একটি গ্রহ কত দিন বেঁচে থাকে
মহাকাশে একটি গ্রহের জীবন মোটেও সহজ নয়। মানুষের মতো গ্রহদেরও জীবনের বিভিন্ন পর্যায় থাকে। প্রথমে এদের জন্ম হয়, এরপর কোটি কোটি বছর ধরে এগুলো নানা পরিবর্তনের মধ্য দিয়ে যায়। সবশেষে একসময় এদের মৃত্যু ঘটে। তবে সব গ্রহের আয়ু কিন্তু সমান নয়। আমাদের পৃথিবীর মতো গ্রহ এবং ছোট কোনো নক্ষত্রকে কেন্দ্র করে ঘোরা গ্রহদের জীবনের সময়সীমার মধ্যে রয়েছে আকাশ-পাতাল পার্থক্য। তাহলে মনে প্রশ্ন জাগতেই পারে, মহাকাশের বেশির ভাগ গ্রহ আসলে কত দিন টিকে থাকে?
গ্রহের আয়ু বুঝতে হলে আমাদের প্রথমেই জানতে হবে এদের জন্ম হয় কীভাবে। ফ্রান্সের বোর্দো বিশ্ববিদ্যালয়ের জ্যোতির্পদার্থবিদ শন রেমন্ড বিষয়টি নিয়ে গবেষণা করছেন। তিনি জানান, গ্রহের জন্মকাহিনি বেশ রোমাঞ্চকর। মহাকাশে তরুণ নক্ষত্রদের চারদিকে ধূলিকণার বিশাল এক চাদর বা ডিস্ক থাকে। খুব ক্ষুদ্র ধূলিকণা হিসেবেই একটি গ্রহের পথচলা শুরু হয়। এরপর কোটি কোটি বছর ধরে এই কণাগুলো একে অপরের সঙ্গে ধাক্কা খেতে খেতে বিশাল আকৃতি ধারণ করে।
বৃহস্পতি বা শনির মতো বিশাল গ্যাসীয় দানবগুলো শুরুতে ছিল পাথর আর বরফের বিশাল একটি পিণ্ড। এরপর এরা নক্ষত্রের চারদিকের সেই ডিস্ক থেকে প্রচুর পরিমাণে গ্যাস টেনে নিয়ে আজকের এই দানবীয় রূপ পেয়েছে। আমাদের পৃথিবীর মতো পাথুরে গ্রহগুলোও এই প্রক্রিয়ার ভেতর দিয়ে গেছে। যখন নক্ষত্রের চারপাশ থেকে গ্যাস উবে যায়, তখন বড় বড় গ্রহের সঙ্গে ছোট ছোট পাথুরে বস্তুর প্রচণ্ড সংঘর্ষের মাধ্যমে তৈরি হয় পৃথিবীর মতো গ্রহ। তবে গ্রহ ঠিক কীভাবে তৈরি হয়েছে, তা নিয়ে বিজ্ঞানীদের মধ্যে এখনো বেশ বিতর্ক চলছে।
শন রেমন্ড জানান, গ্রহের জন্মকাহিনি বেশ রোমাঞ্চকর। মহাকাশে তরুণ নক্ষত্রদের চারদিকে ধূলিকণার বিশাল এক চাদর বা ডিস্ক থাকে। খুব ক্ষুদ্র ধূলিকণা হিসেবেই একটি গ্রহের পথচলা শুরু হয়।
তবে একটি গ্রহের মৃত্যু বা শেষ বলতে আসলে কী বোঝায়, সেই বিষয়টিও জটিল। স্ট্যানফোর্ড বিশ্ববিদ্যালয়ের গ্রহবিজ্ঞানী ম্যাথিউ রেইনহোল্ড জানান, ‘একটি গ্রহ পুরোপুরি ধ্বংস না হওয়া পর্যন্ত টিকে থাকে—এটি যেমন সত্য, তেমনি এর অন্য একটি দিকও আছে।’ কোনো গ্রহ যখন এর চেনা রূপ বা পরিবেশ হারিয়ে সম্পূর্ণ বদলে যায়, তখন তাকেও একধরনের মৃত্যু বলা যেতে পারে। অর্থাৎ হয়তো কোনো একটি গ্রহে আগে বিশেষ পরিবেশ ছিল। কিন্তু যখন সেই পরিবেশ বদলে একদম অন্য রকম হয়ে যায়, তখন বলা যেতে পারে যে আগের সেই গ্রহটির মৃত্যু হয়েছে।
