ইউরেনাস অভিযানে কি স্পেসএক্স নাসাকে সাহায্য করতে পারবে
সৌরজগতের একেবারে শেষের দিকের বরফে ঢাকা গ্রহগুলোর কথা ভাবলে কেমন একটা রহস্যময় অনুভূতি হয়, তাই না? বিশেষ করে ইউরেনাসের কথা যদি বলি। নাসার বিজ্ঞানীদের কাছে এই গ্রহটি এখন গবেষণার সবচেয়ে বড় লক্ষ্যবস্তু। কিন্তু সমস্যা হলো, আগামী ২০৩০-এর দশকের আগে সেখানে যাওয়ার কোনো পাকাপোক্ত পরিকল্পনা এখনো নাসার হাতে নেই!
তবে এই দেরি হওয়াটা হয়তো একদিক দিয়ে শাপে বর হতে পারে। কারণ, এর মধ্যে রকেট প্রযুক্তিতে বিশাল পরিবর্তন আসতে শুরু করেছে। আর এই পরিবর্তনের সবচেয়ে বড় চমক হলো স্পেসএক্সের স্টারশিপ রকেট! যুক্তরাষ্ট্রের ম্যাসাচুসেটস ইনস্টিটিউট অব টেকনোলজির একদল গবেষক সম্প্রতি দেখিয়েছেন, নাসার প্রস্তাবিত ইউরেনাস অভিযানে এই শক্তিশালী রকেটটি আক্ষরিক অর্থেই জাদুর মতো কাজ করতে পারে।
কেন ইউরেনাস এত রহস্যময়
বিজ্ঞানের জন্য এত গুরুত্বপূর্ণ হওয়া সত্ত্বেও ইউরেনাস নিয়ে মানুষের অভিযান হয়েছে খুবই কম। আজ থেকে প্রায় চার দশক আগে ভয়েজার ২ মহাকাশযান এই গ্রহের পাশ দিয়ে উড়ে গিয়েছিল। সেটাই প্রথম এবং শেষ অভিযান! সৌরজগতে ইউরেনাস এবং নেপচুন ছাড়া আর কোনো গ্রহ নেই, যেখানে আমরা কোনো মহাকাশযান পাঠাইনি।
অথচ ইউরেনাস গ্রহটি রহস্যে ভরপুর। এটি অন্যান্য গ্রহের মতো না ঘুরে, একেবারে পাশ ফিরে ঘোরে। অনেকটা লাটিমের শুয়ে শুয়ে ঘোরার মতো! এর চৌম্বকক্ষেত্রটাও খুব অদ্ভুতভাবে বাঁকানো। এর চারপাশের উপগ্রহগুলোর বরফের নিচে বিশাল সব সাগর লুকিয়ে থাকার সম্ভাবনাও আছে। তাই সেখানে একটা মহাকাশযান পাঠাতে পারলে শুধু আমাদের সৌরজগত নয়, মহাবিশ্বের অন্যান্য গ্রহ সম্পর্কেও অনেক অজানা তথ্য জানা যেত।
ইউরেনাস গ্রহটি রহস্যে ভরপুর। এটি অন্যান্য গ্রহের মতো না ঘুরে, একেবারে পাশ ফিরে ঘোরে। অনেকটা লাটিমের শুয়ে শুয়ে ঘোরার মতো! এর চৌম্বকক্ষেত্রটাও খুব অদ্ভুতভাবে বাঁকানো।
আসল সমস্যা হলো দূরত্ব
ইউরেনাসের সবচেয়ে বড় বাধা হলো, এটি পৃথিবী থেকে সূর্যের দূরত্বের চেয়েও ১৯ গুণ বেশি দূরে অবস্থিত! ভয়েজার ২-এর মতো মহাকাশযানের সেখানে পৌঁছাতেই প্রায় সাড়ে নয় বছর লেগেছিল। নাসার আগের হিসাব অনুযায়ী, সাধারণ রকেট দিয়ে অন্য গ্রহের মহাকর্ষ বল ব্যবহার করে ইউরেনাসে পৌঁছাতে প্রায় ১৩ বছরের বেশি সময় লাগার কথা। এই বিশাল সময় ধরে একটি মিশন চালানো মানে অনেক অনেক টাকার প্রয়োজন। তা ছাড়া ১৩ বছরে বিজ্ঞানীদের দলও বদলে যেতে পারে। তাই ইউরেনাসে যদি দ্রুত পৌঁছানো যায়, তাহলে সেটা সবার জন্যই ভালো।
