ডার্ক ম্যাটার ও ডার্ক এনার্জি খুঁজতে ডিটেক্টর তৈরি করছেন বিজ্ঞানীরা
রাতের আকাশে তাকিয়ে তারা দেখেছেন নিশ্চয়ই। এত এত তারা দেখে অবাক হতে হয়। যতদূর চোখ যায় শুধু তারা আর তারা। এসব তারা নিয়ে তৈরি হয় গ্যালাক্সি, নীহারিকা। মনে হয় এই তো মহাবিশ্ব। কিন্তু এখানেই সব শেষ নয়, বলতে পারেন শুরু মাত্র। আমরা যা কিছু দেখি—তারা, গ্রহ, মানুষ, পৃথিবী—সব মিলিয়ে মহাবিশ্বের মোট উপাদানের মাত্র মাত্র ৫ শতাংশ আমরা দেখতে পাই। বাকি ৯৫ শতাংশ আমাদের অপরিচিত। এই অপরিচিত অংশই হলো ডার্ক ম্যাটার এবং ডার্ক এনার্জি। বিজ্ঞানীরা জানেন এরা আছে, কিন্তু এরা আসলে কী দিয়ে তৈরি, তা কেউ জানে না।
তবে এই অন্ধকারের রহস্যভেদ করতে এবার মাঠে নেমেছেন যুক্তরাষ্ট্রের টেক্সাস এঅ্যান্ডএম ইউনিভার্সিটির পদার্থবিজ্ঞানী রূপক মহাপাত্র এবং তাঁর দল। তাঁরা এমন এক শনাক্তকারী যন্ত্র বানাচ্ছেন, যা অদৃশ্য মহাবিশ্বের মুখোশ খুলে দিতে পারে।
সম্প্রতি তাঁদের এই গবেষণার কথা প্রকাশিত হয়েছে বিখ্যাত অ্যাপ্লায়েড ফিজিকস লেটারস জার্নালে।
ডার্ক ম্যাটার ও ডার্ক এনার্জি আসলে কী
নাম শুনেই বোঝা যাচ্ছে, এরা আলো দেয় না, আলো শুষেও নেয় না। তাই টেলিস্কোপ দিয়ে এদের দেখা অসম্ভব। কিন্তু এদের মহাকর্ষীয় টান আমরা অনুভব করতে পারি।
সহজ করে বললে, ডার্ক ম্যাটার একধরনের ‘আঠা’, যা গ্যালাক্সিগুলোকে একসঙ্গে ধরে রাখে। আর ডার্ক এনার্জি হলো এমন এক শক্তি, যা মহাবিশ্বকে ক্রমাগত বেলুনের মতো ফুলিয়ে দূরে ঠেলে দিচ্ছে। ডার্ক ম্যাটার মহাবিশ্বের ২৭ শতাংশ জায়গা দখল করে আছে। আর ডার্ক এনার্জি আছে ৬৮ শতাংশ জুড়ে।
ড. মহাপাত্র এই অবস্থাকে একটি পুরোনো গল্পের সঙ্গে তুলনা করেছেন। অন্ধের হাতি দেখার মতো। কেউ লেজ ধরে ভাবছে দড়ি, কেউ পা ধরে ভাবছে থাম। আমরাও মহাবিশ্বের সামান্য একটু অংশ ধরেই পুরোটা বোঝার চেষ্টা করছি।
ডার্ক ম্যাটার একধরনের আঠা, যা গ্যালাক্সিগুলোকে একসঙ্গে ধরে রাখে। আর ডার্ক এনার্জি হলো এমন এক শক্তি, যা মহাবিশ্বকে ক্রমাগত বেলুনের মতো ফুলিয়ে দূরে ঠেলে দিচ্ছে।
ঝড়ের মধ্যে ফিসফিসানি শব্দ
ড. মহাপাত্রের দল যে যন্ত্রটি বানাচ্ছে, তার নাম টেসারেক্ট (TESSERACT)। এটি সাধারণ কোনো যন্ত্র নয়। একে কাজ করতে হয় পরমশূন্য তাপমাত্রার কাছাকাছি ঠান্ডায়।
