ধারাবাহিক
অ্যালিয়েন অ্যাটাক - ৫
সম্প্রতি মার্কিন যুক্তরাষ্ট্র তাদের গোপন ইউএফও ফাইলগুলো প্রকাশ করেছে। এরপর থেকেই সারা বিশ্বে নতুন করে শুরু হয়েছে জল্পনাকল্পনা। এই বিশাল মহাবিশ্বে আমরা কি আসলেই একা? নাকি ভিনগ্রহে লুকিয়ে আছে বুদ্ধিমান কোনো প্রাণী? যদি সত্যিই তাদের অস্তিত্ব থাকে, তারা যদি হলিউড মুভির মতো হঠাৎ পৃথিবী আক্রমণ করে, তাহলে কী হবে? বিজ্ঞান কী বলে? সত্যিই কি ভিনগ্রহের প্রাণীরা আমাদের জন্য হুমকি হতে পারে?
এসব কৌতূহলোদ্দীপক প্রশ্নের বৈজ্ঞানিক উত্তর দিয়েছেন জ্যোতির্বিজ্ঞানী ফিলিপ প্লেইট তাঁর ডেথ ফ্রম দ্য স্কাইজ!: দ্য সায়েন্স বিহাইন্ড দ্য এন্ড অব দ্য ওয়ার্ল্ড বইয়ে। সূক্ষ্ম রসিকতা ও নিখাদ বিজ্ঞানের দারুণ মিশেলে লেখা রোমাঞ্চকর এই বইয়ের কয়েকটি অধ্যায় ধারাবাহিকভাবে প্রকাশিত হচ্ছে। ভিনগ্রহীদের আক্রমণ নিয়ে লেখা এই অধ্যায়টি অনুবাদ করছেন কাজী আকাশ। আজ পড়ুন ষষ্ঠ অধ্যায়ের পঞ্চম পর্ব।
ভাইরাল আক্রমণ!
সায়েন্স ফিকশনে ভাইরাস খুব জনপ্রিয় বিষয়। পৃথিবীতে হয়তো লাখ লাখ প্রজাতির ভাইরাস আছে। আমরা এদের বৈচিত্র্যের খুব সামান্যই জানতে পেরেছি।
বেশিরভাগ ভাইরাসের গঠন খুবই সাধারণ। এরা মূলত প্রোটিনের একটা খোলসের ভেতরে থাকা এক টুকরো ডিএনএ কোড। এই খোলসকে বলা হয় ক্যাপসিড। এরা নিজে নিজে বংশবৃদ্ধি করতে পারে না। তাই এরা অন্য কোনো কোষের ভেতরে ঢুকে পড়ে। এরপর কোষের নিউক্লিয়াসের ভেতরে নিজেদের ডিএনএ ঢুকিয়ে দেয়। তারপর সেই কোষটিকে বাধ্য করে ভাইরাসের ডিএনএর কপি তৈরি করতে। ভাইরাস হলো অণুবীক্ষণিক জগতের এক গুপ্তঘাতক! এরা চুপিচুপি কোষের কারখানায় ঢুকে পড়ে এবং কোষটিকে তার নিজের বিরুদ্ধেই কাজে লাগায়।
যখন যথেষ্ট পরিমাণ ভাইরাস তৈরি হয়ে যায়, তখন তারা কোষটি ফাটিয়ে বাইরে বেরিয়ে আসে। ফলে কোষটি ধ্বংস হয়ে যায়। এরপর তারা অন্য কোষগুলোর দখল নিতে ছুটে যায়। শরীর যদি এই সংক্রমণের বিরুদ্ধে লড়তে না পারে, আর ভাইরাসটি যদি যথেষ্ট শক্তিশালী হয়, তবে আক্রান্ত প্রাণীটি মারাও যেতে পারে। শরীরের টিস্যুগুলো আক্ষরিক অর্থেই গলে পানিতে পরিণত হয়। একদম জঘন্য ব্যাপার!
