আর্টেমিস ৩ মিশনে চাঁদে যাচ্ছে না মানুষ, নাসার পরিকল্পনায় বড় পরিবর্তন

কেনেডি স্পেস সেন্টারে নাসার আর্টেমিস ২ নভোযানছবি: গ্রেগ নিউটন / এএফপি / গেটি ইমেজ

আর্টেমিস ২ মিশন নিয়ে সারা পৃথিবীর মহাকাশপ্রেমীদের অপেক্ষার প্রহর যেন ফুরোচ্ছেই না। এই মিশনে প্রথমবারের মতো কানাডীয় নভোচারী জেরেমি হ্যানসেনও চাঁদের চারপাশে ঘুরে আসবেন। কিন্তু এর মাঝেই মহাকাশ গবেষণা সংস্থা নাসা এক বিশাল ঘোষণা দিয়ে বসল। পুরো আর্টেমিস প্রোগ্রামের ছকই যেন বদলে যাচ্ছে!

চাঁদে আর্টেমিস মিশনের নভোচারীদের কাল্পনিক ছবি
ছবি: নাসা

আগে কথা ছিল, আর্টেমিস ৩ মিশনে নভোচারীরা সরাসরি চাঁদের মাটিতে পা রাখবেন। কিন্তু নতুন ঘোষণা অনুযায়ী, আর্টেমিস ৩-এ কোনো মানুষ চাঁদে নামছে না! বরং এই মিশনটি পৃথিবীর কাছাকাছি কক্ষপথে কিছু প্রযুক্তিগত পরীক্ষার জন্য ব্যবহৃত হবে। তাহলে চাঁদে মানুষ নামবে কবে? নাসার নতুন পরিকল্পনা বলছে, ২০২৮ সালে আর্টেমিস ৪ মিশনের মাধ্যমে ঘটবে এই ঐতিহাসিক ঘটনা।

আরও পড়ুন
নতুন ঘোষণা অনুযায়ী, আর্টেমিস ৩-এ কোনো মানুষ চাঁদে নামছে না! বরং এই মিশনটি পৃথিবীর কাছাকাছি কক্ষপথে কিছু প্রযুক্তিগত পরীক্ষার জন্য ব্যবহৃত হবে।

হুট করে এমন সিদ্ধান্ত কেন?

আর্টেমিস ২ মিশনের বারবার পিছিয়ে যাওয়ার দিকে তাকালেই পুরো প্রোগ্রামের ভেতরের সমস্যাগুলো আঁচ করা যায়। গত ৩ ফেব্রুয়ারি একটি মহড়ার সময় তরল হাইড্রোজেন লিক হয়ে ত্রুটি দেখা দেয়। ১৯-২০ ফেব্রুয়ারি দ্বিতীয় মহড়াতেও ফের একই সমস্যা। ফলে উৎক্ষেপণের তারিখ পিছিয়ে এখন অন্তত ১ এপ্রিলে গিয়ে ঠেকেছে।

আর্টেমিস ২ নভোযান
ছবি: নাসা

প্রথম আর্টেমিস মিশনের পর ইতিমধ্যেই তিন বছরের বেশি সময় পার হতে চলল। এত লম্বা বিরতি থাকলে সিস্টেমগুলোর দ্রুত উন্নতি করা কঠিন হয়ে পড়ে। একই যান্ত্রিক ত্রুটিও ফিরে আসে বারবার। এর ওপর ২০২৫ সালে নাসা তাদের প্রায় ৪ হাজার কর্মী ছাঁটাই করেছে। এতে তাদের মোট জনবলের প্রায় ২০ শতাংশ কমে গেছে! এত বড় কর্মীসংকটের প্রভাব আর্টেমিস প্রোগ্রামের ওপর তো পড়বেই।

নাসার নতুন প্রধান জ্যারেড আইজ্যাকম্যান পরিস্থিতি বেশ ভালোই বুঝতে পেরেছেন। সম্প্রতি সোশ্যাল মিডিয়ায় তিনি সাফ জানিয়ে দিয়েছেন, ‘নাসার প্রতি ৩ বছর পর পর চাঁদে রকেট পাঠানোর দিন শেষ।’ এখন তাদের মূল লক্ষ্য, স্পেস লঞ্চ সিস্টেম বা এসএলএস রকেটের আপার স্টেজকে একটি নির্দিষ্ট মানদণ্ডে নিয়ে আসা।

আরও পড়ুন
২০২৫ সালে নাসা তাদের প্রায় ৪ হাজার কর্মী ছাঁটাই করেছে। এতে তাদের মোট জনবলের প্রায় ২০ শতাংশ কমে গেছে! এত বড় কর্মীসংকটের প্রভাব আর্টেমিস প্রোগ্রামের ওপর তো পড়বেই।

