২০৩৬ সালের মধ্যে চাঁদে স্থায়ী ঘাঁটি বানাবে নাসা
অ্যাপোলো মিশনের কথা মনে আছে? মানুষ তখন প্রথমবারের মতো চাঁদের বুকে পা রেখেছিল! কিন্তু এরপর দীর্ঘ সময় চাঁদ নিয়ে মানুষের উন্মাদনা কিছুটা যেন থিতিয়ে গিয়েছিল। তবে এবার আর শুধু পায়ের ছাপ বা পতাকা ওড়ানোর গল্প নয়, এবার নাসার লক্ষ্য একেবারে চাঁদের বুকে মানুষের একটি স্থায়ী শহর বা ঘাঁটি গড়ে তোলা!
সম্প্রতি নাসার প্রধান জ্যারেড আইজ্যাকম্যান একটি চমকপ্রদ ঘোষণা দিয়েছেন। আগামী দশকের মধ্যে, অর্থাৎ ২০৩৬ সালের মাঝে চাঁদের দক্ষিণ মেরুতে মানুষের স্থায়ী বসবাসের জন্য তারা ৩০ বিলিয়ন ডলারের এক বিশাল মেগা-প্রকল্প হাতে নিয়েছে। আসুন, জেনে নিই নাসার এই রোমাঞ্চকর অভিযানের আদ্যোপান্ত।
জ্যারেড আইজ্যাকম্যান তাঁর ঘোষণায় পরিষ্কার করে দিয়েছেন, ‘এবারের লক্ষ্য শুধু পতাকা আর পায়ের ছাপ নয়। এবার আমরা সেখানে থাকতে যাচ্ছি!’
এই বিশাল লক্ষ্য পূরণের জন্য নাসা তাদের আগের অনেক পরিকল্পনা বদলে ফেলেছে। যেমন, চাঁদের কক্ষপথে ঘোরার জন্য প্রস্তাবিত গেটওয়ে স্পেস স্টেশনের পরিকল্পনাটি বাতিল করা হয়েছে। এমনকি আন্তর্জাতিক স্পেস স্টেশনের দিক থেকেও তারা মনোযোগ কমিয়ে দিচ্ছে। এর বদলে তারা চাঁদের মাটিতে ঘাঁটি বানানোর দিকেই পুরো শক্তি নিয়োগ করতে চায়।
নাসার প্রধান জ্যারেড আইজ্যাকম্যান তাঁর ঘোষণায় পরিষ্কার করে দিয়েছেন, ‘এবারের লক্ষ্য শুধু পতাকা আর পায়ের ছাপ নয়। এবার আমরা সেখানে থাকতে যাচ্ছি!’
চাঁদে মানুষ পাঠানোর এই মিশনগুলোর নাম দেওয়া হয়েছে আর্টেমিস। নাসার এই নতুন রোডম্যাপটি দেখলে আপনি সত্যিই রোমাঞ্চিত হবেন। আর্টেমিস ২ মিশনে চারজন নভোচারী একটি টেস্ট মিশনে চাঁদের কক্ষপথ ঘুরে আসবে। চলতি বছর ১ এপ্রিল এই মিশন শুরু হওয়ার কথা রয়েছে।
এরপর আর্টেমিস ৩ মিশন শুরু হবে ২০২৭ সালে। এই মিশনে স্পেসএক্স এবং ব্লু অরিজিনের তৈরি লুনার ল্যান্ডারগুলোর সঙ্গে ওরিয়ন ক্যাপসুলের ডকিং হওয়ার পরীক্ষা করা হবে। পরের বছর অর্থাৎ ২০২৮ সালে আর্টেমিস ৪ মিশনে মানুষ আবার চাঁদের মাটিতে পা রাখবে!
নাসার লক্ষ্য, এরপর থেকে প্রতি ছয় মাস অন্তর অন্তর নভোচারীদের একটি করে দল চাঁদের দক্ষিণ মেরুতে পাঠানো হবে। সেখানে তাঁরা লুকিয়ে থাকা বরফ এবং অন্যান্য মহামূল্যবান খনিজ পদার্থ নিয়ে গবেষণা করবেন।
চাঁদের দক্ষিণ মেরুতে স্থায়ী ঘাঁটি গড়া মোটেও সহজ কাজ নয়। সেখানে এমন অনেক বড় বড় গর্ত আছে, যেখানে মাসের পর মাস সূর্যের আলো পৌঁছায় না। সৌরশক্তি ছাড়া সেখানে নভোচারীরা কীভাবে টিকে থাকবেন?
প্ল্যানেটারি সোসাইটির কেসি ড্রেয়ারের মতে, নাসার এই ঘোষণার সবচেয়ে আকর্ষণীয় দিকটি হলো পারমাণবিক শক্তির ব্যবহার। নাসা চাঁদের বুকে বিদ্যুৎ উৎপাদনের জন্য তেজস্ক্রিয় আইসোটোপ এবং শেষ পর্যন্ত একটি পূর্ণাঙ্গ পারমাণবিক চুল্লি স্থাপনের পরিকল্পনা করেছে। এটি শুধু চাঁদের জন্যই নয়, ভবিষ্যতের মঙ্গল অভিযানের জন্যও একটি যুগান্তকারী পদক্ষেপ হতে যাচ্ছে!
আর্টেমিস ৩ মিশন শুরু হবে ২০২৭ সালে। এই মিশনে স্পেসএক্স এবং ব্লু অরিজিনের তৈরি লুনার ল্যান্ডারগুলোর সঙ্গে ওরিয়ন ক্যাপসুলের ডকিং হওয়ার পরীক্ষা করা হবে।
নাসার মুন বেস প্রোগ্রামের কর্মকর্তা কার্লোস গার্সিয়া-গালানের মতে, এই বিশাল স্বপ্নের সবচেয়ে বড় চ্যালেঞ্জ হলো বারবার নিখুঁতভাবে রকেট উৎক্ষেপণের হার। ২০২৮ সালের আর্টেমিস ৪ মিশনের আগে চাঁদ অভিমুখে অন্তত ২৪টি সফল লঞ্চ করতে হবে, যার মধ্যে থাকবে রোভার, ড্রোন এবং নভোচারীদের থাকার মডিউল।
রকেট নিয়েও আছে বেশ অনিশ্চয়তা। প্রথম কয়েকটি মিশনে নাসার নিজস্ব রকেট ব্যবহৃত হলেও পরের লঞ্চগুলোর জন্য তাদের হয়তো স্পেসএক্সের স্টারশিপ রকেটের ওপর নির্ভর করতে হবে।
এরই মধ্যে যুক্ত হয়েছে মহাকাশ দখলের নতুন ভূ-রাজনীতি! চীন ঘোষণা দিয়েছে, তারা ২০৩০ সালের মধ্যেই চাঁদে মানুষ পাঠাবে। নাসার প্রধান জ্যারেড আইজ্যাকম্যান ধারণা করছেন, চীন হয়তো তাদের নির্ধারিত সময়ের আগেই এই অসাধ্য সাধন করে ফেলতে পারে। অর্থাৎ, এবার চাঁদের দখল নিয়ে যুক্তরাষ্ট্র ও চীনের মধ্যে হাড্ডাহাড্ডি লড়াই শুরু হতে যাচ্ছে, যেখানে জয়-পরাজয়ের ব্যবধান বছর নয়, বরং কয়েক মাসের হতে পারে!