বরফ কাচের মতো স্বচ্ছ হলেও তুষার কেন ধবধবে সাদা
বরফ যদি কাঁচের মতো স্বচ্ছ হয়, তবে তুষার কেন ধবধবে সাদা? রক্তের রং লাল, আকাশের রং নীল, কিন্তু তুষারের কোনো নিজস্ব রং নেই কেন? মেরু অঞ্চলে বরফ কেন মাঝেমধ্যে গোলাপি বা নীল দেখায়? এই সাদা বরফের দিকে তাকালে কেন অন্ধ হয়ে যেতে পারেন আপনি? চলুন প্রশ্নগুলোর উত্তর জানা যাক।
তুষারপাতের কথা বললেই চোখের সামনে ভেসে ওঠে ধবধবে সাদা এক প্রান্তর। রক্তের রং যেমন লাল, সমুদ্রের রং যেমন নীল, তুষারের রংও তো সাদাই হওয়ার কথা। কিন্তু মজার ব্যাপার হলো, তুষার আসলে সাদা নয়! বিশ্বাস হচ্ছে না? বিজ্ঞান কিন্তু বলছে, তুষার হলো ছোট ছোট বরফকুচি। আর বরফ বা পানি তো স্বচ্ছ। তাহলে এই স্বচ্ছ বরফকুচিগুলো আকাশ থেকে পড়ার সময় সাদা দেখায় কেন?
এর পেছনে আছে আলোর জাদুকরী ভেলকি। চলুন, বিশেষজ্ঞদের কাছ থেকে জেনে নেওয়া যাক এই সাদা রঙের রহস্য।
তুষার আসলে কী
তুষার কেন সাদা, তা জানার আগে জানতে হবে তুষার জিনিসটা আসলে কী। তুষার কিন্তু সাধারণ বরফ ছাড়া আর কিছু নয়। মজার ব্যাপার হলো, সব বৃষ্টিই আসলে তুষার হয়ে জন্মায়! আকাশের অনেক উঁচুতে মেঘের মধ্যে যখন জন্ম হয়, তখন সব বৃষ্টিই থাকে বরফ। কিন্তু নিচে নামার সময় গরম বাতাসের স্তর পার হলে সেটা গলে পানি বা বৃষ্টি হয়ে ঝরে। কিন্তু আকাশ থেকে মাটি পর্যন্ত পুরো রাস্তাটাই যদি ঠান্ডা থাকে? তখনই সেটা ও আর গলে না, তুষার হয়ে ঝরে পড়ে।
তুষার কেন সাদা, তার উত্তর লুকিয়ে আছে তুষারবিন্দুর গঠনের মধ্যে। আকাশ থেকে পড়ার সময় ওদের রাস্তায় অনেক জ্যাম থাকে! মানে বাতাসে থাকে প্রচুর ধূলিকণা ও ময়লা। পানির কণা যখন জমে বরফ হতে শুরু করে, তখন এই ধূলিকণাকে কেন্দ্র করে জমতে থাকে। এরপর নিচে পড়ার সময় আরও জলীয় বাষ্প এর সঙ্গে মিশে জমে যায়। পানির অণুগুলো জমার সময় অদ্ভুত এক ষড়ভুজ বা ছয় কোণা আকৃতি তৈরি করে। এই জ্যামিতিক গঠনের কারণেই তুষার আয়নার মতো আলো প্রতিফলন করতে পারে।
সব বৃষ্টিই আসলে তুষার হয়ে জন্মায়! আকাশের অনেক উঁচুতে মেঘের মধ্যে যখন জন্ম হয়, তখন সব বৃষ্টিই থাকে বরফ। কিন্তু নিচে নামার সময় গরম বাতাসের স্তর পার হলে সেটা গলে বৃষ্টি হয়ে ঝরে।
রঙের আসল খেলাটা এখানেই। তুষারের সাদা রহস্য সমাধান করতে হলে সূর্যের দিকে তাকাতে হবে। আমরা জানি, সূর্যের আলোয় রংধনুর সাতটি রং লুকিয়ে আছে। এই সবগুলো রং যখন একসঙ্গে মিশে থাকে, তখন আমরা সেটাকে সাদা আলো হিসেবে দেখি। সূর্যের আলো যখন ওই হীরার মতো তুষারকণার ওপর পড়ে, তখন তুষার সেই আলোকে প্রিজমের মতো সব দিকে ছড়িয়ে দেয়। একে বলে আলোর বিচ্ছুরণ।
