পাঠ্যবইয়ের পাতা থেকে পপ গান, কিংবা মহাকাশ অভিযানে গ্যালিলিও গ্যালিলি নামটা যেন এক অবিনশ্বর নক্ষত্র। কিন্তু আমরা কজন জানি সেই মানুষটার কথা? তিনি পিসার এক সাধারণ ল্যাবরেটরিতে বসে মহাবিশ্বকে দেখার চোখটাই বদলে দিয়েছিলেন।
আমরা সাধারণত বিজ্ঞানীদের আবিষ্কারগুলো মুখস্থ করি, কিন্তু সেই আবিষ্কারের পেছনের শ্রম, অনিশ্চয়তা ও লড়াইটা ভুলে যাই। ইতালির ফ্লোরেন্স শহরের গ্যালিলিও মিউজিয়াম ঠিক এই বিষয়টা নিয়েই কাজ করে। এখানে গ্যালিলিও কোনো অতিমানব নন, বরং একজন কর্মঠ বিজ্ঞানী। চলুন, মিউজিয়ামের গাইড ইলেনিয়া উলিভির সঙ্গে এক চক্কর মিউজিয়ামে ঘুরতে ঘুরতে তাঁর ব্যাপারে জেনে নিই।
মিউজিয়ামের শুরুর দিকের ঘরগুলোতে আছে অ্যাস্ট্রোলেব। এটি মূলত সেই যুগের কম্পিউটার। তারার অবস্থান বের করা, সময় দেখা, এমনকি ধ্রুবতারা দেখে নিজের অবস্থান নির্ণয় করা হতো এই যন্ত্র দিয়ে।
গ্যালিলিও নিজেও কিন্তু এই যন্ত্র ব্যবহার করে মেডিচি রাজপরিবারের জন্য রাশিফল বা হরোস্কোপ তৈরি করতেন। অবাক হচ্ছেন? আসলে সেই সময় জ্যোতির্বিজ্ঞান ও জ্যোতিষশাস্ত্র ছিল একে অপরের পরিপূরক। ঠিক যেমনটা ছিল আলকেমি ও রসায়ন।
পাশের ঘরেই রাখা আছে গ্র্যান্ড ডাচেস ক্রিস্টিনা অব লরেইনের জন্য বানানো এক বিশাল আরমিলারী স্ফিয়ার। সোনালি রঙের এই গোলকটি টলেমির পৃথিবীকেন্দ্রিক মডেলের প্রতিচ্ছবি। পৃথিবী মাঝখানে, আর তাকে ঘিরে ঘুরছে চাঁদ, সূর্য, গ্রহ-নক্ষত্র।
মিউজিয়ামের শুরুর দিকের ঘরগুলোতে আছে অ্যাস্ট্রোলেব। এটি মূলত সেই যুগের কম্পিউটার। তারার অবস্থান বের করা, সময় দেখা, এমনকি ধ্রুবতারা দেখে নিজের অবস্থান নির্ণয় করা হতো এই যন্ত্র দিয়ে।
গ্যালিলিও জন্মেছিলেন পিসায়, কিন্তু তিনি পড়াতেন পাদুয়া বিশ্ববিদ্যালয়ে। জায়গাটা ভেনিস রিপাবলিকের খুব কাছে। ভেনিসের বিখ্যাত কাঁচের কারিগরদের সান্নিধ্য গ্যালিলিওকে দারুণ সুবিধা দিয়েছিল। ইউরোপে তখন একধরনের অপরিপক্ক টেলিস্কোপ পাওয়া যেত, লোকে যাকে বলত ডাচ টয় বা ডাচ খেলনা। ১৬০৮ সালে হ্যান্স লিপারশে এই যন্ত্রের পেটেন্ট আবেদন করেন। গ্যালিলিও এই খেলনাকেই এক শক্তিশালী যন্ত্রে রূপ দিলেন।
গ্যালিলিওর কাগজপত্রের মধ্যে পাওয়া বাজারের ফর্দ দেখলে আপনি চমকে যাবেন। সেখানে ছোলা ও মটরশুঁটির পাশেই লেখা আছে চ্যাপ্টা কাঁচ, লেন্স ঘষার পাউডার ও কামানের গোলা। তখনকার দিনে লেন্স পালিশ করার কাজে লাগত এটা! ১৬০৯ সালের মধ্যে তিনি এমন লেন্স বানালেন যা কোনো বস্তুকে ৩০ গুণ বড় করে দেখাতে পারে।
মজার ব্যাপার হলো, গ্যালিলিও টেলিস্কোপকে প্রথমে বিজ্ঞানের যন্ত্র হিসেবে নয়, বরং যুদ্ধের অস্ত্র হিসেবে পরিচয় করিয়েছিলেন। ভেনিসের শাসক ডোজকে তিনি স্যান মার্কোর চূড়ায় নিয়ে গিয়ে দেখালেন, সমুদ্রের বুকে শত্রুজাহাজ খালি চোখে দেখার বহু আগেই এই যন্ত্র দিয়ে দেখা যাচ্ছে!
