মহাকাশে নাসার বাগান ও চ্যালেঞ্জ
মহাকাশে থেকেই লেটুস পাতার স্বাদ পেতে চান নভোচারীরা। মাঝেমধ্যে গাছ থেকে পেড়ে গোটা কতক রসালো স্ট্রবেরি খেতে পারলেও মন্দ হয় না! কিন্তু মহাকাশে আর গাছ কই যে এই স্বপ্ন সত্যি হবে! তবে স্বপ্ন সত্যি করতেই কাজ করে যাচ্ছে অস্ট্রেলিয়ার মেলবোর্ন ইউনিভার্সিটির একদল বিজ্ঞানী। নাসার সঙ্গে হাত মিলিয়ে তাঁরা কাজ করছেন প্ল্যান্টস ফর স্পেস (P4S) প্রজেক্টে। বিশ্বের ১১টি দেশের ৪০ জন বিজ্ঞানী এখন দিনরাত কাজ করছেন। তাঁদের লক্ষ্য একটাই, চাঁদ ও মঙ্গলে মানুষের খাবারের ব্যবস্থা করা।
মহাকাশে গাছ এত জরুরি কেন
মহাকাশে গাছ লাগানো মানে পৃথিবীর বাইরে মানুষের ভবিষ্যৎ চাষ করা। বিজ্ঞানীরা একে বলছেন বায়োরিজেনারেটিভ লাইফ সাপোর্ট সিস্টেম। সোজা কথায়, নভোযানে বা ভিনগ্রহের স্টেশনে গাছ হবে মানুষের বেঁচে থাকার অক্সিজেন ফ্যাক্টরি।
গাছ সেখানে অলরাউন্ডার। এটি কার্বন ডাই-অক্সাইড শুষে নিয়ে অক্সিজেন দেবে, বাতাস পরিষ্কার করবে, পানি রিসাইকেল করবে, এমনকি ওষুধ ও বায়োম্যাটেরিয়াল তৈরির কাঁচামালও জোগাবে। আর মাসের পর মাস মহাশূন্যে থাকতে থাকতে নভোচারীরা যখন মানসিকভাবে হাঁপিয়ে উঠবেন, তখন এক টুকরো সবুজ বাগান তাঁদের দেবে মানসিক প্রশান্তি। গাছ শুধু খাদ্য নয়, মহাকাশে মানুষের টিকে থাকার লাইফলাইন।
অস্ট্রেলিয়ার মেলবোর্ন ইউনিভার্সিটির একদল বিজ্ঞানী নাসার সঙ্গে হাত মিলিয়ে কাজ করছেন প্ল্যান্টস ফর স্পেস প্রজেক্টে। বিশ্বের ১১টি দেশের ৪০ জন বিজ্ঞানী এখন দিনরাত কাজ করছেন।
পৃথিবীর বাইরে চাষাবাদের চ্যালেঞ্জ
২০৩০ সালে চাঁদ ও ২০৪০ সালে মঙ্গলে মানুষ পাঠানোর পরিকল্পনা পাকা। কিন্তু সেখানে গিয়ে মানুষ খাবে কী? পুষ্টির জোগান দেওয়াটা নাসার কাছে এখনও রেড রিস্ক বা সর্বোচ্চ অগ্রাধিকার পাওয়া ঝুঁকির কাজ। কারণ মহাকাশে চাষাবাদ মোটেও সহজ নয়।
সেখানে মাধ্যাকর্ষণ পৃথিবীর মতো নয়। মাইক্রোগ্র্যাভিটিতে পানি ও পুষ্টি উপাদান গাছের শিকড়ে ঠিকমতো পৌঁছাতে চায় না, যেন ভেসে থাকতে চায়। আবার বাতাস চলাচলের স্বাভাবিক নিয়মও সেখানে খাটে না। ফলে গাছের চারপাশের তাপমাত্রা নিয়ন্ত্রণ করা কঠিন হয়ে পড়ে। এতে গাছের বৃদ্ধি থেমে যেতে পারে। বিজ্ঞানীরা এখন বোঝার চেষ্টা করছেন, পৃথিবীর মাধ্যাকর্ষণ ছাড়া গাছ কীভাবে বাড়তে পারে।
চাঁদের বুকে প্রথম গাছ
