ধারাবাহিক
অ্যালিয়েন অ্যাটাক – ২
সম্প্রতি মার্কিন যুক্তরাষ্ট্র তাদের গোপন ইউএফও ফাইলগুলো প্রকাশ করেছে। এরপর থেকেই সারা বিশ্বে নতুন করে শুরু হয়েছে জল্পনাকল্পনা। এই বিশাল মহাবিশ্বে আমরা কি আসলেই একা? নাকি ভিনগ্রহে লুকিয়ে আছে বুদ্ধিমান কোনো প্রাণী? যদি সত্যিই তাদের অস্তিত্ব থাকে, তারা যদি হলিউড মুভির মতো হঠাৎ পৃথিবী আক্রমণ করে, তাহলে কী হবে? বিজ্ঞান কী বলে? সত্যিই কি ভিনগ্রহের প্রাণীরা আমাদের জন্য হুমকি হতে পারে?
এসব কৌতূহলোদ্দীপক প্রশ্নের বৈজ্ঞানিক উত্তর দিয়েছেন জ্যোতির্বিজ্ঞানী ফিলিপ প্লেইট তাঁর ডেথ ফ্রম দ্য স্কাইজ!: দ্য সায়েন্স বিহাইন্ড দ্য এন্ড অব দ্য ওয়ার্ল্ড বইয়ে। সূক্ষ্ম রসিকতা ও নিখাদ বিজ্ঞানের দারুণ মিশেলে লেখা রোমাঞ্চকর এই বইয়ের কয়েকটি অধ্যায় ধারাবাহিকভাবে প্রকাশিত হচ্ছে। ভিনগ্রহীদের আক্রমণ নিয়ে লেখা এই অধ্যায়টি অনুবাদ করছেন কাজী আকাশ। আজ পড়ুন ষষ্ঠ অধ্যায়ের দ্বিতীয় পর্ব।
এটাই জীবন
পৃথিবীর যেখানেই যান না কেন, প্রাণের অস্তিত্ব পাবেন। সমতল ভূমি, পাহাড়ের চূড়া, অনেক উঁচুতে কিংবা মহাসাগরের গভীর তলদেশে; সবখানেই প্রাণ ছড়িয়ে আছে। এমনকি মাটির অনেক গভীরেও এমন পরিবেশ আছে, যেখানটা আমাদের কাছে প্রাণঘাতী মনে হতে পারে; কিন্তু সেখানেও দিব্যি মানিয়ে নিয়েছে আণুবীক্ষণিক প্রাণীরা। প্রাণ আছে সবখানে।
দেখে মনে হতে পারে, পৃথিবীটা বুঝি প্রাণের বেঁচে থাকার জন্যই নিখুঁতভাবে তৈরি হয়েছে। কিন্তু এটা আসলে একটা ভ্রম। সত্যি বলতে, পরিবর্তনের মাধ্যমেই আমরা পৃথিবীর পরিবেশের সঙ্গে মানিয়ে নিয়েছি। পৃথিবীর বুকে, নিচে বা ওপরে থাকা অন্য সব প্রাণীও ঠিক এভাবেই মানিয়ে নিয়েছে। যুগ যুগ ধরে পৃথিবী যেমন বদলেছে, প্রাণও তেমনি বদলেছে। পৃথিবীতে একবার যখন প্রাণের শুরু হয়েই গেল, তখন এর বিকাশ ঘটাটা একরকম অবধারিতই ছিল।
আমরা জানি, আমাদের সৌরজগতে আরও অনেক গ্রহ আছে। এমনকি অন্য নক্ষত্রদের ঘিরেও গ্রহরা ঘুরছে।১ পৃথিবীতে যদি এত বিপুল পরিমাণ প্রাণ থাকতে পারে, তবে যুক্তিমতে অন্য জগতেও প্রাণ থাকতে পারে। সেখানে হয়তো সাধারণ আণুবীক্ষণিক প্রাণীরা গিজগিজ করছে। আবার মহাকাশে আরও জটিল গড়নের প্রাণী থাকার সম্ভাবনাও আছে। হয়তো এমন প্রাণী আছে, যাদের আমরা বুদ্ধিমান বলে মেনে নেব!
