আর্টেমিসের কোনো ছবিতে স্পেস জাঙ্ক দেখা যাচ্ছে না কেন

মহাকাশের বেশির ভাগ আবর্জনাই খুব ছোট। তাই এগুলোর ছবি তোলা প্রায় অসম্ভবছবি: নাসা/জেসিকা মেয়র

আর্টেমিস ২ মিশনের নভোচারীরা চাঁদের কক্ষপথ থেকে ঘুরে এসেছেন সম্প্রতি। চমৎকার সব ছবিও তুলে এনেছেন তাঁরা। চাঁদ ও পৃথিবীর সেই ছবি দেখে সবাই রীতিমতো মুগ্ধ। কিন্তু ইন্টারনেটে এর মধ্যেই একটা অদ্ভুত প্রশ্ন ঘুরপাক খাচ্ছে। সবাই বলছে, পৃথিবীর চারপাশে নাকি মহাকাশের আবর্জনা বা স্পেস জাঙ্ক গিজগিজ করছে! তাহলে আর্টেমিস ২ মিশনের তোলা এত সুন্দর ছবিগুলোতে সেই আবর্জনাগুলো গেল কই? একটা টুকরোও কেন দেখা যাচ্ছে না?

প্রশ্নটা শুনে অদ্ভুত মনে হলেও, এর পেছনের যুক্তিটা কিন্তু দারুণ। বিজ্ঞানীরা তো দিনরাত এই স্পেস জাঙ্ক নিয়ে সতর্ক করছেন। পৃথিবীর কক্ষপথে পুরোনো স্যাটেলাইট ও রকেটের ভাঙা টুকরো জঞ্জালের মতো ভাসছে। এগুলোর গতিও মারাত্মক! ঘণ্টায় প্রায় সাড়ে ১৭ হাজার মাইল বেগে ছুটছে এগুলো।

এই ভয়ংকর গতিতে একটা টুকরো আরেকটার গায়ে ধাক্কা খেলে কী হবে তা নিশ্চয়ই অনুমান করতে পারছেন। টুকরোগুলো ভেঙে আরও ছোট হবে এবং চারদিকে ছড়িয়ে পড়বে। বিজ্ঞানীরা এই বিপদের নাম দিয়েছেন কেসলার সিনড্রোম। এভাবে চলতে থাকলে একসময় হয়তো মহাকাশে নতুন কোনো স্যাটেলাইট বা রকেট পাঠানোই অসম্ভব হয়ে যাবে। নভোচারীদের জীবনও হুমকিতে পড়বে।

পৃথিবীর কক্ষপথে পুরোনো স্যাটেলাইট ও রকেটের ভাঙা টুকরো জঞ্জালের মতো ভাসছে
ছবি: জেনিকব্রোস/আইস্টক/গেটি ইমেজ

তাহলে এতই যদি আবর্জনা থাকে, আর্টেমিস ২ মিশনের নভোচারীরা কেন সেগুলোর ছবি তুললেন না? অথবা মহাকাশ থেকে তোলা পৃথিবীর চারপাশে কেন কোনো স্পেস জাঙ্ক দেখা যাচ্ছে না? প্রমাণ হিসেবে তো দুই-একটা ছবি দেখানোই যেত!

আরও পড়ুন
পৃথিবীর কক্ষপথে পুরোনো স্যাটেলাইট ও রকেটের ভাঙা টুকরো জঞ্জালের মতো ভাসছে। এগুলোর গতিও মারাত্মক! ঘণ্টায় প্রায় সাড়ে ১৭ হাজার মাইল বেগে ছুটছে এগুলো।

সত্যি বলতে, এই ছবি তোলা প্রায় অসম্ভব। এর সবচেয়ে বড় কারণ হলো আকার এবং গতি। মহাকাশের বেশির ভাগ আবর্জনাই খুব ছোট। খালি চোখে এদের আলাদা করে চেনা যায় না। বিশেষ করে এগুলো যখন প্রচণ্ড বেগে ছুটে চলে, তখন তো দেখাই যায় না। পৃথিবীর কক্ষপথে ১ সেন্টিমিটার বা তার চেয়ে বড় লাখ লাখ টুকরো ভাসছে। আর এর চেয়ে ছোট টুকরোর সংখ্যা প্রায় ১৩ কোটি!