মিউজিয়ামের একটি ঘর যুদ্ধের বিজ্ঞানে উৎসর্গ করা হয়েছে। গ্যালিলিও প্রথম বুঝেছিলেন, নিক্ষিপ্ত কোনো বস্তু উপবৃত্তাকার পথে চলে। তাঁর জ্যামিতিক কম্পাস গোলন্দাজদের কামানের পাল্লা মাপতে সাহায্য করত। এই নিখুঁত পরিমাপের বাতিকই তাঁকে গতির সূত্র আবিষ্কারে সাহায্য করেছিল। বিখ্যাত হেলানো তলে তিনি দেখান, পড়ন্ত বস্তু তার ওজন নির্বিশেষে একই ত্বরণে নিচে পড়ে।
গ্যালিলিওর কাগজপত্রের মধ্যে পাওয়া বাজারের ফর্দে ছোলা ও মটরশুঁটির পাশেই লেখা আছে চ্যাপ্টা কাঁচ, লেন্স ঘষার পাউডার ও কামানের গোলা। তখনকার দিনে লেন্স পালিশ করার কাজে লাগত এটা!
মিউজিয়ামের একেবারে কেন্দ্রে রাখা আছে গ্যালিলিওর নিজের হাতে বানানো দুটি টেলিস্কোপ। পাশেই ফ্রেমে বাঁধানো একটি ফাটা লেন্স। এই লেন্স দিয়েই তিনি প্রথম বৃহস্পতি গ্রহের চাঁদগুলো দেখেছিলেন। সেগুলোর নাম আইও, ইউরোপা, গ্যানিমেড এবং ক্যালিস্টো। এগুলো কোনো রেপ্লিকা নয়, আসল যন্ত্র। এই কাঁচের টুকরোগুলোই প্রমাণ করেছিল, সব কিছু পৃথিবীকে কেন্দ্র করে ঘোরে না। বৃহস্পতির চাঁদগুলো গ্যালিলিওকে ফ্লোরেন্সের রাজকীয় গণিতবিদের চাকরি এনে দিয়েছিল ঠিকই, কিন্তু একই সঙ্গে চার্চের সঙ্গে তাঁর সংঘাতের ভিত্তিও তৈরি করেছিল।
গ্যালিলিওর আবিষ্কার অ্যারিস্টটলের ধর্মতাত্ত্বিক ব্যাখ্যার মূলে কুঠারাঘাত করল। বাইবেল ও চার্চের দীর্ঘদিনের বিশ্বাস ছিল, পৃথিবীই মহাবিশ্বের কেন্দ্র। কিন্তু গ্যালিলিওর টেলিস্কোপ বলছিল অন্য কথা। শুক্র গ্রহের দশা পর্যবেক্ষণ করে তিনি নিশ্চিত হলেন, শুক্র সূর্যকে কেন্দ্র করে ঘোরে, পৃথিবীকে নয়।
তিনি যখন তাঁর বিখ্যাত বই ডায়ালগ কনসার্নিং দ্য টু চিফ ওয়ার্ল্ড সিস্টেমস প্রকাশ করলেন, রোমান ইনকুইজিশন বা ধর্মীয় আদালত তাঁকে ডেকে পাঠাল। কথিত আছে, বিচার শেষে বাধ্য হয়ে মত পাল্টানোর পর তিনি ফিসফিস করে বলেছিলেন, ‘তবুও পৃথিবী ঘুরছে’। তাঁকে তাঁর মত প্রত্যাহার করতে বাধ্য করা হয় এবং জীবনের শেষ আট বছর ভিলা আরসেট্রিতে গৃহবন্দী করে রাখা হয়।
গৃহবন্দী থেকেও তিনি থেমে থাকেননি। পেন্ডুলাম, তাপমাত্রা ও গতি নিয়ে কাজ করে গেছেন। তাঁর বানানো থার্মোস্কোপ ছিল থার্মোমিটারের আদি রূপ। তাঁর লেন্সের উন্নতি মাইক্রোস্কোপ আবিষ্কারের পথ খুলে দেয়। তাঁর ছাত্র টরিসেলি পরে ব্যারোমিটার আবিষ্কার করেন।
বাইবেল ও চার্চের দীর্ঘদিনের বিশ্বাস ছিল, পৃথিবীই মহাবিশ্বের কেন্দ্র। কিন্তু গ্যালিলিওর টেলিস্কোপের সাহায্যে শুক্র গ্রহের দশা পর্যবেক্ষণ করে নিশ্চিত হলেন, শুক্র সূর্যকে কেন্দ্র করে ঘোরে, পৃথিবীকে নয়।
১৬৪২ সালে গ্যালিলিও মারা যান। প্রায় এক শতাব্দী পর যখন তাঁর দেহাবশেষ সান্তা ক্রোস চার্চের এক বিশাল সমাধিতে স্থানান্তর করা হয়, তখন তাঁর ভক্তরা কঙ্কাল থেকে কিছু হাড় সরিয়ে ফেলেন। এর মধ্যে গ্যালিলিওর হাতের মাঝখানের আঙুলটি এখন গ্যালিলিও মিউজিয়ামে প্রদর্শিত হচ্ছে। কাঁচের জারে রাখা সেই শুকনো আঙুলটি সোজা আকাশের দিকে তাক করা।
দৃশ্যটি একই সঙ্গে ভুতুড়ে এবং কাব্যিক। আঙুলটি হয়তো সেই মহাকাশের দিকেই নির্দেশ করছে, যা দেখার জন্য তিনি জীবন উৎসর্গ করেছিলেন। অথবা কে জানে, হয়তো যারা তাঁকে একদিন ভুল প্রমাণ করতে চেয়েছিল, অনন্তকাল ধরে তিনি তাদের দিকেই এই আঙুল উঁচিয়ে রেখেছেন এক নীরব কিন্তু শ্লেষাত্মক জয়ে!
আজ ১৫ ফেব্রুয়ারি এই বিজ্ঞানীর জন্মদিনে বিজ্ঞানচিন্তার পক্ষ থেকে রইল বিনম্র শ্রদ্ধা।