যদি সত্যিই তেমন কিছু থেকে থাকে, তবে তারা আমাদের সম্পর্কে কী ভাববে? তারা কি আমাদের জন্য কোনো হুমকি হয়ে দাঁড়াবে? এটা বুঝতে হলে আমাদের একটু পেছনের দিকে তাকাতে হবে। সময়ের টাইমমেশিনে চড়ে ছোট্ট একটা ভ্রমণ করতে হবে। যদিও আমার বলা ‘ছোট্ট’ শব্দটার সংজ্ঞা আপনার চেয়ে একটু আলাদা হতে পারে!
পরিবর্তনের মাধ্যমেই আমরা পৃথিবীর পরিবেশের সঙ্গে মানিয়ে নিয়েছি। পৃথিবীর বুকে, নিচে বা ওপরে থাকা অন্য সব প্রাণীও ঠিক এভাবেই মানিয়ে নিয়েছে।
সৌরজগতের সংক্ষিপ্ত ইতিহাস
প্রায় ৪৬০ কোটি বছর আগের কথা। আপনি তখন মহাকাশের কোটি কোটি ঘনমাইল জায়গাজুড়ে ছড়িয়ে ছিলেন। আমিও ছিলাম। আপনার হাতে থাকা এই স্মার্টফোন বা বই, আপনার পরা পোশাক, আপনার চেনা সব মানুষ; সবাই ছড়িয়ে ছিল। আপনি যা কিছু দেখেছেন, যা কিছু ছুঁয়েছেন, এমনকি যা কিছু নিয়ে স্বপ্ন দেখেছেন—সবকিছুরই একই অবস্থা ছিল। আপনাদের সবার পরমাণুগুলো তখন একটা বিশাল চাকতির অংশ ছিল। সেই চাকতি ছিল কয়েক হাজার কোটি মাইল চওড়া এবং ১০ লাখ মাইল পুরু। চাকতিটার প্রায় পুরোটাই তৈরি ছিল হাইড্রোজেন ও হিলিয়াম গ্যাস দিয়ে। তবে এর মাঝে এখানে সেখানে ছড়িয়ে ছিটিয়ে ছিল দস্তা, লোহা, ক্যালসিয়াম, ফসফরাস ও অন্যান্য বেশ কিছু পদার্থ। চাকতিটি খুব ধীরে ধীরে ঘুরছিল। নিজের মহাকর্ষ বল এবং এর কেন্দ্রের দিকে ফুলে ওঠা অংশের টানে এটি একসঙ্গে টিকে ছিল।
লাখ লাখ বছর ধরে এই চাকতির কেন্দ্রে পদার্থ জমতে থাকে। মহাকর্ষ বল আরও বেশি করে পদার্থ টেনে আনতে শুরু করে। এগুলো যতই সংকুচিত হতে থাকে, ততই গরম হয়। একপর্যায়ে এর ভেতরের তাপমাত্রা পৌঁছায় ২ কোটি ৭০ লাখ ডিগ্রি ফারেনহাইটে। অর্থাৎ প্রায় ১ কোটি ৫০ লাখ ডিগ্রি সেলসিয়াস। শুরু হয় হাইড্রোজেন ফিউশন বিক্রিয়া। ঠিক সেই মুহূর্তেই আমাদের সূর্য একটি সত্যিকারের নক্ষত্রে পরিণত হয়। চারদিকে আলোর বন্যা বয়ে যায়। এর পরপরই ছুটে আসে পারমাণবিক কণার ঢেউ। একেই আমরা এখন বলি সৌরঝড়।
আপনাদের সবার পরমাণুগুলো তখন একটা বিশাল চাকতির অংশ ছিল। সেই চাকতি ছিল কয়েক হাজার কোটি মাইল চওড়া এবং ১০ লাখ মাইল পুরু।
