ডার্ক ম্যাটার কেন এখনো বিজ্ঞানের সবচেয়ে বড় রহস্য

ডার্ক ম্যাটারের কাল্পনিক ছবিছবি: সায়েন্স ফটো লাইব্রেরি

বর্তমান সময়টা ডার্ক ম্যাটার গবেষকদের জন্য একটু অদ্ভুত। একদিকে বিশ্বজুড়ে গবেষণার অর্থায়ন কমে যাচ্ছে, অন্যদিকে পদার্থবিজ্ঞানের তথা বিজ্ঞানের সবচেয়ে বড় অমীমাংসিত রহস্য হয়ে দাঁড়িয়ে আছে এই ডার্ক ম্যাটার।

মহাবিশ্বের হিসাবটা মেলানো যাচ্ছে না কিছুতেই। আমরা যা দেখি, তা আসলে সমুদ্রে ভাসমান বরফখণ্ডের চূড়ার মতো। মহাবিশ্বে প্রতি এক কেজি দৃশ্যমান বস্তুর (যেমন—নক্ষত্র, গ্রহ, মানুষ) বিপরীতে লুকিয়ে আছে প্রায় পাঁচ কেজি ডার্ক ম্যাটার। আমরা কিন্তু এদের চোখে দেখিনি। শুধু বুঝতে পেরেছি, কিছু একটা আছে আছে। কারণ, দৃশ্যমান মহাবিশ্বের ওপর এদের মহাকর্ষীয় প্রভাব স্পষ্ট।

গ্যালাক্সিগুলোর ক্লাস্টারগুলো যেভাবে টিকে আছে, ডার্ক ম্যাটার ছাড়া তার ব্যাখ্যা দেওয়া অসম্ভব। মহাবিশ্বের শুরুর দিকের আলোর বিন্যাসও আমাদের বলে,  সেখানে এমন কিছু আছে যা আমাদের মডেলে এখনো পুরোপুরি ধরা দেয়নি। মানে মহাবিশ্বে প্রচুর অদৃশ্য ভর আছে, যা আমরা দেখতে পাই না ঠিকই, কিন্তু দৃশ্যমান বস্তুকে তারা নিয়ন্ত্রণ করে।

ভেরা সি. রুবিন অবজারভেটরি মহাকাশে ১০ বছর মেয়াদি জরিপ শুরু করতে যাচ্ছে
ছবি: এনএসএফ-ডিওই রুবিন অবজারভেটরি / এইউআরএ / বি. কুইন্ট

২০২০-এর দশকের এই সময়টা ডার্ক ম্যাটার গবেষণার জন্য দারুণ! ইউরোপিয়ান স্পেস এজেন্সির ইউক্লিড স্পেস টেলিস্কোপ গ্যালাক্সির গঠন বুঝতে সাহায্য করছে। একই সঙ্গে ভেরা সি. রুবিন অবজারভেটরি শুরু করতে যাচ্ছে মহাকাশে ১০ বছর মেয়াদি জরিপ। বড় গ্যালাক্সিগুলোর চারপাশে ঘুরতে থাকা ছোট গ্যালাক্সিগুলোর ওপর ডার্ক ম্যাটারের প্রভাব বুঝতে এই জরিপ নতুন দিগন্ত খুলে দেবে।

আরও পড়ুন
মহাবিশ্বের শুরুর দিকের আলোর বিন্যাসও আমাদের বলে,  সেখানে এমন কিছু আছে যা আমাদের মডেলে এখনো পুরোপুরি ধরা দেয়নি।

যাকে দেখা যায় না, তাকে নিয়ে গবেষণা করাটা বিজ্ঞানীদের সৃজনশীলতার চূড়ান্ত পরীক্ষা। তাঁরা এখন ডার্ক ম্যাটারকে বোঝার জন্য ব্যবহার করছেন কোয়ান্টাম ফিল্ড থিওরি।

কোয়ান্টাম ফিল্ড থিওরি অনুযায়ী, মহাবিশ্বের সব জায়গায় কণা তৈরির ক্ষেত্র ছড়িয়ে আছে, বিশেষ শর্তে সেখানে কণা বা পার্টিকল দেখা যায়। বিজ্ঞানীদের ধারণা, ডার্ক ম্যাটারও সাধারণ কণার মতো গাণিতিক নিয়ম মেনে চলে।

কোয়ান্টাম ফিল্ড থিওরি
ছবি: উইকিপিডিয়া

ডার্ক ম্যাটার কী দিয়ে তৈরি, তা যেহেতু আমরা জানি না, তাই বিজ্ঞানীরা ইফেক্টিভ ফিল্ড থিওরি নামে একটি পদ্ধতি ব্যবহার করছেন। এটি হলো একগুচ্ছ সাধারণ সমীকরণ, যা পর্যবেক্ষণের ওপর ভিত্তি করে ঠিকঠাক করে নেওয়া যায়।

এতদিন বিজ্ঞানীরা চেষ্টা করতেন, ডার্ক ম্যাটার কোনো বস্তুকে সরাসরি আঘাত করছে কি না তা খুঁজে বের করতে। এখন তাঁরা কৌশল বদলেছেন। তাঁরা এখন খুঁজছেন ডার্ক ম্যাটার ইলেকট্রনের সঙ্গে ধাক্কা খেয়ে ছিটকে যাচ্ছে কি না।

আরও পড়ুন
কোয়ান্টাম ফিল্ড থিওরি অনুযায়ী, মহাবিশ্বের সব জায়গায় কণা তৈরির ক্ষেত্র ছড়িয়ে আছে, বিশেষ শর্তে সেখানে কণা ফুটে ওঠে। বিজ্ঞানীদের ধারণা, ডার্ক ম্যাটারও কণার মতো গাণিতিক নিয়ম মেনে চলে।

সম্প্রতি পিয়ার্স গিফিন, বেঞ্জামিন লিলার্ড ও তাঁদের দল একটি গবেষণাপত্র (প্রি-প্রিন্ট) প্রকাশ করেছেন। তাঁরা এমন একটি EFT মডেল প্রস্তাব করেছেন, যা এই ইলেকট্রন স্ক্যাটারিংয়ের ঘটনাকে আরও ভালোভাবে ব্যাখ্যা করতে পারবে।

মহাবিশ্বের সবচেয়ে বড় রহস্য ডার্ক ম্যাটার
ছবি: নাসা

হয়তো এই গবেষণাটি সবকিছু বদলে দেবে না, পত্রিকার প্রথম পাতার খবর হবে না, কিন্তু বিজ্ঞান এভাবেই এগোয়—ধীরে, নিঃশব্দে। আমাদের মনে রাখা দরকার, মহাবিশ্বের সবচেয়ে বড় রহস্যভেদের জন্য সবচেয়ে বেশি প্রয়োজন ধৈর্য।

লেখক: ফ্রন্টেন্ড ডেভলপার, সফটভেঞ্চ

সূত্র: সায়েন্টিফিক আমেরিকান

আরও পড়ুন