রাতের আকাশ যেন এক বিশাল ক্যানভাস। সেখানে প্রতিদিন মহাজাগতিক নাটকের কোনো না কোনো প্রদর্শনী চলতেই থাকে! আগস্ট মাসে দুটো গ্রহণ ও পার্সিড উল্কাবৃষ্টির চোখধাঁধানো পারফরম্যান্সের পর মনে হতে পারে, আকাশের শো বোধহয় আপাতত শেষ। কিন্তু টেলিস্কোপটা এখনই তুলে রাখার কোনো কারণ নেই। সেপ্টেম্বর মাসেও মহাকাশের এই বিশাল মঞ্চে বেশ কয়েকটি দারুণ ঘটনা ঘটতে যাচ্ছে। এগুলো হয়তো খুব বেশি আলোচিত নয়, কিন্তু রোমাঞ্চের দিক থেকে কোনো অংশে কমও নয়!
৩ সেপ্টেম্বরের রাতটা একটু অন্যরকম। এদিন চাঁদের ঠিক পাশেই দেখা মিলবে আকাশের অন্যতম বিখ্যাত স্টার ক্লাস্টার প্লিয়াডিস। একে অনেকেই সেভেন সিস্টার্স বা কৃত্তিকা নামে চেনেন। মূলত একই ধূলিমেঘ থেকে জন্ম নেওয়া শত শত তরুণ তারার একটি বিশাল দল হলো এই প্লিয়াডিস, যারা মহাকর্ষ বলের কারণে একে অপরের সঙ্গে আটকে আছে। এদিন চাঁদ আর প্লিয়াডিসের দূরত্ব থাকবে মাত্র ১.১ ডিগ্রি।
খালি চোখে এদের মধ্যে ছয়-সাতটি তারা হীরার টুকরোর মতো জ্বলজ্বল করতে দেখা যায়। এদিন চাঁদের আলো কিছুটা কম থাকায় এই হীরার টুকরোগুলোকে আরও স্পষ্ট দেখা যাবে। আর হাতে একটা বাইনোকুলার থাকলে তো কথাই নেই! এই অল্প সময়ের মধ্যে সবকিছু গুছিয়ে উঠতে না পারলেও সমস্যা নেই। ৩০ সেপ্টেম্বর এই দৃশ্য আবার দেখা যাবে।
আগস্টের বিখ্যাত পার্সিড উল্কাবৃষ্টির মতো বিশাল কিছু না হলেও, সেপ্টেম্বরের ৯ ও ১০ তারিখে দেখা মিলবে এপসিলন পার্সিড উল্কাবৃষ্টি। ঘণ্টায় হয়তো আটটির মতো উল্কা দেখা যাবে। তবে এর সবচেয়ে বড় সুবিধা হলো, ঠিক দুই দিন পরেই অমাবস্যা। ফলে আকাশে চাঁদের আলো থাকবে না বললেই চলে। ঘুটঘুটে অন্ধকার আকাশে উল্কার এই ঝিরঝিরে ধারা উপভোগ করার জন্য শহর থেকে দূরে কোনো অন্ধকার জায়গায় চলে যাওয়াই বুদ্ধিমানের কাজ। মজার ব্যাপার হলো, পৃথিবী যখন কোনো ধূমকেতুর রেখে যাওয়া ধুলো ও কণার মেঘের ভেতর দিয়ে যায়, তখন সেগুলো প্রচণ্ড বেগে বায়ুমণ্ডলে ঢুকে ঘর্ষণে জ্বলে ওঠে। এটাই হলো উল্কাবৃষ্টির রহস্য!