যেহেতু তুষারকণাগুলো কোনো নির্দিষ্ট রং শোষণ করে না, বরং সব রংকেই সমানভাবে সব দিকে প্রতিফলিত করে, তাই আমাদের চোখ সেটাকে সাদা হিসেবে দেখে। এখন প্রশ্ন করতে পারো, বাসার ফ্রিজের বরফ তো স্বচ্ছ, তাহলে তুষার কেন স্বচ্ছ নয়? এর কারণ হলো ভাঙা আয়না ইফেক্ট। একটা আস্ত বরফের টুকরো আলোকে সোজা ভেতরে ঢুকতে দেয়, তাই সেটা স্বচ্ছ। কিন্তু তুষার হলো হাজার হাজার ছোট বরফকুচির সমষ্টি। হাজারটা ভাঙা আয়নার টুকরোকে একসঙ্গে রাখলে যেমন আলো এলোমেলোভাবে ঠিকরে বের হয়, তুষারের ক্ষেত্রেও তাই ঘটে। তাই এটি সাদা দেখায়।
সূর্যের আলো যখন ওই হীরার মতো তুষারকণার ওপর পড়ে, তখন তুষার সেই আলোকে প্রিজমের মতো সব দিকে ছড়িয়ে দেয়। একে বলে আলোর বিচ্ছুরণ।
তুষার কি অন্য রঙের হতে পারে
অবশ্যই পারে! তুষার সব সময় সাদা হয় না। পরিবেশ ও উপাদানের ওপর ভিত্তি করে এর রং বদলাতে পারে। বাতাসে ধুলোবালি বা বালুকণা থাকলে তুষার সোনালি বা বাদামি হতে পারে। যুক্তরাষ্ট্রের ক্যালিফোর্নিয়া বা আল্পস পর্বতে অনেক সময় গোলাপি বা লালচে তুষার দেখা যায়। একে বলে ওয়াটারমেলন স্নো। Chlamydomonas nivalis নামে একধরনের শৈবালের কারণে ওখানে তুষার এমন দেখায়। এই শৈবাল নিজেকে সূর্যের অতিবেগুনি রশ্মি থেকে বাঁচাতে লাল রঙের একধরনের রঞ্জক তৈরি করে। অনেকটা সানস্ক্রিনের মতো! তাই বরফ লালচে দেখায়।
অ্যান্টার্কটিকায় অনেক সময় বরফ গোলাপি হয় পেঙ্গুইনের মলের কারণে! পেঙ্গুইনরা ক্রিল নামে একধরনের চিংড়ি খায় বলে তাদের মলের রং হয় গোলাপি। এর কারণে বরফও গোলাপি দেখায়। হিমবাহের বরফ অনেক সময় নীল দেখায়। কারণ, সেখানকার বরফ খুব ঘন ও জমাটবদ্ধ থাকে। এই ঘন বরফ আলোর লাল ও হলুদ রং শুষে নেয়, কিন্তু নীল রং প্রতিফলিত করে।
বিজ্ঞানীরা তুষারের এই প্রতিফলন ক্ষমতাকে মাপেন অ্যালবেডো দিয়ে। কোনো জিনিস আলো কতটা প্রতিফলন করতে পারে, তার মাপকাঠি এটি। ১ মানে ১০০ শতাংশ প্রতিফলন বা ধবধবে সাদা। আর ০ মানে কোনো প্রতিফলন নেই, মানে কুচকুচে কালো।
অ্যান্টার্কটিকায় অনেক সময় বরফ গোলাপি হয় পেঙ্গুইনের মলের কারণে! পেঙ্গুইনরা ক্রিল নামে একধরনের চিংড়ি খায় বলে তাদের মলের রং হয় গোলাপি। এর কারণে বরফও গোলাপি দেখায়।
তাজা তুষারের অ্যালবেডো প্রায় ০.৮৫ বা তার বেশি। অর্থাৎ এটি প্রায় ৮৫ শতাংশ সূর্যের আলো ফিরিয়ে দেয়। কিন্তু বরফে যদি ধুলো বা ময়লা জমে, তবে এর অ্যালবেডো কমে যায়। তখন বরফ সূর্যের তাপ শুষে নেয় ও দ্রুত গলতে শুরু করে। এটি আমাদের পরিবেশের জন্য খারাপ, কারণ এতে বৈশ্বিক উষ্ণায়ন বেড়ে যায়।
তুষারের এই অতিরিক্ত আলো কিন্তু চোখের জন্য ক্ষতিকর হতে পারে। আকাশভরা মেঘ এবং নিচে সাদা বরফ যখন সমানভাবে আলো প্রতিফলন করে, তখন দিগন্ত রেখা হারিয়ে যায়। পাইলট বা পর্বতারোহীরা তখন আকাশ ও মাটির পার্থক্য বুঝতে পারেন না। একে বলে হোয়াইটআউট। আবার হাজার হাজার আয়নার মতো তুষার যখন সূর্যের আলো সরাসরি আপনার চোখে প্রতিফলন করবে, তখন চোখের কর্নিয়া পুড়ে যেতে পারে। একে বলে স্নো ব্লাইন্ডনেস। তাই বরফে স্কি করার সময় সানগ্লাস পরা জরুরি!