আরেকটা বড় কারণ হলো জায়গা এবং সময়। মার্কিন মহাকাশ গবেষণা সংস্থা নাসার মতে, মহাকাশের বেশির ভাগ আবর্জনা পৃথিবী থেকে ৪৬৬ থেকে ৬২১ মাইল উঁচুতে ভাসছে। এই জায়গাকে বলা যায় আবর্জনার সবচেয়ে বড় আস্তানা। ওরিয়ন স্পেসক্রাফট যখন এই জায়গা পার হচ্ছিল, তখন ছিল মহাকাশযাত্রার একদম শুরুর দিকের মুহূর্ত। নভোচারীরা তখন মহাকাশযান চালানো নিয়ে ভীষণ ব্যস্ত। জীবনের অন্যতম গুরুত্বপূর্ণ সেই মুহূর্তে জানালার বাইরে তাকিয়ে আবর্জনার ছবি তোলার সময় কোথায় তাঁদের?

মহাকাশের আবর্জনাগুলো প্রচণ্ড বেগে ছুটে চলে
ছবি: আর্থ ডটঅর্গ/নাসা

ব্যাপারটা একটু সহজ করে বলি। ধরুন, হাইওয়ের ওপর একটা ছোট নুড়িপাথর পড়ে আছে। আপনি তখন ১০ মাইল দূর থেকে সেটার নিখুঁত ছবি তোলার চেষ্টা করছেন! কাজটা যতটা কঠিন, ওই প্রচণ্ড গতির মহাকাশযান থেকে আবর্জনার ছবি তোলাটাও ঠিক ততটাই কঠিন।

তার মানে কিন্তু এই নয় যে মহাকাশযানের সঙ্গে আবর্জনার কখনো ধাক্কা লাগে না। আন্তর্জাতিক মহাকাশ স্টেশনের সঙ্গে প্রায়ই এমন ছোটখাটো আবর্জনার ধাক্কা লাগে। তবে মহাকাশযানগুলো খুব শক্ত করে তৈরি করা হয়। ১ সেন্টিমিটার আকারের কোনো বস্তুর ধাক্কা তারা সহজেই সামলে নিতে পারে। তবে এর চেয়ে বড় কোনো আবর্জনার সঙ্গে ধাক্কা লাগার আশঙ্কা খুবই কম বলে জানিয়েছে নাসা।

আরও পড়ুন
মার্কিন মহাকাশ গবেষণা সংস্থা নাসার মতে, মহাকাশের বেশির ভাগ আবর্জনা পৃথিবী থেকে ৪৬৬ থেকে ৬২১ মাইল উঁচুতে ভাসছে। এই জায়গাকে বলা যায় আবর্জনার সবচেয়ে বড় আস্তানা।

আসল কথা হলো, মহাকাশ অকল্পনীয় বড়। আমাদের পৃথিবীটাও অনেক বড়। তাই আবর্জনা থাকলেও আর্টেমিস ২ বা ভবিষ্যতের মহাকাশযানগুলোর নিরাপদে উড়ে যাওয়ার মতো যথেষ্ট জায়গা সেখানে আছে। রাডার ও ট্র্যাকিং প্রযুক্তির সাহায্যে তারা নিরাপদ পথ ঠিকই খুঁজে নেয়।

স্পেস জাঙ্ক অবশ্যই আমাদের ভবিষ্যতের জন্য একটি গুরুতর সমস্যা। বিজ্ঞানীদের এ নিয়ে ভাবতেই হবে। কিন্তু তাই বলে এটা ভেবে ভয় পাওয়ার কিছু নেই যে নভোচারীরা সারাক্ষণ বিপদের মুখে আছেন। আর মহাকাশের আবর্জনা দেখা যায়নি বলে আর্টেমিস ২ মিশনের তোলা সেই চোখধাঁধানো ছবিগুলো নিয়ে সন্দেহ করার তো কোনো অবকাশই নেই!

লেখক: ফ্রন্টেন্ড ডেভলপার, সফটভেঞ্চ

সূত্র: পপুলার সায়েন্স

আরও পড়ুন