নতুন পাওয়া মহাকর্ষ তরঙ্গ থেকে খোঁজ মিলবে ব্ল্যাকহোলের অজানা রহস্য

ব্ল্যাকহোল কীভাবে বড় হয় বা একে অপরের সঙ্গে মিশে যায়?ছবি: ভিক্টর ডে সোয়ানবার্গ/সায়েন্স ফটো লাইব্রেরি

প্রায় এক দশক আগে, লেজার ইন্টারফেরোমিটার গ্র্যাভিটেশনাল-ওয়েভ অবজারভেটরি বা লাইগো নামে একটি বিশেষ গবেষণাগার মহাকাশে সম্পূর্ণ নতুন একধরনের সংকেত খুঁজে পেয়েছিল। এটি ছিল একধরনের মহাকর্ষ তরঙ্গ। আজ থেকে প্রায় ১৩০ কোটি আলোকবর্ষ দূরে দুটি বিশাল কৃষ্ণগহ্বর একে অপরের সঙ্গে মিলেমিশে এক হয়ে যায়। ফলে মহাকাশে এক শক্তিশালী মহাকর্ষ তরঙ্গের সৃষ্টি হয়, যা পৃথিবীতে এসে পৌঁছালে লাইগোর যন্ত্রে ধরা পড়ে।

সেই ঘটনার পর থেকে গবেষকেরা মহাকাশের এ ধরনের ক্ষণস্থায়ী তরঙ্গগুলো আরও নিখুঁতভাবে ধরার জন্য তাঁদের যন্ত্রপাতি উন্নত করার কাজে মনোযোগ দেন। যখনই এমন কোনো তরঙ্গের সন্ধান মেলে, তখনই সেটিকে একটি ক্যাটালগে যুক্ত করা হয়। এই তালিকাটি তৈরি করে লাইগো-ভার্গো-কাগ্রা নামে চারটি মহাকর্ষীয় তরঙ্গ ডিটেক্টরের একটি আন্তর্জাতিক নেটওয়ার্ক। এই নেটওয়ার্কের আওতায় যুক্তরাষ্ট্রের দুটি লাইগো স্টেশন, ইতালির ভার্গো স্টেশন এবং জাপানের কাগ্রা স্টেশন একসঙ্গে কাজ করে।

বাঁ থেকে ডানে যথাক্রমে জাপানের কাগ্রা স্টেশন, যুক্তরাষ্ট্রের একটি লাইগো স্টেশন, ইতালির ভার্গো স্টেশন এবং যুক্তরাষ্ট্রের আরেক লাইগো স্টেশন
ছবি: আইসিআরআর, ইউনিভার্সিটি অব টোকিও/লাইগো ল্যাব/ক্যালটেক/এমআইটি/ভার্গো কলাবোরেশন

সম্প্রতি এই তালিকায় এক বিশাল রেকর্ড যুক্ত হয়েছে। ২০২৪ সালের এপ্রিল থেকে ২০২৫ সালের জানুয়ারির মধ্যে বিজ্ঞানীরা রেকর্ডসংখ্যক ১৬১টি মহাকর্ষীয় তরঙ্গ শনাক্ত করেছেন। একের পর এক মহাকাশের এই রহস্যময় তরঙ্গের সন্ধান মেলায় বিজ্ঞানীরা দারুণ উত্তেজিত। তাঁরা মনে করছেন, এর মাধ্যমে মহাবিশ্বকে জানার জন্য মহাকর্ষীয় জ্যোতির্বিজ্ঞানের এক নতুন যুগের সূচনা হলো।

আরও পড়ুন
যখনই কোনো তরঙ্গের সন্ধান মেলে, তখনই সেটিকে একটি ক্যাটালগে যুক্ত করা হয়। এই তালিকাটি তৈরি করে লাইগো-ভার্গো-কাগ্রা নামে চারটি মহাকর্ষীয় তরঙ্গ ডিটেক্টরের একটি আন্তর্জাতিক নেটওয়ার্ক।

ফ্রেঞ্চ ন্যাশনাল সেন্টার ফর সায়েন্টিফিক রিসার্চ ও প্যারিস সিটি ইউনিভার্সিটির গবেষক এড পোর্টার এক বিবৃতিতে জানান, তাঁদের ব্যবহৃত ডিটেক্টর এখন এতটাই সংবেদনশীল যে প্রতি সপ্তাহে অন্তত তিন থেকে চারটি মহাকর্ষ তরঙ্গের সংকেত অনায়াসে ধরা পড়ছে। এই বিপুল পরিমাণ তথ্য বিশ্লেষণ ও গবেষণার জন্য এখন বিশ্বজুড়ে বিজ্ঞানীদের একটি বড় দল কাজ করছে। এই অগ্রগতির ফলেই কেবল নতুন কিছু আবিষ্কারের প্রাথমিক ধাপ পেরিয়ে এখন নিখুঁত ও নির্ভুল মহাকর্ষীয় জ্যোতির্বিজ্ঞানের যুগে প্রবেশ করা সম্ভব হয়েছে।

