মূল কাজ শুরুর আগেই ১১ হাজার গ্রহাণু আবিষ্কার করেছে ভেরা সি. রুবিন মানমন্দির
মহাকাশ গবেষণার জন্য নির্মিত ভেরা সি. রুবিন মানমন্দির তৈরি করা হয়েছে এক বিশাল ও উচ্চাভিলাষী লক্ষ্য সামনে রেখে। এর অন্যতম প্রধান উদ্দেশ্য, আগামী ১০ বছর ধরে মহাকাশের একটি মেগা-জরিপ চালানো। এই জরিপের নাম দেওয়া হয়েছে ‘লিগ্যাসি সার্ভে অব স্পেস অ্যান্ড টাইম’ বা এলএসএসটি। এই দীর্ঘ সময়ে মানমন্দিরটি প্রায় ৩০ পেটাবাইট ডেটা সংগ্রহ করবে। এর মাধ্যমে সৌরজগতের একটি পূর্ণাঙ্গ তালিকা তৈরি, সুপারনোভা বা পরিবর্তনশীল নক্ষত্রের মতো অস্থায়ী বস্তুগুলো পর্যবেক্ষণ এবং আমাদের গ্যালাক্সি মিল্কিওয়ের একটি মানচিত্র তৈরি করা হবে।
তবে চমকপ্রদ ব্যাপার হলো, এই বিশাল কর্মযজ্ঞ আনুষ্ঠানিকভাবে শুরু হওয়ার আগেই বিজ্ঞানীরা এক অভাবনীয় সাফল্য পেয়েছেন। মানমন্দিরটির প্রাথমিক যন্ত্রপাতি পরীক্ষার সময় সংগ্রহ করা ডেটা থেকেই সৌরজগতের ১১ হাজার নতুন গ্রহাণু আবিষ্কার করা হয়েছে! ইন্টারন্যাশনাল অ্যাস্ট্রোনমিক্যাল ইউনিয়নের মাইনর প্ল্যানেট সেন্টার সম্প্রতি এই আবিষ্কারের সত্যতাও নিশ্চিত করেছে।
গত এক বছরের মধ্যে এটিই একসঙ্গে সবচেয়ে বেশি গ্রহাণু আবিষ্কারের ঘটনা। মাত্র দেড় মাস ধরে আকাশ পর্যবেক্ষণের মাধ্যমে এই ১১ হাজার নতুন গ্রহাণু এবং আগে থেকে পরিচিত আরও ৮০ হাজার গ্রহাণু শনাক্ত করা হয়েছে। রুবিন মানমন্দিরের অত্যাধুনিক প্রযুক্তির সক্ষমতা কতটা শক্তিশালী, এই প্রাথমিক ডেটাই তার সবচেয়ে বড় প্রমাণ। আগামী বছর যখন এলএসএসটি ক্যাম্পেইনটি পুরোদমে শুরু হবে, তখন সৌরজগৎ নিয়ে আমাদের জানাবোঝায় এটি কতটা যুগান্তকারী প্রভাব ফেলবে, তা এই আবিষ্কার থেকেই আঁচ করা যায়।
ভেরা সি. রুবিন মানমন্দিরটির প্রাথমিক যন্ত্রপাতি পরীক্ষার সময় সংগ্রহ করা ডেটা থেকেই সৌরজগতের ১১ হাজার নতুন গ্রহাণু আবিষ্কার করা হয়েছে!
