অবিশ্বাস্য গতিতে ঘুরছে আমাদের গ্যালাক্সির ব্ল্যাকহোল

ব্ল্যাকহোল মানেই এক সর্বগ্রাসী অন্ধকারছবি: মিডজার্নির সাহায্যে তৈরি

মহাকাশের এক গভীর ও অন্ধকার রহস্যের নাম ব্ল্যাকহোল বা কৃষ্ণগহ্বর। আমাদের নিজেদের গ্যালাক্সি মিল্কিওয়ের ঠিক কেন্দ্রে ঘাপটি মেরে বসে আছে এমনই এক দানব। নাম তার স্যাজিটেরিয়াস এ*। পৃথিবী থেকে প্রায় ২৬ হাজার আলোকবর্ষ দূরে অবস্থিত এই সুপারম্যাসিভ ব্ল্যাকহোলটি সম্পর্কে বিজ্ঞানীরা সম্প্রতি এমন এক তথ্য দিয়েছেন, যা শুনে পদার্থবিদরাও চমকে গেছেন। এই দানবটি ঘুরছে বনবন করে। তবে যেনতেন ঘোরা নয়; আইনস্টাইনের পদার্থবিজ্ঞানের নিয়ম মেনে প্রকৃতিতে কোনো বস্তুর পক্ষে ঠিক যতটা দ্রুতগতিতে ঘোরা সম্ভব, এর গতি প্রায় সেই সর্বোচ্চ সীমার কাছাকাছি!

ব্ল্যাকহোল মানেই এক সর্বগ্রাসী অন্ধকার। এর মহাকর্ষীয় টান এতই শক্তিশালী যে আলোও সেখান থেকে বেরিয়ে আসতে পারে না। তাই ব্ল্যাকহোলকে সরাসরি দেখা অসম্ভব। তবে এর চারপাশের উত্তপ্ত গ্যাস ও ধুলিকণার যে বলয় থাকে, তাকে বলে অ্যাক্রিশন ডিস্ক। এই ডিস্ক থেকে আসা আলো দেখেই বিজ্ঞানীরা এর অস্তিত্ব টের পান। ইভেন্ট হরাইজন টেলিস্কোপ কোলাবোরেশন কয়েক বছর আগে আমাদের এই ব্ল্যাকহোলের ছায়ার প্রথম ছবি তুলেছিল। সেই ঝাপসা, কমলা রঙের আগুনের আংটির মতো ছবিটি নিশ্চয়ই আপনাদের মনে আছে? সেই ছবি ও টেলিস্কোপের ডেটা থেকেই বেরিয়ে এসেছে এই নতুন ও চাঞ্চল্যকর তথ্য।

ইভেন্ট হরাইজন টেলিস্কোপের সাহায্যে তোলা স্যাজিটেরিয়াস এ* ব্ল্যাকহোলের ছায়ার প্রথম ছবি
ছবি: উইকিপিডিয়া

তবে কাজটা মোটেও সহজ ছিল না। পৃথিবীজুড়ে ছড়ানো টেলিস্কোপের নেটওয়ার্ক থেকে পাওয়া ওই অস্পষ্ট ছবি দেখে ব্ল্যাকহোলের ঘূর্ণন গতি বের করা অনেকটা খড়ের গাদায় সুচ খোঁজার মতো। তাই বিজ্ঞানীরা এবার সাহায্য নিলেন আধুনিক প্রযুক্তির। নেদারল্যান্ডসের র‍্যাডবাউড ইউনিভার্সিটি এবং জার্মানির ম্যাক্স প্ল্যাঙ্ক ইনস্টিটিউটের জ্যোতির্বিজ্ঞানী মাইকেল জানসেনের নেতৃত্বে একটি গবেষক দল সুপারকম্পিউটার ব্যবহার করে এক বিশাল কর্মযজ্ঞ শুরু করেন। তাঁরা কৃত্রিমভাবে কয়েক মিলিয়ন সিমুলেটেড ব্ল্যাকহোল তৈরি করেন। এরপর তাঁরা একটি নিউরাল নেটওয়ার্ককে প্রশিক্ষণ দেন, যাতে সেটি আসল ব্ল্যাকহোলের ডেটা ও  সিমুলেশনের ডেটা মিলিয়ে গোপন তথ্য বের করে আনতে পারে।

আরও পড়ুন
ব্ল্যাকহোল মানেই এক সর্বগ্রাসী অন্ধকার। এর মহাকর্ষীয় টান এতই শক্তিশালী যে আলোও সেখান থেকে বেরিয়ে আসতে পারে না। তাই ব্ল্যাকহোলকে সরাসরি দেখা অসম্ভব।

