চাঁদে উদ্দেশ্যে যাওয়ার আগে নভোচারীরা কেন কোয়ারেন্টিনে বন্দি থাকেন
করোনা অতিমারির পর আইসোলেশন শব্দটার সঙ্গে আমরা সবাই কমবেশি পরিচিত। করোনার সময় আমাদের অনেককেই দিনের পর দিন ঘরের ভেতর বন্দি থাকতে হয়েছিল। কিন্তু আপনি কি জানেন, মহাকাশে বা চাঁদের কাছাকাছি যাওয়ার আগেও নভোচারীদের বাধ্যতামূলকভাবে এই কোয়ারেন্টিনে থাকতে হয়?
দীর্ঘ ৫০ বছরেরও বেশি সময় পর মানুষ আবারও চাঁদের কাছাকাছি যাচ্ছে। নাসার আর্টেমিস ২ মিশনের মাধ্যমে নভোচারীরা চাঁদের উদ্দেশ্যে রওনা হবেন। সবকিছু ঠিক থাকলে এপ্রিলে এই মিশন শুরু হওয়ার কথা রয়েছে। কিন্তু এই মহাযাত্রার আগে মিশনের চার নভোচারী রিড ওয়াইজম্যান, ভিক্টর গ্লোভার, ক্রিস্টিনা কোচ এবং কানাডিয়ান স্পেস এজেন্সির জেরেমি হ্যানসেন বর্তমানে হিউস্টনের একটি বিশেষ কোয়ারেন্টিন সেন্টারে বন্দি জীবন কাটাচ্ছেন! কিন্তু কেন? চাঁদে যাওয়ার আগে এই বন্দিদশার কী দরকার?
পৃথিবীতে আমাদের একটু সর্দি-কাশি বা পেটব্যথা হলে আমরা কী করি? চট করে ডাক্তারের কাছে যাই বা ওষুধ খেয়ে নিই। কিন্তু মহাকাশে তো আর কোনো হাসপাতাল বা ফার্মেসি নেই! আর্টেমিস ২ মিশনের এই চারজন নভোচারী যে ওরিয়ন নভোযানে চাঁদের দিকে যাবেন, তার ভেতরের জায়গা মাত্র দুটি মিনিভ্যানের সমান। এই ছোট্ট জায়গাতেই তাঁদের ঘুমানোর জায়গা, কাজের জায়গা এবং টয়লেট। টানা অন্তত ১০ দিন তাঁদের এই গাদাগাদি করা জায়গাতেই থাকতে হবে।
১৯৭০-এর দশকে অ্যাপোলো মিশনের সময় থেকেই এই কোয়ারেন্টিন প্রথা চলে আসছে। বর্তমানে নাসা একে বলছে হেলথ স্ট্যাবিলাইজেশন প্রোগ্রাম।
এর মধ্যে যদি একজনেরও সাধারণ কোনো ছোঁয়াচে রোগ বা ফ্লু হয়, তবে তা মুহূর্তের মধ্যে সবার মধ্যে ছড়িয়ে পড়বে। এতে নভোচারীদের কাজের ক্ষমতা কমে যাবে। আর সবচেয়ে ভয়ের ব্যাপার হলো, চাঁদের যে দিকটা পৃথিবীর দিকে কখনো ঘোরে না, মানে চাঁদের অন্ধকার দিকটায় যখন ওরিয়ন পৌঁছাবে, তখন কয়েক ঘণ্টার জন্য পৃথিবীর সঙ্গে নভোচারীদের সব যোগাযোগ বিচ্ছিন্ন হয়ে যাবে। ওই সময় যদি কারও বড় কোনো শারীরিক সমস্যা দেখা দেয়, তবে নাসার বিজ্ঞানীদের কিছুই করার থাকবে না। কিছুদিন আগেই কিন্তু চিকিৎসাজনিত জরুরি অবস্থার কারণে নাসা আন্তর্জাতিক মহাকাশ স্টেশনের একটি মিশন বাতিল করতে বাধ্য হয়েছিল। কারণ সেখানে চিকিৎসার প্রয়োজনীয় যন্ত্রপাতি ছিল না।
তাই নাসা কোনো ঝুঁকি নিতে রাজি নয়। ১৯৭০-এর দশকে অ্যাপোলো মিশনের সময় থেকেই এই কোয়ারেন্টিন প্রথা চলে আসছে। বর্তমানে নাসা একে বলছে হেলথ স্ট্যাবিলাইজেশন প্রোগ্রাম। নিয়ম অনুযায়ী, রকেট উৎক্ষেপণের ঠিক ১৪ দিন আগে থেকে নভোচারীদের আইসোলেশনে চলে যেতে হয়। এই সময় তারা জনসমাগম এড়িয়ে চলেন, বিশেষ মাস্ক পরেন। এমনকি পরিবারের মানুষদের সঙ্গে দেখা হলেও দূর থেকে কথা বলতে হয়! ওরিয়নের জীবাণুমুক্ত পরিবেশকে সুরক্ষিত রাখতেই এত কড়াকড়ি।
