স্পেসস্যুট তৈরিতে পিছিয়ে পড়ছে নাসা, ২০২৮ সালে হয়তো চাঁদে যাওয়া হচ্ছে না

২০২৮ সালে নাসার চাঁদের বুকে আবারও মানুষ পাঠানোর ঐতিহাসিক মিশনটি এখন বড় ধরনের হুমকির মুখে পড়েছে!ছবি: নাসা

২০২৮ সালে চাঁদের বুকে আবারও মানুষ পাঠানোর বিশাল পরিকল্পনা করেছে নাসা। কিন্তু ঐতিহাসিক এই মিশনটি এখন বড় ধরনের হুমকির মুখে পড়েছে। কারণ নভোচারীদের স্পেসস্যুট এখনো তৈরি হয়নি! নাসার অফিস অব ইন্সপেক্টর জেনারেলের (ওআইজি) নতুন এক প্রতিবেদনে সতর্ক করে বলা হয়েছে, ‘নতুন স্পেসস্যুট তৈরি করতে এতটাই দেরি হচ্ছে যে, চাঁদের এই মিশন ২০৩১ সাল পর্যন্ত পিছিয়ে যেতে পারে।’

নাসার নভোচারীরা আন্তর্জাতিক মহাকাশ স্টেশনে বর্তমানে যে স্পেসস্যুটগুলো পরে হাঁটাচলা করেন, সেগুলোর নকশা করা হয়েছিল আজ থেকে প্রায় ৫০ বছর আগে। গত ২০ বছরে এগুলোতে বড় কোনো আধুনিক পরিবর্তনও আনা হয়নি। অন্যদিকে, সেই অ্যাপোলো আমলের পুরোনো চাঁদের স্যুটগুলোও এখন আর ব্যবহারের উপযোগী নেই। তাই ২০২২ সালে নাসা নতুন স্পেসস্যুট তৈরির জন্য অ্যাক্সিওম স্পেস ও কলিন্স অ্যারোস্পেস নামে দুটি বেসরকারি কোম্পানিকে দায়িত্ব দেয়। চুক্তিটি ছিল প্রায় ৩১০ কোটি ডলারের! কথা ছিল, কোম্পানিগুলো স্যুট বানাবে এবং নাসা সেগুলো মহাকাশ মিশনের জন্য ভাড়ায় ব্যবহার করবে।

২০২২ সালে নাসা নতুন স্পেসস্যুট তৈরির জন্য অ্যাক্সিওম স্পেস ও কলিন্স অ্যারোস্পেস নামে দুটি বেসরকারি কোম্পানিকে দায়িত্ব দেয়
ছবি: মার্ক ফেলিক্স/এএফপি/গেটি ইমেজ

কিন্তু কাজ শুরু হতেই বাধে বিপত্তি। নাসার দেওয়া সময়সীমার মধ্যে স্যুট তৈরি করতে না পারায় ২০২৪ সালে কলিন্স অ্যারোস্পেস এই প্রকল্প থেকে সরে দাঁড়ায়। ফলে পুরো দায়িত্ব এসে পড়ে অ্যাক্সিওম স্পেসের ওপর। নাসার প্রাথমিক লক্ষ্য ছিল, ২০২৫ সালের মধ্যে চাঁদের উপযোগী স্যুটের প্রদর্শন করা এবং ২০২৬ সালে মহাকাশ স্টেশনে এর শূন্য মাধ্যাকর্ষণ সংস্করণের পরীক্ষা চালানো। কিন্তু ওআইজির প্রতিবেদনে বলা হয়েছে, নাসার এই সময়সীমার মধ্যে স্পেসস্যুট বানানো বাস্তবে অসম্ভব।

আরও পড়ুন
২০২২ সালে নাসা নতুন স্পেসস্যুট তৈরির জন্য অ্যাক্সিওম স্পেস ও কলিন্স অ্যারোস্পেস নামে দুটি বেসরকারি কোম্পানিকে দায়িত্ব দেয়। চুক্তিটি ছিল প্রায় ৩১০ কোটি ডলারের!