ফলাফল যা এল, তা চমকে ওঠার মতো। গবেষণায় দেখা গেছে, স্যাজিটেরিয়াস এ* তার সর্বোচ্চ সীমার খুব কাছাকাছি গতিতে ঘুরছে। পদার্থবিজ্ঞানে একটি ব্ল্যাকহোলের ভরের ওপর ভিত্তি করে তার ঘূর্ণন গতির একটা সর্বোচ্চ সীমা থাকে, যাকে বলা হয় ‘কার লিমিট’। আমাদের গ্যালাক্সির ব্ল্যাকহোলটি সেই সীমানা ছুঁইছুঁই করছে। মানে এটি তার আশপাশের স্থান-কাল বা স্পেস-টাইমকে প্রচণ্ড শক্তিতে নিজের সঙ্গে পেঁচিয়ে ফেলছে। বিজ্ঞানের ভাষায় একে বলে ফ্রেম ড্র্যাগিং।

গবেষণায় আরও একটি মজার বিষয় উঠে এসেছে। ব্ল্যাকহোলটির ঘূর্ণন অক্ষ সরাসরি আমাদের পৃথিবীর দিকে তাক করা। সহজ করে বললে, আমরা এর পাশ থেকে দেখছি না, বরং ওপর থেকে নিচের দিকে তাকিয়ে আছি। অনেকটা লাটিমের মাথার ওপর থেকে দেখার মতো।

পৃথিবী থেকে প্রায় ৫৫ মিলিয়ন আলোকবর্ষ দূরে অবস্থিত এম৮৭* ব্ল্যাকহোল
ছবি: ব্রিটানিকা

এ কারণেই আমরা এর চারপাশের উজ্জ্বল রিংটিকে প্রায় গোলাকার দেখি। এ ছাড়া এর চারপাশের বস্তুর চৌম্বক ক্ষেত্র ঠিক সেভাবে কাজ করছে না, যেমনটা তাত্ত্বিকভাবে আশা করা হয়েছিল। এটা বিজ্ঞানীদের জন্য এক নতুন ধাঁধা।

শুধু আমাদেরটাই নয়, ৫৫ মিলিয়ন আলোকবর্ষ দূরের এম৮৭* ব্ল্যাকহোল নিয়েও তাঁরা গবেষণা করেছেন। দেখা গেছে, সেটিও বেশ জোরে ঘুরছে, তবে স্যাজিটেরিয়াস এ*-এর মতো অতটা দ্রুত নয়। তবে এম৮৭*-এর ক্ষেত্রে এক অদ্ভুত ব্যাপার লক্ষ্য করা গেছে। এর চারপাশের ডিস্ক যেদিকে ঘুরছে, ব্ল্যাকহোলটি ঘুরছে তার উল্টো দিকে! বিজ্ঞানীদের ধারণা, হয়তো অতীতে অন্য কোনো ব্ল্যাকহোলের সঙ্গে সংঘর্ষের কারণে এমনটা হয়েছে।

আরও পড়ুন
পদার্থবিজ্ঞানে একটি ব্ল্যাক হোলের ভরের ওপর ভিত্তি করে তার ঘূর্ণন গতির একটা সর্বোচ্চ সীমা থাকে, যাকে বলা হয় কার লিমিট। আমাদের গ্যালাক্সির ব্ল্যাকহোলটি সেই সীমানা ছুঁইছুঁই করছে।

মাইকেল জানসেন বলেন, “প্রচলিত থিওরিকে চ্যালেঞ্জ করা সব সময়ই উত্তেজনার। তবে আমাদের এই এআই প্রযুক্তি কেবল প্রথম ধাপ। আফ্রিকায় নতুন ‘আফ্রিকা মিলিমিটার টেলিস্কোপ’ তৈরি হচ্ছে। ওটা চালু হলে আমরা আইনস্টাইনের সাধারণ আপেক্ষিকতা তত্ত্বকে আরও নিখুঁতভাবে যাচাই করতে পারব।”

আফ্রিকা মিলিমিটার টেলিস্কোপের কাল্পনিক ছবি
ছবি: স্পেস ইন আফ্রিকা

মহাবিশ্বের এই দানবদের আচরণ বোঝা আমাদের জন্য জরুরি, কারণ এদের মাধ্যমেই আমরা মহাকর্ষ এবং স্থান-কালের চূড়ান্ত সীমা সম্পর্কে জানতে পারি। কে জানে, হয়তো ভবিষ্যতের কোনো গবেষণায় এই ব্ল্যাকহোলই আমাদের জানাবে মহাবিশ্বের সৃষ্টির গোপন কোনো রহস্য!

গবেষকদের এই বিস্তারিত ফলাফল সম্প্রতি তিনটি আলাদা গবেষণাপত্রে প্রকাশিত হয়েছে। এরমধ্যে একটি অ্যাস্ট্রোনমি অ্যান্ড অ্যাস্ট্রোফিজিকস জার্নাল।

লেখক: সহকারী শিক্ষক, গণিত বিভাগ, পদ্মা ক্যান্টনমেন্ট পাবলিক স্কুল অ্যান্ড কলেজ, শরীয়তপুর

সূত্র: অ্যাস্ট্রোনমি অ্যান্ড অ্যাস্ট্রোফিজিক্স জার্নাল ও সায়েন্স অ্যালার্ট

আরও পড়ুন