একই সময়ে চাকতির বাইরের দিকের অংশগুলোতেও পদার্থ জমতে শুরু করে। শুরুতে বিভিন্ন খণ্ড কেবল রাসায়নিক প্রক্রিয়ার কারণেই একে অপরের সঙ্গে আটকে যেত। সূর্যের চেয়ে দূরের অংশে, যেখানে তাপমাত্রা খুব কম ছিল, সেখানে বরফের স্ফটিক তৈরি হয়। সিলিকেটের টুকরোগুলো একে অপরের সঙ্গে ধাক্কা খেয়ে জোড়া লেগে যায়। সময়ের সঙ্গে সঙ্গে এই বস্তুগুলো যত বড় হতে থাকে, তাদের ভরও তত বাড়তে থাকে। ভর বাড়ার সঙ্গে সঙ্গে বাড়ে তাদের মহাকর্ষ বল। এই ছোট ছোট গ্রহাণুগুলো তখন আরও জোরে অন্য পদার্থগুলোকে নিজের দিকে টানতে শুরু করে। এটা ছিল লাগামহীন একটি প্রক্রিয়া। ভর বাড়ে তো মহাকর্ষ বাড়ে, মহাকর্ষ বাড়ে তো আরও পদার্থ জমা হয়। আর পদার্থ জমলে ভর আরও বাড়ে। এভাবেই চলতে থাকে। যখন আশপাশে টেনে নেওয়ার মতো আর কোনো পদার্থ বাকি থাকে না, কেবল তখনই এই প্রক্রিয়া থামে। এভাবেই জন্ম নেয় নতুন সব গ্রহ। এর মধ্যে কিছু গ্রহ ছিল ছোট, কিছু বড়। আবার অনেক গ্রহ পুরোপুরি সৌরজগতের বাইরে ছিটকে পড়েছিল। কারণ, ঘুরতে ঘুরতে সেগুলো বিশাল আকারের গ্রহগুলোর খুব কাছাকাছি চলে গিয়েছিল।
যে গ্রহগুলো টিকে ছিল, সেগুলোর সবগুলোর কেন্দ্রই পাথুরে এবং ঘন বায়ুমণ্ডল ছিল। কিছু গ্রহের বায়ুমণ্ডল ছিল হাজার হাজার মাইল গভীর। সেগুলোর আসলে নির্দিষ্ট কোনো ভূপৃষ্ঠই ছিল না। আবার কিছু গ্রহ ছিল ছোট, তবে সেগুলোরও ঘন বায়ুমণ্ডল ছিল। গ্রহগুলো যখন তৈরি হচ্ছিল, তখন প্রচুর তাপ সৃষ্টি হয়েছিল। সেই তাপের কারণে ছোট গ্রহগুলোর ওপরিভাগ ছিল উত্তপ্ত ও গলিত অবস্থায়।
সূর্যের চেয়ে দূরের অংশে, যেখানে তাপমাত্রা খুব কম ছিল, সেখানে বরফের স্ফটিক তৈরি হয়। সিলিকেটের টুকরোগুলো একে অপরের সঙ্গে ধাক্কা খেয়ে জোড়া লেগে যায়।
এরপর যখন চাকতির মাঝখানে থাকা সূর্য জ্বলে উঠল, তখন তার তীব্র আলো ও সৌরঝড় সরাসরি এসে পড়ল এই নতুন গ্রহগুলোর ওপর। আলোর চাপ এবং চারদিকে ছিটকে পড়া পদার্থগুলো সেই পাতলা হয়ে আসা চাকতিতে এসে ধাক্কা মারল। ফলে সৌরজগতের অবশিষ্ট ধুলোবালি ও আবর্জনা উড়ে গিয়ে সব পরিষ্কার হয়ে গেল। শেষমেশ একটি তরুণ ও উত্তপ্ত নক্ষত্রকে ঘিরে ঘুরতে থাকল কেবল গুটিকয়েক গ্রহ, কোটি কোটি গ্রহাণু এবং লাখো-কোটি বরফের ধূমকেতু।২
এভাবেই জন্ম নিল আমাদের সৌরজগত।
