মহাবিশ্বকে ব্যাখ্যা করতে ঠিক কয়টি সংখ্যা লাগে

মাইকেল ডাফের মতে, মহাবিশ্বকে ব্যাখ্যা করতে শূন্যটি সংখ্যার প্রয়োজন!ছবি: নাসা

গল্পের শুরু ১৯৯২ সালে। সুইজারল্যান্ডের বিখ্যাত গবেষণা কেন্দ্র সার্নের ক্যাফেটেরিয়ায় হুলুস্থুল কাণ্ড চলছে। একদিকে তৈরি হচ্ছে লার্জ হ্যাড্রন কোলাইডার নামে বিশাল এক যন্ত্র, অন্যদিকে মাত্র কয়েক মাস আগে জন্ম নিয়েছে ওয়ার্ল্ড ওয়াইড ওয়েব বা ইন্টারনেট। কিন্তু ক্যাফেটেরিয়ার এক কোণায় তিন বাঘা পদার্থবিজ্ঞানী এসব নিয়ে কথা বলছিলেন না। তাঁদের তর্কের বিষয় ছিল অদ্ভুত এবং আপাতদৃষ্টিতে খুব সাধারণ। এই মহাবিশ্বকে পুরোপুরি ব্যাখ্যা করতে ঠিক কয়টি সংখ্যার প্রয়োজন?

টেবিলে ছিলেন তিন মেরুর তিনজন মানুষ। গ্যাব্রিয়েলে ভেনেজিয়ানো—স্ট্রিং থিওরির অন্যতম জনক, সোভিয়েত বিজ্ঞানী লেভ ওকুন—যিনি হ্যাড্রন শব্দটি চালু করেছিলেন এবং ব্রিটিশ থিওরিজিশিয়ান মাইকেল ডাফ—তিনি কাজ করেছেন এম-থিওরি নিয়ে।

স্ট্রিং থিওরির অন্যতম জনক গ্যাব্রিয়েলে ভেনেজিয়ানো
ছবি: সার্ন

ভেনেজিয়ানো বলছিলেন, মহাবিশ্ব চালাতে মাত্র দুটি মৌলিক ধ্রুবকই যথেষ্ট। ওকুন রেগেমেগে বলছিলেন, অসম্ভব! অন্তত তিনটি সংখ্যা তো লাগবেই। আর মাইকেল ডাফ দুজনকে তুড়ি মেরে উড়িয়ে দিয়ে বলছিলেন, তোমাদের কারোরটাই ঠিক নয়। মহাবিশ্ব ব্যাখ্যা করতে আসলে শূন্যটি সংখ্যার প্রয়োজন!

সেই দুপুরের তর্ক আর থামেনি। ৩০ বছর ধরে এই তিন বিজ্ঞানী এবং তাঁদের অনুসারীরা এই প্রশ্নটি নিয়ে মাথা ঘামিয়ে চলেছেন। চলুন, এই মহাজাগতিক তর্কের গভীরে ঢোকা যাক।

আরও পড়ুন
ভেনেজিয়ানো বলছিলেন, মহাবিশ্ব চালাতে মাত্র দুটি মৌলিক ধ্রুবকই যথেষ্ট। ওকুন রেগেমেগে বলছিলেন, অসম্ভব! অন্তত তিনটি সংখ্যা তো লাগবেই।

যেকোনো পদার্থবিজ্ঞানের বই খুললে দেখবেন প্রচুর সংখ্যার ছড়াছড়ি। তবে এর মধ্যে তিনটি সংখ্যাকে বিজ্ঞানীরা জাদুর কাঠির মতো মনে করেন। এগুলো হলো আলোর গতি c, মহাকর্ষীয় ধ্রুবক G এবং প্ল্যাঙ্কের ধ্রুবক h। আইনস্টাইনের বিখ্যাত E=mc2 সূত্রে আমরা পাই c। এটি শক্তি ও ভরকে এক সুতোয় গাঁথে। আবার স্থান ও কালকে মিলিয়ে দেয়। আবার G মহাকর্ষ বলের মান ঠিক করে। এটি বলে দেয় ভরযুক্ত বস্তু কীভাবে স্থান-কালকে বাঁকিয়ে দেয়। আর h কোয়ান্টাম মেকানিক্সের চাবিকাঠি। এটি তরঙ্গ এবং কণার মধ্যে সম্পর্ক তৈরি করে।

সোভিয়েত বিজ্ঞানী লেভ ওকুন
ছবি: ফিজিক্স টুডে

লেভ ওকুনের দাবি ছিল খুব সোজাসাপ্টা। তিনি বললেন, এই তিনটি—c, G, h—হলো মহাবিশ্বের ভিত্তি। এদের যেকোনো একটা বাদ দিলে থিওরি অব এভরিথিং দাঁড় করানো যাবে না। তিনি একটি কাল্পনিক মানচিত্র এঁকে দেখালেন, যেখানে এই তিনটি সংখ্যা হলো তিনটি সুইচ। সুইচ বন্ধ থাকলে আপনি নিউটনের সাধারণ জগতে আছেন। c অন করলে রিলেটিভিটি, h অন করলে কোয়ান্টাম জগত, এবং G অন করলে মহাকর্ষ। সব অন করলেই কেবল মহাবিশ্বকে বোঝা যাবে। তাই সংখ্যা হতে হবে তিন।

ইতালিয়ান বিজ্ঞানী ভেনেজিয়ানো মানতে চাইলেন না। তিনি স্ট্রিং থিওরির চশমা দিয়ে জগতটাকে দেখছিলেন। স্ট্রিং থিওরি বলে, মহাবিশ্বের সবকিছুই আসলে একরৈখিক সুতো বা স্ট্রিংয়ের কম্পন।

