মহাকর্ষের প্রভাবে কি সত্যিই বয়স ধীরে বাড়ে
প্রতিদিন আপনি হয়তো কাজের প্রয়োজনে কয়েকবার সিঁড়ি ভেঙে দোতলায় ওঠেন। কিন্তু কখনো কি ভেবেছেন, সিঁড়ির নিচের ধাপটির চেয়ে ওপরের ধাপে আপনার সময় কিছুটা হলেও দ্রুত কাটছে? শুনতে অবিশ্বাস্য হলেও বিজ্ঞান বলছে, কথাটি শতভাগ সত্যি!
এক শতাব্দীরও বেশি আগে আলবার্ট আইনস্টাইনের সাধারণ আপেক্ষিকতা তত্ত্ব মহাবিশ্ব সম্পর্কে মানুষের জানাশোনার ভিতটাই পুরোপুরি পাল্টে দিয়েছিল। এই তত্ত্বের সবচেয়ে বিস্ময়কর আবিষ্কারগুলোর একটি হলো, সময়ের এই বয়ে চলা সব জায়গায় মোটেও সমান নয়।
পৃথিবী থেকে আপনি যত ওপরে উঠবেন বা দূরে যাবেন, মহাকর্ষের প্রভাব তত কমতে থাকবে। আর মহাকর্ষের প্রভাব যেখানে কম, সেখানে সময় ঠিক ততটাই দ্রুত ছুটতে শুরু করবে!
মহাকর্ষ ও সময়ের অদ্ভুত সম্পর্ক
এই অদ্ভুতুড়ে ব্যাপারটি ঘটার মূল কারণ হলো মহাকর্ষ। কোনো বস্তু পৃথিবীর যত কাছাকাছি থাকে, তার ওপর পৃথিবীর মহাকর্ষের টান তত বেশি হয়। আপেক্ষিকতা তত্ত্ব অনুযায়ী, মহাকর্ষ হলো মূলত স্থান ও কালের একধরনের বক্রতা। ভর আছে এমন যেকোনো বস্তু এই স্থান-কালের অদৃশ্য চাদরকে নিজের চারদিকে বাঁকিয়ে দেয়। তাই পৃথিবী থেকে আপনি যত ওপরে উঠবেন বা দূরে যাবেন, মহাকর্ষের প্রভাব তত কমতে থাকবে। আর মহাকর্ষের প্রভাব যেখানে কম, সেখানে সময় ঠিক ততটাই দ্রুত ছুটতে শুরু করবে!
যুক্তরাজ্যের দ্য ওপেন ইউনিভার্সিটির জ্যোতির্পদার্থবিজ্ঞানের অধ্যাপক অ্যান্ড্রু নর্টন পুরো ব্যাপারটি বুঝিয়ে দিয়েছেন। তাঁর মতে, স্থান-কাল হলো একটি চারমাত্রিক চাদর; যার তিনটি মাত্রা হলো স্থান (ওপর-নিচ, ডান-বাঁ, সামনে-পেছনে) এবং অপরটি হলো কাল বা সময় (অতীত-ভবিষ্যৎ)। ভরের কারণে এই চাদরটি যখন বেঁকে যায়, তখন একইসঙ্গে স্থানের বক্রতা এবং সময়ের প্রসারণ ঘটে। দৈনন্দিন জীবনে এর প্রভাব এতই নগণ্য যে আমরা তা খালি চোখে টেরই পাই না।
আপেক্ষিকতা তত্ত্ব অনুযায়ী, মহাকর্ষ হলো মূলত স্থান ও কালের একধরনের বক্রতা। ভর আছে এমন যেকোনো বস্তু এই স্থান-কালের অদৃশ্য চাদরকে নিজের চারদিকে বাঁকিয়ে দেয়।
পাহাড়ের চূড়ায় কি বয়স দ্রুত বাড়ে
সময় যদি সত্যিই মহাকর্ষের ওপর নির্ভর করে, তবে কি সমুদ্রপৃষ্ঠে থাকা মানুষের চেয়ে পাহাড়ের চূড়ায় থাকা মানুষের বয়স দ্রুত বাড়ে? সহজ কথায় উত্তর, হ্যাঁ।
যুক্তরাষ্ট্রের ন্যাশনাল ইনস্টিটিউট অব স্ট্যান্ডার্ডস অ্যান্ড টেকনোলজির পদার্থবিদ জেমস চিন-ওয়েন চৌ ঠিক এই কথাই বলেছেন। তিনি জানান, মহাকর্ষের কারণে তুলনামূলকভাবে আমাদের বয়স ধীরে বাড়ে। মহাজাগতিক কোনো বিশাল ভরের বস্তুর কাছাকাছি না থাকা একজন মানুষের তুলনায় আমাদের বয়স অত্যন্ত সামান্য পরিমাণে হলেও ধীরগতিতে বাড়ছে।