চাঁদের যে দিকটা পৃথিবীর দিকে কখনো ঘোরে না, মানে চাঁদের অন্ধকার দিকটায় যখন ওরিয়ন পৌঁছাবে, তখন কয়েক ঘণ্টার জন্য পৃথিবীর সঙ্গে নভোচারীদের সব যোগাযোগ বিচ্ছিন্ন হয়ে যাবে।
অ্যাপোলো আমলের কোয়ারেন্টিনের গল্পটা কিন্তু একটু অন্য রকম ছিল। ১৯৬৯ সালে নিল আর্মস্ট্রংরা যখন অ্যাপোলো ১১ মিশনে চাঁদে নেমেছিলেন, তখন বিজ্ঞানীরা নিশ্চিত ছিলেন না যে চাঁদে কোনো অণুজীব বা ব্যাকটেরিয়া আছে কি না। প্রমাণ না থাকলেও তাঁদের ভয় ছিল, নভোচারীদের স্পেসস্যুটের সঙ্গে হয়তো ভিনগ্রহের কোনো ভয়ংকর ভাইরাস বা জীবাণু পৃথিবীতে চলে আসতে পারে এবং মহামারি ঘটাতে পারে! তাই আর্মস্ট্রংরা পৃথিবীতে ফেরার পর নাসা তাঁদের টানা ২১ দিন কোয়ারেন্টিন ইউনিটে আটকে রেখেছিল, যাতে কোনো অস্বাভাবিক উপসর্গ দেখা দেয় কি না, তা ডাক্তাররা নজরে রাখতে পারেন। পরে অবশ্য অ্যাপোলো ১৪ মিশন পর্যন্ত গিয়ে বিজ্ঞানীরা যখন নিশ্চিত হলেন যে চাঁদ থেকে জীবাণু আসার কোনো ভয় নেই, তখন এই নিয়ম তুলে নেওয়া হয়।
আগে বিজ্ঞানীরা ভয় পেতেন চাঁদের জীবাণু নিয়ে, আর এখন সাম্প্রতিক গবেষণা বলছে উল্টো কথা। এখন ভয় পৃথিবীর জীবাণু নিয়ে! আর্টেমিস প্রোগ্রামের অন্যতম বড় লক্ষ্য চাঁদের দক্ষিণ মেরুর খাদ নিয়ে গবেষণা করা। চাঁদের এই অঞ্চলে কখনো সূর্যের আলো পৌঁছায় না। এগুলো অনেকটা প্রাকৃতিক ডিপ ফ্রিজের মতো, যেখানে ব্যবহারের উপযোগী বরফ লুকিয়ে থাকার সম্ভাবনা রয়েছে।
নিল আর্মস্ট্রংরা পৃথিবীতে ফেরার পর নাসা তাঁদের টানা ২১ দিন কোয়ারেন্টিন ইউনিটে আটকে রেখেছিল, যাতে কোনো অস্বাভাবিক উপসর্গ দেখা দেয় কি না, তা ডাক্তাররা নজরে রাখতে পারেন।
নাসার এখন সবচেয়ে বড় দায়িত্ব এই জীবাণুর বিস্তার রোধ করা। নভোচারীদের মাধ্যমে পৃথিবীর কোনো অণুজীব বা ব্যাকটেরিয়া যদি চাঁদের ওই দক্ষিণ মেরুতে চলে যায়, তবে তা সেই প্রাকৃতিক ফ্রিজের ভেতর দিব্যি কয়েক দশক বেঁচে থাকতে পারবে! হয়তো তারা সেখানে বংশবৃদ্ধি করবে না, কিন্তু চাঁদের যে আদিম বরফের ভেতর সৌরজগতের সৃষ্টির শুরুর দিকের এবং চাঁদের উৎসের অনেক তথ্য লুকিয়ে আছে, তা দূষিত করে দিতে পারে।
সবচেয়ে মজার এবং বিপদের ব্যাপার হলো, বিজ্ঞানীরা হয়তো ভবিষ্যতে চাঁদের ওই বরফ পরীক্ষা করে কোনো ব্যাকটেরিয়া পেলেন এবং আনন্দে লাফিয়ে উঠে বললেন, ‘ইউরেকা! আমরা ভিনগ্রহের প্রাণের সন্ধান পেয়েছি!’ কিন্তু পরে পরীক্ষা করে হয়তো দেখা গেল, সেটা আসলে পৃথিবীরই সাধারণ কোনো ব্যাকটেরিয়া!
কী এক অদ্ভুত ব্যাপার, তাই না? একসময় আমরা চাঁদের জীবাণু থেকে নিজেদের বাঁচাতে চাইতাম, আর আজ আমাদের নিজেদের জীবাণুর হাত থেকেই চাঁদকে বাঁচানোর জন্য এত আয়োজন!