তবে তখন দেখতে এটি মোটেও এখনকার মতো ছিল না! বৃহস্পতি গ্রহ তখন সূর্যের থেকে এখনকার তুলনায় অনেক দূরে ছিল। অন্যদিকে শনি, ইউরেনাস এবং নেপচুন ছিল সূর্যের আরও কাছাকাছি। গ্রহগুলোর নিজেদের মহাকর্ষ বলের পারস্পরিক প্রভাবে একপর্যায়ে আজকের অবস্থানে এসে দাঁড়িয়েছে। সৌরজগতের ভেতরের দিকের গ্রহ, অর্থাৎ বুধ, শুক্র, পৃথিবী ও মঙ্গলের ঘন ও স্যুপের মতো বায়ুমণ্ডল ছিল। সময়ের সঙ্গে সঙ্গে গ্রহগুলো যত কঠিন হতে লাগল, তারাও তত বদলাতে শুরু করল।
কিছু গ্রহ ছিল ছোট, তবে সেগুলোরও ঘন বায়ুমণ্ডল ছিল। গ্রহগুলো যখন তৈরি হচ্ছিল, তখন প্রচুর তাপ সৃষ্টি হয়েছিল। সেই তাপের কারণে ছোট গ্রহগুলোর ওপরিভাগ ছিল উত্তপ্ত ও গলিত অবস্থায়।
বুধ গ্রহটি সূর্যের খুব কাছে হওয়ায় এবং এর মহাকর্ষ বল খুব কম থাকায় গ্রহটির বায়ুমণ্ডল হারিয়ে যেতে লাগল। তা ছাড়া, এই ছোট্ট গ্রহটির কোনো চৌম্বকক্ষেত্র ছিল না। ফলে এটি সূর্যের তীব্র সৌরঝড়ের সামনে পুরোপুরি অরক্ষিত হয়ে পড়ে।
শুক্র গ্রহও একসময় তার সব হাইড্রোজেন ও হিলিয়াম হারিয়ে ফেলেছিল। তবে কোটি কোটি বছর ধরে চলা নানা রাসায়নিক প্রক্রিয়া এবং লাগামহীন গ্রিনহাউস প্রতিক্রিয়ার ফলে সেখানে কার্বন ডাই-অক্সাইডের একটি ঘন বায়ুমণ্ডল তৈরি হয়। সূর্যের তাপ ধরে রেখে এই গ্রহটি শেষ পর্যন্ত চুল্লির মতো গরম এক ভয়ংকর মরুভূমিতে পরিণত হয়। এর ভূপৃষ্ঠের পাথরগুলো সব সময় গলনাঙ্কের একেবারে কাছাকাছি তাপমাত্রায় থাকে।৩
পৃথিবীরও তখন ঘন বায়ুমণ্ডল ছিল, তবে আজকের মতো নয়। সেই বায়ুমণ্ডল দেখতে ছিল তখনকার বৃহস্পতি বা শনি গ্রহের মতো। এই বায়ুমণ্ডল মূলত হাইড্রোজেন ও হিলিয়াম দিয়ে তৈরি ছিল। মূলত পৃথিবী তৈরি হওয়ার সময় ওই বিশাল চাকতি থেকে রয়ে গিয়েছিল এই মৌল দুটি। সূর্য থেকে পৃথিবীর যে দূরত্ব, সেখানে সূর্যের তাপ ও পৃথিবীর ভেতরের তাপ মিলে এই ঘন বাতাসকে মহাকর্ষ বলের সঙ্গে এক সূক্ষ্ম ভারসাম্যে ফুলিয়ে রাখত। লাখ লাখ বছর ধরে হালকা উপাদানগুলো হারিয়ে গেল। পড়ে রইল কেবল কার্বন ডাই-অক্সাইড, জলীয় বাষ্প, কার্বন মনোক্সাইড, অ্যামোনিয়া, মিথেন ও অন্যান্য বিষাক্ত গ্যাসের এক বায়ুমণ্ডল, যার বেশির ভাগই আবার পৃথিবীর ভেতর থেকে বেরিয়ে আসা।
কোটি কোটি বছর ধরে চলা নানা রাসায়নিক প্রক্রিয়া এবং লাগামহীন গ্রিনহাউস প্রতিক্রিয়ার ফলে শুক্র গ্রহে কার্বন ডাই-অক্সাইডের একটি ঘন বায়ুমণ্ডল তৈরি হয়।
