শনির বায়ুমণ্ডলে রহস্যময় দশকোণাকৃতির তরঙ্গের সন্ধান

শনি গ্রহের বায়ুমণ্ডলে, ঠিক দক্ষিণ মেরুর ওপর দিয়ে বিশাল এক তরঙ্গের সৃষ্টি হয়েছেছবি: সংগৃহীত

সৌরজগতের সবচেয়ে আকর্ষণীয় গ্রহ হয়তো শনি। চারপাশের বিশাল ও সুন্দর বলয়ের জন্য মহাকাশপ্রেমীদের কাছে এর কদর একটু বেশি। কিন্তু এবার সেই শনি গ্রহ এমন এক অদ্ভুত কাণ্ড ঘটিয়েছে, যা দেখে রীতিমতো চোখ কপালে ওঠার জোগাড়। গ্রহটির বায়ুমণ্ডলে, ঠিক দক্ষিণ মেরুর ওপর দিয়ে বিশাল এক তরঙ্গের সৃষ্টি হয়েছে। তবে এটি সাধারণ কোনো ঢেউ নয়, দেখতে একেবারে নিখুঁত দশভুজের মতো! মহাকাশের বুকে হঠাৎ এমন জ্যামিতিক আকার দেখে বিজ্ঞানীরা রীতিমতো বিস্মিত।

বিষয়টা একটু সহজ করে বলা যাক। পৃথিবীতে যখন কোনো ঘূর্ণিঝড় বা বায়ুপ্রবাহ তৈরি হয়, সেটি সাধারণত বৃত্তাকার হয় এবং স্থলভাগে আঘাত হানার পর ধীরে ধীরে দুর্বল হয়ে যায়। কারণ পাহাড় বা মাটির ঘর্ষণে বাতাসের গতি বাধা পায়। কিন্তু শনির মতো গ্যাসীয় দানব গ্রহগুলোতে কঠিন মাটির কোনো অস্তিত্বই নেই! সেখানে পুরোটাই গ্যাস ও মেঘের রাজত্ব। ফলে সেখানে যখন কোনো ঝড় বা বায়ুপ্রবাহ তৈরি হয়, সেটি বাধাহীনভাবে বছরের পর বছর চলতে পারে। স্পেনের বিলবাও স্কুল অব ইঞ্জিনিয়ারিংয়ের পদার্থবিদ অগাস্টিন সানচেজ-লাভেগার মতে, পৃথিবীর বায়ুমণ্ডলে এমন কোনো কিছুর অস্তিত্ব নেই, যার সঙ্গে শনির এই দশভুজ তরঙ্গের তুলনা করা চলে।

আরও পড়ুন
পৃথিবীতে যখন কোনো ঘূর্ণিঝড় বা বায়ুপ্রবাহ তৈরি হয়, সেটি সাধারণত বৃত্তাকার হয় এবং স্থলভাগে আঘাত হানার পর ধীরে ধীরে দুর্বল হয়ে যায়। কারণ পাহাড় বা মাটির ঘর্ষণে বাতাসের গতি বাধা পায়।

বিজ্ঞানীরা কেন দিশেহারা

হুট করে গ্রহটির দক্ষিণ মেরুতে কেন এমন দশ কোণবিশিষ্ট একটি বিশাল তরঙ্গের সৃষ্টি হলো, তা এক বিরাট রহস্য। বিজ্ঞানীরা নিশ্চিতভাবে এখনো এর পেছনের কারণ বের করতে পারেননি। তবে তাঁদের ধারণা, গ্যাসের প্রবাহে কোনো বড় ধরনের গোলমালের কারণে এমনটা হতে পারে। হয়তো শনির ওই অঞ্চলে কোনো উচ্চচাপের বিশাল ঘূর্ণিঝড় তৈরি হয়েছে, ঠিক যেমনটা দেখা যায় বৃহস্পতি গ্রহের বিখ্যাত গ্রেট রেড স্পটের ক্ষেত্রে।

হুট করে গ্রহটির দক্ষিণ মেরুতে কেন এমন দশ কোণবিশিষ্ট একটি বিশাল তরঙ্গের সৃষ্টি হলো, তা এক বিরাট রহস্য
ছবি: নাসা

গবেষক সানচেজ-লাভেগা জানান, এটি ব্যাখ্যা করার মতো একক কোনো বৈজ্ঞানিক মডেল আপাতত তাদের হাতে নেই। হয়তো গ্রহটির প্রবল বায়ুপ্রবাহের অস্থিতিশীলতার কারণে এমনটা হয়েছে, অথবা গ্রহটির বায়ুমণ্ডলের অনেক গভীর থেকে কোনো শক্তিশালী ঢেউ ওপরের দিকে উঠে এসেছে। এই গবেষণার বিস্তারিত ফলাফল সম্প্রতি বিখ্যাত সায়েন্স অ্যাডভান্সেস বিজ্ঞান সাময়িকীতে প্রকাশিত হয়েছে।

আরও পড়ুন
অবাক করা বিষয় হলো, মাত্র কয়েক বছর আগে, ২০২৩ সালে হাবল টেলিস্কোপের তোলা ছবিতে প্রথমবারের মতো এই ঢেউটি দানা বাঁধতে দেখা যায়। এরপর এটি ধীরে ধীরে আরও স্পষ্ট হতে থাকে।

