মঙ্গলে ইটের বদলে ব্যাকটেরিয়া দিয়ে তৈরি হবে বাড়ি

আসলেই কি মঙ্গলে বসতি স্থাপন করা সম্ভব?ছবি: মার্স ওয়ান / ব্রায়ান ভারস্টিগ

লাল গ্রহ মঙ্গলে মানুষের পা পড়ার আর খুব বেশি দেরি নেই। ২০৩০-এর দশকের কোনো এক সময়ে নাসার নভোচারীরা মঙ্গলের বুকে হাঁটবেন, এমনটাই পরিকল্পনা। পৃথিবীর সঙ্গে মঙ্গলের বেশ কিছু মিল আছে। যেমন সেখানেও পাতলা বায়ুমণ্ডল ও প্রাচীনকালে পানির অস্তিত্ব থাকার শক্ত প্রমাণ রয়েছে। তাই মঙ্গলে বসতি গড়ার স্বপ্নটা অনেক দিনের পুরোনো।

কিন্তু মহাকাশযাত্রা প্রচণ্ড ব্যয়বহুল। শুধু মানুষ পাঠানোই তো শেষ কথা নয়, সেই বিরূপ ও তেজস্ক্রিয় পরিবেশে টিকে থাকতে হলে নভোচারীদের জন্য মজবুত ঘরবাড়ি লাগবে, দরকার হবে যন্ত্রপাতি ও বেঁচে থাকার নানা সরঞ্জাম। পৃথিবী থেকে ইট, বালু, সিমেন্ট ও রড নভোযানে ভরে মঙ্গলে নিয়ে যাওয়াটা রীতিমতো পাগলামি। হিসাব করে দেখা গেছে, পৃথিবী থেকে মঙ্গলে এক কেজি ওজনের কোনো বস্তু পাঠাতেই লাখ লাখ ডলার খরচ হয়ে যায়! সেখানে আস্ত একটা বাড়ি বানানোর মালমশলা পাঠাতে গেলে বিশ্বের বড় বড় অর্থনীতির দেশেরও লালবাতি জ্বলবে।

ইন-সিটু রিসোর্স ইউটিলাইজেশন পদ্ধতি
ছবি: আইকন / বিগ-বিয়ার্ক ইঙ্গলস গ্রুপ

তাহলে উপায়? বিজ্ঞানীরা বলছেন, পৃথিবী থেকে সবকিছু বয়ে নিয়ে যাওয়ার কোনো মানে নেই। এর বদলে মঙ্গলের মাটিতেই তৈরি করতে হবে বাড়িঘর। বিজ্ঞানের ভাষায় এই পদ্ধতির নাম ইন-সিটু রিসোর্স ইউটিলাইজেশন বা স্থানীয় সম্পদের ব্যবহার। অতীতকালে পৃথিবীর অভিযাত্রীরা যেমন নতুন কোনো দ্বীপে গিয়ে জাহাজের কাঠ দিয়ে নয়, বরং সেখানকার গাছ ও পাথর দিয়ে ঘর বানাতেন, মঙ্গলেও ঠিক সেটাই করতে হবে। ইতালির পলিটেকনিক ইউনিভার্সিটি অব মিলানের একদল গবেষক এর জন্য এক অভিনব উপায়ের কথা বলেছেন। তাঁরা বলছেন, মঙ্গলে বাড়িঘর বানানোর জন্য কোনো রাজমিস্ত্রি লাগবে না, এই কাজ করবে ব্যাকটেরিয়া!

আরও পড়ুন
অতীতকালে পৃথিবীর অভিযাত্রীরা যেমন নতুন কোনো দ্বীপে গিয়ে জাহাজের কাঠ দিয়ে নয়, বরং সেখানকার গাছ ও পাথর দিয়ে ঘর বানাতেন, মঙ্গলেও ঠিক সেটাই করতে হবে।

চোখে দেখা যায় না এমন অণুজীব কীভাবে ইট-পাথরের মতো শক্ত বাড়ি বানাবে? গবেষকেরা বায়োমিনারেলাইজেশন নামে একটি প্রাকৃতিক প্রক্রিয়ার কথা উল্লেখ করেছেন। এই প্রক্রিয়ায় জীবন্ত অণুজীবরা খনিজ পদার্থ তৈরি করতে পারে।

বিজ্ঞানীরা দুটি বিশেষ ব্যাকটেরিয়ার নাম বলেছেন। সেগুলো হলো স্পোরোসারসিনা পাস্তুরি এবং ক্রোকোকিডিওপসিস। এই দুটি ব্যাকটেরিয়াকে একসঙ্গে মিশিয়ে একটি যৌথ মিশ্রণ তৈরি করা হবে। এরপর এই মিশ্রণটিকে মঙ্গলের মাটির সঙ্গে মেলালে জাদুর মতো কাজ হবে।