অবশেষে পৃথিবীর ওপরিভাগ ঠান্ডা হলো। গলিত ও আধা-কঠিন পাথরের স্তরের ওপর তৈরি হলো এক পুরু আবরণ। লোহা, ইরিডিয়াম ও ইউরেনিয়ামের মতো ভারী পদার্থগুলো পৃথিবীর কেন্দ্রের দিকে তলিয়ে গেল। তেজস্ক্রিয় পদার্থগুলো ভেঙে তাপ তৈরি করতে লাগল। এই তাপের সঙ্গে যোগ হলো পৃথিবী সৃষ্টির সময় ভেতরে আটকে থাকা সেই পুরোনো তাপ। শুরু হলো পরিচলন স্রোত। তৈরি হলো এক বিশাল ম্যাগনেটিক ডায়নামো। আর এভাবেই পৃথিবী সূর্যের ভয়ংকর সৌরঝড়ের হাত থেকে রক্ষা পেল।
তাই বলে তরুণ পৃথিবী যে মহাকাশের অন্যান্য বিপদ থেকে সম্পূর্ণ নিরাপদ ছিল, তা কিন্তু নয়। সৌরজগতের সেই আদি চাকতির বেশির ভাগ পদার্থ গ্রহগুলো শুষে নিলেও কিছু পদার্থ তখনো বাকি ছিল। গ্রহাণুর এক বিশাল ভান্ডার পুরো সৌরজগতে ঘুরে বেড়াচ্ছিল। মাঝে মাঝেই এরা গ্রহগুলোর চলার পথে চলে আসত। গ্রহগুলো তৈরি হওয়ার পরপরই এদের ওপর নির্মমভাবে এই গ্রহাণুগুলোর বোমা বর্ষণ শুরু হয়। সৌরজগতের প্রায় প্রতিটি কঠিন ভূত্বকের ওপরই এই ভয়ংকর ধ্বংসযজ্ঞের ছাপ রয়ে গেছে। চাঁদের দিকে একবার তাকালেই দেখবেন, তার গায়ে কীভাবে অসংখ্য ক্ষতচিহ্ন বা গর্ত তৈরি হয়ে আছে।
পৃথিবীকেও এর ভালোই চড়া মূল্য দিতে হয়েছিল। চাঁদের চেয়ে পৃথিবীর ওপর গ্রহাণুর আঘাত বেশি এসেছিল। কারণ পৃথিবীর আকার বড় এবং এর মহাকর্ষ বলও বেশি। আসলে চাঁদের জন্ম নিয়ে সবচেয়ে জনপ্রিয় তত্ত্বটি হলো, মঙ্গল গ্রহের সমান আকারের বিশাল কোনো বস্তুর সঙ্গে পৃথিবীর ভয়াবহ সংঘর্ষ হয়েছিল। সেই সংঘর্ষের ফলে পৃথিবী থেকে ছিটকে পড়া পদার্থগুলো একত্রিত হয়েই চাঁদের জন্ম। সেই সংঘর্ষ এতই ভয়ংকর ছিল যে কল্পনা করলেও শিউরে উঠতে হয়!
গ্রহগুলো তৈরি হওয়ার পরপরই এদের ওপর নির্মমভাবে এই গ্রহাণুগুলোর বোমা বর্ষণ শুরু হয়। সৌরজগতের প্রায় প্রতিটি কঠিন ভূত্বকের ওপরই এই ভয়ংকর ধ্বংসযজ্ঞের ছাপ রয়ে গেছে।
কিন্তু কোটি কোটি বছর ধরে টেকটোনিক প্লেটের নড়াচড়া ও ক্ষয় প্রক্রিয়ার ফলে পৃথিবী থেকে সেই আদিম বোমা বর্ষণের সব প্রমাণ মুছে গেছে। শুধু খুব সম্প্রতি তৈরি হওয়া গর্তগুলোই এখনো টিকে আছে। কয়েক মিলিয়ন বছরের পুরোনো গর্তগুলো প্রায় চোখেই পড়ে না। তবে মহাকাশ থেকে আসা এই অবিরাম পাথরবৃষ্টির কারণে সে সময় পৃথিবীতে চরম এক বৈরী পরিবেশ তৈরি হয়েছিল। যখনই মনে হতো সব শান্ত হয়ে আসছে, তখনই হয়তো ৫০ মাইল চওড়া বিশাল কোনো পাথর আছড়ে পড়ত। ফলে পৃথিবীর ভূতাত্ত্বিক ঘড়িকে আবার শূন্য থেকে শুরু করতে বাধ্য করত।
