প্রলয়ংকরী সৌরঝড়ের নেপথ্যে কি চুম্বকীয় তুষারঝড়
সম্প্রতি ইউরোপীয় স্পেস এজেন্সি ইসার সোলার অরবিটার এবং নাসার চন্দ্র এক্সরে অবজারভেটরির প্রকাশিত এক ভিডিওতে সৌরপৃষ্ঠে এক অদ্ভুত দৃশ্য ধরা পড়েছে। বিজ্ঞানীরা এর নাম দিয়েছেন ম্যাগনেটিক অ্যাভালেন্স। বাংলায় বলা যায় চুম্বকীয় তুষারঝড়। ধারণা করা হচ্ছে, প্রলয়ংকরী সৌরঝড়ের নেপথ্যে রয়েছে এই বিশেষ প্রক্রিয়া।
প্রসঙ্গত, গত ১৮ ও ১৯ জানুয়ারি বিশ্ববাসী এক তীব্র সৌরঝড়ের সাক্ষী হয়েছে। বিজ্ঞানীরা পরিমাপ করে দেখেছেন, সৌরঝড় পরিমাপক স্কেলে এর মাত্রা ছিল ৪। গত ২৩ বছরে এত তীব্র সৌরঝড় আর দেখা যায়নি। অ্যাস্ট্রোনমি অ্যান্ড অ্যাস্ট্রোফিজিক্স জার্নালে সদ্য প্রকাশিত এই গবেষণার ভিত্তি ছিল ২০২৪ সালের একটি পর্যবেক্ষণ। সে বছর ৩০ সেপ্টেম্বর সোলার অরবিটার যখন সূর্যের খুব কাছাকাছি পৌঁছায়, তখনই ভিডিওটি রেকর্ড করা হয়েছিল।
সৌরজগতে সচরাচর যে ধরনের বিস্ফোরণ লক্ষ করা যায়, তার মধ্যে সৌরঝড় অন্যতম। কিন্তু কেন সৃষ্টি হয় এই ঝড়? বিজ্ঞানীদের দাবি, শক্তিশালী এই সৌরঝড়ের পেছনে মূল কারিগর হলো চুম্বকীয় তুষারঝড়। সূর্যের চৌম্বক ক্ষেত্রটির প্রকৃতি বেশ জটিল, অনেকটা টান টান জালের মতো। সূর্যের দ্রুত ঘূর্ণনের কারণে চৌম্বক বলরেখাগুলো রাবার ব্যান্ডের মতো পেঁচিয়ে জট পাকিয়ে যায়। এদিকে সূর্যের ভেতরে রয়েছে উত্তপ্ত জ্বলন্ত প্লাজমা, যা চৌম্বক বলরেখার ওপর ক্রমাগত চাপ সৃষ্টি করে। ক্রমবর্ধমান এই চাপের কারণে বলরেখাগুলো প্রসারিত হতে হতে একসময় ছিঁড়ে যায়। ঠিক যেন টান টান করা রাবার ব্যান্ড ছিঁড়ে যাওয়ার মতো ঘটনা। বলরেখাগুলো মুক্ত হওয়ার পরপরই আবার অন্য রেখার সঙ্গে যুক্ত হয়। বিজ্ঞানের ভাষায় এটি ম্যাগনেটিক রিকানেকশন বা চৌম্বকীয় পুনঃসংযোগ নামে পরিচিত। নবগঠিত এই চৌম্বকীয় পুনর্বিন্যাসের কারণে সূর্যের ভেতরে প্লাজমা প্রচণ্ড উত্তপ্ত হয় এবং সেকেন্ডে প্রায় এক হাজার কিলোমিটার বেগে তীব্রভাবে বেরিয়ে আসে।
বিজ্ঞানীদের দাবি, শক্তিশালী এই সৌরঝড়ের পেছনে মূল কারিগর হলো চুম্বকীয় তুষারঝড়। সূর্যের চৌম্বক ক্ষেত্রটির প্রকৃতি বেশ জটিল, অনেকটা টান টান জালের মতো।
একের পর এক পুনর্বিন্যাসের ফলে একটি শৃঙ্খল চেইন রিয়েকশনের সৃষ্টি হয়। এর প্রতিটি ধাপে নির্গত শক্তি পার্শ্ববর্তী অঞ্চলগুলোকে প্রভাবিত করে। ক্রমান্বয়ে এই শৃঙ্খল বিক্রিয়ার বিস্তার ঘটায় এবং কয়েক মিনিটের মধ্যে প্লাজমার তাপমাত্রা মিলিয়ন ডিগ্রিতে পৌঁছায়। তখন সূর্যের বাইরের করোনা অঞ্চল থেকে ইলেকট্রন, প্রোটন ও কিছু ভারী নিউক্লীয় পদার্থ প্রচণ্ড বেগে (সেকেন্ডে প্রায় ১৭০০ কিলোমিটার) বেরিয়ে আসে। একে বলা হয় করোনাল মাস ইজেকশন বা সিএমই।
সৌরঝড়ের নেপথ্যের চালক কে, এই প্রশ্নের উত্তর খুঁজতেই চারটি সোলার অরবিটার যন্ত্রের পর্যবেক্ষণে এই বিরল তথ্য উঠে এসেছে। মাত্র একটি শিখার জন্ম থেকে বিরাট সৌরঝড় সৃষ্টির পূর্বমুহূর্ত পর্যন্ত পুরো প্রক্রিয়াই ধরতে পেরেছে যন্ত্রগুলো। সোলার অরবিটারের এক্সট্রিম আল্ট্রাভায়োলেট ইমেজার (ইইউআই) সূর্যের বাইরের বায়ুমণ্ডল অর্থাৎ করোনার বিশদ চিত্র ধারণ করে। কোনো সৌরশিখা জন্মানোর পর থেকে প্রতি দুই সেকেন্ড অন্তর কী পরিবর্তন হচ্ছে, তাও পর্যবেক্ষণ করে এই ইইউআই।