আরও নানা ধরনের ভাইরাস আছে। কিছু ভাইরাস ডিএনএর বদলে আরএনএ ব্যবহার করে।১ আবার কিছু ভাইরাস টিস্যুর কোষের বদলে ব্যাকটেরিয়াকে আক্রমণ করে। আপনাকে ভয় দেখানোর জন্য বলছি না, তবে এই মুহূর্তে আপনার শরীর এমন ভাইরাসে গিজগিজ করছে! তবে এগুলোর বেশিরভাগই উপকারী ব্যাকটেরিয়া।
যখন যথেষ্ট পরিমাণ ভাইরাস তৈরি হয়ে যায়, তখন তারা কোষটি ফাটিয়ে বাইরে বেরিয়ে আসে। ফলে কোষটি ধ্বংস হয়ে যায়। এরপর তারা অন্য কোষগুলোর দখল নিতে ছুটে যায়।
কিছু কিছু ভাইরাস অবশ্য নানা রকম সমস্যা তৈরি করে। এরা শরীরের স্বাভাবিক কাজকর্মের নিয়ন্ত্রণ নষ্ট করে দিতে পারে। ফলে সাধারণ জ্বর-সর্দি থেকে শুরু করে মারাত্মক সব রোগ হতে পারে। তবে বেশিরভাগ ভাইরাসই আমাদের মারে না। মারতে হলে তাদের বিশাল সংখ্যায় আক্রমণ করতে হয়, অথবা তাদের খুব ভয়ংকর হতে হয়। যেমন মারবার্গ ভাইরাসে মৃত্যুর হার প্রায় ২৫ শতাংশ। আর বেশি পরিচিত ইবোলা ভাইরাসে মৃত্যুর হার রীতিমতো আতঙ্ক ধরানোর মতো, প্রায় ৮০ থেকে ৯০ শতাংশ!২
মহাকাশ থেকে পৃথিবীতে আক্রমণের ক্ষেত্রে ভাইরাসের এই সাধারণ গঠন একই সঙ্গে আশীর্বাদ এবং অভিশাপ।
গঠন খুব সাধারণ হওয়ায় ভাইরাস মহাকাশের এমন অনেক বৈরী পরিবেশ সহজেই সামলে নিতে পারে, যা কোনো জটিল অণুজীবের পক্ষে সম্ভব হতো না। দীর্ঘসময় মহাকাশের শূন্যতায় থাকা, প্রচণ্ড ঠান্ডা, এমনকি কিছুটা বিকিরণও এদের খুব একটা ক্ষতি করতে পারে না। কোনো পাথরের অনেক গভীরে লুকিয়ে এরা একেবারে অক্ষত অবস্থায় পৃথিবীতে এসে পড়তে পারে। এরপর হয়তো দুর্ভাগা কোনো বিজ্ঞানী অভিশপ্ত ফারাওদের মমির কবরের মতো সেই পাথরটা ভেঙে ভাইরাসটাকে মুক্ত করে দেবেন।
কিন্তু সেই ভাইরাস যদি বিজ্ঞানীর ত্বকের নিচে ঢুকেও পড়ে, তবুও হয়তো সে না খেয়েই মারা পড়বে!
মারবার্গ ভাইরাসে মৃত্যুর হার প্রায় ২৫ শতাংশ। আর বেশি পরিচিত ইবোলা ভাইরাসে মৃত্যুর হার রীতিমতো আতঙ্ক ধরানোর মতো, প্রায় ৮০ থেকে ৯০ শতাংশ!
কারণ, ভাইরাস সাধারণত নির্দিষ্ট কোনো প্রজাতির প্রাণী বা উদ্ভিদকে আক্রমণ করার জন্য তৈরি হয়। যে ভাইরাস কোনো গাছকে সংক্রমিত করতে পারে, সে কোনো প্রজাপতির ক্ষতি করতে পারে না। আবার যে ভাইরাস ব্যাকটেরিয়াকে আক্রমণ করে, তারা মানুষের কোনো ক্ষতি করতে পারে না। ভাইরাসের গঠন এতই সাধারণ যে, তারা হঠাৎ করে নিজেদের খুব বেশি বদলাতেও পারে না। ভাইরাসের ডিএনএ বা আরএনএর টুকরোটা অনেকটা তালার চাবির মতো। গাড়ির চাবি দিয়ে তো আর বাড়ির দরজা খোলা যাবে না!
তাই মহাকাশ থেকে আসা কল্পিত কোনো ভাইরাস যদি বিজ্ঞানীর ল্যাবরেটরি পর্যন্ত টিকে চলেও আসে, তবুও তার পক্ষে বংশবৃদ্ধি করে আমাদের সবাইকে জম্বি বানিয়ে ফেলার সম্ভাবনা মোটেই নেই।৩
কাজেই বাস্তবে ভিনগ্রহের ভাইরাস আমাদের জন্য খুব বড় কোনো হুমকি নয়। তারা পৃথিবীতে এসে দেখবে, তাদের উদ্দেশ্য পূরণের জন্য আমাদের শরীর একেবারেই বেমানান। ফলে তারা খুব দ্রুতই মারা পড়বে।
এই যাত্রায় পৃথিবীর প্রাণীদেরই জয় হবে!