এমনিতে রাতের আকাশে শুক্র গ্রহ খুঁজে পাওয়া খুব সহজ, কিন্তু ২২ সেপ্টেম্বর এটি যেন একেবারে সুপারস্টার হয়ে উঠবে! এদিন শুক্রের উজ্জ্বলতা পৌঁছাবে মাইনাস ৪.৮ ম্যাগনিচিউডে। জ্যোতির্বিজ্ঞানে ম্যাগনিচিউড স্কেলের নিয়মটা বেশ অদ্ভুত। সংখ্যা যত কম হবে, বস্তুটা তত বেশি উজ্জ্বল দেখাবে। রাতের আকাশের সবচেয়ে উজ্জ্বল তারা লুব্ধকের ম্যাগনিচিউড মাত্র মাইনাস ১.৪৬। পূর্ণিমার চাঁদের ম্যাগনিচিউড মাইনাস ১২.৭। সেখানে শুক্রের হবে ৪.৮। বুঝতেই পারছেন, সূর্যাস্তের পর পশ্চিম আকাশে শুক্র কতটা ঝলমলে রূপে হাজির হবে!
২৩ সেপ্টেম্বরের ঘটনাটি টেলিস্কোপ দিয়ে দেখার মতো কিছু নয়, তবে এটি একটি দারুণ মহাজাগতিক মুহূর্ত। পৃথিবী তার অক্ষে ২৩.৫ ডিগ্রি হেলে সূর্যকে প্রদক্ষিণ করে। ঘুরতে ঘুরতে এই দিনে সূর্য ঠিক বিষুবরেখার ওপর অবস্থান করে। ফলে পৃথিবীর উত্তর ও দক্ষিণ গোলার্ধে দিন ও রাতের দৈর্ঘ্য প্রায় সমান হয়ে যায়। উত্তর গোলার্ধে এদিন থেকে আনুষ্ঠানিকভাবে শরতের শুরু, আর দক্ষিণ গোলার্ধে বসন্ত।
সৌরজগতের সবচেয়ে দূরের গ্রহ নেপচুনকে খুঁজে পাওয়া বেশ কঠিন। তবে ২৬ সেপ্টেম্বর সেই সুযোগটি মিলছে। এদিন নেপচুন প্রতিযোগে পৌঁছাবে। মানে, সূর্য এবং নেপচুনের ঠিক মাঝখানে থাকবে আমাদের পৃথিবী। ফলে গ্রহটি আমাদের সবচেয়ে কাছাকাছি থাকবে এবং সূর্যের আলো পুরোপুরি এর ওপর পড়বে। সারা রাত জুড়েই এটি আকাশে থাকবে। তবে খালি চোখে এটি দেখার কোনো উপায় নেই, একটা ভালো মানের টেলিস্কোপ লাগবে। মীন রাশির তারামণ্ডলীর মাঝে ছোট্ট একটি নীলাভ চাকতির মতো ধরা দেবে এই গ্যাসীয় দৈত্য।
সেপ্টেম্বরের শেষটা হবে দারুণ এক পূর্ণিমা দিয়ে। ২৬ সেপ্টেম্বরের এই পূর্ণিমাকে ঐতিহ্যগতভাবে বলা হয় হারভেস্ট মুন। ইকুইনক্সের সবচেয়ে কাছাকাছি সময়ের পূর্ণিমাকে এই নাম দেওয়া হয়। নাম শুনে মনে হতে পারে চাঁদ বুঝি ফসলের মতো রং বদলাবে বা অন্য কোনো জাদুকরী রূপ নেবে! আসলে তা নয়। প্রাচীনকালে যখন বৈদ্যুতিক বাতি ছিল না, তখন কৃষকেরা এই টানা কয়েক রাতের উজ্জ্বল চাঁদের আলোয় গভীর রাত পর্যন্ত মাঠের ফসল ঘরে তোলার কাজ করতেন। সেই থেকেই এর নাম হারভেস্ট মুন।
তাই সেপ্টেম্বর মাসে মাঝে মাঝে রাতের আকাশের দিকে তাকালে মোটেও লোকসান হবে না! কে জানে, হয়তো আপনার চোখের সামনেই ঘটে যেতে পারে দারুণ কোনো মহাজাগতিক ঘটনা!