প্রথমবারের মতো সৌরপৃষ্ঠে দেখা গেছে প্লাজমা ঢেউ

ইনোউয়ে সৌর দূরবীক্ষণ যন্ত্রে ৪১৬ ন্যানোমিটার তরঙ্গদৈর্ঘ্যে তোলা সূর্যের দৃশ্যমান পৃষ্ঠের (ফটোস্ফিয়ার) এখন পর্যন্ত সবচেয়ে উচ্চ রেজল্যুশনের ছবিছবি: এনএসএফ/এনএসও/এউআরএ/এমপিএস

হাওয়াই দ্বীপপুঞ্জে বসানো বিশ্বের সবচেয়ে বড় সৌর টেলিস্কোপের লেন্সে সম্প্রতি এমন কিছু ধরা পড়েছে, যা জ্যোতির্বিজ্ঞানের ইতিহাসে রীতিমতো এক যুগান্তকারী ঘটনা। বিজ্ঞানীরা প্রথমবারের মতো সূর্যের অশান্ত পৃষ্ঠের একেবারে নিখুঁত ও স্পষ্ট ছবি তুলতে সক্ষম হয়েছেন। ছবিগুলো এতটাই নিখুঁত যে, সেখানে মাত্র ২০ কিলোমিটার চওড়া প্লাজমার ছোট ছোট ঢেউও স্পষ্টভাবে দেখা যাচ্ছে। এই আবিষ্কারের বিশালত্ব বোঝাতে গিয়ে বিজ্ঞানীরা চমৎকার একটি তুলনা টেনেছেন—এটি অনেকটা ৭৪ মাইল দূর থেকে একটি ছোট্ট কয়েনের ওপর থাকা মানুষের মুখচ্ছবি চিনে ফেলার মতো কঠিন কাজ!

বিজ্ঞান সাময়িকী নেচার-এ প্রকাশিত নতুন এই গবেষণাপত্রটি সৌরবিজ্ঞানের অনেক অজানা দরজা খুলে দিয়েছে। সূর্যের যে অংশটুকু আমরা দেখি, তাকে বলা হয় ফটোস্ফিয়ার। এই অংশটা মোটেও শান্ত কোনো জায়গা নয়, বরং এটি তরল প্লাজমায় টগবগ করে ফুটতে থাকা এক ভয়ংকর পরিবেশ। আমরা পৃথিবীতে বসে সূর্যের যে আলো দেখি, তা মূলত এখানকার এই তরল প্লাজমা থেকেই নির্গত হয়।

প্রচণ্ড তাপের স্রোত ও শক্তিশালী চৌম্বক ক্ষেত্রের কারণে এই ফটোস্ফিয়ারে সারাক্ষণই ফুটন্ত পানির বুদবুদের মতো নকশা তৈরি হতে থাকে। বিজ্ঞানের ভাষায় এদের বলা হয় গ্রানিউলস। নাম শুনে এগুলোকে ছোটখাটো দানার মতো মনে হলেও, বাস্তবে একেকটি গ্রানিউল ৩১০ থেকে ১ হাজার ২৪০ মাইল পর্যন্ত চওড়া হতে পারে! অসংখ্য গ্রানিউলস গায়ে গায়ে লেগেই মূলত সূর্যের বাইরের দৃশ্যমান আবরণটি তৈরি করেছে।

আরও পড়ুন
প্রচণ্ড তাপের স্রোত ও শক্তিশালী চৌম্বক ক্ষেত্রের কারণে এই ফটোস্ফিয়ারে সারাক্ষণই ফুটন্ত পানির বুদবুদের মতো নকশা তৈরি হতে থাকে। বিজ্ঞানের ভাষায় এদের বলা হয় গ্রানিউলস।

