বিজ্ঞানচর্চা শখ নয়, অস্তিত্বের সংগ্রাম
বাংলাদেশের উত্তর-পশ্চিম আকাশে ১৪ জুলাই সূর্যাস্তের ঘণ্টাখানেক পর থেকেই একটি ধূমকেতু দেখা যাচ্ছে। এর নাম নিওওয়াইজ। সুদূর ওর্ট মেঘমালা থেকে আসা এই অতিথি পৃথিবী থেকে প্রায় ১০ কোটি ৩০ লাখ কিলোমিটার দূরে থাকলেও খালি চোখেই এর কেন্দ্র দেখা যাচ্ছে। দূরবীক্ষণ যন্ত্র দিয়ে দেখলে এর লম্বা লেজটিও চোখে পড়ে। ভয়ের কিছু নেই, এটি পৃথিবীকে পাশ কাটিয়ে চলে যাবে। আবার ফিরে আসবে প্রায় ৬ হাজার ৭৫৫ বছর পর। এমন দৃশ্য নিঃসন্দেহে মহাজাগতিক সৌন্দর্য। কিন্তু এই সৌন্দর্যের আড়ালেই লুকিয়ে থাকে ভয়। ইতিহাসের দিকে তাকালে দেখা যায়, এই ধূমকেতুরাই ডাইনোসরের বিলুপ্তি ঘটিয়েছে, বদলে দিয়েছে পৃথিবীর জীববৈচিত্র্যের গতিপথ।
বিখ্যাত সায়েন্স ফিকশন লেখক ও স্যাটেলাইট কমিউনিকেশনের স্বপ্নদ্রষ্টা আর্থার সি ক্লার্ককে একবার পৃথিবী ধ্বংস হওয়ার সম্ভাবনা নিয়ে প্রশ্ন করা হয়েছিল। তিনি বলেছিলেন, সম্ভাবনা ৫০-৫০। এর ঠিক বিশ বছর পর, স্নায়ুযুদ্ধ শেষ হওয়ার পর তাঁকে আবারও একই প্রশ্ন করা হয়। তিনি মুচকি হেসে উত্তর দেন, ‘৫১ শতাংশ’।
সাংবাদিকরা অবাক হলে তিনি ব্যাখ্যা করেন, ওই বাড়তি ১ শতাংশ ঝুঁকি হলো ধূমকেতু, গ্রহাণু বা উল্কাপাতের মতো মহাজাগতিক আঘাতের কারণে। আর্থার সি ক্লার্কের এই আশঙ্কার তালিকায় জনসংখ্যা বৃদ্ধি ও পরিবেশ দূষণও ছিল। আজকের করোনা বিপর্যয় বা অন্যান্য মহামারির দিকে তাকালে বোঝা যায়, পরিবেশের ওপর আমাদের অত্যাচারের ফল আমরা এখন ভোগ করছি।
বিখ্যাত সায়েন্স ফিকশন লেখক ও স্যাটেলাইট কমিউনিকেশনের স্বপ্নদ্রষ্টা আর্থার সি ক্লার্ককে একবার পৃথিবী ধ্বংস হওয়ার সম্ভাবনা নিয়ে প্রশ্ন করা হয়েছিল। তিনি বলেছিলেন, সম্ভাবনা ৫০-৫০।
করোনাভাইরাস হোক বা অন্য কোনো জীবাণু, এরা একসময় প্রকৃতিতে সুপ্ত অবস্থায় ছিল। কিন্তু মানুষ যখন প্রকৃতির ভারসাম্য নষ্ট করেছে, তখনই এরা বেরিয়ে এসেছে। মানুষ জলে-স্থলে-অন্তরীক্ষে নিজের আধিপত্য বিস্তার করেছে প্রযুক্তির জোরে। কিন্তু বিজ্ঞানের মূল সুর, অর্থাৎ প্রকৃতির সঙ্গে সহাবস্থানের শিক্ষাটা আমরা গ্রহণ করিনি। একটি জনবসতি গড়ে তুলতে কতটা গাছপালা বা জলাভূমি রাখা দরকার, বিজ্ঞান তা বলে দিয়েছে। কিন্তু আমরা তা মানিনি।
বিজ্ঞান ও প্রযুক্তিকে আমরা কেবল ভোগের যন্ত্র হিসেবে ব্যবহার করেছি। ফলে ম্যালেরিয়া, ডেঙ্গু, জিকা বা করোনার মতো একের পর এক মহামারি আমাদের তাড়া করছে। যদিও জীববিজ্ঞানী ডেভিড কোয়েম্যান মনে করেন, ভাইরাসের বিস্তারে পরিবেশ দূষণ সরাসরি দায়ী নয়। তবে প্রযুক্তিনির্ভর এই সমাজে মানুষে-মানুষে যোগাযোগের যে বিশাল নেটওয়ার্ক তৈরি হয়েছে, তা মহামারি আটকানো কঠিন করে তুলেছে।
মহামারিতে হয়তো সভ্যতা পুরোপুরি বিলীন হবে না, কিন্তু মহাকাশ থেকে আসা কয়েক কিলোমিটার চওড়া একটি গ্রহাণুর আঘাত মুহূর্তেই সব শেষ করে দিতে পারে। সাড়ে ছয় কোটি বছর আগে ১০ কিলোমিটার ব্যাসের একটি উল্কাপিণ্ডের আঘাতেই ডাইনোসর বিলুপ্ত হয়েছিল। সেই আঘাতে আকাশ ঢেকে গিয়েছিল ধুলোয়, পৃথিবীতে নেমে এসেছিল দীর্ঘস্থায়ী ‘নিউক্লিয়াস শীত’। তবে সেই ধ্বংসযজ্ঞের পরেই স্তন্যপায়ী প্রাণীদের বিকাশ ঘটে এবং কালক্রমে মানুষের উদ্ভব হয়। আমাদের ইতিহাস বলে, নির্দিষ্ট সময় পরপর এমন মহাজাগতিক ঘটনা ঘটে। আগের পাঁচটি গণবিলুপ্তি তারই প্রমাণ।