স্টারশিপ কীভাবে হিসাব বদলে দেবে
এই বিপদ থেকেই নাসাকে বাঁচাতে পারে স্পেসএক্সের স্টারশিপ। সবকিছু ঠিকঠাক থাকলে এই দশকের শেষেই এটি পুরোপুরি ব্যবহারের জন্য প্রস্তুত হয়ে যাবে। স্টারশিপ শুধু অনেক বেশি ওজনই বইতে পারে না, এর আরও দুটি দারুণ ক্ষমতা আছে যা ইউরেনাসের উদ্দেশ্যে পাঠানো মিশনেকে আরও সহজ করে দেবে।
প্রথমটি হলো মহাকাশে জ্বালানি ভরার ক্ষমতা। সাধারণ রকেটকে পৃথিবী থেকেই সব জ্বালানি নিয়ে উড়তে হয়। কিন্তু স্টারশিপ মহাকাশে গিয়ে অন্য যান থেকে জ্বালানি নিতে পারবে। ফলে এটি আরও বেশি গতিতে ছুটে যাওয়ার সুযোগ পাবে।
দ্বিতীয় ক্ষমতাটি হলো, স্টারশিপ নিজেই একটি বিশাল ব্রেক হিসেবে কাজ করতে পারবে! এমআইটির গবেষকরা বলছেন, স্টারশিপকে মহাকাশযানের শরীর থেকে আলাদা না করে, সেটিসহ ইউরেনাসে পাঠানো যেতে পারে। ইউরেনাসের বায়ুমণ্ডলে ঢোকার সময় স্টারশিপের তাপ নিরোধক বর্মটি বাতাসের ঘর্ষণের মাধ্যমে মহাকাশযানের গতি কমিয়ে দেবে। একে বিজ্ঞানের ভাষায় বলে অ্যারোব্রেকিং।
সাধারণ রকেটকে পৃথিবী থেকেই সব জ্বালানি নিয়ে উড়তে হয়। কিন্তু স্টারশিপ মহাকাশে গিয়ে অন্য যান থেকে জ্বালানি নিতে পারবে। ফলে এটি আরও বেশি গতিতে ছুটে যাওয়ার সুযোগ পাবে।
১৩ বছরের যাত্রা নেমে আসবে অর্ধেকে!
মহাকাশে জ্বালানি ভরা এবং অ্যারোব্রেকিং প্রযুক্তির সাহায্যে ইউরেনাসে পৌঁছানোর সময় একেবারে অর্ধেক হয়ে যাবে! গবেষকেরা হিসাব করে দেখেছেন, এর মাধ্যমে মাত্র সাড়ে ৬ বছরেই ইউরেনাসে পৌঁছানো সম্ভব। পথে অন্য কোনো গ্রহের মহাকর্ষ বলের সাহায্যও লাগবে না। স্টারশিপ পাঠানোর খরচ একটু বেশি হলেও, যাত্রার সময় অর্ধেক কমে যাওয়ায় মিশনের পুরো খরচ অবিশ্বাস্যভাবে কমে যাবে।
অবশ্য এত আশার কথার পরও বাস্তবতা হলো, ইউরেনাস মিশনটি এখনো পরিকল্পনার কাগজেই বন্দী। স্টারশিপও এখনো অন্য গ্রহে অ্যারোব্রেকিং করার জন্য পুরোপুরি প্রস্তুত নয়। তবে ২০৩০-এর দশকের সুযোগ যদি আমরা হাতছাড়া করি, তবে পরের সুযোগটি আসবে ২০৪০-এর দশকের মাঝামাঝি সময়ে। তার মানে, ভয়েজার ২-এর পর আবার ইউরেনাসে যেতে মানুষের প্রায় ৭০ বছর লেগে যাবে!
মহাকাশপ্রেমী হিসেবে আমরা শুধু আশা করতে পারি, নাসা এবং সংশ্লিষ্ট সবাই মিলে দ্রুত এই রোমাঞ্চকর অভিযানের জন্য প্রস্তুত হবে। স্টারশিপ ব্যবহার হোক বা না হোক, এই অদ্ভুত সুন্দর বরফের গ্রহে আমাদের আবার ফিরে যেতেই হবে!