মহাকাশের আবহাওয়া বুঝতে হলে উচ্চশক্তি সম্পন্ন এক্স-রশ্মির বিশ্লেষণ জরুরি। ত্বরিত কণাগুলো কোথায় তাদের শক্তি মুক্ত করবে, সে বিষয়ে আগাম পূর্বাভাস দিতে পারে একমাত্র এক্স-রশ্মি। উচ্চ গতিসম্পন্ন এই কণাগুলো একবার মহাকাশে ছড়িয়ে পড়লে উপগ্রহ, নভোচারী এবং এমনকি পৃথিবীর যোগাযোগ ব্যবস্থার জন্য চরম ঝুঁকির কারণ হতে পারে।
প্রায় ৪০ মিনিটের বেশি সময় ধরে সৌরঝড় গঠনের প্রক্রিয়া বিশ্লেষণ করতে গিয়ে বিজ্ঞানীরা দেখেন, বড় কোনো একক বিস্ফোরণের জন্য ভয়ংকর সৌরঝড়ের সৃষ্টি হয় না। বরং এর পেছনে রয়েছে অনেক ছোট ছোট পুনঃসংযোগের ঘটনা। এগুলো একে অপরের সঙ্গে মিথস্ক্রিয়া করে এবং একটি শক্তিশালী ক্যাসকেড বা প্রপাত গঠন করে। এর পোশাকি নাম ম্যাগনেটিক অ্যাভালেন্স।
মহাকাশের আবহাওয়া বুঝতে হলে উচ্চশক্তি সম্পন্ন এক্স-রশ্মির বিশ্লেষণ জরুরি। ত্বরিত কণাগুলো কোথায় তাদের শক্তি মুক্ত করবে, সে বিষয়ে আগাম পূর্বাভাস দিতে পারে একমাত্র এক্স-রশ্মি।
এই চুম্বকীয় তুষারপাত আহিত কণাগুলোকে আরও ত্বরান্বিত করে। ফলে ইলেকট্রনগুলো চৌম্বকীয় লুপে ঘুরতে থাকে এবং এক্স-রে নির্গত করে। আহিত মানে কোনো বস্তু বা কণার মধ্যে বৈদ্যুতিক আধান বা চার্জ থাকা। নাসার চন্দ্র এক্স-রে অবজারভেটরি যখন উত্তপ্ত প্লাজমাগুলো পরীক্ষা করছিল, তখন এর তীব্রতা সম্পর্কে ধারণা পাওয়া যায়। সহজ কথায়, ক্রমাগত ঘটে চলা ছোট ছোট পুনঃসংযোগ বিক্রিয়ার ফলেই চুম্বকীয় তুষারঝড়ের সূত্রপাত ঘটে ও প্রচুর পরিমাণে শক্তি নির্গত করে। যার চূড়ান্ত ফল এই বিরাট সৌরঝড়।
গত ১৮ জানুয়ারি সূর্য থেকে নির্গত ‘সিএমই’ পরদিন অর্থাৎ ১৯ জানুয়ারি ঠিক দুপুর ২টা ৩৮ মিনিটে পৃথিবীর চৌম্বকমণ্ডলে আঘাত করে। ফলে একটি জি৪ মাত্রার ভূ-চৌম্বকীয় ঝড়ের সৃষ্টি হয়। ন্যাশনাল ওশেনিক অ্যান্ড অ্যাটমোস্ফেরিক অ্যাডমিনিস্ট্রেশনের স্পেস ওয়েদার প্রেডিকশন সেন্টার জানায়, ওই দিন সন্ধ্যা পর্যন্ত সৌরবায়ুর গতিবেগ ছিল সেকেন্ডে প্রায় ১০০০ কিলোমিটার। সেই সময়ে কৃত্রিম উপগ্রহগুলোতে খুব শক্তিশালী এস৪ সৌর বিকিরণ ঝড় আঘাত হানে। এটি ২০০৩ সালের হ্যালোইন ঝড়ের চেয়েও শক্তিশালী ছিল।
মহাশূন্যে উচ্চশক্তির প্রোটনের স্রোতের কারণে হাই ফ্রিকোয়েন্সি রাডার সাময়িকভাবে কাজ করা বন্ধ করে দেয়। এই সময় পৃথিবীর মেরু অঞ্চল এবং ফ্রান্স, জার্মানি ও যুক্তরাষ্ট্রে বর্ণিল মেরুপ্রভা বা অরোরার দেখা মেলে। আহিত কণাগুলোর সঙ্গে বায়ুমণ্ডলের সংঘাতের কারণেই আকাশকে সবুজ এবং বেগুনি দেখায়। সৌরঝড় নিয়ে পদার্থবিজ্ঞানীরা অনেক দিন ধরেই গবেষণা চালিয়ে যাচ্ছেন। কিন্তু ঠিক কী কারণে মাত্র কয়েক মিনিটের মধ্যে কয়েক হাজার হাইড্রোজেন বোমার সমতুল্য শক্তির উদ্গিরণ হয়, তা এতদিন অজানা ছিল। চুম্বকীয় তুষারঝড়ের এই আবিষ্কার সেই রহস্যের জট কিছুটা খুলতে পেরেছে বলে মনে করছেন বিশেষজ্ঞরা।