মঙ্গলে গিয়ে মানুষ মহাজাগতিক রশ্মির হাত থেকে বাঁচবে কীভাবে
চাঁদে মানুষের পা রাখা ছিল ইতিহাসের অন্যতম সেরা রোমাঞ্চকর ঘটনা। সেই সফলতার পর বিজ্ঞানীদের চোখ এখন মঙ্গলের দিকে। নাসার আর্টেমিস মিশনের তোড়জোড় চলছে পুরোদমে। সব ঠিক থাকলে ২০৩০-এর দশকেই মানুষ পাড়ি জমাবে মঙ্গল গ্রহে। কিন্তু এই স্বপ্ন পূরণের পথে বাধা হয়ে দাঁড়িয়েছে এক অদৃশ্য শত্রু, মহাজাগতিক রশ্মি।
রাতের আকাশে আমরা নক্ষত্র দেখি, মাঝেমধ্যে দেখি উল্কাপাত। কিন্তু এই মহাজাগতিক রশ্মি আমাদের চোখে পড়ে না। অথচ এগুলো প্রচণ্ড শক্তি নিয়ে ধেয়ে আসে বিস্ফোরিত নক্ষত্র থেকে। প্রোটন, ইলেকট্রন ও হিলিয়াম নিউক্লিয়াস দিয়ে তৈরি এই রশ্মি এতই শক্তিশালী যে, এগুলো যেকোনো পদার্থের পরমাণু ভেঙে ফেলতে পারে। মানুষ বা মেশিন, কাউকেই ছাড় দেয় না। পৃথিবীতে আমরা নিরাপদ, কারণ আমাদের বায়ুমণ্ডল ও চুম্বকীয়ক্ষেত্র এই রশ্মিকে ঠেকিয়ে রাখে। কিন্তু মহাকাশে এই সুরক্ষা নেই। সেখানে এই রশ্মি নভোচারীদের ডিএনএ ভেঙে দিতে পারে, কোষ নষ্ট করতে পারে এবং ক্যানসারের ঝুঁকি বাড়িয়ে দিতে পারে বহুগুণ।
বিজ্ঞানীদের কাজ এখন একটাই, এই রশ্মি জীবন্ত প্রাণীর কতটা ক্ষতি করে, তা মাপা এবং বাঁচার উপায় বের করা। ইঁদুর বা কোষ মহাকাশে পাঠিয়ে পরীক্ষা করা বেশ খরচ সাপেক্ষ। তাই যুক্তরাষ্ট্র ও জার্মানির বিজ্ঞানীরা ল্যাবে পার্টিকল অ্যাক্সিলারেটর ব্যবহার করে কৃত্রিম মহাজাগতিক রশ্মি তৈরি করছেন। জার্মানির একটি নতুন আন্তর্জাতিক গবেষণাগারে মহাকাশের মতোই উচ্চশক্তির রশ্মি তৈরি করা হচ্ছে। কিন্তু সমস্যা হলো, ল্যাবের এই পরীক্ষা পুরোপুরি বাস্তবসম্মত নয়। এখানে হয়তো একবারে অনেক বেশি রেডিয়েশন দেওয়া হয়; অনেকটা বৃষ্টির প্রভাব বোঝার জন্য সুনামি ব্যবহার করার মতো। মহাকাশে রশ্মিগুলো আসে মিশ্রভাবে, সবদিক থেকে। এখানে কৃত্রিমভাবে তা করা সম্ভব নয়।
প্রোটন, ইলেকট্রন ও হিলিয়াম নিউক্লিয়াস দিয়ে তৈরি এই মহাজাগতিক রশ্মি এতটাই শক্তিশালী যে, এগুলো যেকোনো পদার্থের পরমাণু ভেঙে ফেলতে পারে। মানুষ বা মেশিন, কাউকেই ছাড় দেয় না।
রশ্মি থেকে বাঁচতে নভোযানে হাইড্রোজেন-সমৃদ্ধ পলিইথিলিন বা পানির আস্তরণ ব্যবহার করার কথা ভাবা হচ্ছে। কিন্তু গ্যালাকটিক কসমিক রে বা দূরের নক্ষত্র থেকে আসা রশ্মি এতটাই শক্তিশালী যে, এসব বর্ম ভেদ করে চলে যায়। এমনকি বর্মে ধাক্কা খেয়ে নতুন করে আরও ক্ষতিকর বিকিরণ তৈরি করতে পারে। তাই শুধু যান্ত্রিক বর্ম দিয়ে কাজ হবে না।
বিজ্ঞানীরা এখন তাই বায়োলজিক্যাল সমাধানের দিকে ঝুঁকছেন। গবেষণায় দেখা গেছে, সিডিডিও-ইএ (CDDO-EA) নামে এক কৃত্রিম অ্যান্টিঅক্সিডেন্ট তেজস্ক্রিয়তা থেকে মস্তিষ্ককে রক্ষা করতে পারে। ল্যাবে দেখা গেছে, রেডিয়েশনের শিকার হওয়ার পরেও যেসব ইঁদুরকে এই অ্যান্টিঅক্সিডেন্ট দেওয়া হয়েছে, তারা দিব্যি সব কাজ করতে পারছে।
আবার যেসব প্রাণী শীতনিদ্রায় যায়, ঘুমন্ত অবস্থায় তাদের রেডিয়েশন সহ্য করার ক্ষমতা বেড়ে যায়। নভোচারীদের হয়তো শীতনিদ্রায় পাঠানো সম্ভব নয়, কিন্তু কৃত্রিমভাবে তাঁদের শরীরে এমন অবস্থা তৈরি করা যায় কি না, তা নিয়ে গবেষণা চলছে।
ল্যাবে দেখা গেছে, রেডিয়েশনের শিকার হওয়ার পরেও যেসব ইঁদুরকে এই সিডিডিও-ইএ কৃত্রিম অ্যান্টিঅক্সিডেন্ট দেওয়া হয়েছে, তারা দিব্যি সব কাজ করতে পারছে।
এ ছাড়া টার্ডিগ্রেডের মতো আণুবীক্ষণিক জীব প্রচণ্ড রেডিয়েশনেও বেঁচে থাকে। এদের টিকে থাকার কৌশল ব্যবহার করে মহাকাশ ভ্রমণে খাদ্যশস্য বা অণুজীব সংরক্ষণ করা যেতে পারে। এমনকি প্রচণ্ড গরমে শরীরের কোষগুলো ডিএনএ রক্ষার জন্য বিশেষ ব্যবস্থা নেয়। বিজ্ঞানীরা ভাবছেন, বিশেষ ডায়েট বা ওষুধের মাধ্যমে নভোচারীদের শরীরে এই প্রতিরক্ষা ব্যবস্থা আগে থেকেই চালু করে দেওয়া সম্ভব।
শুধু ফিজিক্যাল শিল্ড বা বর্ম দিয়ে এই অদৃশ্য ঘাতককে ঠেকানো যাবে না। বায়োলজিক্যাল বা শারীরিক সমাধানই ভরসা। তবে বর্তমান গতিতে এগোলে এই সমস্যার পুরোপুরি সমাধান হতে আরও কয়েক দশক লেগে যেতে পারে। মঙ্গলে নিরাপদে পা রাখতে হলে এই অদৃশ্য শুত্রুকে ঠেকানোর বর্ম আমাদের তৈরি করতেই হবে!