়। গবেষকেরা দেখেছেন, চাঁদ যদি এই ব্যাসার্ধের বা শিকলের দৈর্ঘ্যের ৪০ শতাংশের ভেতর থাকে, তবে গ্রহটি ছিটকে যাওয়ার সময় চাঁদটিও নিরাপদে তার সঙ্গে চলে যায়। কিন্তু দূরত্ব যদি অর্ধেক বা ৫০ শতাংশ পার হয়ে যায়, তাহলে আর কোনো আশা নেই। ছিটকে পড়ার মাঝপথেই গ্রহ ও চাঁদ একে অপরের কাছ থেকে আলাদা হয়ে যায়।

নতুন গবেষণা বলছে, বিপথগামী গ্রহগুলো অনেক সময় একা নয়, তাদের সঙ্গে উপগ্রহও থাকে
ছবি: নাসা

আমাদের সৌরজগতের উপগ্রহগুলোর জন্য এটি দারুণ সুখবর। যেমন, বৃহস্পতির উপগ্রহ আইও। এটি বৃহস্পতির হিল ব্যাসার্ধের এক-শতাংশের চেয়েও অনেক কম দূরত্বে ঘুরছে। বিজ্ঞানীদের সিমুলেশন বলছে, আজ যদি পাশ দিয়ে ছুটে যাওয়া কোনো নক্ষত্রের টানে বৃহস্পতি আমাদের সৌরজগৎ থেকে ছিটকেও যায়, তবুও আইও, ইউরোপা, গ্যানিমিড এবং ক্যালিস্টোর মতো চাঁদগুলো বৃহস্পতির সঙ্গেই নিরাপদে মহাকাশে পাড়ি জমাবে।

আরও পড়ুন
MOA-2011-BLG-262L নামে মহাজাগতিক বস্তুটি যদি সত্যিই একটি গ্রহ হয়ে থাকে, তবে বিজ্ঞানীদের হিসাব বলছে; জন্মের সময় এটি তার নক্ষত্র থেকে ৫.২ অ্যাস্ট্রোনমিক্যাল ইউনিট দূরত্বে ছিল।

এই গবেষণার সবচেয়ে চমৎকার দিকটি হলো, চাঁদের কক্ষপথের ধরন দেখে এর অতীত ইতিহাস বলে দেওয়া সম্ভব। যে চাঁদগুলো গ্রহের খুব কাছাকাছি থেকে এই মহাজাগতিক ধাক্কা সামলে নেয়, তাদের কক্ষপথ ছিটকে যাওয়ার পরও সুন্দর ও প্রায় বৃত্তাকার থাকে। কিন্তু যেগুলো ছিটকে পড়ার সময় সীমানার একেবারে শেষ প্রান্তে থাকে, বিপদের ধাক্কায় তাদের কক্ষপথ এলোমেলো, প্রসারিত ও বাঁকা হয়ে যায়। অন্য কোনো গ্রহের ধাক্কায় ছিটকে পড়লে এই কক্ষপথে আরও বেশি পরিবর্তন দেখা যায়। ছিটকে পড়ার ঘটনাগুলোর প্রায় ৯০ ভাগ ক্ষেত্রেই গ্রহ ও চাঁদের মধ্যকার দূরত্ব খুব একটা বদলায় না। তাই কোনো ভবঘুরে চাঁদের বর্তমান কক্ষপথ দেখেই বিজ্ঞানীরা গোয়েন্দাদের মতো বের করে ফেলতে পারেন, অতীতে ঠিক কী ঘটেছিল।

গবেষক দল বাস্তবেও এমন একটি গ্রহের ওপর তাদের এই সূত্র প্রয়োগ করেছেন। মাইক্রোলেন্সিং পদ্ধতিতে শনাক্ত হওয়া MOA-2011-BLG-262L নামে একটি মহাজাগতিক বস্তু হয়তো এমন একটি ভবঘুরে গ্রহ, যার পৃথিবীর চেয়েও কম ভরের একটি নিজস্ব চাঁদ আছে। যদিও ডেটা অনুযায়ী অন্য সম্ভাবনাও রয়েছে। কিন্তু এটি যদি সত্যিই একটি গ্রহ হয়ে থাকে, তবে বিজ্ঞানীদের হিসাব বলছে; জন্মের সময় এটি তার নক্ষত্র থেকে ৫.২ অ্যাস্ট্রোনমিক্যাল ইউনিট দূরত্বে ছিল। মজার ব্যাপার হলো, সূর্য থেকে বৃহস্পতির দূরত্বও প্রায় ৫.২ অ্যাস্ট্রোনমিক্যাল ইউনিট!

আরও পড়ুন
মাইক্রোলেন্সিং পদ্ধতিতে শনাক্ত হওয়া MOA-2011-BLG-262L নামে একটি মহাজাগতিক বস্তু হয়তো এমন একটি ভবঘুরে গ্রহ, যার পৃথিবীর চেয়েও কম ভরের একটি নিজস্ব চাঁদ আছে।

এই আবিষ্কারের সঙ্গে দারুণ রোমাঞ্চকর একটি ব্যাপার জড়িয়ে আছে। নক্ষত্রহীন মহাকাশে ছিটকে পড়া গ্রহের নিজস্ব কোনো সূর্য থাকে না। তাই সেখানে থাকে ঘুটঘুটে অন্ধকার ও হাড়কাঁপানো ঠান্ডা। কিন্তু গ্রহের মহাকর্ষীয় টানের কারণে চাঁদের ভেতরের অংশ সংকুচিত ও প্রসারিত হয়।

বৃহস্পতির উপগ্রহ ইউরোপা ঠিক এমন একটি জগত, যার বরফের স্তরের নিচে তরল পানির এক বিশাল মহাসাগর লুকিয়ে আছে
ছবি: নাসা

ফলে সেখানে ভেতর থেকেই প্রচণ্ড তাপ উৎপন্ন হয়। এর জন্য কোনো সূর্যের আলোর দরকার পড়ে না। বৃহস্পতির উপগ্রহ ইউরোপা ঠিক এমন একটি জগত, যার বরফের স্তরের নিচে তরল পানির এক বিশাল মহাসাগর লুকিয়ে আছে। এখন পুরো গ্রহ আর চাঁদটিকে যদি সৌরজগৎ থেকে বের করেও দেওয়া হয়, তবুও এই মহাকর্ষীয় টানের খেলা চলতে থাকবে।

লেখক: সহকারী শিক্ষক, গণিত বিভাগ, গাভা হাই স্কুল, বরিশাল

সূত্র: ইউনিভার্স টুডে

আরও পড়ুন