সাড়ে ছয় কোটি বছর আগে ১০ কিলোমিটার ব্যাসের একটি উল্কাপিণ্ডের আঘাতেই ডাইনোসর বিলুপ্ত হয়েছিল। সেই আঘাতে আকাশ ঢেকে গিয়েছিল ধুলোয়, পৃথিবীতে নেমে এসেছিল নিউক্লিয়াস শীত।
মাত্র ৫০ হাজার বছর আগেও যুক্তরাষ্ট্রের অ্যারিজোনায় ১৮০ ফুট ব্যাসের একটি ধূমকেতু পড়ে বিশাল গর্ত তৈরি করেছিল। এতে ৪ হাজার ফুট বড় ও ৬০০ ফুট গভীর গর্ত হয়েছিল। এমনকি মাত্র ৩০ ফুট ব্যাসের ধুমকেতুও যদি পৃথিবীতে আছড়ে পড়ে, তাহলে হিরোশিমায় ফেলা পরমাণু বোমার চেয়েও পাঁচগুণ বেশি ক্ষতি হবে। ১৯০৮ সালে সাইবেরিয়ায় তুঙ্গুস্কা ঘটনার জন্য দায়ী উল্কাপিণ্ডের অংশ খুঁজে পাওয়ার দাবি করেছেন ইতালির গবেষকরা।
যেসব গ্রহাণু বা ধূমকেতু ভবিষ্যতে পৃথিবীকে আঘাত করতে পারে, সেগুলোকে বলা হয় নিও (NEO) বা পৃথিবীর নিকটবর্তী বস্তু। বিজ্ঞানীরা এগুলো খুঁজে বের করতে নিরলস কাজ করছেন। লিনিয়ার, নিট বা স্পেসওয়াচের মতো প্রকল্পের মাধ্যমে এখন পর্যন্ত ২ হাজারের বেশি এমন বস্তু শনাক্ত করা হয়েছে। এর মধ্যে কোনো কোনোটির আকার ১০ ঘনকিলোমিটারেরও বেশি।
মনে রাখতে হবে, মাত্র ৪০ মিটার চওড়া একটি গ্রহাণু একটি বিশাল শহর ধ্বংস করে দিতে পারে। এখনো হাজার হাজার নিও অনাবিষ্কৃত রয়ে গেছে। সচেতনতা বাড়াতে প্রতি বছর ৩০ জুন আন্তর্জাতিক গ্রহাণু দিবস পালন করা হয়। ১৯০৮ সালের তুঙ্গুস্কা বিস্ফোরণের স্মৃতিতেই এই দিনটি বেছে নেওয়া হয়েছে।
মহাবিশ্বে মহাজাগতিক ঘটনা আমাদের কল্পনার চেয়েও বেশি ঘটে। বড় ধরনের ঘটনা আনুমানিক ৩০০ বছর পরপর ঘটে। আমরা গত কয়েকশ বছরে বড় কিছু দেখিনি বলেই হয়তো পরিস্থিতি সম্পর্কে এতটা অসচেতন।
যেসব গ্রহাণু বা ধূমকেতু ভবিষ্যতে পৃথিবীকে আঘাত করতে পারে, সেগুলোকে বলা হয় নিও বা পৃথিবীর নিকটবর্তী বস্তু। এখন পর্যন্ত ২ হাজারের বেশি এমন বস্তু শনাক্ত করেছে বিজ্ঞানীরা।
কিন্তু পরিসংখ্যানে দেখা যায়, এক জীবনে এমন ঘটনার মুখোমুখি হওয়ার সম্ভাবনা একেবারে উড়িয়ে দেওয়া যায় না। শুধু গ্রহাণু নয়, মহাকাশের গভীর থেকে আসা গামা রশ্মির বিস্ফোরণও পৃথিবীর জন্য হুমকি হতে পারে। অষ্টম শতাব্দীতে এমন এক গামা রশ্মির ধাক্কা পৃথিবীতে এসে লেগেছিল। জাপানের সিডার গাছের গোড়া পরীক্ষা করে এর প্রমাণ পাওয়া গেছে। হাজার আলোকবর্ষ দূরে না হয়ে যদি কাছে কোথাও এমন নিউট্রন নক্ষত্রের সংঘর্ষ হতো, তবে পৃথিবীর প্রাণকূল নিমেষেই ধ্বংস হয়ে যেত।
যখনই পৃথিবীর কাছাকাছি নতুন কোনো মহাজাগতিক বস্তু আবিষ্কৃত হয়, বিজ্ঞানীরা তার গতিপথ বোঝার চেষ্টা করেন। কিন্তু মহাকাশ অনিশ্চয়তায় ভরা। উত্তর-পশ্চিম আকাশে নিওওয়াইজের মতো ধূমকেতু হয়তো সৌন্দর্য ছড়িয়ে নিরাপদে চলে যায়। কিন্তু পরের আগন্তুকটি এত নিরাপদ নাও হতে পারে। সংঘর্ষের আশঙ্কা সব সময়ই থাকে। আর এই সম্ভাব্য ধ্বংসযজ্ঞ থেকে বাঁচার একমাত্র উপায় বিজ্ঞান। তাই বিজ্ঞানচর্চা কোনো বিলাসিতা বা শখের বিষয় নয়, এটি আমাদের অস্তিত্ব টিকিয়ে রাখার সংগ্রাম।