অরোরা: রূপকথার আলো নাকি বিজ্ঞানের খেলা

উত্তর মেরুর আকাশে মাঝরাতে জ্বলে ওঠে অলৌকিক আলো। লাল, নীল আর সবুজের ঢেউ খেলে যায় আকাশজুড়ে। এই রহস্যময় আলোর নাম অরোরা। কিন্তু এই আলো আসে কোথা থেকে? অদ্ভুত এই আলোর পেছনের আসল বিজ্ঞান…

অরোরাছবি: সিনিয়র এয়ারম্যান জশুয়া স্ট্র্যাং

ছোটবেলায় আমরা সবাই কমবেশি টম অ্যান্ড জেরি দেখেছি। এর একটা পর্বের কথা হয়তো অনেকের মনে আছে। টম আর জেরি উত্তর মেরুর বরফে এস্কিমো সেজে থাকে। টমের ধাওয়া খেয়ে জেরি উঠে যায় পাহাড়ের চূড়ায়। সেখানে গিয়ে সে দেখে এক অদ্ভুত দৃশ্য। রাতের আকাশজুড়ে ভেসে বেড়াচ্ছে সবুজ, লাল আর নীল রঙের আলোর ঢেউ। জেরি সেই আলো দিয়ে টমকে ভয় দেখায়।

আজ অনেক বছর পর ছোটবেলার সেই দৃশ্য মনে করলে প্রশ্ন জাগে, আকাশের ওই আলোগুলো আসলে কী ছিল? সেগুলো কি শুধুই কার্টুনের কল্পনা, নাকি বাস্তবেও এমন কিছুর অস্তিত্ব আছে? উত্তর—হ্যাঁ, বাস্তবে সত্যিই এমন আলোর অস্তিত্ব আছে। বিজ্ঞানের ভাষায় এই চমৎকার ঘটনার নাম অরোরা। বাংলায় একে বলে মেরুজ্যোতি। পৃথিবীর মেরু অঞ্চলে সচরাচর এটি দেখা যায়। এ কারণেই এর নামের সঙ্গে মেরুর সম্পর্ক।

নর্দার্ন লাইটস
ছবি: ফ্র্যাঙ্ক ওলসেন/গেটি ইমেজে

স্ক্যান্ডিনেভিয়ান দেশগুলো, আলাস্কা ও কানাডার মতো উত্তর মেরু অঞ্চলের দেশগুলোকে বলে নর্দার্ন লাইটস বা অরোরা বোরিয়ালিস। আর অস্ট্রেলিয়া, নিউজিল্যান্ড বা আর্জেন্টিনার কাছাকাছি দক্ষিণ মেরু অঞ্চলে বলে সাউদার্ন লাইটস বা অরোরা অস্ট্রোলেস।

নামটির উৎস বেশ কাব্যিক। রোমানদের প্রভাতের দেবী অরোরার নাম থেকে এটি এসেছে। বোরিয়ালিস শব্দটি এসেছে গ্রিক পুরাণের উত্তরের বায়ুর দেবতা বোরিয়াস থেকে। আর অস্ট্রালিস শব্দটির অর্থ দক্ষিণ। অবশ্য এই নামগুলো আধুনিক কালে ইউরোপীয় বিজ্ঞানীদের দেওয়া। তারও বহু আগে অস্ট্রেলিয়া ও নিউজিল্যান্ডের আদিবাসীরা অরোরাকে আগুনের সঙ্গে তুলনা করত। তারা একে আকাশের আগুন বলে মনে করত।

আরও পড়ুন
রোমানদের প্রভাতের দেবী অরোরার নাম থেকে এটি এসেছে। বোরিয়ালিস শব্দটি এসেছে গ্রিক পুরাণের উত্তরের বায়ুর দেবতা বোরিয়াস থেকে। আর অস্ট্রালিস শব্দটির অর্থ দক্ষিণ।

স্বাভাবিকভাবেই প্রশ্ন আসে, এই মেরুজ্যোতি আসলে ঘটে কীভাবে? এর উত্তর বুঝতে হলে তিনটি বিষয় সম্পর্কে ধারণা থাকতে হবে: সৌরবায়ু, পৃথিবীর চৌম্বকক্ষেত্র এবং পৃথিবীর বায়ুমণ্ডল।

শুরু করা যাক সূর্য থেকে। সূর্য এবং অন্য সব নক্ষত্র মূলত প্লাজমা দিয়ে তৈরি। সূর্যের তাপমাত্রা এতটাই বেশি যে পরমাণুর ইলেকট্রনগুলো সেখানে আর পরমাণুর সঙ্গে আবদ্ধ থাকতে পারে না। ফলে পরমাণুগুলো আয়নিত অবস্থায় থাকে।

সূর্য মূলত প্লাজমা দিয়ে তৈরি
ছবি: গেটি ইমেজ

সূর্যের বাইরের স্তরে থাকা এই চার্জযুক্ত কণাগুলো ক্রমাগত মহাকাশে ছড়িয়ে পড়ে। এই কণার প্রবাহকেই বলা হয় সৌরবায়ু। কিন্তু এই সৌরবায়ু পৃথিবীতে এসে কীভাবে প্রভাব ফেলে? সেটা বুঝতে হলে জানতে হবে পৃথিবীর চৌম্বকক্ষেত্র সম্পর্কে।