চাঁদে কিন্তু গাছ জন্মেছে, তবে খুব অল্প সময়ের জন্য। ২০১৯ সালে চীনের মহাকাশযান চ্যাং-ই ৪ চাঁদের উল্টো পিঠে অবতরণ করে ইতিহাস গড়েছিল। এই মিশনের একটি অংশ ছিল ছোট একটি বায়োস্ফিয়ার বা কৃত্রিম জীবমণ্ডল।
সেই ছোট কৌটায় বিজ্ঞানীরা পাঠিয়েছিলেন তুলা, আলু, সরিষা গোত্রীয় দানাশস্য, ইস্ট এবং ফলের মাছি। উদ্দেশ্য ছিল একটি ক্ষুদ্র ইকোসিস্টেম তৈরি করা। অবিশ্বাস্য হলেও সত্য, চাঁদের মাটিতে তুলার বীজ অঙ্কুরিত হয়েছিল! এটিই ছিল ভিনগ্রহে জন্মানো প্রথম কোনো উদ্ভিদ।
কিন্তু চাঁদের রাত বড়ই নিষ্ঠুর। তাপমাত্রা হিমাঙ্কের নিচে মাইনাস ১৯০ ডিগ্রি সেলসিয়াসে নেমে যাওয়ায় সেই কচি চারাটি মাত্র ১৪ দিন পরেই মারা যায়। জানিয়ে রাখি, চাঁদের একদিন মানে পৃথিবীর প্রায় ১৪ দিন। অর্থাৎ, চাঁদে যতক্ষণ দিন ছিল (১৪ দিন), ততক্ষণ তুলার চারাটি বেঁচে ছিল। কিন্তু রাত নামতেই তাপমাত্রা হিমাঙ্কের নিচে চলে যাওয়ায় গাছটি মারা যায়। চীনের এই পরীক্ষা আমাদের দেখিয়ে দিয়েছে, চাঁদের পরিবেশ কতটা প্রতিকূল এবং সেখানে গ্রিনহাউস প্রযুক্তি কতটা নিখুঁত হতে হবে।
২০১৯ সালে চীনের মহাকাশযান চ্যাং-ই ৪ চাঁদের উল্টো পিঠে অবতরণ করে ইতিহাস গড়েছিল। এই মিশনের একটি অংশ ছিল ছোট একটি বায়োস্ফিয়ার বা কৃত্রিম জীবমণ্ডল।
নতুন মিশন আসছে
২০২৭ সালের শেষ দিকে ইতিহাস গড়তে যাচ্ছে মানুষ। নাসার আর্টেমিস ৩ মিশনে প্রথমবারের মতো চাঁদের বুকে গাছ জন্মানোর ব্যাপক পরীক্ষা চালানো হবে। এর নাম দেওয়া হয়েছে লিফ (LEAF - Lunar Effects on Agricultural Flora)। চাঁদের মাটিতে একটি নিয়ন্ত্রিত চেম্বারে তিনটি দ্রুত বর্ধনশীল গাছ লাগানো হবে।
এক সপ্তাহ পর মাত্র ৫০০ গ্রাম গাছের নমুনা পৃথিবীতে ফিরিয়ে আনা হবে বিশ্লেষণের জন্য। অস্ট্রেলিয়ায় বসে বিজ্ঞানীরা দেখবেন মহাকাশীয় বিকিরণ এবং কম মাধ্যাকর্ষণে এসব গাছের জিনে কোনো পরিবর্তন এনেছে কি না।
এখানেই শেষ নয়, ব্যবহার করা হচ্ছে কৃত্রিম বুদ্ধিমত্তা বা এআই। তৈরি করা হচ্ছে গাছের ডিজিটাল যমজ। অর্থাৎ কম্পিউটারের ভেতরেই হুবহু গাছের মডেল তৈরি করে আগেভাগে দেখে নেওয়া হবে, মহাকাশে ওই গাছ কেমন আচরণ করবে। মহাকাশচারীদের যাতে একই খাবার খেতে খেতে অরুচি না আসে, সেটাও দেখবে এই প্রযুক্তি।
এই গবেষণা শুধু মঙ্গলে বা চাঁদে বসতি গড়ার জন্য নয়। চরম প্রতিকূল পরিবেশে কীভাবে ফসল ফলানো যায়, সেই জ্ঞান আমাদের পৃথিবীর কৃষিকেও বদলে দিতে পারে। জলবায়ু পরিবর্তনের এই সময়ে টেকসই কৃষির জন্য এই গবেষণা হতে পারে আশীর্বাদ।