এত আয়োজন করার কারণ, ডার্ক ম্যাটার সাধারণ পদার্থের সঙ্গে প্রায় মেশেই না। এগুলো এত দুর্বলভাবে ইন্টারঅ্যাক্ট করে যে, হয়তো বছরে একবার বা দশ বছরে একবার কোনো কণা এই যন্ত্রে ধরা দিতে পারে।
টেসারেক্টের কাজ হলো সেই বিরল ঘটনাটি খুঁজে বের করা। কিন্তু বিজ্ঞানীরা হাল ছাড়েননি। তাঁরা এমন প্রযুক্তি তৈরি করছেন, যা নয়েজ কমিয়ে ওই সূক্ষ্ম সংকেতটুকু ধরে ফেলতে পারে।
প্রযুক্তির সীমানা পেরিয়ে
ড. মহাপাত্র গত ২৫ বছর ধরে এই অদৃশ্য কণার পেছনে ছুটছেন। তিনি বিখ্যাত সুপার সিডিএমএস এক্সপেরিমেন্টের সঙ্গেও যুক্ত। ২০১৪ সালে তিনি এবং তাঁর দল এমন এক যুগান্তকারী পদ্ধতি আবিষ্কার করেছিলেন, যা দিয়ে খুব কম ভরের কণা শনাক্ত করা সম্ভব।
তিনি বিশ্বাস করেন, কোনো একটি নির্দিষ্ট পরীক্ষা দিয়ে সব উত্তর পাওয়া যাবে না। তাই তিনি বিভিন্ন পদ্ধতির মেলবন্ধন ঘটাতে চান।
ডার্ক ম্যাটার সাধারণ পদার্থের সঙ্গে প্রায় মেশেই না। এগুলো এত দুর্বলভাবে ইন্টারঅ্যাক্ট করে যে, হয়তো বছরে একবার বা দশ বছরে একবার কোনো কণা এই যন্ত্রে ধরা দিতে পারে।
রহস্যময় কণা উইম্পস
ডার্ক ম্যাটার আসলে কী দিয়ে তৈরি? বিজ্ঞানীদের ধারণা, এর অন্যতম দাবিদার উইম্পস বা উইকলি ইন্টারঅ্যাক্টিং ম্যাসিভ পার্টিকেলস। এগুলো এত গুরুত্বপূর্ণ কেন? উইম্পসের অস্তিত্ব প্রমাণ করা গেলে মহাবিশ্বের হারিয়ে যাওয়া ভরের হিসাব মিলে যাবে।
সুপার সিডিএমএস এবং টেসারেক্টের মতো যন্ত্রগুলো মাটির নিচে গভীর অন্ধকারে পরমশূন্য তাপমাত্রায় পাতা হয়েছে। উদ্দেশ্য একটাই, যদি কোনো উইম্প কণা ভুল করে ডিটেক্টরে ধাক্কা দেয়!
তবে সমস্যা হলো, একটা উইম্প কণা হয়তো পৃথিবীর এপাশ থেকে ওপাশ পর্যন্ত চলে যাবে, কিন্তু কোনো কিছুর সঙ্গে ধাক্কাই খাবে না। তাই বছরের পর বছর অপেক্ষা করা ছাড়া বিজ্ঞানীদের করার কিছু নেই।
ড. মহাপাত্র আশাবাদী হয়ে বলেছেন, ‘আমরা যদি ডার্ক ম্যাটার শনাক্ত করতে পারি, তবে পদার্থবিজ্ঞানের নতুন এক অধ্যায় শুরু হবে। এটা এমন সব প্রযুক্তির জন্ম দেবে, যা আজ আমরা কল্পনাও করতে পারছি না।’
অদৃশ্য সেই কণাটি কি ধরা দেবে মানুষের পাতা ফাঁদে? নাকি মহাবিশ্ব তার রহস্য চাদরেই ঢেকে রাখবে? উত্তরটা সময়ই বলে দেবে।