বিশ্বের সবচেয়ে বড় মহাকাশবন্দর বানাবে স্পেসএক্স
ইলন মাস্কের রকেট কোম্পানি স্পেসএক্স ইতিধ্যেই মহাকাশ বাণিজ্যের অঘোষিত সম্রাট হয়ে বসে আছে। গত বছর বিশ্বের অন্য সব দেশ ও কোম্পানি মিলে মহাকাশে মোট যত ওজনের স্যাটেলাইট এবং যন্ত্রপাতি পাঠিয়েছে, স্পেসএক্স একাই পাঠিয়েছে তার চেয়ে চারগুণ বেশি! কিন্তু মাস্কের মতো মানুষের কাছে এসব তো নস্যি। তিনি এবার এমন এক কাণ্ড ঘটাতে যাচ্ছেন, যা শুনলে সায়েন্স ফিকশন মুভির গল্পও আপনার কাছে পানসে মনে হবে।
গুজবটা মহাকাশপ্রেমীদের মধ্যে বেশ কয়েক মাস ধরেই উড়ছিল। অবশেষে গত ২৫ আগস্ট সেই গুজবেই সিলমোহর পড়েছে। স্পেসএক্স সটান কিনে ফেলেছে যুক্তরাষ্ট্রের দক্ষিণ লুইজিয়ানার ৫০ হাজার হেক্টরের বিশাল এলাকা! লুইজিয়ানা রাজ্য সরকারের সঙ্গে যৌথভাবে তারা ঘোষণা দিয়েছে, নিউ অরলিন্স থেকে প্রায় ২৩০ কিলোমিটার পশ্চিমে অবস্থিত পেকান আইল্যান্ডে তারা বিশ্বের সবচেয়ে বড় মহাকাশবন্দর বানাতে যাচ্ছে। এর বাজেট ধরা হয়েছে পাক্কা ১০ হাজার কোটি ডলার!
আপনার মনে হতেই পারে, স্পেসএক্সের তো এমনিতেই টেক্সাসে বিশাল স্টারবেস আছে। ফ্লোরিডার কেপ ক্যানাভেরাল থেকেও তো তারা নিয়মিত রকেট ওড়াচ্ছে। তাহলে আবার নতুন জায়গার কী দরকার?
গত বছর বিশ্বের অন্য সব দেশ ও কোম্পানি মিলে মহাকাশে মোট যত ওজনের স্যাটেলাইট এবং যন্ত্রপাতি পাঠিয়েছে, স্পেসএক্স একাই পাঠিয়েছে তার চেয়ে চারগুণ বেশি!
ব্যাপারটা হলো, টেক্সাসের স্টারবেস জায়গাটা আসলে মাত্র ১৪০ হেক্টরের মতো, যা মাস্কের আকাশছোঁয়া স্বপ্নের তুলনায় একটা ছোটখাটো খেলার মাঠের চেয়ে বেশি কিছু নয়। অন্যদিকে ফ্লোরিডার স্পেস সেন্টারটি অনেকটা ব্যস্ত বাসস্ট্যান্ডের মতো হয়ে গেছে। সেখানে নাসাসহ আরও বেশ কয়েকটি কোম্পানির রকেট লঞ্চ প্যাড গাদাগাদি করে আছে। ইলন মাস্কের চাই এমন এক নির্জন ও বিশাল জায়গা, যেখানে কেউ তাকে বিরক্ত করবে না এবং পুরো এলাকাটি শুধু তারই থাকবে। তাই পেকান আইল্যান্ডের এই বিশাল জমি কেনা।
সবকিছু ঠিক থাকলে এই কমপ্লেক্সে স্পেসএক্সের দানবাকৃতির স্টারশিপ রকেট ওড়ানোর জন্য অন্তত ১০টি লঞ্চ প্যাড থাকবে।
শুধু তাই নয়, এর ভেতরেই থাকবে বিশাল সব জ্বালানির ট্যাংক, সমুদ্রগামী জাহাজের জন্য একটি গভীর জলের বন্দর এবং রকেটের যন্ত্রাংশ আনা-নেওয়ার জন্য আস্ত একটি বিমানবন্দর!