অবশেষে একসময় এই লোহা ও পাথরের বৃষ্টি থামল। পৃথিবী ঠান্ডা হওয়ার সঙ্গে সঙ্গে তৈরি হতে শুরু করল আরও জটিল সব অণু। পৃথিবীর বায়ুমণ্ডলে থাকা মিথেন ছিল হাইড্রোজেনের বড় উৎস। অ্যামোনিয়া থেকেও হাইড্রোজেন মিলত। এর মধ্যে নাইট্রোজেনও ছিল। কার্বন ডাই-অক্সাইড থেকে আসত কার্বন। এই কার্বন যখন অক্সিজেন থেকে আলাদা হতো, তখন তা আরও জটিল সব অণুর শিকল তৈরি করতে পারত।
অ্যামিনো অ্যাসিড সম্ভবত খুব দ্রুতই তৈরি হয়েছিল এবং নতুন সব উপায়ে একে অপরের সঙ্গে যুক্ত হতে শুরু করেছিল। অ্যামিনো অ্যাসিডকে বলা হয় প্রোটিনের মূল ভিত্তি। বায়ুমণ্ডলের বিদ্যুৎ-চমক ও সূর্যের অতিবেগুনি রশ্মি হয়তো এই অণুগুলোকে ভাঙতে এবং নতুন করে গড়তে প্রয়োজনীয় শক্তি জুগিয়েছিল। কোনো একসময়—কেউ ঠিক করে বলতে পারে না কখন বা কীভাবে, তবে গ্রহাণুর আঘাত বন্ধ হওয়ার প্রায় কাছাকাছি সময়েই—এই অণুগুলো মিলে এমন এক প্যাটার্ন তৈরি করল, যার এক অদ্ভুত ক্ষমতা ছিল। এরা নিজেদের প্রতিলিপি তৈরি করতে পারত!
পৃথিবী ঠান্ডা হওয়ার সঙ্গে সঙ্গে তৈরি হতে শুরু করল আরও জটিল সব অণু। পৃথিবীর বায়ুমণ্ডলে থাকা মিথেন ছিল হাইড্রোজেনের বড় উৎস। অ্যামোনিয়া থেকেও হাইড্রোজেন মিলত।
এখনকার হিসেবে হয়তো সেই অণুটি খুবই সাধারণ ছিল। কিন্তু তার পরও এর মধ্যে অবাক করা একটা ক্ষমতা ছিল। সে চারপাশের কাঁচামাল সংগ্রহ করে সেগুলোকে এমনভাবে সাজাতে পারত, যাতে তার নিজেরই একটা হুবহু কপি বা প্রতিলিপি তৈরি হয়। তারপর তারা চারদিকে ছড়িয়ে পড়ল এবং সংখ্যায় বাড়তে থাকল।
এটা আসলে সাধারণ একটি রাসায়নিক বিক্রিয়া ছাড়া আর কিছুই ছিল না। কিংবা বলা যায়, অনেকগুলো রাসায়নিক বিক্রিয়ার একটা লম্বা চেইন। এই বিক্রিয়াগুলো ঘটানোর জন্য কাঁচামাল হিসেবে বাতাস ও ভূপৃষ্ঠের উপাদানগুলোর প্রয়োজন হতো। ফলে তৈরি হতো কিছু বর্জ্য পদার্থ। এই বর্জ্য পদার্থগুলোর মধ্যে অন্যতম ছিল অক্সিজেন। বাতাসে অক্সিজেনের পরিমাণ যত বাড়তে লাগল, রাসায়নিক প্রক্রিয়াগুলোও তত বদলাতে শুরু করল।