এই পার্থক্য খুবই সামান্য হলেও তা বৈজ্ঞানিকভাবে মাপা সম্ভব। ধরুন, আপনি সমুদ্রপৃষ্ঠ থেকে ২৯ হাজার ফুট উঁচুতে মাউন্ট এভারেস্টের চূড়ায় টানা ৩০ বছর বসে থাকলেন। এই ৩০ বছর পর হিসাব কষলে দেখা যাবে, সমুদ্রপৃষ্ঠে থাকা একজন মানুষের চেয়ে আপনার বয়স মাত্র ০.৯১ মিলি সেকেন্ড বেশি হয়েছে! একইভাবে, সমুদ্রপৃষ্ঠে বসবাসকারী যমজ দুই ভাইয়ের একজন যদি ১৬০০ মিটার উঁচু কোনো পাহাড়ি শহরে টানা ৩০ বছর কাটিয়ে ফিরে আসেন, তবে তিনি তার যমজ ভাইয়ের চেয়ে ০.১৭ মিলি সেকেন্ড বেশি বয়সী হবেন।
মহাজাগতিক কোনো বিশাল ভরের বস্তুর কাছাকাছি না থাকা একজন মানুষের তুলনায় আমাদের বয়স অত্যন্ত সামান্য পরিমাণে হলেও ধীরগতিতে বাড়ছে।
বিজ্ঞানের অগ্রগতি এখন এতই সূক্ষ্ম যে, পাহাড়ের চূড়া পর্যন্ত যাওয়ারও দরকার নেই। ২০২২ সালে নেচার জার্নালে প্রকাশিত একটি গবেষণাপত্রে ন্যাশনাল ইনস্টিটিউট অব স্ট্যান্ডার্ডস অ্যান্ড টেকনোলজির বিজ্ঞানীরা বিশ্বের সবচেয়ে নিখুঁত পারমাণবিক ঘড়ি ব্যবহার করে একটি পরীক্ষা চালান। সেখানে তাঁরা প্রমাণ করে দেখিয়েছেন, পৃথিবীর পৃষ্ঠ থেকে মাত্র ০.২ মিলিমিটার ওপরেও সময় অপেক্ষাকৃত দ্রুত চলে!
এই গবেষণার অন্যতম লেখক টোবিয়াস বোথওয়েল জানান, ‘এগুলো শুধু খাতায়-কলমের তাত্ত্বিক হিসাব নয়। মানুষের একটি চুলের যে প্রস্থ, ঠিক ততটুকু দূরত্বের ব্যবধানেও আমরা ঘড়ির টিক টিক শব্দের পরিবর্তন মাপতে পেরেছি।’
টোবিয়াস বোথওয়েল জানান, ‘এগুলো শুধু খাতায়-কলমের তাত্ত্বিক হিসাব নয়। মানুষের একটি চুলের যে প্রস্থ, ঠিক ততটুকু দূরত্বের ব্যবধানেও আমরা ঘড়ির টিক টিক শব্দের পরিবর্তন মাপতে পেরেছি।’
জিপিএস প্রযুক্তিতে মহাকর্ষ
আমাদের দৈনন্দিন জীবনে এই মিলি সেকেন্ডের হিসাব হয়তো কোনো কাজে আসে না, কিন্তু মহাকাশ প্রযুক্তির ক্ষেত্রে এই মহাকর্ষীয় সময় প্রসারণের প্রভাব এড়িয়ে যাওয়ার কোনো উপায় নেই। আমরা যে জিপিএস ব্যবহার করি, সেই স্যাটেলাইটগুলো পৃথিবী থেকে ২০ হাজার ১৮৬ কিলোমিটার ওপরে পৃথিবীকে প্রদক্ষিণ করছে। সেখানে পৃথিবীর তুলনায় মহাকর্ষ বল অনেকটাই কম। ফলে মহাকর্ষীয় প্রভাবের কারণে স্যাটেলাইটের ভেতরের ঘড়িগুলো পৃথিবীর ঘড়ির তুলনায় প্রতি ২৪ ঘণ্টায় ৪৫.৭ মাইক্রোসেকেন্ড দ্রুত চলে।
বিজ্ঞানীদের প্রতিদিন এই সময়ের পার্থক্যটুকু খুব সতর্কতার সঙ্গে সমন্বয় করতে হয়। তা না হলে আমাদের মোবাইলের জিপিএস ম্যাপে আমাদের সঠিক অবস্থান দেখানো সম্ভব হতো না।
সব মিলিয়ে এ কথা নিশ্চিতভাবেই বলা যায় যে, মহাকর্ষ আসলেই আমাদের বয়স ধীরে বাড়ায়। তবে হ্যাঁ, মিলি সেকেন্ডের ভগ্নাংশের এই পার্থক্যটুকু কাজে লাগিয়ে আজীবন তারুণ্য ধরে রাখার আশায় সারা জীবন সমুদ্রসৈকতে বসে কাটানোটা খুব একটা ফলপ্রসূ হবে না। তবে মহাবিশ্বের এই অদ্ভুত নিয়ম অন্তত আমাদের এটুকু মনে করিয়ে দেয়, সময় সত্যিই ভীষণ আপেক্ষিক; বিশেষ করে আপনি যখন পৃথিবীর মায়ার বাঁধন ছাড়িয়ে দূরে কোথাও পাড়ি জমাবেন!