পেকান আইল্যান্ডে মাস্ক আসলে কী করতে চান? শুনলে আপনার চোখ কপালে উঠতে বাধ্য। তিনি চান, এই স্পেসপোর্ট থেকে প্রতিদিন অন্তত ৩০টি রকেট মহাকাশের উদ্দেশে উড়াল দেবে! অর্থাৎ, রকেট উৎক্ষেপণ ব্যাপারটা অনেকটা লোকাল বাসের মতো রুটিন কাজ হয়ে যাবে।
ইলন মাস্কের চাই এমন এক নির্জন ও বিশাল জায়গা, যেখানে কেউ তাকে বিরক্ত করবে না এবং পুরো এলাকাটি শুধু তারই থাকবে। তাই পেকান আইল্যান্ডের এই বিশাল জমি কেনা।
এত রকেট দিয়ে তিনি কী করবেন? এর প্রধান কারণ দুটি। প্রথমত, তাঁর ইন্টারনেট সেবা স্টারলিংকের হাজার হাজার স্যাটেলাইট মহাকাশে পাঠানো। দ্বিতীয় কারণটি আরও অদ্ভুত, মহাকাশে ডেটা সেন্টার বানানো! পৃথিবীতে বড় বড় ডেটা সেন্টার বানাতে বিশাল জায়গা লাগে, প্রচুর বিদ্যুতের বিল গুনতে হয়, আর আশপাশের মানুষজনও নানা রকম পরিবেশগত অভিযোগ তুলতে থাকে। কিন্তু মহাকাশে এসবের কোনো বালাই নেই। সেখানে অফুরন্ত সৌরবিদ্যুৎ একদম ফ্রি। আর সেখানে আপনার কাজের বিরুদ্ধে অভিযোগ করার মতো কোনো ঘ্যানঘ্যানে প্রতিবেশীও নেই!
ইলন মাস্কের পরিকল্পনা অনুযায়ী আগামী বছরই এই স্পেসপোর্টের নির্মাণকাজ শুরু হবে এবং ২০২৯ সালের মধ্যেই প্রথম রকেট উড়বে। যদিও মাস্কের দেওয়া সময়সীমা নিয়ে সবারই একটু সন্দেহ থাকে। কারণ তিনি বরাবরই একটু বেশিই আশাবাদী থাকেন। তবে তিনি যদি সত্যিই দিনে ৩০টি রকেট ওড়ানোর লক্ষ্যমাত্রা ছুঁতে পারেন, তবে স্পেসএক্স প্রতি বছর ২০ লাখ টন ওজনের পেলোড মহাকাশে পাঠাতে পারবে।
একটু তুলনা দিলেই বুঝবেন। ২০২৫ সালে তাদের লক্ষ্যমাত্রা যেখানে মাত্র ৩ হাজার ৮০০ টন, সেখানে ২০ লাখ টনের হিসাবটা কতটা অকল্পনীয়! এই হিসাব সত্যি হলে বাকি দুনিয়ার সব রকেট কোম্পানি হয়তো ধুলোয় মিশে যাবে।
স্পেসএক্সের স্টারশিপ রকেটগুলো জ্বালানি হিসেবে মিথেন গ্যাস ব্যবহার করে, যা প্রাকৃতিক গ্যাসের প্রধান উপাদান। একেকবার রকেট ওড়াতেই প্রায় ১ হাজার ৩০০ টন মিথেন লাগে!
অন্য জায়গা বাদ দিয়ে কেন লুইজিয়ানার কাদাজলে মহাকাশবন্দর
পেকান আইল্যান্ডের এই জায়গাটা বেছে নেওয়ার পেছনে ইলন মাস্কের জবরদস্ত কিছু ব্যবসায়িক অঙ্ক রয়েছে। প্রথমত, মহাকাশে ডেটা সেন্টারগুলোকে সবচেয়ে বেশি সৌরবিদ্যুৎ পেতে হলে সেগুলোকে পৃথিবীর দুই মেরুর ওপর দিয়ে ঘুরতে হবে। মানে হলো রকেটগুলোকে পূর্ব বা পশ্চিমে না ছুড়ে উত্তর বা দক্ষিণ দিকে ছুড়তে হবে। সুরক্ষার খাতিরে নিয়ন্ত্রক সংস্থাগুলো চায় রকেট যেন লোকালয়ের ওপর দিয়ে না গিয়ে সাগরের ওপর দিয়ে ওড়ে। লুইজিয়ানা থেকে সোজা দক্ষিণ দিকে রকেট ছুড়লে তা পুরোটাই সাগরের ওপর দিয়ে যাবে। এতে দুর্ঘটনার ঝুঁকি একেবারেই কমে যায়।
দ্বিতীয়ত, স্পেসএক্সের স্টারশিপ রকেটগুলো জ্বালানি হিসেবে মিথেন গ্যাস ব্যবহার করে, যা প্রাকৃতিক গ্যাসের প্রধান উপাদান। একেকবার রকেট ওড়াতেই প্রায় ১ হাজার ৩০০ টন মিথেন লাগে!
লুইজিয়ানার উপকূলে মেক্সিকো উপসাগরের তেল-গ্যাস উত্তোলনের জন্য আগে থেকেই বিশাল সব পাইপলাইন ও মজুত করার অবকাঠামো তৈরি করা আছে। ফলে এত বিশাল পরিমাণ জ্বালানি জোগাড় করা এখানে সবচেয়ে সহজ।
তা ছাড়া, টেক্সাসে স্পেসএক্সের যে বিশাল রকেট তৈরির কারখানা রয়েছে, সেখান থেকে মালবাহী জাহাজে করে বিশাল সব রকেটের যন্ত্রাংশ খুব সহজেই নৌপথে লুইজিয়ানার এই নতুন স্পেসপোর্টে নিয়ে আসা যাবে। সব মিলিয়ে ইলন মাস্কের ছক একদম নিখুঁত।