বেশির ভাগ সাধারণ অণুজীবের কাছে এই অক্সিজেন ছিল বিষাক্ত। অনেক সময় জীবন্ত প্রাণীরা যে বর্জ্য পদার্থ তৈরি করে, তা তাদের নিজেদের জন্যই ক্ষতিকর হয়। অক্সিজেনের পরিমাণ বাড়ার সঙ্গে সঙ্গে তা অণুজীবগুলোকে বিষক্রিয়ায় মারতে শুরু করে। কিছু প্রজাতির অণুজীব নতুন পরিবেশের সঙ্গে মানিয়ে নিতে পারল! ওদের বংশধরেরা এখনো নীলচে-সবুজ শৈবাল বা অন্যান্য রূপে বেঁচে আছে। কিন্তু যারা মানিয়ে নিতে পারল না, তারা বিলুপ্ত হয়ে গেল। লাখ লাখ বছর ধরে পৃথিবীতে রাজত্ব করার পর শেষমেশ নিজেদের তৈরি বর্জ্যেই তাদের প্রাণ গেল!৪
অনেক সময় জীবন্ত প্রাণীরা যে বর্জ্য পদার্থ তৈরি করে, তা তাদের নিজেদের জন্যই ক্ষতিকর হয়। অক্সিজেনের পরিমাণ বাড়ার সঙ্গে সঙ্গে তা অণুজীবগুলোকে বিষক্রিয়ায় মারতে শুরু করে।
তবে ঠিক একই সময়ে আরেক ধরনের জটিল অণুও পৃথিবীতে ছিল। সেগুলো এই বর্জ্যটাকে দারুণভাবে কাজে লাগাতে পারত। অক্সিজেন যখন অন্য রাসায়নিক পদার্থের সঙ্গে যুক্ত হয়, তখন প্রচুর শক্তি উৎপন্ন করতে পারে। এই শক্তি প্রজনন এবং মেটাবলিজম বাড়ানোর কাজে ব্যবহার করা যায়। এই নতুন অণুজীবগুলো অন্যদের তৈরি বর্জ্য খেয়েই বেঁচে থাকত। যখন অক্সিজেনের মাত্রা এতটাই বেড়ে গেল যে প্রথম দিকের অণুজীবগুলো মরতে শুরু করল, তখন এই অক্সিজেন ব্যবহারকারী অণুজীবগুলো ক্ষমতা দখলের জন্য পুরোপুরি প্রস্তুত। তারা পৃথিবীর দখল নিয়ে নিল। অক্সিজেন উৎপাদনকারী অণুজীবদের মধ্যে কিছু বেঁচে গেল। পরিবেশের সঙ্গে মানিয়ে নিতে তারা প্রতিনিয়ত নিজেদের পরিবর্তন করতে থাকল। যারা অক্সিজেন ব্যবহার করতে বেশি পারদর্শী ছিল, তারা টিকে গেল; বাকিরা মারা পড়ল।৫
লাখ লাখ বছর ধরে গ্রহাণুর আঘাত, সূর্যের ভয়ংকর অগ্ন্যুৎপাত এবং কাছাকাছি কোনো সুপারনোভা বিস্ফোরণের কারণে হয়তো এই প্রক্রিয়া বহুবার ব্যাহত হয়েছে, কিংবা প্রাণের অস্তিত্ব প্রায় ধ্বংসের দ্বারপ্রান্তে চলে গিয়েছে। কিন্তু শেষমেশ তারা পৃথিবীতে এমন শক্তভাবে নিজেদের শেকড় গেড়েছে, তাদের আর উৎখাত করা সম্ভব হয়নি।
পৃথিবী প্রাণবন্ত হয়ে উঠল।
পৃথিবীতে কীভাবে প্রাণের শুরু হয়েছিল, এটি তার অনেকগুলো সম্ভাব্য উপায়ের একটি মাত্র। আমরা আসলে নিশ্চিত করে জানি না, ঠিক কীভাবে এটা ঘটেছিল। এটা কোথায় ঘটেছিল—মাটিতে, সমুদ্রে, বাতাসে, নাকি গভীর মহাসাগরে—এমনকি এই পৃথিবীতেই ঘটেছিল কি না, সে সম্পর্কেও আমরা পুরোপুরি নিশ্চিত নই। সৌরজগতের শুরুর দিকে যে কয়েকটি গ্রহে প্রাণের বিকাশ ঘটার অনুকূল পরিবেশ তৈরি হয়েছিল, পৃথিবী তার মধ্যে কেবল একটি।