বিজ্ঞানীরা স্বপ্ন দেখছেন—মঙ্গলের মাটি ও ব্যাকটেরিয়া মিশিয়ে থ্রিডি প্রিন্টারে চোখের পলকে আস্ত সব বাড়ি তৈরি করা সম্ভব!
ছবি: নাসা

গবেষকদের মতে, স্পোরোসারসিনা ব্যাকটেরিয়া একধরনের প্রাকৃতিক পলিমার নিঃসরণ করে। এটি খনিজ পদার্থের বৃদ্ধি ত্বরান্বিত করে এবং মঙ্গলের আলগা মাটিকে জমাট বাঁধিয়ে একদম কংক্রিটের মতো শক্ত পদার্থে পরিণত করে। বিজ্ঞানীরা স্বপ্ন দেখছেন, মঙ্গলের মাটি ও ব্যাকটেরিয়ার এই মিশ্রণটিকে বিশাল থ্রিডি প্রিন্টারের কালি হিসেবে ব্যবহার করে চোখের পলকে আস্ত সব বাড়ি বা হ্যাবিট্যাট প্রিন্ট করে ফেলা সম্ভব!

এই অণুজীবদের জাদুকরী ক্ষমতা শুধু ইট-সিমেন্টের বিকল্প হওয়ার মাঝেই আটকে নেই। মঙ্গলের সেই বৈরী পরিবেশে নভোচারীদের বেঁচে থাকার জন্য আরও অনেক কিছু দরকার। ক্রোকোকিডিওপসিস নামে ব্যাকটেরিয়াটি নিজে থেকে অক্সিজেন তৈরি করতে পারে। অর্থাৎ, এরা শুধু নভোচারীদের জন্য মজবুত বাড়ির দেয়ালই বানাবে না, ঘরের ভেতরে শ্বাস নেওয়ার জন্য জীবনদায়ী অক্সিজেনেরও জোগান দেবে।

আরও পড়ুন
স্পোরোসারসিনা ব্যাকটেরিয়া একধরনের প্রাকৃতিক পলিমার নিঃসরণ করে। এটি খনিজ পদার্থের বৃদ্ধি ত্বরান্বিত করে এবং মঙ্গলের আলগা মাটিকে জমাট বাঁধিয়ে কংক্রিটের মতো শক্ত পদার্থে পরিণত করে।

অন্যদিকে স্পোরোসারসিনা পাস্তুরি ব্যাকটেরিয়া যখন কাজ করে, তখন তার শরীর থেকে উপজাত হিসেবে বের হয় অ্যামোনিয়া গ্যাস। দীর্ঘমেয়াদে এই অ্যামোনিয়াকে সার হিসেবে কাজে লাগিয়ে মঙ্গলের বুকে কৃষিকাজ গড়ে তোলা সম্ভব। এমনকি মঙ্গলের পরিবেশকে পৃথিবীর মতো বাসযোগ্য করে তোলার যে বিশাল স্বপ্ন, সেখানেও এই ক্ষুদ্র ব্যাকটেরিয়াগুলো জাদুর কাঠির মতো কাজ করতে পারে।

স্পোরোসারসিনা পাস্তুরি ব্যাকটেরিয়া
ছবি: রিসার্চ গেইট

২০২৫ সালের ২ ডিসেম্বর বিখ্যাত বিজ্ঞান সাময়িকী ফ্রন্টিয়ার্স এই অভাবনীয় গবেষণাপত্রটি প্রকাশ করেছে। মহাকাশবিজ্ঞানের এই নতুন দিকটি আমাদের চোখে আঙুল দিয়ে দেখিয়ে দিচ্ছে, বিশাল মহাকাশ জয়ের জন্য সব সময় বিশাল যন্ত্রপাতির দরকার হয় না। অনেক সময় পৃথিবীর সবচেয়ে ক্ষুদ্র প্রাণীরাই সবচেয়ে বড় অসাধ্য সাধন করে ফেলতে পারে। কে জানে, হয়তো আগামী দশকের নভোচারীদের জীবন বাঁচানোর সবচেয়ে বড় কৃতিত্ব লেখা থাকবে এই খুদে ব্যাকটেরিয়াদের নামেই!

লেখক: সহকারী শিক্ষক, গণিত বিভাগ, পদ্মা ক্যান্টনমেন্ট পাবলিক স্কুল অ্যান্ড কলেজ, শরীয়তপুর

সূত্র: স্পেস ডটকম

আরও পড়ুন