ঘড়ির কাঁটা কিন্তু থেমে নেই। নাসা চায় ২০৩০ সালে আন্তর্জাতিক মহাকাশ স্টেশন অবসরে যাওয়ার আগেই সেখানে নতুন স্যুটের পরীক্ষা সারতে। ২০২৮ সালে আর্টেমিস ৪ মিশনের জন্যই চাঁদের স্যুটগুলো পুরোপুরি প্রস্তুত থাকতে হবে, কারণ ১৯৭২ সালের পর এই মিশন দিয়েই আবার চাঁদে মানুষের পা পড়ার কথা।

প্রতিবেদনে স্পষ্টভাবে সতর্ক করা হয়েছে, অ্যাক্সিওম স্পেসের কাজে যদি আরও দেরি হয়, তবে ২০৩১ সালের আগে কোনো স্যুটই হয়তো হাতে পাওয়া যাবে না।

অবশ্য বিকল্প হিসেবে ইলন মাস্কের স্পেসএক্সের তৈরি স্যুটের কথাও প্রতিবেদনে উঠে এসেছে। সম্প্রতি পোলারিস ডন মিশনে স্পেসএক্সের একটি স্যুট পরীক্ষা করা হয়েছে এবং প্রতিষ্ঠানটির দাবি, কিছুটা পরিবর্তন করলে তাদের এই স্যুট চাঁদেও ব্যবহার করা যাবে।

ইলন মাস্কের স্পেসএক্সের তৈরি স্যুট
ছবি: স্পেসএক্স

এত সমালোচনার পরও অ্যাক্সিওম স্পেসের সিইও জোনাথন সারটেইন বেশ আত্মবিশ্বাসী। তিনি এক বিবৃতিতে জানিয়েছেন, তারা এ বছরই স্যুটের একটি পরীক্ষার যোগ্য মডেল নাসার কাছে হস্তান্তর করবেন। ২০২৭ সালের মধ্যে মহাকাশে এটি পরীক্ষার জন্য তারা কাজ চালিয়ে যাচ্ছেন। নভোচারীদের নিরাপদে চাঁদে ফেরানোই তাদের প্রধান লক্ষ্য বলে তিনি উল্লেখ করেন।

আরও পড়ুন
বিশেষজ্ঞরা একমত যে, চাঁদে নামার ওই যানের নকশা চূড়ান্ত না হওয়া পর্যন্ত স্পেসস্যুটের নকশাও পুরোপুরি চূড়ান্ত করা সম্ভব নয়। কারণ, যানের সিস্টেমের সঙ্গে স্যুটের নিখুঁত সমন্বয় থাকতে হবে।

স্মিথসোনিয়ান ইনস্টিটিউশনের মহাকাশ কর্মসূচির কিউরেটর ক্যাথলিন লুইসের মতে, স্পেসস্যুট তৈরিতে দেরি হওয়ার বিষয়টি অবাক করার মতো কিছু নয়। ইতিহাসে সব সময়ই মহাকাশ অভিযানের একদম শেষ ধাপে এসে এই স্যুট নিয়ে কাজ হয়েছে। তবে শিকাগো বিশ্ববিদ্যালয়ের মহাকাশ ইতিহাসবিদ জর্ডান বিম আরেকটি বড় সমস্যার কথা মনে করিয়ে দিয়েছেন। শুধু স্পেসস্যুট নয়, নভোচারীদের চাঁদের কক্ষপথ থেকে পৃষ্ঠে নামানোর জন্য যে মহাকাশযান তৈরি হচ্ছে, সেটির কাজও পিছিয়ে আছে।

বিশেষজ্ঞরা একমত যে, চাঁদে নামার ওই যানের নকশা চূড়ান্ত না হওয়া পর্যন্ত স্পেসস্যুটের নকশাও পুরোপুরি চূড়ান্ত করা সম্ভব নয়। কারণ, যানের সিস্টেমের সঙ্গে স্যুটের নিখুঁত সমন্বয় থাকতে হবে।

ওআইজি তাদের প্রতিবেদনে নাসাকে পরামর্শ দিয়েছে, তারা যেন বর্তমান চুক্তির বিষয়ে অন্যান্য প্রযুক্তি প্রতিষ্ঠানের মতামত নেয় এবং সব যানের সঙ্গেই স্যুটগুলো মানিয়ে যায়, এমন একটি পরিকল্পনা তৈরি করে। নাসা এই পরামর্শ সানন্দে মেনে নিয়েছে। তাদের মতে, ভবিষ্যৎ মিশন সফল করার জন্য মহাকাশচারীদের নিরাপত্তাই তাদের প্রধান অগ্রাধিকার।

সূত্র: সায়েন্টিফিক আমেরিকান

আরও পড়ুন