ভেনেজিয়ানোর যুক্তি হলো, স্ট্রিং থিওরি যদি সত্যি হয়, তবে নিউটনের মহাকর্ষীয় ধ্রুবক আলাদাভাবে দরকার নেই। স্ট্রিংয়ের কম্পন দিয়েই ভর, শক্তি সব ব্যাখ্যা করা যায়। তাই তাঁর মতে, প্রকৃতিকে ব্যাখ্যা করতে দরকার মাত্র দুটি জিনিস, স্ট্রিংয়ের দৈর্ঘ্য এবং আলোর গতি (c)। তাই সংখ্যাটি হবে দুই।

আরও পড়ুন
লেভ ওকুনের দাবি ছিল খুব সোজাসাপ্টা। তিনি বললেন, এই তিনটি—c, G, h—হলো মহাবিশ্বের ভিত্তি। এদের যেকোনো একটা বাদ দিলে থিওরি অব এভরিথিং দাঁড় করানো যাবে না।

সবচেয়ে অদ্ভুত দাবিটা ছিল মাইকেল ডাফের। তিনি বললেন, ‘তোমরা যেসব সংখ্যার কথা বলছ, আলোর গতি বা প্ল্যাঙ্কের ধ্রুবক, এগুলো আসলে মানুষের তৈরি করা মাপজোখ। প্রকৃতি এসব মিটার, সেকেন্ড বা কেজির তোয়াক্কা করে না।’

ডাফের যুক্তিটা ভাবুন। আমরা বলি আলোর গতি সেকেন্ডে ২৯৯,৭৯২,৪৫৮ মিটার। কিন্তু মিটার বা সেকেন্ড তো প্যারিসের এক কমিটি ঠিক করে দিয়েছে! ভিনগ্রহের কোনো এলিয়েন যদি পদার্থবিজ্ঞান চর্চা করে, তারা তো আর মিটার বা সেকেন্ড ব্যবহার করবে না। তাদের কাছে আলোর গতির সংখ্যাটা হবে অন্যরকম।

ব্রিটিশ থিওরিজিশিয়ান মাইকেল ডাফ
ছবি: ইম্পেরিয়াল কলেজ লন্ডন

ডাফ বললেন, মহাবিশ্বের আসল ধ্রুবক সেগুলোই, যাদের কোনো একক নেই। যেমন, প্রোটন ও ইলেকট্রনের ভরের অনুপাত। আপনি কেজিতে মাপেন আর পাউন্ডে, অনুপাতটা একই থাকবে। ডাফের মতে, c, G বা h মানুষের তৈরি স্কেল মাত্র। চাইলেই আমরা অঙ্ক কষে এদের মান ১ ধরে নিতে পারি। তাই মৌলিকভাবে, মহাবিশ্ব ব্যাখ্যা করতে কোনো নির্দিষ্ট এককের সংখ্যার প্রয়োজন নেই। তাই উত্তর হলো শূন্য।

এতক্ষণে তর্ক কি থামল? না, থামল না। এই তিন বিজ্ঞানী যেখানেই দেখা করতেন—কনফারেন্সে কিংবা স্কি করতে গিয়ে—ওকুন দূর থেকে ভেনেজিয়ানোকে দেখলেই চিৎকার করে জিজ্ঞেস করতেন, ‘কী হে? দুই নাকি তিন?’

আরও পড়ুন
ডাফ বললেন, মহাবিশ্বের আসল ধ্রুবক সেগুলোই, যাদের কোনো একক নেই। যেমন, প্রোটন ও ইলেকট্রনের ভরের অনুপাত। আপনি কেজিতে মাপেন আর পাউন্ডে, অনুপাতটা একই থাকবে।

২০১৫ সালে ওকুন মারা যান, কিন্তু তর্ক রয়েই যায়। এর মধ্যেই ২০২৪ সালে ব্রাজিলের সাও পাওলো স্টেট ইউনিভার্সিটির জর্জ ম্যাটাস এবং তাঁর দল নতুন এক বোমা ফাটালেন। তাঁরা বললেন, উত্তর তিন, দুই বা শূন্য নয়, উত্তর হলো এক! শুরু হলো নতুন যুক্তি!

ম্যাটাস বললেন, ধরুন আপনি এক নির্জন দ্বীপে আটকা পড়েছেন। মহাবিশ্ব মাপার জন্য আপনার সবচেয়ে কম কয়টা যন্ত্র লাগবে? তাঁর মতে, শুধু একটা ঘড়ি থাকলেই চলে। কেন? 

কারণ মহাকর্ষের কারণে ওপর থেকে নিচে পড়লে সময়ের হেরফের হয়, সেখান থেকে ভর বের করা যায়। আবার রিলেটিভিটি দিয়ে সময় থেকে দূরত্ব বের করা যায়। অর্থাৎ, শুধু সময় মাপতে পারলেই আপনি দৈর্ঘ্য, ভর সব বের করতে পারবেন। তাই মহাবিশ্ব চালাতে লাগে মাত্র একটি সংখ্যা।

তাহলে শেষমেশ কি কোনো সিদ্ধান্তে পৌঁছানো গেল? ইম্পেরিয়াল কলেজ লন্ডনের জোয়াও মাগুইজো অবশ্য এই পুরো তর্কটাকেই একটু বাঁকা চোখে দেখেন। তিনি বলেন, ‘আমরা এখন যা জানি, সেটাকেই শেষ কথা ভাবাটা বোকামি। গ্যালিলিও ভাবতেন পৃথিবীর মহাকর্ষ সব জায়গায় সমান, এখন আমরা জানি তা উচ্চতা ভেদে বদলায়।’

সূত্র: নিউ সায়েন্টিস্ট

আরও পড়ুন