প্রথমবার নক্ষত্রহীন গ্রহের ওজন মাপলেন বিজ্ঞানীরা
পৃথিবীর মতো সব গ্রহের ভাগ্য সুপ্রসন্ন নয়। আমাদের মাথার ওপর সূর্য আছে। আছে একটা সাজানো-গোছানো সৌরজগৎ। কিন্তু মহাকাশে এমন অনেক হতভাগা গ্রহ আছে, যাদের কেউ নেই। না আছে কোনো নক্ষত্র, না আছে কোনো সঙ্গী। অনন্ত মহাকাশে এরা একা একা ঘুরে বেড়ায়। এদের বলা হয় রুগ প্ল্যানেট বা ভবঘুরে গ্রহ।
বিজ্ঞানীরা এই প্রথমবারের মতো এমন এক নিঃসঙ্গ গ্রহের ভর মাপলেন। পৃথিবী থেকে এর দূরত্ব নিখুঁতভাবে মাপতে পেরেছেন তাঁরা।
মহাকাশের গহিন অন্ধকারে লুকিয়ে আছে এই গ্রহ। ভরের দিক দিয়ে এটি আমাদের বৃহস্পতি গ্রহের প্রায় পাঁচ ভাগের এক ভাগ। এটি পৃথিবী থেকে প্রায় ১০ হাজার আলোকবর্ষ দূরে, মিল্কিওয়ে গ্যালাক্সির কেন্দ্রের দিকে অবস্থিত।
বিজ্ঞানীদের ধারণা, এই গ্রহটি শুরু থেকেই এমন ভবঘুরে ছিল না। সম্ভবত এটি কোনো এক নক্ষত্র পরিবারেই জন্মেছিল। তারপর মহাকর্ষের কোনো এক অদ্ভুত খেলায় ধাক্কা খেয়ে এটি তার পরিবার থেকে ছিটকে পড়েছে অসীম শূন্যতায়। এই অদ্ভুত খেলাকে বিজ্ঞানীরা নাম দিয়েছেন মহাজাগতিক বিলিয়ার্ড।
সমস্যা হলো, এই গ্রহগুলোর নিজস্ব কোনো আলো নেই। আবার কোনো নক্ষত্রের আলোও এদের ওপর পড়ে না। তাই এদের সরাসরি দেখা প্রায় অসম্ভব। ভাবতে পারেন, তাহলে বিজ্ঞানীরা এদের খুঁজে পেলেন কীভাবে? আসলে বিজ্ঞানীরা ব্যবহার করেছেন গ্র্যাভিটেশনাল মাইক্রোলেন্সিং। বিষয়টা একটু সহজভাবে বলি।
যখন এই অন্ধকার গ্রহটি পৃথিবী এবং দূরের কোনো উজ্জ্বল নক্ষত্রের মাঝখান দিয়ে যায়, তখন গ্রহটির মহাকর্ষ বল একধরনের লেন্সের মতো কাজ করে। ফলে পেছনের নক্ষত্রের আলো কিছু সময়ের জন্য বেঁকে যায় বা উজ্জ্বল হয়ে ওঠে। এই আলোর পরিবর্তন দেখেই বিজ্ঞানীরা বুঝতে পারেন, ওখানে কিছু একটা আছে।
সাধারণত লেন্সিং দেখে গ্রহের ভর বের করতে হলে আগে জানতে হয় গ্রহটি কত দূরে আছে। কিন্তু যার কোনো নক্ষত্র নেই, তার দূরত্ব মাপা খুব কঠিন। এখানেই বিজ্ঞানীরা এক দারুণ বুদ্ধির খেলা খেললেন। ২০২৪ সালের ৩ মে পৃথিবীর একাধিক টেলিস্কোপ এই লেন্সিং ঘটনাটি পর্যবেক্ষণ করে। ঠিক একই সময়ে পৃথিবী থেকে ১৫ লাখ কিলোমিটার দূরে থাকা গায়া স্পেস টেলিস্কোপও রেকর্ড করে ঘটনাটি।
আমাদের দুই চোখ যেমন মাঝখানের সামান্য দূরত্বের কারণে কোনো জিনিসের গভীরতা বা দূরত্ব বুঝতে পারে, ঠিক তেমনি পৃথিবী এবং মহাকাশ থেকে পর্যবেক্ষণ করার ফলে বিজ্ঞানীরা গ্রহটির সঠিক দূরত্ব বের করে ফেলেন। আর দূরত্ব পেয়ে গেলে ভর বের করা তো সময়ের ব্যাপার মাত্র।
গবেষকেরা বলছেন, এই সাফল্য এক নতুন দিগন্ত খুলে দিল। যুক্তরাজ্যের কুইন মেরি ইউনিভার্সিটির অ্যাস্ট্রোফিজিসিস্ট গ্যাভিন কোলম্যানের মতে, ২০২৭ সালে যখন নাসার ন্যান্সি গ্রেস রোমান স্পেস টেলিস্কোপ আকাশে ডানা মেলবে, তখন এই পদ্ধতি ব্যবহার করে আমরা মহাকাশের এমন আরও অনেক নিঃসঙ্গ পথিকের খোঁজ পাব।
হাবল টেলিস্কোপের চেয়ে হাজার গুণ দ্রুত কাজ করা এই টেলিস্কোপ হয়তো আমাদের জানিয়ে দেবে, মহাকাশে আমরা কতটা একা! গবেষণাটি সম্প্রতি সায়েন্স জার্নালে প্রকাশিত হয়েছে।