লাখ লাখ মাইল দূর থেকে এই বুদবুদগুলোর ভেতরের সূক্ষ্ম কাঠামো দেখাটা আক্ষরিক অর্থেই এক অসাধ্য সাধন। হাওয়াইয়ের ড্যানিয়েল কে. ইনোয়ে সোলার টেলিস্কোপ থেকে পাওয়া বিপুল পরিমাণ ডেটা এবং জার্মানির ম্যাক্স প্ল্যাঙ্ক ইনস্টিটিউট ফর সোলার সিস্টেম রিসার্চের ব্রডব্যান্ড ক্যামেরার ছবি এক করে বিজ্ঞানীরা এই অসম্ভবকে সম্ভব করেছেন।

সবচেয়ে চমকপ্রদ ব্যাপারটি ঘটেছে গ্রানিউলসগুলোর প্রান্তসীমা বিশ্লেষণ করতে গিয়ে। বিজ্ঞানীরা সেখানে কেলভিন-হেলমহোল্টজ ইনস্টেবিলিটির স্পষ্ট প্রমাণ পেয়েছেন। ফ্লুইড ডায়নামিক্স বা প্রবাহী বলবিদ্যার এই খটমটে নামটা শুনে ঘাবড়ে যাওয়ার কিছু নেই। বিষয়টি খুব সহজ। একটি শান্ত নদীর ওপর দিয়ে যখন প্রচণ্ড বেগে বাতাস বয়ে যায়, তখন বাতাস আর পানির গতির পার্থক্যের কারণে নদীর পৃষ্ঠে যেমন ছোট ছোট ঢেউ তৈরি হয়, ঠিক একই ঘটনা ঘটছে সূর্যের পৃষ্ঠেও!

সূর্যের বুকে যখন দুটি ভিন্ন গতির প্লাজমার স্রোত একে অপরের গা ঘেঁষে ছুটে যায়, তখন তাদের এই গতির পার্থক্যের কারণে ছোটখাটো ঘর্ষণ থেকে ভয়ংকর সব ঢেউ ও ঘূর্ণির সৃষ্টি হয়। পৃথিবীর হ্রদ কিংবা বৃহস্পতির মতো গ্যাসীয় গ্রহের বায়ুমণ্ডলে এমন ঢেউয়ের দেখা প্রায়ই মেলে। কিন্তু খোদ সূর্যের বুকেই যে এমন তরঙ্গের খেলা চলে, তা এবারই প্রথম এতটা স্পষ্টভাবে প্রমাণিত হলো।

আরও পড়ুন
একটি শান্ত নদীর ওপর দিয়ে যখন প্রচণ্ড বেগে বাতাস বয়ে যায়, তখন বাতাস আর পানির গতির পার্থক্যের কারণে নদীর পৃষ্ঠে যেমন ছোট ছোট ঢেউ তৈরি হয়, ঠিক একই ঘটনা ঘটছে সূর্যের পৃষ্ঠেও!

ম্যাক্স প্ল্যাঙ্ক ইনস্টিটিউটের পরিচালক ও এই গবেষণার সহ-লেখক সামি সোলাঙ্কি জানিয়েছেন, প্লাজমার এই খুদে ঘূর্ণিগুলো সূর্যের সামগ্রিক চরিত্র নির্ধারণে কতটা বিশাল ভূমিকা রাখে, তা সত্যিই অবাক করার মতো। তবে এই রহস্যের পর্দা তোলা মোটেও সহজ ছিল না। গবেষক মিশিয়েল ভ্যান নর্টের মতে, সূর্যের বুকে মাত্র ২০ কিলোমিটার আকারের কোনো কাঠামোর খোঁজ পাওয়াটা বর্তমানের অত্যাধুনিক প্রযুক্তি ও বিশ্বের সবচেয়ে বড় টেলিস্কোপেরও একেবারে চূড়ান্ত সীমার একটি কাজ। এই অভাবনীয় সাফল্য আমাদের বুঝিয়ে দিল, বিশাল সৌরজগতের রহস্য বুঝতে হলে কখনো কখনো একদম ক্ষুদ্র জিনিসের দিকেও গভীর মনোযোগ দিতে হয়।

সূত্র: পপুলার সায়েন্স

আরও পড়ুন