শাপে বর হলো কি

খবরটা শোনার পর অনেকেই হয়তো ভাবছেন, আর্টেমিস ৩ মিশন বুঝি বাতিলই হয়ে গেল! খবরটা মোটেও তেমন নয়। বরং অনেক বিজ্ঞানীই মনে করছেন, এই নতুন পরিকল্পনা আগের চেয়ে অনেক বেশি বাস্তবসম্মত এবং রোমাঞ্চকর।

১৯৭২ সালের অ্যাপোলো ১৭-এর পর প্রথম চন্দ্রাবতরণ হিসেবে আর্টেমিস ৩-এর বদলে এখন আর্টেমিস ৪-এর জন্য অপেক্ষা করতে হবে ঠিকই, কিন্তু এর মধ্যে আর্টেমিস ৩ দারুণ কিছু কাজ করবে। নভোচারীদের নিয়ে স্পেসক্রাফট ওরিয়ন পৃথিবীর কক্ষপথে ঘুরবে এবং সেখানে লাইফ সাপোর্ট, প্রোপালশন ও যোগাযোগের মতো জরুরি প্রযুক্তিগুলো পরীক্ষা করবে।

শুধু তা-ই নয়, এই কক্ষপথে থাকা অবস্থায় ওরিয়ন স্পেসএক্স বা ব্লু অরিজিনের তৈরি কমার্শিয়াল লুনার ল্যান্ডারের সঙ্গে ডকিং পরীক্ষাও চালাতে পারে। সরাসরি চাঁদে গিয়ে বিপদে পড়ার চেয়ে, পৃথিবীর কাছাকাছি থেকে এই ল্যান্ডারগুলো পরীক্ষা করে নেওয়া বেশি বুদ্ধিমানের কাজ!

আর্টেমিস ৩ মিশনের নভোচারীদের স্যুটগুলো এখনো কোনো মহাকাশ মিশনে ব্যবহার করা হয়নি
ছবি: কেবিআর / অ্যাক্সিওম স্পেস

পাশাপাশি নভোচারীদের নতুন তৈরি স্যুটগুলোও পরীক্ষার ব্যাপার আছে। কারণ, এই স্যুটগুলো এখনো আসল কোনো মহাকাশ মিশনে ব্যবহার করা হয়নি। এই প্রস্তুতি ২০২৮ সালে চাঁদে নিরাপদে নামার সম্ভাবনা অনেক বাড়িয়ে দেবে।

সবচেয়ে চমকপ্রদ খবর হলো, নাসা ২০২৮ সালে শুধু একবার নয়, দুবার চাঁদে নামার চেষ্টা করবে! এরপর থেকে প্রতি বছর একটি করে মিশন পাঠাবে। ঠিক যেন ষাটের দশকের সেই অ্যাপোলো যুগের ফিরে আসা, যখন মাত্র চার বছরে ১১টি ক্রু মিশন পাঠানো হয়েছিল!

আরও পড়ুন
আর্টেমিস ৩ নভোচারীদের নিয়ে স্পেসক্রাফট ওরিয়ন পৃথিবীর কক্ষপথে ঘুরবে এবং সেখানে লাইফ সাপোর্ট, প্রোপালশন ও যোগাযোগের মতো জরুরি প্রযুক্তিগুলো পরীক্ষা করবে।

লুনার গেটওয়ে কি হারিয়ে গেল

নাসার এই বড় ঘোষণায় একটি জিনিসের নাম একদমই শোনা যায়নি, লুনার গেটওয়ে। অর্থাৎ চাঁদের কক্ষপথে ঘোরার জন্য প্রস্তাবিত একটি ছোট স্পেস স্টেশন। আগের পরিকল্পনা অনুযায়ী, আর্টেমিস ৪ মিশনটি এই লুনার গেটওয়ে হয়েই চাঁদের বুকে নামার কথা ছিল।

লুনার গেটওয়ের কাল্পনিক ছবি
ছবি: উইকিপিডিয়া

এই গেটওয়ে মহাকাশ গবেষণার জন্য, বিশেষ করে কানাডার জন্য ভীষণ গুরুত্বপূর্ণ। কারণ এখানে যুক্ত থাকার কথা ক্যানাডার্ম৩। এটি কানাডার তৈরি কৃত্রিম বুদ্ধিমত্তাসম্পন্ন অত্যাধুনিক রোবোটিক হাত। কানাডা আর্টেমিস প্রোগ্রামে এই রোবটিক হাতের কার্যক্রম যাচাই করে দেখবে। এটি বানাতে কানাডার খরচ হয়েছে প্রায় ২০০ কোটি ডলার। পৃথিবী থেকে এত দূরে নিখুঁতভাবে কাজ করার জন্য এর এআই প্রযুক্তি খুব জরুরি। আশা করা যায়, দ্বিতীয় চন্দ্রাভিযান এবং এর পরের মিশনগুলোর চূড়ান্ত পরিকল্পনায় নাসা এই লুনার গেটওয়ে এবং ক্যানাডার্ম৩-কে ঠিকই কাজে লাগাবে।

সূত্র: সায়েন্স অ্যালার্ট

আরও পড়ুন