যুক্তরাষ্ট্রের ওয়াশিংটন বিশ্ববিদ্যালয়ের শিক্ষক এবং রুবিনের সৌরজগৎ বিষয়ক প্রধান বিজ্ঞানী মারিও জুরিক একটি আনুষ্ঠানিক প্রেস বিজ্ঞপ্তিতে বলেন, ‘প্রাথমিক ডেটা থেকে পাওয়া এই সাফল্য আসলে হিমশৈলের চূড়া মাত্র। এটি প্রমাণ করে, আমাদের মানমন্দির পুরোপুরি প্রস্তুত। আগে যেসব আবিষ্কার করতে বছরের পর বছর লেগে যেত, রুবিন এখন তা কয়েক মাসেই করে ফেলবে।’
নতুন পাওয়া এই ডেটাসেটে পৃথিবীর কাছাকাছি থাকা ৩৩টি অজানা বস্তুর সন্ধান মিলেছে। এর মধ্যে সবচেয়ে বড় বস্তুটির ব্যাস প্রায় ৫০০ মিটার। নিয়ার-আর্থ অবজেক্টগুলোর ওপর বিজ্ঞানীদের বিশেষ নজর থাকে। কারণ এগুলোর মধ্যে কিছু বস্তু ভবিষ্যতের জন্য হুমকিস্বরূপ হতে পারে। সেগুলোর পৃথিবীতে আঘাত হানার আশঙ্কা থাকে। তবে আশার কথা হলো, নতুন আবিষ্কৃত এই বস্তুগুলোর কোনোটিই বর্তমানে পৃথিবীর জন্য হুমকিস্বরূপ নয়।
রুবিন যখন পুরোপুরি কাজ শুরু করবে, তখন এটি প্রায় ৯০ হাজার নতুন নিয়ার-আর্থ অবজেক্ট আবিষ্কার করবে বলে আশা করা হচ্ছে। এটি গ্রহ প্রতিরক্ষায় দারুণভাবে সাহায্য করবে।
নতুন আবিষ্কারের তালিকায় নেপচুনের কক্ষপথের বাইরের প্রায় ৩৮০টি বস্তু রয়েছে। এর মধ্যে দুটির কক্ষপথ অত্যন্ত প্রসারিত। প্রাথমিকভাবে ‘২০২৫ এলএস২’ এবং ‘২০২৫ এমএক্স৩৪৮’ নাম দেওয়া এই বস্তু দুটি তাদের কক্ষপথে ঘুরতে ঘুরতে সূর্য থেকে পৃথিবীর দূরত্বের চেয়ে প্রায় ১০০০ গুণ বেশি দূরে চলে যায়! এগুলো সৌরজগতের সবচেয়ে দূরবর্তী ৩০টি ক্ষুদ্র গ্রহের তালিকায় জায়গা করে নিয়েছে।
নিয়ার-আর্থ অবজেক্টগুলোর ওপর বিজ্ঞানীদের বিশেষ নজর থাকে। কারণ এগুলোর মধ্যে কিছু বস্তু ভবিষ্যতের জন্য হুমকিস্বরূপ হতে পারে। সেগুলোর পৃথিবীতে আঘাত হানার আশঙ্কা থাকে।
হার্ভার্ড এবং স্মিথসোনিয়ান সেন্টার ফর অ্যাস্ট্রোফিজিকসের গবেষক ম্যাথিউ হোলম্যান বলেন, ‘আকাশের লক্ষ কোটি আলোর বিন্দুর মধ্য থেকে একটি বস্তু খুঁজে বের করা খড়ের গাদায় সুই খোঁজার মতো কঠিন কাজ। কম্পিউটারকে কোটি কোটি কম্বিনেশন বিশ্লেষণ করে সম্ভাব্য দূরবর্তী জগৎগুলোকে আলাদা করার জন্য আমাদের বিশেষ অ্যালগরিদম ব্যবহার করতে হয়েছে।’
ওয়াশিংটন বিশ্ববিদ্যালয়ের গবেষক আরি হেইঞ্জ এবং জ্যাকব কুরল্যান্ডারের তৈরি করা বিশেষ সফটওয়্যার এই বিশাল ডেটা বিশ্লেষণে গুরুত্বপূর্ণ ভূমিকা রেখেছে। বর্তমানের যেকোনো মানমন্দিরের চেয়ে রুবিন মানমন্দিরের সংবেদনশীলতা প্রায় ছয় গুণ বেশি। এর বিশাল আয়না, বিশ্বের সর্ববৃহৎ ডিজিটাল ক্যামেরা এবং অত্যাধুনিক সফটওয়্যারের সমন্বয় অতি ম্লান এবং দ্রুতগতিতে ছুটে চলা বস্তুগুলোকেও শনাক্ত করতে পারে।
সবচেয়ে দারুণ খবর হলো, এটি তো কেবল শুরু! ১০ বছর মেয়াদি মূল জরিপটি যখন শুরু হবে, তখন বিজ্ঞানীরা আশা করছেন, রুবিন প্রতি দুই থেকে তিন রাতে এ রকম ১১ হাজার করে গ্রহাণু আবিষ্কার করবে। এটি সৌরজগতের ইতিহাস ও বিবর্তন বুঝতে আমাদের বর্তমান জ্ঞানকে পুরোপুরি বদলে দেবে।
নতুন আবিষ্কৃত এই গ্রহাণুগুলো সম্পর্কে আরও জানতে এবং সেগুলোর ত্রিমাত্রিক অবস্থান দেখতে চাইলে, অনলাইনে রুবিন অরবিটভিউয়ার এবং স্মল বডি এক্সপ্লোরার সাইটগুলো ঘুরে আসতে পারেন।