সম্প্রতি প্রতি সপ্তাহে যে নতুন সংকেতগুলো পাওয়া যাচ্ছে, তা এলভিকে নেটওয়ার্কের এ পর্যন্ত খুঁজে পাওয়া মোট মহাকর্ষ তরঙ্গের প্রায় ৭৫ শতাংশ। এই আবিষ্কারগুলোর ফলে বিজ্ঞানীদের তালিকায় থাকা নিশ্চিত মহাকর্ষ তরঙ্গের মোট সংখ্যা এখন ৩৯০-এ গিয়ে পৌঁছেছে।

GW240615 নামে তরঙ্গটির আসল উৎস মহাবিশ্বের ঠিক কোন জায়গায়, তা বিজ্ঞানীরা নিখুঁতভাবে হিসাব করে বের করতে পেরেছেন
ছবি: শাটারস্টক

মহাকাশের এমন অদ্ভুত ও বিরল ঘটনাগুলো যত বেশি পর্যবেক্ষণ করা যাবে, গবেষকদের পক্ষে মহাবিশ্বের রহস্যময় স্থানগুলো নিয়ে গবেষণা করা ততটাই সহজ হবে। এর পাশাপাশি কৃষ্ণগহ্বরের আসল প্রকৃতি, এদের জন্ম এবং জ্যোতিঃপদার্থবিজ্ঞানের আরও অনেক মৌলিক প্রশ্নের উত্তর আরও স্পষ্টভাবে বুঝতে সাহায্য করবে এটি।

সম্প্রতি খুঁজে পাওয়া মহাকর্ষ তরঙ্গের তালিকা থেকে বিজ্ঞানীরা বেশ কিছু দারুণ আবিষ্কারের দেখা পেয়েছেন। GW240615 নামে তরঙ্গটির আসল উৎস মহাবিশ্বের ঠিক কোন জায়গায়, তা বিজ্ঞানীরা নিখুঁতভাবে হিসাব করে বের করতে পেরেছেন। আবার GW250114 নামে তরঙ্গটি থেকে এখন পর্যন্ত সবচেয়ে স্পষ্ট ও নিখুঁত সংকেত পাওয়া গেছে। এ ছাড়া GW241011 এবং GW241110 নামের দুটি তরঙ্গ বিজ্ঞানীদের একটি নতুন ধারণা দেয়। তাঁদের মতে, এগুলো দ্বিতীয় প্রজন্মের কৃষ্ণগহ্বরের অস্তিত্বের প্রমাণ দেয়, যা মূলত ছোট ছোট কয়েকটি কৃষ্ণগহ্বর একে অপরের সঙ্গে মিলে গিয়ে তৈরি হয়।

আরও পড়ুন
সম্প্রতি প্রতি সপ্তাহে যে নতুন সংকেতগুলো পাওয়া যাচ্ছে, তা এলভিকে নেটওয়ার্কের এ পর্যন্ত খুঁজে পাওয়া মোট মহাকর্ষীয় তরঙ্গের প্রায় ৭৫ শতাংশ।

ইতালির ইন্টারন্যাশনাল স্কুল ফর অ্যাডভান্সড স্টাডিজের গবেষক মারিও স্পেরা বিষয়টি নিয়ে কাজ করছেন। তিনি জানান, এই ঘটনাগুলো একটি বিষয় স্পষ্ট করে—ব্ল্যাকহোল কীভাবে জন্ম নেয়, বড় হয় বা একে অপরের সঙ্গে মিশে যায়। তবে বিজ্ঞানীরা আশাবাদী, এলভিকে নেটওয়ার্কের নতুন প্রতিটি তালিকার সঙ্গে সঙ্গে এই রহস্যের চিত্রটি আরও স্পষ্ট ও চমকপ্রদ হয়ে উঠবে।

নতুন খুঁজে পাওয়া এই ১৬১টি তরঙ্গ থেকে যে পরিমাণ তথ্য পাওয়া গেছে, তা বিজ্ঞানীদের আগামী কয়েক বছর গবেষণার কাজে ব্যস্ত রাখার জন্য যথেষ্ট। তবে গবেষকদের আন্তর্জাতিক দলটির মতে, সামনে আরও বড় চমক আসছে। কারণ, মহাবিশ্বের এই তরঙ্গগুলো যাতে আরও সূক্ষ্ম ও নিখুঁতভাবে ধরা যায়, সেজন্য তাঁরা ডিটেক্টর যন্ত্রগুলোকে প্রতিনয়ত আরও উন্নত করার কাজ চালিয়ে যাচ্ছেন।

সূত্র: সায়েন্স অ্যালার্ট ও সায়েন্টিফিক আমেরিকান

আরও পড়ুন