বিষয়টি পরিষ্কার করতে আমাদের পৃথিবীর উদাহরণ নেওয়া যাক। পৃথিবীর আয়ু আসলে আমাদের সূর্যের ওপর নির্ভর করে। সূর্য বর্তমানে এর কেন্দ্রে হাইড্রোজেন গ্যাস পুড়িয়ে হিলিয়ামে রূপান্তর করছে। এই প্রক্রিয়াই আমরা আলো ও তাপ পাই।
বিজ্ঞানীরা হিসাব করে দেখেছেন, আরও প্রায় ৫০০ কোটি বছর পর সূর্যের হাইড্রোজেন ফুরিয়ে যাবে। তখন সূর্য ধীরে ধীরে ফুলতে শুরু করবে। ফলে সূর্য এক বিশাল লাল দানবে পরিণত হবে।
আমাদের এই পৃথিবী হয়তো কয়েক ধাপে মৃত্যুর স্বাদ গ্রহণ করবে। প্রথমত, সূর্য যখন ক্রমে আরও উজ্জ্বল হতে শুরু করবে, তখন প্রচণ্ড তাপে পৃথিবীর সমস্ত সাগরের পানি বাষ্প হয়ে উড়ে যাবে। ফলে পৃথিবী আর বসবাসের যোগ্য থাকবে না। দ্বিতীয়ত, সূর্য যখন বিশাল এক লাল দানব নক্ষত্রে পরিণত হবে, তখন সেটি পৃথিবীকে পুরোপুরি গিলে ফেলতে পারে। আর যদি কোনোভাবে পৃথিবী টিকে যায়, তবে শেষমেশ এটি হয়তো নক্ষত্রহীন হয়ে যাবে।
বিজ্ঞানীরা হিসাব করে দেখেছেন, আরও প্রায় ৫০০ কোটি বছর পর সূর্যের হাইড্রোজেন ফুরিয়ে যাবে। তখন সূর্য ধীরে ধীরে ফুলতে শুরু করবে। ফলে সূর্য এক বিশাল লাল দানবে পরিণত হবে।
বিজ্ঞানীদের এই হিসাব অনুযায়ী, পৃথিবীর মোট আয়ু হতে পারে প্রায় ৯৫০ কোটি বছর। তবে ম্যাথিউ রেইনহোল্ড একটি চমকপ্রদ তথ্য দিয়েছেন। তিনি জানিয়েছেন, আমাদের পৃথিবী সম্ভবত মহাকাশের বেশিরভাগ গ্রহের মতো অত বেশি দিন বাঁচবে না। এর কারণ হলো আমাদের সূর্য। সূর্য হলো একটি হলুদ বামন নক্ষত্র। কিন্তু মহাকাশের বেশির ভাগ নক্ষত্রই হলো লাল বামন বা ‘রেড ডোয়ার্ফ’। যেগুলো সূর্যের চেয়ে অনেক ছোট ও শীতল। এই নক্ষত্রগুলো খুব ধীরে ধীরে এদের জ্বালানি পোড়ায়। তাই এই নক্ষত্রদের চারদিকে ঘুরতে থাকা গ্রহগুলো কয়েক লাখ কোটি (Trillions) বছর পর্যন্ত টিকে থাকতে পারে।
সময়ের সঙ্গে একটি গ্রহের পরিবেশ পুরোপুরি বদলে গেলেও এর ভেতরের কঠিন শিলা বা মূল কাঠামোটি হয়তো টিকে থাকে। কিন্তু কোটি কোটি বছরের এই দীর্ঘ সময়ে গ্রহটির সঙ্গে যেকোনো বড় দুর্ঘটনা ঘটার সম্ভাবনাও বেড়ে যায়। হতে পারে সেটি অন্য কোনো গ্রহের সঙ্গে সজোরে ধাক্কা খেল। অথবা কোনো কারণে নিজের কক্ষপথ থেকে বিচ্ছিন্ন হয়ে গেল।
অনেক সময় গ্রহগুলো এদের জন্মদাতা নক্ষত্র থেকে বিচ্ছিন্ন হয়ে যায়। তখন সেগুলো মহাকাশের শূন্যতায় একাকী ঘুরে বেড়াতে থাকে। এদের বলা হয় ‘রুগ প্ল্যানেট’ বা ভবঘুরে গ্রহ। এমনকি একসময় হয়তো এরা নিজ গ্যালাক্সি বা ছায়াপথ থেকেও বেরিয়ে যায়। সেই যাযাবর গ্রহটির শেষ পরিণতি আসলে কী হবে, তা নির্ভর করবে মহাবিশ্ব শেষ পর্যন্ত কোন পথে ধ্বংস হয় তার ওপর।