আমরা জানি, একটি দণ্ড চুম্বককে সুতোয় ঝুলিয়ে দিলে সেটি উত্তর–দক্ষিণ দিকে মুখ করে থাকে। কারণ, পৃথিবী নিজেই একটি বিশাল চুম্বকের মতো আচরণ করে। পৃথিবীর কেন্দ্রে রয়েছে গলিত লোহা। পৃথিবীর ঘূর্ণন এবং অভ্যন্তরীণ গতির কারণে এই লোহা সব সময় চলমান থাকে। ফলে পৃথিবীর চারপাশে একটি শক্তিশালী চৌম্বকক্ষেত্র তৈরি হয়। এই ক্ষেত্রটি মেরু অঞ্চলে সবচেয়ে শক্তিশালী।

আরও পড়ুন
সূর্য এবং অন্য সব নক্ষত্র মূলত প্লাজমা দিয়ে তৈরি। সূর্যের তাপমাত্রা এতটাই বেশি যে পরমাণুর ইলেকট্রনগুলো সেখানে আর পরমাণুর সঙ্গে আবদ্ধ থাকতে পারে না।

এখন প্রশ্ন হলো, এই চৌম্বকক্ষেত্রের মধ্য দিয়ে যদি কোনো চার্জযুক্ত কণা প্রবেশ করে, তবে তার কী হয়? একটি চার্জযুক্ত কণা যখন চৌম্বকক্ষেত্রের মধ্যে ঢোকে, তখন সেটি একটি বল অনুভব করে। ফলে কণাটি সরল পথে না গিয়ে বক্রাকার পথে বা পেঁচিয়ে ঘুরতে থাকে।

যেহেতু সৌরবায়ুর কণাগুলো চার্জযুক্ত এবং পৃথিবীর একটি শক্তিশালী চৌম্বকক্ষেত্র রয়েছে, তাই এই কণাগুলো পৃথিবীর কাছে এসে বক্র পথে আটকে পড়ে। শেষ পর্যন্ত তারা পৃথিবীর বায়ুমণ্ডলের ওপরের স্তরের সংস্পর্শে আসে।

এখানেই শুরু হয় আসল আলোর খেলা। পরমাণুর ইলেকট্রনগুলো নির্দিষ্ট শক্তিস্তরে অবস্থান করে। স্বাভাবিক অবস্থায় তারা সর্বনিম্ন শক্তিস্তরে থাকে। কিন্তু যখন কোনো পরমাণু সৌরবায়ুর উচ্চ শক্তিসম্পন্ন কণার সঙ্গে সংঘর্ষে আসে, তখন তার ইলেকট্রন শক্তি নিয়ে লাফ দিয়ে ওপরের স্তরে উঠে যায়। একে বলা হয় উত্তেজিত অবস্থা।

পরমাণুর ইলেকট্রনগুলো নির্দিষ্ট শক্তিস্তরে অবস্থান করে
ছবি: মিডজার্নির সাহায্যে তৈরি

তবে এই অবস্থা বেশিক্ষণ টেকে না। ইলেকট্রন খুব দ্রুত আবার নিজের পুরোনো জায়গায় বা নিম্ন শক্তিস্তরে ফিরে আসে। এই ফিরে আসার সময় অতিরিক্ত শক্তিটুকু সে ফোটন বা আলো আকারে বের করে দেয়।

কোন গ্যাস থেকে আলো বের হচ্ছে, তার ওপর রঙের ধরন নির্ভর করে। বায়ুমণ্ডলের ওপরের স্তরে থাকা অক্সিজেন ও নাইট্রোজেন পরমাণু থেকে নির্গত এই আলোগুলোই আমাদের চোখে ধরা পড়ে সবুজ, লাল কিংবা নীল রঙের অরোরা হিসেবে।

আরও পড়ুন
যখন কোনো পরমাণু সৌরবায়ুর উচ্চ শক্তিসম্পন্ন কণার সঙ্গে সংঘর্ষে আসে, তখন তার ইলেকট্রন শক্তি নিয়ে লাফ দিয়ে ওপরের স্তরে উঠে যায়। একে বলা হয় উত্তেজিত অবস্থা।

আগেই বলা হয়েছে, এই ঘটনা মেরু অঞ্চলে বেশি দেখা যায়। কারণ সেখানেই পৃথিবীর চৌম্বকক্ষেত্র সবচেয়ে শক্তিশালী। বাংলাদেশের ভৌগোলিক অবস্থান বিষুবরেখার কাছাকাছি হওয়ায় এখান থেকে মেরুজ্যোতি দেখা প্রায় অসম্ভব। এটা দেখতে হলে যেতে হবে নরওয়ে, কানাডা, আলাস্কা কিংবা অ্যান্টার্কটিকার মতো দূরবর্তী অঞ্চলে।

অরোরা
ছবি: উইকিপিডিয়া

তবুও জীবনে যদি কখনো সেই সৌভাগ্য হয়, যদি কোনো রাতে হঠাৎ আকাশজুড়ে রঙিন আলোর ঢেউ নাচতে দেখা যায়, তখন মুগ্ধ দৃষ্টিতে আকাশের দিকে তাকিয়ে একটা কথা মনে করতে পারেন—মেরুজ্যোতি যতটা সুন্দর, তার পেছনের বিজ্ঞানটাও ঠিক ততটাই সুন্দর।

লেখক: শিক্ষার্থী, পদার্থবিজ্ঞান বিভাগ, ঢাকা বিশ্ববিদ্যালয়

আরও পড়ুন