উত্তরে ষড়ভুজ, দক্ষিণে দশভুজ

শনির বুকে অদ্ভুত আকারের ঢেউ দেখার ঘটনা কিন্তু এটাই প্রথম নয়। ১৯৮০-এর দশকে বিজ্ঞানীরা শনির উত্তর মেরুতে একটি বিশাল ষড়ভুজাকার ঢেউ আবিষ্কার করেছিলেন। তখন থেকেই অনেকের ধারণা ছিল, দক্ষিণ মেরুতেও হয়তো এমন কোনো আকারের দেখা মিলতে পারে। কিন্তু মজার ব্যাপার হলো, এই দশভুজটি একেবারেই নতুন একটি ঘটনা।

নাসার ক্যাসিনি মহাকাশযান ২০০৪ থেকে ২০১৭ সাল পর্যন্ত দীর্ঘ ১৩ বছর শনি গ্রহকে খুব কাছ থেকে প্রদক্ষিণ করেছে। এত লম্বা সময় ধরে গ্রহটির প্রতিটি কোণ স্ক্যান করার পরও ক্যাসিনির তীক্ষ্ণ চোখে দক্ষিণ মেরুর এই দশভুজটি ধরা পড়েনি। এমনকি হাবল স্পেস টেলিস্কোপের পুরোনো ছবিতেও এর কোনো অস্তিত্ব ছিল না। অবাক করা বিষয় হলো, মাত্র কয়েক বছর আগে, ২০২৩ সালে হাবল টেলিস্কোপের তোলা ছবিতে প্রথমবারের মতো এই ঢেউটি দানা বাঁধতে দেখা যায়। এরপর এটি ধীরে ধীরে আরও স্পষ্ট হতে থাকে। বিজ্ঞানীদের তথ্য অনুযায়ী, ২০২৫ সালের আগস্ট ও সেপ্টেম্বরে তোলা ছবিগুলোতে এই দশভুজটি একেবারে পূর্ণাঙ্গ ও স্পষ্ট আকার ধারণ করেছে। মাত্র কয়েক বছরের ব্যবধানে এত বিশাল একটি গ্রহে এমন নিখুঁত জ্যামিতিক আকার তৈরি হওয়ার ঘটনা সত্যিই রোমাঞ্চকর।

আরও পড়ুন
বিশেষ করে ২০৩২ সালের দিকে যখন ওই নির্দিষ্ট অক্ষাংশে সূর্যালোকের পরিমাণ সর্বোচ্চ পর্যায়ে পৌঁছাবে, তখন এই দশভুজটি হয়তো তার সবচেয়ে ভয়ংকর বা স্পষ্ট রূপ ধারণ করবে।

এই অদ্ভুত দশভুজের ভবিষ্যৎ কী

এই দশভুজ তরঙ্গটি কি এভাবেই থাকবে, নাকি ভবিষ্যতে আরও রূপ বদলাবে? গবেষকদের মতে, এই কাঠামোর উৎপত্তির পেছনে শনির দক্ষিণ মেরু অঞ্চলের ঋতু পরিবর্তন বা সূর্যালোকের চক্রের একটি বড় ভূমিকা থাকতে পারে। যদি তা-ই হয়, তবে আগামী বছরগুলোতে এটি আরও বেশি স্পষ্ট ও শক্তিশালী হয়ে উঠতে পারে। বিশেষ করে ২০৩২ সালের দিকে যখন ওই নির্দিষ্ট অক্ষাংশে সূর্যালোকের পরিমাণ সর্বোচ্চ পর্যায়ে পৌঁছাবে, তখন এই দশভুজটি হয়তো তার সবচেয়ে ভয়ংকর বা স্পষ্ট রূপ ধারণ করবে।

বর্তমান ছবিগুলো খুব কাছ থেকে বিশ্লেষণ করে বিজ্ঞানীরা দেখেছেন, দশভুজের কিছু কিছু রেখা এখনো বেশ ঝাপসা। মানে ঢেউটি এখনো পুরোপুরি স্থিতিশীল হতে পারেনি।

বৃহস্পতিও শনির মতোই গ্যাসীয় দানব এবং সেখানেও সারাক্ষণ ভয়ংকর সব ঝড় চলতে থাকে
ছবি: রয়টার্স

বিজ্ঞানীদের জন্য আরেকটি বড় চিন্তার বিষয় বৃহস্পতি গ্রহ। বৃহস্পতিও শনির মতোই গ্যাসীয় দানব এবং সেখানেও সারাক্ষণ ভয়ংকর সব ঝড় চলতে থাকে। কিন্তু এমন জ্যামিতিক আকারের ঢেউ কেবল শনিতেই কেন দেখা যাচ্ছে, তা এক বিরাট প্রশ্ন। তাছাড়া এক মেরুতে ছয় কোণ এবং অন্য মেরুতে দশ কোণ কেন হবে? হয়তো দুই মেরুর অক্ষাংশের পার্থক্যের কারণে এমনটা হচ্ছে বলে বিজ্ঞানীরা ধারণা করছেন।

লেখক: প্রাক্তন শিক্ষার্থী, গণিত বিভাগ, সরকারি তিতুমীর কলেজ, ঢাকা

সূত্র: সায়েন্টিফিক আমেরিকান

আরও পড়ুন